 |
খুলনা: আকাশ সংস্কৃতির অবাধ প্রবেশ, নিম্নমানের চলচ্চিত্র নির্মাণ ও বিদ্যুৎবিল বৃদ্ধির কারণে খুলনায় একযুগে ২০টি হলের মধ্যে ১১টিই বন্ধ হয়ে গেছে।
আর যেসব হল চালু রয়েছে সেগুলো চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। সেই সঙ্গে বন্ধের তালিকায় রয়েছে বেশ কয়েকটি হল।
হল মালিকদের মধ্যে অনেকেই বাংলানিউজকে জানিয়েছেন, তথ্য প্রযুক্তির উদ্ভাবনে বিকল্প বিনোদন ব্যবস্থা, উম্মুক্ত আকাশ সংস্কৃতির প্রসার ও পাইরেসির কারণে মানুষ ঘরে বসে দেশ-বিদেশের চলচ্চিত্র দেখার সুযোগ পাচ্ছে। ফলে, হলে গিয়ে সিনেমা দেখার আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে এসব দর্শক।
তারা আরও জানান, দর্শক না থাকার কারণে ক্রমান্বয়ে লোকসানের মুখে তারা এ ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছেন। যাদের হলগুলোর নিভু নিভু অবস্থায় তারাও হল ব্যবসা বাদে অন্য কিছুর চিন্তা করছেন।
জানা গেছে, খুলনায় বর্তমানে যেসব হল চালু রয়েছে সেগুলো হলো-সঙ্খ, সংগীতা, সোসাইটি, পিকসার প্যালেস, ঝিনুক, চিত্রালী ,লিবার্টী, গ্যারিসন এবং রূপসাগর।
এছাড়া বন্ধের তালিকায় রয়েছে- স্টার, উল্লাসিনী, মিনাক্ষী, জনতা, সাগরিকা, বৈকালী, বাশুরী, সোহাগ, শংখমহল, হীরামন ও শাপলা।
বন্ধ হয়ে যাওয়া স্টার সিনেমা হলের পরিচালক এমডি পারভেজ হক বাংলানিউজকে জানান, দর্শক ঘরে বসেই যেখানে সব ধরণের বিনোদন উপভোগের সুযোগ পাচ্ছেন, সেখানে তাদের হলে যাওয়ার প্রয়োজন হচ্ছেনা।
তবে, এ ক্ষেত্রে তিনি দেশের বর্তমান চলচ্চিত্র জগতের দৈন্যদশাকেও দায়ী করে বলেছেন, গত ১৫ বছরেও চিত্রজগতে ভালো কোনো নায়ক-নায়িকা তৈরি হয়নি। এমনকি ছবির গল্প, কোয়ালিটি, অভিনয় ও গান সেকেলেই রয়ে গেছে। লাগেনি তেমন কোনো আধুনিকতার ছোঁয়া।
বন্ধ হয়ে যাওয়া উল্লাসিনী সিনেমা হলের ম্যানেজার রবিন দাস বাংলানিউজকে জানান, মালিকদের হল বন্ধের কারণে খুলনায় প্রায় ৫ শতাধিক লোক বেকার হয়ে পড়েছেন। খুলনায় বিকল্প কর্মসংস্থান না থাকায় তারা অনেকে মানবেতর জীবন যাপন করছেন।
চালুকৃত রূপসাগর সিনেমা হলেন টিকিট কাউন্টারের কর্মী মো. সোহাগ বাংলানিউজকে জানান, বিদেশি ছবির প্রসার এবং পাইরেসির কারণে দেশিয় ছবির কপি সহজলভ্য। যার কারণে হলে দর্শকদের ভিড় হয়না।
সাম্প্রতিককালে বন্ধ হয়েছে খুলনার ঐতিহ্যবাহী হল বৈকালী। এখানকার স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল গফফার বাংলানিউজকে জানান, হল মালিক সরোয়ার খান হলের জায়গাও বিক্রি করে দিয়েছেন।
তিনি আরও জানান, শুনেছি ওই জমিতে তিনি গার্মেন্টস গড়ে তুলবেন।
এছাড়া ক্ষতির কারণে বন্ধ হওয়া স্টার সিনেমা হলের জায়গায় শোনা যাচ্ছে আধুনিক সুবিধা সম্বোলিত বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
পঞ্চাশ উর্ধ্ব হারুন-আর-রশিদ বাংলানিউজকে জানান, এক সময় সিনেমা তৈরি হতো বাস্তবধর্মী কাহিনী অবলম্বনে। থাকতো সামাজিকতার ছোঁয়াও। নৈতিকতার আলোকে নির্মিত এসব ছবি পরিবার-পরিজন নিয়ে উপভোগ করা হতো। বর্তমানে আগের সেই চিত্র নেই। ফলে রুচিশীল দর্শকরা সিনেমা হলে চলচ্চিত্র দেখতে যায়না।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারু ও কারুকলা ইনিস্টিটিউটের ১ বর্ষের শিক্ষার্থী আফছানা মৌ বাংলানিউজকে জানান, বর্তমানে সিনেমা হলগুলোতে যেসব ছবি দেখানো হয় তার গুণগত মান খুবই নিম্নমানের।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, “প্রতিটি ছবিতে একই ধরনের কাহিনী। যার কারণে সচেতন দর্শকরা হল বিমুখ হয়েছেন। তিনি নির্মাতাদের শিক্ষামূলক ছবি নিমার্ণ করে চলচ্চিত্র শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার আহবান জানান।”
খুলনার স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মীরা বাংলানিউজকে জানিয়েছেন, এখন হলে গিয়ে সিনেমা দেখার মতো দর্শক আর পাওয়া যায়না। তাদের মতে, বর্তমান চলচ্চিত্র সুস্থ ধারার বিনোদন দিতে পারেনা। এছাড়া অশ্লীল ছবির কারণে দর্শক আর হলে আসে না।
চলচ্চিত্র বোদ্ধা গৌরহরি দাস বাংলানিউজকে বলেন, “সিনেমা হলের খাত থেকে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে মোটা অংকের রাজস্ব জমা হতো। কিন্তু হল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সরকারের আয়ও বন্ধ হয়ে গেছে। এখন মালিকরা অন্য ব্যবসার দিকে ঝুঁকে পড়েছেন। এ জন্য তিনি সরকারের হক্ষক্ষেপ কামনা করেন।”
তার মতে, ভিন দেশের ছবি নকল করার প্রবণতা ও নির্মাতাদের অজ্ঞতার কারণেও ভালো ছবি নির্মাণ হচ্ছেনা। ভালো ছবি নিমাণে প্রযোজকও পাওয়া যাচ্ছেনা। চলচ্চিত্র শিল্পকে রক্ষার জন্য অশ্লীলতা, পাইরেসি বন্ধ ও শুল্ক মওকুফের আহ্বান জানান তিনি।
পাঠক আগামীকাল শুক্রবার থাকছে যশোরের সিনেমা হলগুলোর বর্তমান অবস্থা নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন।
বাংলাদেশ সময়: ০০৩০ ঘণ্টা, সেপ্টেম্বর ২০, ২০১২
সম্পাদনা: মাহাবুর আলম সোহাগ, নিউজরুম এডিটর