 |
| ছবি: সোহেল সরওয়ার/ বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম |
চট্টগ্রাম: সব ধরনের গানের চর্চা করলেও গজল গানেই স্বচ্ছন্দ বোধ করেন শিল্পী সোহরাব খান। চট্টগ্রামের উদীয়মান ও প্রতিশ্রুতিশীল এ শিল্পীর গজলের ইন্দ্রজালে এখন বন্দরনগরীর রুচিশীল শ্রোতারা আপ্লুত।
তার গায়কীতে আছে সদ্যপ্রয়াত শেহেনশাহ-ই-গজল মেহেদী হাসানের মখমলী গলার আবেশ- এটা পাহাড় বেষ্টিত, সাগরবিধৌত চট্টলার সুররসিকদের মূল্যায়ন।
হালে চট্টগ্রামের রুচিশীল শ্রোতাদের আলোচনায় উঠে আসা গায়ক সোহরাবের বিষয়ে জানতে পাঠকদের পক্ষ থেকে বাংলানিউজ তার মুখোমুখী হয়। আমাদের স্টাফ করেসপন্ডেন্ট আল রাহমানকে গজল শিল্পী সোহরাব বলেছেন এ জগৎ সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গি আর ধারণার কথা।
তার সঙ্গে একান্ত আলাপনে শুদ্ধসংগীতের (ক্লাসিক্যাল) প্রচার-প্রসার-চর্চার ক্ষেত্রে সংকট ও সীমাবদ্ধতা, গজল গানের সাম্প্রতিক অবস্থা, তরুণ শিল্পীদের নানা প্রতিবন্ধকতা ও চাওয়া-পাওয়া, অল্প পরিশ্রমে তারকা খ্যাতি পাওয়ার মোহ, পৃষ্ঠপোষকের অভাবসহ বিবিধ বিষয় উঠে আসে।
গজল গানের প্রতি আগ্রহী হলেন কিভাবে- এমন প্রশ্নের জবাবে সোহরাব বলেন, সব ধরনের গানের চর্চা করলেও গজল গানেই স্বচ্ছন্দ বোধ করি। এ গান একটু উঁচু শ্রেণির সমঝদার শ্রোতাদের জন্য।
তবে তিনি মনে করেন, এই একই কারণে এই গানের সিডি-অ্যালবাম বের করলে ব্যবসাসফল হয় না। তাই সমাজেরসঙ্গীত পিয়াসু রুচিশীল বিত্তবানদের এর পৃষ্ঠপোষকতায় এগিয়ে আসা দরকার, এটাকে তাদের দায়িত্ব বলে বিবেচনা করতে হবে।
সংগীতে কখন হাতেখড়ি, কার কাছে?
১৯৭৫ সালের ১০ আগস্ট জন্ম চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার নোয়াপাড়া গ্রামে। ৫ বছর বয়সে মা আয়েশা খানমের কাছেই সংগীতে হাতেখড়ি। মা তালিম নিয়েছিলেন বড় ওস্তাদের কাছে। বড়ভাই সাদেক খান ছোটবেলায় আমাকে বেতারসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নিয়ে যেত, সেও খুব ভালো গাইত। এরপর আমার গুরু ছিলেন দীলিপ দাশ। তার কাছে উচ্চাঙ্গ, নজরুল, পল্লীগীতি ও দেশাত্মবোধক গান শিখতাম।
যখন আমি সপ্তম শ্রেণির ছাত্র তখন ঢাকায় একটি অনুষ্ঠানে ওস্তাদ রশিদ খানের সঙ্গে এবং অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় চিটাগাং ক্লাবে মেহেদী হাসানের সঙ্গে হারমোনিয়াম বাজিয়েছি। এছাড়া ভারতের ব্যাঙ্গালোরে ছিলাম ৩ বছর, সেখানেই গ্রাজুয়েশন করেছি। তখন কলকাতায় মাঝেমধ্যে ওস্তাদ রশিদ খানের মজলিসে যেতাম, বসতাম আর কি।
কখন ঠিক করলেন গজল গানের শিল্পী হবেন?
