 |
| ছবি:সোহেল সরওয়ার/ বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম |
চট্টগ্রাম: ``নেত্রকোনার জনগণ`` পরিচয় দিয়ে চাঞ্চল্যকর দশ ট্রাক অস্ত্র মামলার বিচারক, চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ এস এম মুজিবুর রহমানের কাছে ‘মৃত্যু পরোয়ানা’ লেখা কাফনের কাপড় পাঠিয়েছে অজ্ঞাতপরিচয় দুর্বৃত্তরা।
একই সঙ্গে দশ ট্রাক অস্ত্র মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত রায় দিলে রিমোট কন্ট্রোল বোমায় মহানগর দায়রা জজ আদালত ও বিচারককে উড়িয়ে দেওয়ারও হুমকি দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার সকাল ৯টায় নিজ কার্যালয়ে আসার পর চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ ডাকযোগে আসা একটি খাম খুলে কাফনের কাপড় এবং তার সঙ্গে এক পৃষ্ঠার একটি চিঠি হাতে পান। এ ঘটনায় মহানগর দায়রা জজ নিজের জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে নগরীর কোতয়ালী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) দায়ের করেছেন।
এদিকে, মহানগর দায়রা জজকে পরোয়ানা পাঠানোর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর আদালত অঙ্গনে আতংক ছড়িয়ে পড়েছে। সংশ্লিষ্ট আদালতে নিরাপত্তা জোরদার করেছে পুলিশ। সার্বিক পরিস্থিতিতে আদালতের কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।

চট্টগ্রাম মহানগর সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) অ্যাডভোকেট কামাল উদ্দিন আহমেদ এ ঘটনাকে দশ ট্রাক অস্ত্র মামলার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ বিচারের পথে বাধা সৃষ্টির চক্রান্ত বলে মন্তব্য করেছেন।
মহানগর পিপি বাংলানিউজকে বলেন, “চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় থাকার সময় দশ ট্রাক অস্ত্র আটকের ঘটনা ধামাচাপা দিতে চেয়েছিল। এখন হুমকি-ধমকি দিয়ে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বাবরের লোকজন বিচার বন্ধ করতে চাচ্ছে। সরকার এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উচিৎ হবে বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা।”
সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের পক্ষে মামলা পরিচালনাকারী অ্যাডভোকেট এস ইউ নূরুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে বাংলানিউজকে বলেন, “এটি বাবর সাহেবের কোনো অন্ধভক্তের অতি উৎসাহী কাজ অথবা বাবর সাহেবকে বিপদে ফেলার জন্য কারও সাজানো কাজ হতে পারে। পুলিশের উচিৎ হবে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করে দেখা।”
মহানগর দায়রা জজকে কাফনের কাপড় পাঠানোর খবর শুনে ঘটনাস্থলে যান নগর গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী কমিশনার (উত্তর) শাহরিয়ার আলী। এসময় ওই আদালতে বিচারকের চেম্বারের সামনে এবং আশপাশে পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
শাহরিয়ার আলী বাংলানিউজকে বলেন, “কাফনের কাপড়ের সঙ্গে যে চিঠি পাঠানো হয়েছে তাতে স্পষ্টত দশ ট্রাক অস্ত্র মামলার জন্য বিচারককে হুমকি দেওয়া হয়েছে। এটা বিচার প্রভাবিত করার চেষ্টা। কারা এটা করতে পারে, নাকি নিছক ভয় দেখানোর উদ্দেশ্যে কেউ এ কাজ করেছে তা আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখব।”
