 |
| ছবি: বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম |
হবিগঞ্জ: ১ হাজার ১শ ৪৭ জন শিক্ষার্থীর জন্য শিক্ষক মাত্র ১০ জন; অধ্যক্ষের বাসভবনে চলে কলেজের প্রশাসনিক কার্যক্রম; প্রয়োজনীয় বিষয় না থাকায় অনেক শিক্ষার্থী ভর্তি হন না; হিসাববিজ্ঞানের একজন শিক্ষক বাণিজ্য বিভাগের সব ক্লাস নেন; ডিগ্রি পর্যায়ে উচ্চতর বাংলা (ঐচ্ছিক) নিতে হয় বাধ্যতামূলক, অথচ এ বিষয়ের শিক্ষক নেই; ডিগ্রিতে শিক্ষার্থী মাত্র ১০ জন; অনার্স-মাস্টার্স কোর্স নেই; কর্মচারী সংকট।
এত সব সমস্যায় নিমজ্জিত হবিগঞ্জের চুনারুঘাট সরকারি কলেজ।
প্রতিষ্ঠাকাল: ১৯৭৩ সালের ৭ এপ্রিল চুনারুঘাট উপজেলা সদরের নয়ানী গ্রামে ২.৭৭ একর জমির ওপর কলেজটি প্রতিষ্ঠিত হয়। জাতীয়করণ হয় ১৯৮৬ সালের ২৮ অক্টোবর। প্রতিষ্ঠার ৪১ বছরেও কলেজটিতে উন্নয়নের তেমন ছোঁয়া লাগেনি।
বিষয় আছে শিক্ষক নেই: বাণিজ্য বিভাগে হিসাববিজ্ঞান, ব্যবসায় নীতি ও প্রয়োগ, ব্যবস্থাপনা বিষয় রয়েছে। অথচ এ বিভাগে শুধুমাত্র হিসাববিজ্ঞানের শিক্ষক রয়েছেন। তিনিই ৩ বিষয়ের ক্লাস নেন। বিশেষ করে ডিগ্রি পর্যায়ের প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে বাংলা ঐচ্ছিক (উচ্চতর বাংলা) বিষয়টি বাধ্যতামূলকভাবে নিতে হয়। কিন্তু এ কলেজে এ বিষয়ের কোনো শিক্ষকই নেই। এমনকি বইও পাওয়া যায় না। সে কারণে কলেজে বিএ পর্যায়ের শিক্ষার্থী মাত্র ১০ জন!
এদিকে, কলেজ কর্তৃপক্ষ উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে ইসলামের ইতিহাস, ইসলাম শিক্ষা, যুক্তিবিদ্যা, সমাজবিজ্ঞান, সমাজকল্যাণ ও পরিসংখ্যান বিষয় এবং ডিগ্রি পর্যায়ে বিএসএস, বিবিএ, এবং বিএসসি কোর্স অন্তর্ভুক্তির জন্য মহাপরিচালক (শিক্ষা) বরাবরে আবেদন করেছে।
শিক্ষার্থী ও শিক্ষক সংখ্যা: এ কলেজে বর্তমানে মানবিক, বাণিজ্য ও বিজ্ঞান বিভাগ মিলিয়ে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী সংখ্যা ১ হাজার ১শ ৩৭ জন। এর মধ্যে একাদশ শ্রেণীতে ৬শ ৭৯ এবং দ্বাদশ শ্রেণীতে ৪শ ৫৮ জন শিক্ষার্থী পড়াশুনা করছে।
২ হাজার ২শ ৭৪ জন শিক্ষার্থীর জন্য এখানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ১০ জন শিক্ষক। শিক্ষক সংকট কলেজের প্রধান সমস্যা। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সৃষ্ট ২টি ও ব্যবস্থাপনায় সৃষ্ট একটি মাত্র পদে কোনো শিক্ষকই নেই। এ ছাড়া ইতিহাসের একটি ও হিসাববিজ্ঞান শিক্ষকের একটি পদ খালি রয়েছে।
অধ্যক্ষের পদটি দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন উপাধ্যক্ষ হারুন মিয়া।
কর্মচারী সংকট: ৮টি পদের মধ্যে অফিস সহকারীর ১টি, এমএলএসএস ২টি, ঝাড়ুদার ১টি ও নৈশপ্রহরীর ১টি পদ খালি রয়েছে চুনারুঘাট সরকারি কলেজে।
অধ্যক্ষ (ভারপ্রাপ্ত) হারুন মিয়া প্রশাসনিক কাজে গতি সঞ্চারের জন্য শূন্যপদে কর্মচারী নিয়োগের পাশাপাশি হিসাব রক্ষকের ১টি, হিসাব সহকারীর ১টি, অফিস সহকারীর ৩টি, ক্যাশ সহকারীর ১টি, এমএলএসএস ৬টি এবং নৈশপ্রহরীর ২টি পদ সৃষ্টির জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
অবকাঠামোগত সমস্যা: কলেজে একাডেমিক ভবনের সংকট রয়েছে। মাত্র ৪টি টিনশেড বিল্ডিং, একটি ৩ তলা বিল্ডিং (নির্মাণাধীন) এবং একটি ২ তলা বিশিষ্ট একাডেমিক ভবন রয়েছে।
অধ্যক্ষের কার্যালয়সহ প্রশাসনিক ভবন চলছে অধ্যক্ষের জন্য নির্ধারিত একতলা বিশিষ্ট একটি বাসভবনে। নেই শিক্ষার্থীদের থাকার জন্য ছাত্রাবাস, মিলনায়তন এবং শিক্ষক ও কর্মচারীদের ডরমেটরি বা বাসভবন।
কলেজের প্রবেশদ্বারের অংশ বাদে অন্য ৩ দিকে সীমানা প্রাচীর নেই। একটি মাঠের অভাবে শিক্ষার্থীরা ভালোভাবে কোনো উৎসবও পালন করতে পারেন না।
ফলাফল সন্তোষজনক: এত সমস্যার মধ্যেও শিক্ষার্থীদের আগ্রহ এবং শিক্ষকদের আন্তরিকতার ফলে কলেজের ফলাফল সন্তোষজনক বলা চলে।
২০১২ সালের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় ৪শ ৪৯ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিয়ে ৩শ ৬২ জন পাস করেছেন। পাসের হার শতকরা ৮১.৬২ ভাগ। এর মধ্যে মানবিকে ৩শ ১০ জনের মধ্যে ২শ ২৭, বিজ্ঞান বিভাগে ১২ জনের মধ্যে ১১ এবং বাণিজ্য বিভাগে ১শ ২৭ জনের মধ্যে ১শ ২৪ জন কৃতকার্য হন।
