৬ আষাঢ় ১৪২০, বৃহস্পতিবার জুন ২০, ২০১৩ ৬:৩০ পিএম BDST banglanew24
11 Aug 2012   07:43:56 PM   Saturday BdST
E-mail this

ট্রিবিউট টু তারেক মাসুদ


বিপুল হাসান
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
ট্রিবিউট টু তারেক মাসুদ

‘পাখি উড়ে যায়, পালক পড়ে রয়’; ধীমান চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ নেই, রয়ে গেছে তার অনুপম কিছু নির্মাণ। তবে তিনি অন্যভাবে বেঁচে আছেন, বেঁচে থাকবেন তার চলচ্চিত্রের মাঝে। চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদের অকাল মৃত্যুর একবছর পূর্ণ হলো। প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে মেধাবী এই চলচ্চিত্রকারের প্রতি বাংলানিউজের বিনত শ্রদ্ধা।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার জন্য যারা স্বপ্ন দেখেছেন, চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ তাদের মধ্যে অন্যতম। তিনি শুধু স্বপ্নই দেখেননি, স্বপ্নপূরণের পথে হেঁটেছেন। সেই চলার পথেই ঘটে যায় মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। ২০১১ সালের ১৩ আগস্ট মানিকগঞ্জের অদূরে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ ও এটিএন নিউজের প্রধান নির্বাহী মিশুক মুনীরসহ ৫ জন।

চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ তার নতুন ছবি ‘কাগজের ফুল’- এর শুটিং লোকেশন নির্বাচনের জন্য ১৩ আগস্ট ভোরে মানিকগঞ্জের বালিয়াজুড়ি যান। তার সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী ক্যাথেরিন মাসুদ, এটিএন নিউজের সিইও ও শহীদ বুদ্ধিজীবী মুনীর চৌধুরীর ছেলে মিশুক মুনীর, শিল্পী ঢালী আল মামুন ও তার স্ত্রী দিলারা বেগম জলিসহ মোট নয় জন। লোকেশন দেখে ফেরার পথে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে বিপরীত দিক থেকে আসা চুয়াডাংগাগামী একটি বাসের সাথে তাদের মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। ঘটনাস্থলেই তারা নিহত হন।

তারেক মাসুদের অকাল মৃত্যুতে দেশজুড়ে নেমে আসে শোকের ছায়া। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে তার মরদেহের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে নামে মানুষের ঢল। ১৭ আগস্ট চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদকে ফরিদপুরের ভাঙ্গার নূরপুরে নিজ বাড়ির উঠোনে ফুলবাগানে বাবার কবরের কাছেই তাকে দাফন করা হয়।

তারেক মাসুদ ও  মিশুক মুনীরের স্মৃতি রক্ষায় গঠিত হয়েছে ‘তারেক-মিশুক স্মৃতি পরিষদ’। প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীর দিনটি পরিষদের পক্ষ থেকে যথাযোগ্য মর্যাদার সঙ্গে পালন করার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। যার মধ্যে আছে ফরিদপুরে পারিবারিক কবরস্থানে তারেক মাসুদ ও বনানী কবরস্থানে মিশুক মুনীরের কবরে পুস্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে শ্রদ্ধা নিবেদন, ঢাকার পাবলিক লাইব্রেরি মিলনায়তনে শোকসভা এবং তারেক মাসুদ নির্মিত চলচ্চিত্র প্রদর্শনী। অকালপ্রয়াত দুই কীর্তিমানের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্য ১২ আগস্ট দুপুরে রাজধানীর রোকেয়া হল সংলগ্ন সড়কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীরের স্মৃতি ভাস্কর্য উন্মোচন করবেন।

তারেক মাসুদের জীবন ও কর্ম
তারেক মাসুদের জন্ম ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা থানায় ১৯৫৭ সালের ৬ ডিসেম্বর। বাল্যকালে তার শিক্ষাজীবন শুরু মাদ্রাসায়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তার মাদ্রাসা শিক্ষা শেষ হয়। মুক্তিযুদ্ধের পর তিনি সাধারণ শিক্ষায় প্রবেশ করেন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই তিনি বাংলাদেশের চলচ্চিত্র আন্দোলনের সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থেকেছেন এবং দেশে-বিদেশে চলচ্চিত্র বিষয়ক অসংখ্য কর্মশালা এবং কোর্সে অংশ নিয়েছেন।