পাশাপাশি চট্টগ্রাম আদালতের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে বলেও জানান সহকারী কমিশনার (গোয়েন্দা) শাহরিয়ার আলী।

কোতয়ালী থানার ওসি (তদন্ত) সদীপ কুমার দাশ বাংলানিউজকে বলেন, “মহানগর দায়রা জজকে হুমকি দেওয়ার বিষয়ে একটি অভিযোগ আমরা পেয়েছি। আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিষয়টি তদন্ত করব। পাশাপাশি বিচারকের নিরাপত্তায় আমরা সব ধরনের ব্যবস্থা নেব।”
আদালত সূত্রে জানা গেছে, একটি সাদা কাফনের কাপড়ে লাল রক্ত দিয়ে লিখে দেওয়া হয়েছে, “এটি তোমার মৃত্যুর পরোয়ানা।” এছাড়া ওই কাপড়ে বোমায় বিধ্বস্ত মানুষের একটি কার্টুনও এঁকে দেওয়া হয়েছে।
কাপড়ের সঙ্গে পাঠানো চিঠিতে চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ এস এম মুজিবুর রহমানের নাম উল্লেখ করে লেখা হয়েছে, “নেত্রকোনাবাসীর নয়নমণি, সাবেক সফল স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, শহীদ জিয়ার আদর্শের সৈনিক লুৎফুজ্জামান বাবর ভাইকে যদি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সাজা দেওয়া হয় তাহলে মনে রাখবে, রিমোট কন্ট্রোল টিপে বোমা মেরে যেখানে বসে থাকবে সেখানে উড়িয়ে দেয়া হবে।”
এতে আরও লেখা হয়েছে, “আমাদের নেতা বাবর ভাইয়ের সঙ্গে কাশিমপুর কারাগার কর্তৃপক্ষ খারাপ ব্যবহার করে। তার সঙ্গে ফ্যামিলির লোকজন দেখা করতে গেলে গোয়েন্দারা বিরক্ত করে। চট্টগ্রাম আদালতে নেওয়ার পথে এবং এজলাসে তাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রাখা হয়।”
এতে বলা হয়, “বাবর ভাইয়ের বিরুদ্ধে প্রহসনের বিচার বন্ধ না করলে রিমোট কন্ট্রোল বোমা মেরে উড়িয়ে দেওয়া হবে।”
চিঠির শেষ অংশে লেখা হয়েছে, “এটি আপনার মৃত্যুর নোটিশ। আপনি বাবর ভাইকে সাজা দিয়ে হাইকোর্টের বিচারপতি হবার স্বপ্ন দেখছেন। আপনাকে হাইকোর্টের বিচারপতি হবার স্বপ্ন পূরণ হতে দেব না।”
চিঠির নিচে “ইতি-নেত্রকোণার জনগণ” লেখা হয়েছে। চিঠিতে তারিখ-৩ অক্টোবর, ২০১২ লেখা থাকলেও সেটি পোস্ট করা হয়েছে ৪ অক্টোবর।

কাফনের কাপড়ের সঙ্গে সংযুক্ত এক পৃষ্ঠার চিঠিটি যে খামে করে পাঠানো হয়েছে তার প্রেরকের স্থানে লেখা হয়েছে, শহীদ মিয়া, হলি সুপার মার্কেট, মীরপুর, ঢাকা-১২১৬। প্রাপক হিসেবে বলা হয়েছে, এস এম মুজিবুর রহমান, মহানগর দায়রা জজ, চট্টগ্রাম আদালত।
মহানগর দায়রা জজ আদালত এবং বিচারককে বোমায় উড়িয়ে দেওয়ার হুমকির কারণে সাংবাদিকদের কাছে নিজের জীবনের নিরাপত্তা নিয়েও শংকা প্রকাশ করেছেন শুরু থেকেই রাষ্ট্রপক্ষে এ মামলা পরিচালনকারী মহানগর পিপি অ্যাডভোকেট কামাল উদ্দিন আহমেদ।
মহানগর পিপি বলেন, “বিচারককে হুমকি দেওয়ার পর এ মামলার সর্বশেষ তদন্তকারী কর্মকর্তা, সাক্ষীসহ সবার জীবনের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছে। এর আগেও এক সাক্ষীকে একইভাবে চিঠি পাঠিয়ে হুমকি দেওয়া হয়েছিল।”
