 |
ঢাকা : ঢাকার নবাবগঞ্জের জমিদার ব্রজেন রায় ওরফে সুদর্শন রায়ের বাড়ি কথিত জজ বাড়ি হিসেবে দখলে যুগ্ম জেলা জজের সংশ্লিষ্টতা আছে কিনা, তা তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।
এক মাসের মধ্যে আইন সচিবকে এ বিষয়টি তদন্ত করে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে।
বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী ও বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ সোমবার আদেশ দেবেন।
রোববার এ বিষয়ে আদালতে শুনানি শেষ হয়।
সোমবার আদালতে দখলকারী তিন ভাই যুগ্ম জেলা জজ আবুল হোসেন খন্দকার, নবাবগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান খন্দকার আবু আশফাক ও আবুল কালাম খন্দকার এবং তাদের চাচা অ্যাডভোকেট খন্দকার আবুল হাশেম উপস্থিত ছিলেন।
আগামী ৮ জুলাই এ বিষয়ে পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেন আদালত। ওই দিন তাদের আবারো আদালতে হাজির হতে হবে।
প্রসঙ্গত, নবাগঞ্জের জমিদার বাড়ি নিয়ে গত ১০ মে ইংরেজি সংবাদপত্র ডেইলি সানে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর হাইকোর্ট স্বতপ্রণোদিত হয়ে রুল জারি করেন এবং দখলকারী তিন ভাই যুগ্ম জেলা জজ আবুল হোসেন খন্দকার, নবাবগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান খন্দকার আবু আশফাক ও আবুল কালাম খন্দকার এবং তাদের চাচা অ্যাডভোকেট খন্দকার আবুল হাশেমকে তলব করেন।
পরদিন ১১ মে ‘জমিদারবাড়ি এখন জজবাড়ি’ শিরোনামে কালের কণ্ঠে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী রোববার সকালে সংশ্লিস্টরা হাজির হন। তাদের পক্ষে আইনজীবী ছিলেন অ্যাডভোকেট শ ম রেজাউল করিম ও শেখ গোলাম হাফিজ। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এবিএম আলতাফ হোসেন।
তবে শুনানির সময় ওই বাড়ির সঙ্গে নিজের সম্পৃক্তার কথা অস্বীকার করেছেন যুগ্ম জেলা জজ আবুল হোসেন খন্দকার। তিনি বলেছেন, বাড়িটি তার মামার।
এর আগে রোববার সকালে শুনানির শুরুতে সংশ্লিষ্ট উপজেলা ভূমি কর্মকর্তা আদালতকে জানান, ১৯৬৭ সালে এ জমি অর্পিত সম্পত্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়। এর মালিকানা নিয়ে একাধিক মামলা বিচারাধীন। এর মধ্যে একটি মামলায় আগামী ২২ মে সাক্ষীর জন্য ধার্য আছে। হাইকোর্টেও একটি মামলা বিচারাধীন।
এ সময় যুগ্ম জেলা জজ আবুল হোসেন খন্দকারসহ চারজনের পক্ষে আইনজীবী শ ম রেজাউল করিম আদালতে বলেন, ‘এ জমির মালিক হিসেবে গুলজার হোসেন তার ভাগ্নে আবুল কালাম খন্দাকরকে মামলা পরিচালনার জন্য তদবিরকারক হিসেবে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দেন।’
এ সময় এবিএম আলতাফ হোসেন আদালতকে বলেন, ‘হাইকোর্টের আরেকটি বেঞ্চে এ বাড়ি নিয়ে আরেকটি মামলা বিচারাধীন। ওই আদালতে গত ১৬ মে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেছেন, অন্য একটি বেঞ্চে একটি রুল জারি হয়েছে। তাই কার্যতালিকা থেকে বাদ (আউট অব লিস্ট) দেওয়া হোক। এরপর আদালত কার্যতালিকা থেকে বাদ দিয়েছেন।’
এ সময় আদালত বলেন, ‘সেটি সিভিল (দেওয়ানি মামলা)। দেওয়ানি মামলা শুনানির এখতিয়ার আমাদের নেই। তবে ওই মামলাটির দ্রুত নিষ্পত্তি হওয়া দরকার। কিন্তু দেওয়ানি মামলা নিষ্পত্তি হতে কয়েক বছর সময় লেগে যাবে।’
