 |
“এইখানেই কাৎ হইয়া আমি বিশ্ববহ্মাণ্ডের ছবি তুলিতেছি” – ফরহাদ মজহার
কবিতাগুলির মধ্যে ‘বাণী’ হওয়ার একটা বাসনা আছে - প্রথম কয়েকটা কবিতা পড়ার পর এই কথা মনে হইলো। যা কিছুই বলা হইতেছে, তা একটা উদ্দেশ্য বা বোধ থেকে উৎসারিত হইতেছে, কবিতা-লিখার ভিতর কোন আবিষ্কার নাই, এইরকম একটা অতৃপ্তি জাগছে। মানে প্রি-ফিক্সড যে ভাবনা, তার প্রকাশ আছে, কিন্তু লিখাটা, লেখক এর অধিক কিছুই না, এইরম হতাশা আসছে, মনে। এইটা সাময়িক - এই ভাবনা, তারে অতিক্রম কইরা সামনের দিকে যাই। কারণ আমি তো তাকাইয়া থাকি, কিন্তু দেখি না। এই যে দুইটা টুকরা, তার বিভাজন কিরম স্পষ্ট তা আর বলতে নাই, মানে তাকাইয়া থাকা অথবা দেখা, মানে যেইখানে প্রবেশাধিকার নাই, ধাক্কা দিলেই হয়তো দরজা খুলবে অথবা সেইখানে কোন দরোজাই নাই।
তো কি নাই কি নাই তো বললাম, এইবার তাইলে বলি কি আছে কি আছে।
এই কবিতায় ন্যারেশন আছে, সাম্প্রতিক আছে, যেহেতু এরা (এইসব উপমা, দৃশ্যকল্প) সাময়িক, এদের অমরত্বে সওয়ার হওয়ার সম্ভাবনা নিয়া আছে। অযৌনী’র যৌনতা আছে। পুরুষের নারীবেশ শুইনা মনে হইলো, বেশিরভাগ নারীই যে ইনফিরিয়র’র পুরুষরূপ (মানে সোশ্যাল স্ট্যাটাসের দিক দিয়া) এবং পুরুষের নারীভাব যে একেবারেই দুর্লভ সেইদূর পর্যন্ত ইশারা আছে (অথবা আমি ভুলভাবে সেই কণা দেখতে চাইতেছি)। দারুণ বর্ষাকাল আছে তার আর্ন্তজাতিকতাসহ, কাব্য আছে অতীন্দ্রিয় আবেগ এবং ভাবালুতাসহ। শহর এবং তার অদূরেও দূরবর্তী গ্রাম আছে।
কিন্তু এইটা কবিতা কেন হইলো? মানে ক্যাটাগরি হিসাবে তারে কবিতা কেন বলবো? গান হইতে পারে, চিন্তা হইতে পারে, প্রবন্ধ হইতে পারে, আলোচনা অনুষ্ঠান হইতে পারে, কিন্তু কেন কবিতা, এই প্রশ্ন-উত্তর খেলাও তো আছে।
‘নীল’; হায় হায়! সমস্ত প্রতিভা-ই তো তাই! রাধিকার রং, আকাশেরও কোন মন নাই। মানে রং নাই। আসলে তো আকাশই নাই। এবং যেহেতু নাই, এইটাই আছে একমাত্র। এইরম হালকা টুইস্ট নাই, কবিতার যে রহস্যময় ঘ্রাণ, সেই ফুলকি/দ্যুতি/ঝলক আছে।
কবিতা ও ধর্ম এর একটা টানাটানি কি আছে? তবে দাঁতে মনুষ্যমাংস আছে। মানে মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান কেন কবিতা লিখলেন? মানে, উনি তো লিখেনই। এইরম করেই তো। একটু অন্যরকম সামাজিকতা আর কি। আর আসলে ভঙ্গিটাতে আর কি যায় আসে। ওইটা কি বয়সের একটা কিছু? ফরহাদ মজহার আর হাবিবুর রহমান কি সমবয়সী? মানে উনাদের এইজ ডিফারেন্সটা কত? এইটা অ-বিচ্ছিন্ন একটা কিছু না, তবে হয়তো অতিরিক্ত একটা কিছু।
কবিতা যে সামাজিক জ্ঞান নিয়া চলবো না, তা না; কিন্তু যখন কবিতারে আপনি একটা কিছু প্রকাশের মাধ্যম হিসাবে নেন, কবিতা ইটসেলফ আর কোনকিছু না তখন ব্যাপারটা ঝাপসা ও মলিন হইতে থাকে। আফসোস, ওর ডানা বা পুচ্ছ কিছুই আমি ধরতে পারলাম না!