ওস্তাদ নীরদবরণ বড়–য়ার কাছে শিখতে যাওয়ার পর উনিই ঠিক করে দিলেন। বললেন গজল গানই আমার কণ্ঠের সঙ্গে বেশি মানাবে।
গজল গানে খুব বেশি প্রেরণা পেয়েছেন এমন কোনো ঘটনা আছে আপনার জীবনে?
কলকাতায় একটি অনুষ্ঠানে আমার গুরুজি ছিলেন। আরও ছিলেন অজয় চক্রবর্তী ও হৈমন্তী শুক্লা। মধ্যপ্রদেশ, কলকাতা, বোম্বে, দিল্লিসহ বিভিন্ন অঞ্চলের ক্ল্যাসিক গানের শিল্পীরা একে একে পরিবেশন করছেন। আমি তখনো জানতাম না এখানে পুরস্কারের ব্যবস্থা আছে। খেয়াল, ভজন, রাগ পরিবেন করছেন শিল্পীরা। তখনো আমি ভাবতাম এদের তুলনায় আসলে আমার কিছুই শেখা হয়নি। একসময় আমার পালা এলো এবং আমিই বেস্ট পারফরমারের পুরস্কার পেলাম। ওই রাতে এ গুণী শিল্পীদের কাছে তালিম নেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম।
এখনো অ্যালবাম বের হয়নি কেন প্রশ্নের জবাবে শিল্পী বলেন, সাড়ে তিন বছর আগে অ্যালবাম বের হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাসার ৫ তলার ছাদ থেকে পড়ে ৬ মাস বিছানায় ছিলাম। এ দুর্ঘটনা আমার অনেক ক্ষতি করেছে। তবে এটা ঠিক, গানই আমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছে। ওই সময় গান গেয়েই অসহায়ত্ব, একাকিত্ব দূর করতাম। ডাক্তার চন্দনের তত্ত্বাবধানে সুস্থ হয়ে উঠেছিলাম। আশার কথা, এখন একটি অ্যালবামের কাজ গুছিয়ে নিয়েছি অনেকটা।
মঞ্চে নিয়মিত ডাক পড়ছে, সমঝদার শ্রোতাদের বুঁদ করে রাখছেন গজল গেয়ে। কেমন লাগছে?
আমি মনে করি, শ্রোতা তৈরির দায়িত্ব শিল্পীকেই নিতে হবে। আগেই বলেছি, উচ্চাঙ্গ সংগীতের, গজল গানের শ্রোতারা উচুঁ শ্রেণির। আধুনিক গানের মতো বেশি নয়। তবে হ্যাঁ, বেশি বেশি, প্রতিদিন প্রোগ্রাম করলে কণ্ঠের ওপর চাপ পড়ে। তাই মাঝেমধ্যে কণ্ঠকে বিশ্রাম দিতে হয়। তাই ৭ থেকে ৮ দিন পরপর প্রোগ্রাম নিতে পছন্দ করি।
সম্প্রতি তরুণদের মধ্যে তারকা বনে যাওয়ার প্রবণতা সম্পর্কে তিনি বলেন, আমি উপলব্ধি করি, যেকোনো গানের চর্চা করতে হলে উচ্চাঙ্গ সংগীতের মজবুত ভিত্তি থাকা চাই। নয়তো বেশিদিন টিকে থাকা যাবে না। এখন শিশু-কিশোর-তরুণ সবাই রাতারাতি তারকা হতে মরিয়া। রাতারাতি বিখ্যাত হওয়ার প্রতিযোগিতা। তাই একদিকে শুদ্ধ সংগীত হচ্ছে না, অন্যদিকে সাময়িক তারকা হলে দীর্ঘমেয়াদে কিন্তু তারা হারিয়েই যাচ্ছে। পরিচিতি মানে কিন্তু যোগ্যতা নয়। অবশ্য আমি কখনো মঞ্চে উচ্চাঙ্গ সংগীত পরিবেশন করিনি। সত্যি কথা হচ্ছে মিউজিক শেখা কখনো শেষ হয় না। এখনো কলকাতা ও ঢাকায় গিয়ে শিখি। নিয়মিত রাতদুপুরে ও ভোরে চেন রেওয়াজ করি। কারণ ক্লাসিকে চেন প্র্যাকটিসের একটি ব্যাপার আছে।