১৯৮৫ সালের শেষ দিকে তারেক মাসুদ জীবনের প্রথম ডকুমেন্টারি চলচ্চিত্র ‘আদম সুরত’ নির্মাণ করেন। এই ডকুমেন্টারিটি ছিল বাংলাদেশের প্রখ্যাত শিল্পী এস এম সুলতানের জীবন নিয়ে। এরপর তিনি বেশ কিছু ডকুমেন্টারি, এনিমেশন এবং স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন।

১৯৯৫ সালে তারেক মাসুদ নির্মাণ করেন প্রামাণ্য চিত্র ‘মুক্তির গান’ ও ‘মুক্তির কথা’। মুক্তিযুদ্ধের হৃদয়স্পর্শী দৃশ্যসমৃদ্ধ এ দুটো প্রামাণ্যচিত্র দেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ছড়িয়ে দিতে পালন করে অবিস্মরণীয় ভূমিকা।

২০০২ সালে তারেক মাসুদ নির্মিত প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘মাটির ময়না’ মুক্তি পায়। এই চলচ্চিত্রটি কান চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয় এবং দেশে-বিদেশে ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করে। ‘মাটির ময়না’ প্রথম বাংলাদেশি সিনেমা হিসেবে অস্কার প্রতিযোগিতায় বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র বিভাগে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। এডিবনার্গ, মন্ট্রিল, কায়রো উৎসবেও ‘মাটির ময়না’ প্রদর্শিত হয়। পাশাপাশি ২০০২ সালে মারাকেশ আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা চিত্রনাট্যের পুরস্কার লাভ করে। ২০০৩ সালে করাচি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবেও সেরা ছবির পুরস্কার লাভ করে। ২০০৪ সালে ছবিটি ব্রিটেনের ডিরেক্টরস গিল্ড পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়।

তারেক মাসুদ নির্মিত দর্শক সমাদৃত আরেকটি ছবি হচ্ছে ‘অন্তর্যাত্রা’। এই ছবিটি তিনি নির্মাণ করেন ২০০৬ সালে। তারেক মাসুদ গতবছর সর্বশেষ নির্মাণ করেন ‘রানওয়ে’ ছবিটি। প্রস্ততি নিচ্ছিলেন নতুন ছবি ‘কাগজের ফুল’ নির্মাণের।

বাংলাদেশের বিকল্প ধারার চলচ্চিত্র নির্মাতাদের সংগঠন শর্ট ফিল্ম ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য তারেক মাসুদ। ১৯৮৮ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত প্রথম আন্তর্জাতিক স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র উৎসবের কো-অর্ডিনেটর হিসেবে কাজ করেন তিনি। এছাড়া তিনি যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ এবং এশিয়ার বিভিন্ন দেশে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে যোগ দেওয়ার পাশাপাশি নিয়মিত চলচ্চিত্র বিষয়ে লেখালেখি করতেন।

তারেক মাসুদের স্ত্রী ক্যাথেরিন মাসুদ একজন মার্কিন নাগরিক। ক্যাথেরিন এবং তারেক মিলে ঢাকায় একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন যার নাম ‘অডিওভিশন’। চলচ্চিত্র নির্মাণ ছাড়া তারেক মাসুদের আগ্রহের বিষয় ছিল লোকসংগীত এবং লোকধারা। জীবনের শেষভাগে তিনি বাংলাদেশের সিনেমা হলগুলোর পুণঃজাগরণের উদ্দেশ্যে কর্মকাণ্ড পরিচালনা শুরু করেছিলেন।

বিকল্পধারার জীবনঘনিষ্ঠ চলচ্চিত্র নির্মাণ করে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রাঙ্গনে তারেক মাসুদ অনন্য ভূমিকা রেখেছিলেন। তার এই অবদান বাংলার চলচ্চিত্রপ্রেমীরা আজীবন মনে রাখবে।