কলেজের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এ বছরের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় বাণিজ্য বিভাগ থেকে ৩ জন পরীক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে।
২০১১ সালের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফলও সন্তোষজনক ছিল। এ বছর ৩শ ৭৬ জন পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ৩শ ১৫ জন কৃতকার্য হন। পাসের হার শতকরা ৮৪ ভাগ।
শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের কথা: ২০১২ সালে বাণিজ্য বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থী শাহি খান বাংলানিউজকে বলেন, “কলেজে শিক্ষকের সংকট রয়েছে। এতে করে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ায় মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটে। এ ছাড়া বিনোদনেরও কোনো ব্যবস্থাও নেই।”
উচ্চ মাধ্যমিক বাণিজ্য বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী বেবী তালুকদার বাংলানিউজকে বলেন, “আমাদের বিভাগে হিসাববিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক ছাড়া আর কোনো বিষয়ের শিক্ষকই নেই। তিনি একাই সবগুলো বিষয়ে ক্লাস নেন। যদি সবগুলো বিষয়ের শিক্ষক থাকতেন, তাহলে ছাত্রছাত্রীদের জন্য ভালো হতো।”
এক ছাত্রীর অভিভাবক শফিকুল ইসলাম বাংলানিউজকে বলেন, “শিক্ষকের অভাবে কলেজে শিক্ষার গুণগত মান নেই। আর যে সব শিক্ষক কর্মরত আছেন, তাদের আরও মনোযোগী হয়ে পাঠদান করতে হবে। তাহলেই কলেজের কাঙ্ক্ষিত ফলাফল আসবে।”
শিক্ষকের কথা: হিসাববিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক মঈন উদ্দিন আহমেদ আব্বাসী বাংলানিউজকে বলেন, “এ কলেজে জিপিএ-৫ প্রাপ্ত কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি হয় না। অপেক্ষাকৃত দুর্বলরা ভর্তি হয়। তারপরও কলেজের ফলাফল খারাপ নয়। প্রয়োজনীয় শিক্ষক নিয়োগ করা হলে শিক্ষার হার ও মান বাড়বে।”
অধ্যক্ষের কথা: কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হারুন মিয়া বাংলানিউজকে বলেন, “কলেজের নানা সমস্যার মধ্যে শিক্ষক ও কর্মচারী সংকট প্রধান সমস্যা।”
একদিকে প্রয়োজনীয় শিক্ষকের অভাবে শিক্ষার্থীদের ভালোভাবে পাঠদান করানো সম্ভব হচ্ছে না; অন্যদিকে, কর্মচারী সংকটের কারণে প্রশাসনিক কাজও সঠিকভাবে সম্পাদন কষ্টকর হয়ে উঠেছে।”
তিনি বলেন, “কলেজে অবকাঠামোগত সমস্যা রয়েছে। আরও অন্তত একটি বহুতল একাডেমিক ভবন ও শিক্ষকদের আবাসন ব্যবস্থা করতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।”
ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আরও বলেন, “কলেজে একটি ছাত্রাবাস নির্মাণ করা হলে দূরের শিক্ষার্থীরা ছাত্রাবাসে থেকে লেখাপড়া করতে পারবে। এতে কলেজে ছাত্রসংখ্যা ও শিক্ষার মান বাড়বে।”
কলেজের সাফল্য তুলে ধরে হারুন মিয়া বলেন, “আমি প্রথমে উপাধ্যক্ষ (২০১০ সালের ২০ জানুয়ারি) এবং পরে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ (২০১১ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি) পদে নিয়োগ পাওয়ার পর শিক্ষার মান বৃদ্ধিতে তৎপর হই। শিক্ষকরা আন্তরিকভাবে পাঠদানের ফলে কলেজের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এ বছর ৩ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে।”
তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, “শিক্ষক সংকটসহ অন্যান্য সমস্যা দূর করা হলে কলেজটি এলাকার অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ হিসেবে গড়ে উঠবে।”
বাংলাদেশ সময়: ০৮০০ ঘণ্টা, সেপ্টেম্বর ২০, ২০১২
সম্পাদনা: প্রভাষ চৌধুরী, নিউজরুম এডিটর, আশিস বিশ্বাস, অ্যাসিস্ট্যান্ট আউটপুট এডিটর ; জুয়েল মাজহার, কনসালট্যান্ট এডিটর jewel_mazhar@yahoo.com
আগামী শনিবার পুড়ুন- হবিগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজ বিষয়ে বিশেষ প্রতিবেদন