প্রসঙ্গক্রমে এসে যায় বাংলা গানের কথা। সোহরাব খান বলেন, ইদানীং যে বাংলা গান লেখা হচ্ছে তাতে মানোত্তীর্ণ গীতিকবিতা মিলছে না। এখন বাংলা গান ক্যাসেট সর্বস্ব, সফটওয়্যার সর্বস্ব হয়ে পড়ছে। বেসুরো গানও সফটওয়্যারের কারণে সুরেলা হয়ে যাচ্ছে। অনেক সময় শিল্পীকণ্ঠ চাপা পড়ে যাচ্ছে যন্ত্রসংগীতের কাছে। কণ্ঠের যে সূক্ষ্ম কারুকাজ তা বোধগম্য হচ্ছে না।
বন্দরনগরী চট্টগ্রামে সংগীতচর্চার সীমাবদ্ধতা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখানে স্টুডিও নেই বললেই চলে। চট্টগ্রামের প্লাটফর্ম ছোট। বাংলাদেশ টেলিভিশন চট্টগ্রাম কেন্দ্রে (সিটিভি) শুদ্ধসংগীতের স্ট্যান্ডার্ড কাজ হচ্ছে না। এ বিষয়টা আমাদেরই অযোগ্যতা, কারও ওপর দোষ চাপাতে চাই না। গান শেখানোর যেসব প্রতিষ্ঠান আছে তাদের আরও সিরিয়াস হতে হবে। সংগীত হয়তো সার্বিক পৃষ্ঠপোষকতা পাচ্ছে না। এ প্রতিষ্ঠান থেকে অনেক গুণী শিল্পী বেরোতো যদি প্রতিষ্ঠান পরিচালনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা উদ্যোগী হতেন।
শিল্পী সম্মানী প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ ব্যাপারটা কষ্টের। শিল্পী সম্মানী খুবই কম, যথেষ্ট নয়। রয়্যালিটির নিশ্চয়তা না থাকলে মিউজিককে পেশা হিসেবে নিতে পারেন না শিল্পীরা। পাশাপাশি শিল্পীদের ক্ষেত্রে সরকারি সহযোগিতাও অপ্রতুল। আমি মনে করি ব্যক্তি উদ্যোগেও শিল্পীদের পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া যেতে পারে।
প্রিয় গান
নিয়াজ মোহাম্মদের ‘আজ এই বৃষ্টির কান্না দেখে’ ও ‘জীবন আনন্দ হয়ে সংসারে আজও আমি’, মোহাম্মদ রফির ‘তোমাদের আশীর্বাদে এ শতদল মাথায় রাখি’ (সুর: সতীনাথ), শাকিল বদাউনির লেখা ‘বাহারো ফুল বারসাও মেরা মেহবুব আয়া হে’, ডা. গোলাম মোস্তফার লেখা ‘শুধু এই রাতটাকে স্মরণের বাঁধনে বেঁধে রাখো’, বাসু দেব ঘোষের লেখা ‘মনে পড়ে যায় সেই কিশোর বেলায় দিদিমার শেষ কটি গল্প’ গাইতে খুব পছন্দ সোহরাবের।
বাংলাদেশে প্রিয় গজলশিল্পীর নাম জানতে চাইলে বলেন, অনেকের গানই আমার প্রিয়। বারবার শুনতে ইচ্ছে করে। আবু কাওয়াল, আমিনুল ইসলাম কাওয়াল, ওয়াকিল কাওয়াল, চট্টগ্রামের গজলশিল্পী জান্নাতুল ফেরদৌস টুম্পা, আরিফুল ইসলাম মিঠু, সানি জোবায়ের সৌরভ, নাজিরহাটের শাহজাহান খান, জামাল ইসলাম খান, রূপতনু শর্মা (একসময় ভালো গজল ও ভজন গাইতেন), সন্দ্বীপন, এসএম বাকের প্রমুখের গান ভালো লাগে। সন্দ্বীপন চট্টগ্রামের গান গেয়ে খ্যাতি পেলেও গজল থেকে শুরু করে সব গানই গাইতে পারেন।
বাংলাদেশ সময়: ২১৫২ ঘণ্টা, জুন ১৯, ২০১২
আল রাহমান/ সম্পাদনা : আহ্সান কবীর, আউটপুট এডিটর
ahsan@banglanews24.com