একনজরে তারেক মাসুদ
tareqপুরো নাম: আবু তারেক মাসুদ
জন্ম: ১৯৫৭ সালের ৬ ডিসেম্বর
জন্মস্থান: ফরিদপুরের ভাঙ্গায় নূরপুর গ্রাম
মায়ের নাম: নুরুন নাহার মাসুদ
বাবার নাম: মশিউর রহমান মাসুদ
বাবার পেশা: শিক্ষকতা
ভাইবোন: ৫ ভাই ২ বোন
শিক্ষাজীবন: ভাঙ্গা ঈদগাঁ মাদ্রাসায় প্রথম পড়াশোনা। এরপর ঢাকার লালবাগের একটি মাদ্রাসা থেকে মৌলানা পাস করেন। ফরিদপুরের ভাঙ্গা পাইলট উচ্চবিদ্যালয় থেকে প্রাইভেট পরীক্ষার মাধ্যমে প্রথম বিভাগে এসএসসি পাস করেন। আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজে ছয় মাস পড়াশোনার পর বদলি হয়ে নটরডেম কলেজ থেকে মানবিক বিভাগে এইচএসসি পাস করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাস বিভাগে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন
পেশা: চলচ্চিত্র নির্মাণ
উপাধি: বিকল্পধারার চলচ্চিত্রনির্মাতা
তারেক মাসুদের বিয়ে: ১৯৮৯ সালে
স্ত্রীর নাম: ক্যাথেরিন মাসুদ
সন্তান: বিংহাম পুটার মাসুদ নিষাদ
মৃত্যু: ১৩ আগস্ট ২০১১

উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র: আদম সুরত (১৯৮৫), সোনার বেড়ি (১৯৮৯), মুক্তির গান (১৯৯৫), মুক্তির কথা (১৯৯৬), মাটির ময়না (২০০২), অন্তর্যাত্রা (২০০৬), নরসুন্দর (২০০৯) ও রানওয়ে (২০১০)।

উল্লেখযোগ্য অর্জন: ‘মুক্তির গান’ নির্মাণের জন্য ফিল্ম সাউথ এশিয়ার বিশেষ সম্মাননা (১৯৯৭); ‘মাটির ময়না’ নির্মাণের জন্য কান চলচ্চিত্র উৎসব আন্তর্জাতিক সমালোচক পুরস্কার (২০০২), কান চলচ্চিত্র উৎসব ডিরেক্টর ফর ফোর্টনাইট পুরস্কার (২০০২), এডিনবার্গ আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব (২০০২), মন্ট্রিয়েল আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব (২০০২), আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব অব মারাকেশ, বেস্ট স্ক্রিনপ্লে (২০০২), কায়রো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব (২০০৩), পাম স্প্রিং আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব (২০০৩), নিউ ডিরেক্টর/নিউ চলচ্চিত্র উৎসব (২০০৩), কারা চলচ্চিত্র উৎসব বেস্ট ফিল্ম (২০০৩)।

মরণোত্তর সম্মাননা: একুশে পদক ২০১২



বাংলাদেশ সময়: ১৯২০, আগস্ট ১১, ২০১২
সম্পাদনা: আহমেদ জুয়েল, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Bookmark and Share
REVE Systems
banglanews24 All Apps
RehabHousing.com

বিনোদন

8877
IIMEJ
Kaspersky Lab - Antivirus Software [ Bangladesh ]
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম | এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন

ফোন: +৮৮০ ২ ৮৪০২১৮১, ৮৪০২১৮২ আই.পি. ফোন: +৮৮০-৯৬১২১২০০০০ নিউজ রুম সেল: +৮৮-০১৭২৯০৭৬৯৯৬, ০১৭২৯০৭৬৯৯৯ ফ্যাক্স: +৮৮০ ২ ৮৪০ ২৩৪৬
ইমেইল: news.bn24@gmail.com, editor.banglanews@gmail.com, editor@banglanews24.com    বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম    এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন

বাংলায় লেখা হলে ইউনিকোডে পরিবর্তন করে ইমেইল করুন    কপিরাইট © 2013 সকল স্বত্ব ® সংরক্ষিত    একটি ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেড প্রতিষ্ঠান