 |
| ছবি: নয়ন কুমার /বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম |
ঢাকা: তরুণদের সামাজিক ফিকশন তৈরির আহবান জানিয়েছেন শান্তিতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
তিনি বলেছেন, ``বিজ্ঞান নিয়ে নানা কল্পকাহিনী (সায়েন্স ফিকশন) আছে। কিন্তু আজ থেকে ২০ বা ৫০ বছর পরে মানুষ কোথায় যাবে, কি সামাজিক পরিবর্তন হবে তার কোনো ফিকশন রচনা আমরা করতে পারিনি। তাই তোমাদের এখনই সামাজিক ফিকশনগুলো তৈরি করতে হবে। যাতে তোমরাই এর বাস্তবায়ন করতে পারো।``
মঙ্গলবার বিকেলে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি মিলনায়নতনে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর এন্টারপ্রেনরশিপ ডেভেলপমেন্ট ও এন্টারপ্রেনরশিপ ডেভেলপমেন্ট ফোরাম আয়োজিত সামাজিক ব্যবসা বিষয়ক একক বক্তৃতায় তিনি এ আহবান জানান।
ড. ইউনূস বলেন, ``সামাজিক ব্যবসায় মুনাফা নেওয়ার রেওয়াজ নেই। এটা মানুষের মঙ্গলের জন্য। এখান থেকে এর উদ্যোক্তারা মুনাফা নিতে পারবে না। আমরা টাকা উপার্জন করে যেমন আনন্দ পাই, তেমনি মানুষের সমস্যা দূর করতে পারলেও আনন্দ পাই। আর এ দুই তৃপ্তির মধ্যে সমন্বয় করতে পারে সামাজিক ব্যবসা।``
ড. ইউনূস বলেন, ``পরিকল্পনার মাধ্যমে একটি সমস্যার সমাধান করতে হবে। গ্রামীণব্যাংকের গ্রাহকরা শুধু অর্থ ঋণ দেয় না, তারা সঞ্চয়ও করে। আমাদের ২ হাজার ৬শ’ শাখা রয়েছে। এসব শাখায় গিয়ে আমি ব্যাংকের কর্মীদের সঙ্গে কথা বলি। তারা গ্রাহকদের ‘ঋণগ্রহীতা’ বলে। তখন আমি তাদের বলি এটা বলা যাবে না। তারা অর্থ ধার দেয় কিংবা ঋণ প্রদানকারী। আমরা ঋণ গ্রহণকারী। আমি বিষয়টি তাদের এভাবেই দেখতে বলি। গ্রামীণব্যাংক একটি সঞ্চয়ী ইনস্টিটিউট।``
তিনি বলেন, ``কেউ দরিদ্র নয়, কিংবা দরিদ্ররা দারিদ্র্যের জন্য দায়ী নয়। এজন্য দায়ী পদ্ধতি। যে বা যারা এই পদ্ধতি তৈরি করছে সে-ই এজন্য দায়ী। তাই পদ্ধতি বদলাতে হবে। আসলে প্রতিটি মানুষই উদ্যোক্তা।``
দেশের ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম সম্পর্কে নোবেলজয়ী ড. ইউনূস বলেন, ``এখানকার ব্যাংকিং পদ্ধতির মাধ্যমে ধনীরা আরো ধনী হবে। আর দরিদ্ররা দরিদ্রই থেকে যাবে। ধনীদের অর্থ তৈরির কাজেই ব্যাংকগুলো কাজ করছে। এটি আমাকে বিস্মিত করেছে। অথচ যার অর্থ নেই তার জন্য কিছুই করছে না ব্যাংকগুলো। গ্রামীণব্যাংক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আমরা এই ধারণা পাল্টে দিয়েছি।``
তিনি বলেন, ``বৈশ্বিক অর্থনীতির অবস্থা ভালো নয়। অর্থনীতির অবস্থা নড়বড়ে। পুন: পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে, যাতে করে আমরা সবাই মিলে সমস্যার সমাধান করতে পারি।``
তিনি বলেন, ``আমরা ভারত থেকে ডিম কিনি। যেদিন আমরা ভারতে ডিম বিক্রি করতে পারবো সেইদিন আমাদের অর্থনীতির চেহার পাল্টে যাবে। তাই মাছ, কৃষিসহ যেকোনো পণ্য উৎপাদন আমাদের বাড়াতে হবে।``
``সম্ভব ও অসম্ভবের মধ্যে পার্থক্য দিনে দিনে কমে আসছে`` বলে উল্লেখ করে নোবেলজয়ী এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ``আজ যে কাজ অসম্ভব কাল তা সম্ভব হচ্ছে। আর এজন্য কৃতিত্বের দাবিদার তরুণরাই।``
দারিদ্র সম্পর্কে তিনি বলেন, ``আগামী ২০ বছর পরের প্রজন্ম হয়তো দারিদ্র্ কি জিনিস তা জানবে না। তাদের বিষয়টি বোঝাতে হবে। অথবা বেকারত্ব শব্দটির মানে তাদের কাছে বোধগম্য হবে না। এভাবে ২০ কিংবা ৫০ বছর পরে কি হবে তার ফিকশন রচনা তরুণ প্রজন্মকেই করতে হবে। ‘চিন্তা ও পরিকল্পনা’ তোমাদেরকেই করতে হবে। সামাজিক ব্যবসা মানে স্রেফ অর্থ নয়, এটি একটি চিন্তা।``
সামাজিক ব্যবসার ওপর বক্তব্যের শুরুতে তিনি বলেন, ``চার দলীয় জোট সরকারের সময় গ্রামীণব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগের ক্ষমতা পরিচালনা পর্ষদের কাছে হাতে দেওয়ার একটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিকল্পনা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে এই কাজটি চূড়ান্ত হলেও আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার আর তা বাস্তবায়ন করেনি।``
এর পরপরই মুহাম্মদ ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংকের শুরুর ইতিহাস তুলে ধরে বিস্তারিত বক্তব্য রাখেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের অধ্যাপক ড. আকবর আলী খান।
বাংলাদেশ সময়: ১৭৪৩ ঘণ্টা, জুন ১২, ২০১২, এআর
সম্পাদনা: জাকারিয়া মন্ডল, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর;
জুয়েল মাজহার, কনসালট্যান্ট এডিটর