অবশ্য, গদ্যের ভিতর কবিতা ফলানোর কোন বিষয় নাই। যেই চেষ্টাটা এইখানে লুকানো যাইতেছে না এবং এইটা যদি অহেতুক হয়া থাকে, তাইলে এর বিপরীতটাও সম্ভব! এইটা অবশ্য সাবজেক্টিভিটির চূড়ান্ত প্রায়। যেমন বৃষ্টি, তোরে আমি ধরুম না বইলা বলবো যে, ধরমু। মানে ফিউচার টেনস, যখন ধরে ফেলছি তখন তো আর বর্তমান নাই। আমি নাই, অন্য একটা আমি। এই যে একটা উত্তীর্ণতা, পার হইয়া যাওয়া, পার হই নাই তবু যে কেউ পার হইতেছে, তার পথ ঘাট চিহ্ন, দেখতে আছি, মানে আপাতত এইসব আলতা মাখা সেই পদযুগল আমি নিরীক্ষণ করিতে আছি। এইটা তো আছেই।
এতসব কিছু বলার পর মনে হইতে থাকে, থাকা আর না-থাকা (মানে হয়তো বলা আর না-বলা) এমন আর কি বিরাট পার্থক্য!
অতিরিক্ত:
যেহেতু ‘বাণী’র (মানে যাদের কোটেশন হিসাবে যার বহুল ব্যবহার সম্ভব) কথা বলছি, উদাহারণ দেয়াটা এক ধরণের বাধ্যবাধকতার পর্যায়ে পইড়া যায়, তাই -
বাণী ১:
“.... যাহারা দেখিবে না -
তাহারা তাকাইয়া থাকিবে, কিন্তু দেখিবে না।
কসম কবিতার, না, কখনই না।”
(পৃষ্টা: ১৭)
বাণী ২:
“সত্য জানিও, ফরহাদ তাহার মায়ের কাছেই ফিরিয়া যাইবে-
কোনো কবরে যাইবে না।”
(পৃষ্টা: ২৫)
বাণী ৩:
“মানুষের মধ্যেই আমার ধর্ম ও ইহলোক
মানুষের মধ্যেই একদিন
পূর্ণিমার উদয় ঘটিবে।”
(পৃষ্টা: ৩৮)
আরো আছে, কিন্তু এর বেশি হয়তো দরকার নাই, ৩টাই যথেষ্ঠ... ১০০।
আমি যেই কপিটা কিনছিলাম, সেইটার ১টা ফর্মার প্রিণ্ট (পৃষ্টা৩৩ - পৃষ্টা৪৮) খুবই বাজে। ছাপা মোটামুটি।
ক্যামেরাগিরি। ফরহাদ মজহার। আগামী প্রকাশনী। ফেব্রুয়ারি ২০১০। প্রচ্ছদ: সব্যসাচী হাজরা। কবিতা সংখ্যা: ১৯।পৃষ্টা: ৫৪। মূল্য: ১০০ টাকা।
বাংলাদেশ সময়: ১৫৪০ ঘণ্টা, ১৪ অক্টোবর, ২০১২
সম্পাদনা: এম জে ফেরদৌস mjferdous0@gmail.com