উল্লেখ্য, এ মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী, তত্তাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও সাবেক শিল্পসচিব ড. শোয়েব আহমেদকে চিঠি পাঠিয়ে হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে তিনি আদালতকে জানিয়েছিলেন। এ ঘটনার পর তার নিরাপত্তার বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ডিএমপি কমিশনারকে নির্দেশ দিয়েছিলেন আদালত।
হুমকি দেওয়ার বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর চট্টগ্রাম আদালতে কর্মরত বিচারকরা এবং অ্যাডভোকেট রেজাউল করিম চৌধুরী, অ্যাডভোকেট ইব্রাহিম হোসেন চৌধুরী বাবুলসহ চট্টগ্রাম বারের জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা মহানগর দায়রা জজের সঙ্গে দেখা করতে যান।
মহানগর দায়রা জজের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে বেরিয়ে অ্যাডভোকেট ইব্রাহিম হোসেন চৌধুরী বাবুল বাংলানিউজকে বলেন, “এটি কাপুরুষোচিত এবং ন্যক্কারজনক কাজ। ন্যায়বিচার, বিচার অঙ্গনের মর্যাদা এবং বিচারকের সম্মান ও নিরাপত্তা রক্ষায় আমরা অতীতেও সব আইনজীবীরা ঐক্যবদ্ধ ছিলাম, এখনও আছি। আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে কাপুরুষদের এসব কর্মকাণ্ড মোকাবেলা করব।”
উল্লেখ্য, ২০০৪ সালের ১ এপ্রিল রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানা চিটাগং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল) জেটিঘাটে দশ ট্রাক অস্ত্রের চালানটি ধরা পড়ে।
বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমল থেকে প্রায় সাড়ে তিন বছর অধিকতর তদন্তের পর ২০১১ সালের ২৬ জুন সিআইডি আদালতে দশ ট্রাক অস্ত্র মামলার সম্পূরক চার্জশিট দাখিল করেন।
এরপর ওই বছরের ১৫ নভেম্বর আসামিদের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগ (চার্জ) গঠন করা হয়। ২০১১ সালের ২৯ নভেম্বর থেকে সাক্ষ্যগ্রহণের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে বিচার।
এ মামলার গুরুত্বপূর্ণ আসামিদের মধ্যে আছেন, জামায়াত নেতা ও বিএনপি সরকারের শিল্পমন্ত্রী মতিউর রহমান নিজামী, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) তৎকালীন মহাপরিচালক অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আব্দুর রহিম, প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই’র তৎকালীন পরিচালক অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী, এনএসআই’র সাবেক পরিচালক অবসরপ্রাপ্ত উইং কমান্ডার সাহাবুদ্দিন, উপ-পরিচালক অবসরপ্রাপ্ত মেজর লিয়াকত হোসেন, ফিল্ড অফিসার আকবর হোসেন খান, রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানা সিইউএফএল’র সাবেক এমডি মোহসীন তালুকদার, সিইউএফএল’র সাবেক মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) এনামুল হক, চোরাচালানি হিসেবে অভিযুক্ত হাফিজুর রহমান ও ট্রলার মালিক দীন মোহাম্মদ।
এ ছাড়া সম্পূরক চার্জশিটভুক্ত দু`আসামি ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট অব আসামের (উলফা) সামরিক কমান্ডার পরেশ বড়ুয়া ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সচিব নূরুল আমিন বর্তমানে পলাতক আছেন।
বাংলাদেশ সময় : ১৩১১ ঘণ্টা, অক্টোবর ১৬, ২০১২
আরডিজি/সম্পাদনা: রানা রায়হান, অ্যাসিসট্যান্ট; জুয়েল মাজহার, কনসালট্যান্ট এডিটর jewel_mazhar@yahoo.com