আদালত আরো বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অ্যাটর্নি জেনারেলের বক্তব্য শোনা দরকার। এরপর অ্যাটর্নি জেনারেলকে আসতে বলা হয়।’
এক পর্যায়ে আদালত শ ম রেজাউল করিমের কাছে জানতে চান, বাড়িটির নাম জজ বাড়ি হলো কিভাবে। জবাবে শ ম রেজাউল করিম বলেন, ‘ভাগ্নে জজ। তিনিই দেখাশোনা করতেন। তাই হয়তো জজ বাড়ি হিসেবে পরিচিত পেতে পারে। তবে এ বাড়ির সম্পত্তির সঙ্গে জজ সাহেবের বিন্দুমাত্র সম্পর্ক নেই।’
তখন আদালত বলেন, ‘এ বাড়িতো তার না। এটা তার মামার বাড়ি। তাই মামার বাড়ি তার নামে হবে কেন? এ সময় আদালতের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি বলেন, ‘আমার নানাও একজন জেলা জজ ছিলেন। আমার বাড়িতো জজ সাহেবের বাড়ি হিসেবে পরিচিত হয়নি। জজ সাহেবের নামে বাড়ি হওয়ায় সন্দেহ বাড়ছে। মনে হচ্ছে, তিনিই সুবিধাভোগী। বেনামে কিছু হয়েছে কিনা খতিয়ে দেখা দরকার।’
জবাবে শ ম রেজাউল করিম বলেন, ‘কোনো ভাইবেই জজ সাহেব জড়িত নন।’
আদালত বলেন, ‘ভাগ্নের নামে মামার জমি হতে পারে না। তাই জজ সাহেবের প্রত্যক্ষ স্বার্থ জড়িত আছে বলেই মনে হয়।’
শ ম রেজাউল করিম বলেন, ‘মামার স্নেহে বড় হয়েছেন। এ কারণেও হতে পারে।
আদালত বলেন, ‘এটা তারই বাড়ি।’
এরপর বেলা দুইটায় অ্যাটর্নি জেনারেল হাজির হয়ে আদালতে বলেন, ‘এ বিষয় নিয়ে নিম্ন আদালতে কয়েকটি মামলা আছে। হাইকোর্টের আরেকটি বেঞ্চে সিভিল আপিল বিচারাধীন। আপনিও রুল জারি করেছেন। তাই এ দুটি মামলা হাইকোর্টের একটি বেঞ্চে শুনানির জন্য প্রধান বিচারপতির কাছে আবেদন জানাবো।’
শ ম রেজাউল করিম আবারো আদালতে বলেন, ‘এ জমির সঙ্গে জজ সাহেব কোনোভাবেই সম্পৃক্ত নন।’
আদালত বলেন, ‘আপনার মক্কেল ধুয়া তুলসিপাতা নন। তিনিই দখল করেছেন। তিনিই পিছন থেকে কলকাঠি নাড়ছেন।’
শুনানি শেষে আদালত সোমবার আদেশের জন্য দিন ধার্য করেন। তবে ওই যুগ্ম জেলা জজ আবুল হোসেনসহ সংশ্লিষ্ট চারজনকে আজও আদালতে হাজির থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জানা যায়, ব্রিটিশ শাসনামলে ঢাকার নবাবগঞ্জের জমিদার ব্রজেন রায় ওরফে সুদর্শন রায়ের বাড়ির নাম রাখা হয় ব্রজ নিকেতন। এটি এখন জজ বাড়ি নামে পরিচিত।
বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য ও নবাবগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান খন্দকার আবু আশফাক পরিবারের সদস্যদের দখলে আছে চার একর ৫৭ শতক জমির ওপর তৈরি পুরো জমিদার বাড়িটি। খন্দকার আবু আশফাকের বড় ভাই খন্দকার আবুল হোসেন একজন যুগ্ম জেলা জজ। জমিদার বাড়ির পুরো সম্পত্তিটি অর্পিত সম্পত্তি হিসেবে দাবি করছে সরকার। দখল বুঝে নিতে সরকার মামলাও করেছে। তবে খন্দকার পরিবারের সদস্যরা বলছেন, এটি তাদের কেনা সম্পত্তি।
কথিত একটি দলিলের মাধ্যমে জমিদার বাড়ি ব্রজ নিকেতনের মালিক দাবি করেন এম গোলজার হোসেন। মৃত্যুর আগে গোলজার হোসেন বাড়িটি দেখভালের জন্য পাওয়ার অব অ্যাটর্নি বা আমমোক্তার দলিল করে দেন চেয়ারম্যানের ভাই আবুল কালাম খন্দকারকে। সেই আমমোক্তারনামা দলিলের বলেই চেয়ারম্যান পরিবারের লোকজন বাড়িটি দখল করে রেখেছেন।
বাংলাদেশ সময় : ১৪১৫ ঘণ্টা, মে ২১ ২০১২
এমইএস / সম্পাদনা : অশোকেশ রায়, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর