চট্টগ্রাম: চাঞ্চল্যকর দশ ট্রাক অস্ত্র মামলায় সাক্ষ্য দেওয়ার সময় র্যাবের নির্যাতনের বর্ণনা দিয়ে আদালতে কান্নায় ভেঙে পড়েন নগরীর বন্দর থানার কয়লার ডিপো পুলিশ ফাঁড়ির তৎকালীন সার্জেন্ট হেলাল উদ্দিন। বর্তমানে নগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগে কর্মরত এ সার্জেন্ট দশ ট্রাক অস্ত্র আটকের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।
রোববার চট্টগ্রামের স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারক এসএম মুজিবুর রহমানের আদালতে হেলাল উদ্দিন কান্নাজড়িত কণ্ঠে যখন ঘটনার বর্ণনা দিচ্ছিলেন তখন বিচারক তাকে সান্ত্বনা দেন।
উল্লেখ্য, ২০০৪ সালের ১ এপ্রিল রাতে দশ ট্রাক অস্ত্র আটকের পর ২০০৫ সালে সে চালান থেকে দুটি একে-৪৭ অস্ত্র চুরি করে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগে তৎকালীন সার্জেন্ট হেলাল উদ্দিনসহ দু’জন পুলিশ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। এ ঘটনায় তাদের বিরুদ্ধে নোয়াখালীর সুধারাম থানায় মামলাও হয়।
এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ও মহানগর পিপি অ্যাডভোকেট কামালউদ্দিন আহমেদ বাংলানিউজকে বলেন, “দশ ট্রাক অস্ত্র আটকের অপরাধে তৎকালীন সরকার র্যাবের মাধ্যমে সার্জেন্ট হেলালউদ্দিনকে নির্যাতন করে তা পা ভেঙে দিয়েছিল। পা ভাঙ্গার প্রমাণস্বরুপ এক্সরে রিপোর্ট আদালতে জমা দিয়েছেন হেলাল।”
সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য রোববার বেলা সোয়া ১টায় সার্জেন্ট হেলাল উদ্দিনকে আদালতে হাজির করেন রাষ্ট্রপক্ষ। কিন্তু আগেও একবার এ মামলায় সার্জেন্ট হেলাল উদ্দিন আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন মর্মে তার পুনর্বার সাক্ষ্য নেওয়ার বিষয়ে আপত্তি তোলেন আসামিপক্ষের আইনজীবীরা।
আসামি অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল রেজ্জাকুল হায়দারের আইনজীবী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম সাজ্জাদ বাংলানিউজকে বলেন, “সাক্ষীকে পুনরায় সাক্ষ্য প্রদান করানোর ক্ষেত্রে আদালতে দরখাস্ত দিতে হয়। কিন্তুসেই দরখাস্ত দাখিল করা হয়নি। এজন্য আমরা আপত্তি জানিয়েছি।”
মহানগর পিপি অ্যাডভোকেট কামাল উদ্দিন আহমেদ বাংলানিউজকে বলেন, “ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪০ ধারায় সাক্ষীকে রি-কল করার বিধান আছে। এক্ষেত্রে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা যে আপত্তি তুলেছেন তা ওই বিধান সমর্থন করে না। এজন্য আদালত সার্জেন্ট হেলাল উদ্দিনকে পুনরায় সাক্ষ্য প্রদানের অনুমতি দিয়েছেন।”
রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের আইনজীবীদের বিতর্ক এবং এক ঘণ্টার মুলতবি শেষে বিকেল পৌনে ৩টায় হেলাল উদ্দিনের সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়।
আদালতে দেওয়া সাক্ষ্যে সার্জেন্ট হেলাল উদ্দিন জানান, দশ ট্রাক অস্ত্র আটকের পর ২০০৫ সালের ২ আগস্ট তাকে ঢাকায় বদলি করা হয়। ১৯ আগস্ট ঢাকায় বাংলামটর এলাকায় দায়িত্ব পালনের সময় তাকে ডিবি অফিসে ডেকে নিয়ে র্যাবের হাতে তুলে দেওয়া হয়। সেখানে লে. কর্নেল গুলজার তাকে এ সংক্রান্ত অনেক তথ্য জিজ্ঞেস করেন। পরদিন ভোর ৬টায় তাকে র্যাবের চট্টগ্রাম কার্যালয়ে নিয়ে আসা হয়।
তিনি জানান, র্যাব কার্যালয়ে আনার পর তাকে অধিনায়ক লে. কর্নেল এমদাদের কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ঢোকার পর অধিনায়ক জিজ্ঞেস করেন, হেলাল কে? হেলাল নিজের পরিচয় দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অধিনায়ক তাকে একটি থাপ্পড় দেন এবং লোহার রড দিয়ে পিটিয়ে পা ভেঙ্গে দেন।
এ বর্ণনা দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে সার্জেন্ট হেলাল উদ্দিন আদালতে বলেন, “তখনও আমি জানতাম না কেন, কি কারণে আমাকে পেটানো হচ্ছে? আমার অপরাধ কী? আমি বললাম- আমাকে জানতে দিন আমার অপরাধ কী? অধিনায়ক বলেন- তোর জন্য দেশের এ অবস্থা।”
এসময় বিচারক তাকে সান্ত্বনা দেন।
তিনি বলেন, “আমি স্যারকে (অধিনায়ক) বলি- আমি যেটা করেছি শুধু উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের বৈধ আদেশ পালন করেছি। যদি কোন দোষ হয়ে থাকে সেটা আমার নয়। তখন তিনি আমার কাছ থেকে বিস্তারিত শোনেন। এরপর তিনি আমাকে চিকিৎসার নির্দেশ দিলে আমাকে তিনটি ইনজেকশন পুশ করা হয়। এরপর আমাকে নোয়াখালী থানার মামলা নম্বর-২৭, তারিখ-১৯ আগস্ট, ২০০৫ গ্রেপ্তার দেখানো হয় এবং নোয়াখালী জেলা কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।”
এ পর্যায়ে আদালত সোমবার পর্যন্ত সার্জেন্ট হেলাল উদ্দিনের সাক্ষ্যগ্রহণ মুলতবি করেন।
রোববার আসামিদের মধ্যে যারা আদালতে হাজির ছিলেন তারা হলেন- জামায়াত নেতা মওলানা মতিউর রহমান নিজামী, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা এনএসআই’র তৎকালীন মহাপরিচালক অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আব্দুর রহিম, প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই’র তৎকালীন পরিচালক অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী, এনএসআই’র সাবেক পরিচালক অবসরপ্রাপ্ত উইং কমান্ডার সাহাবুদ্দিন, উপ-পরিচালক অবসরপ্রাপ্ত মেজর লিয়াকত হোসেন, ফিল্ড অফিসার আকবর হোসেন খান, রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানা সিইউএফএল’র সাবেক এমডি মোহসীন তালুকদার, চোরাচালানী হিসেবে অভিযুক্ত হাফিজুর রহমান ও ট্রলার মালিক দীন মোহাম্মদ।
অসুস্থ থাকায় সিইউএফএল’র সাবেক মহাব্যবস্থাপক এনামুল হককে আদালতে হাজির করা হয়নি।
এছাড়া সম্পূরক চার্জশিটভুক্ত দু’আসামি ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট অব আসাম (উলফা) এর সামরিক কমান্ডার পরেশ বড়–য়া ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সচিব নূরুল আমিন বর্তমানে পলাতক আছেন।
উল্লেখ্য, ২০০৪ সালের ১ এপ্রিল রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানা চিটাগং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল) জেটিঘাটে দশ ট্রাক অস্ত্রের চালানটি ধরা পড়ে।
বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমল থেকে প্রায় সাড়ে তিন বছর অধিকতর তদন্তের পর ২০১১ সালের ২৬ জুন সিআইডি আদালতে দশ ট্রাক অস্ত্র মামলার সম্পূরক চার্জশিট দাখিল করেন। এরপর ওই বছরের ১৫ নভেম্বর আসামিদের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগ (চার্জ) গঠন করা হয়। ২০১১ সালের ২৯ নভেম্বর থেকে সাক্ষ্যগ্রহণের মধ্য দিয়ে শুরু হয় বিচার।
এ মামলায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও সাবেক শিল্পসচিব ড. শোয়েব আহমেদ, গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএইফআই’র সাবেক মহাপরিচালক অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল সাদিক হাসান রুমি, বিসিআইসি’র সাবেক চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল ইমামুজ্জামান বীরবিক্রম, এনএসআই’র সাবেক পরিচালক অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এনামুর রহমান চৌধুরী, ডিজিএফআই’র সাবেক ডিটাচমেন্ট কমান্ডার কর্নেল (অব.) এ কে এম রেজাউর রহমান, এনএসআই’র সাবেক সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ আলী এবং সিএমপি’র বন্দর জোনের তৎকালীন উপ-পুলিশ কমিশনার আবদুল্লাহ হেল বাকী, সাবেক ডিআইজি (এসবি) শামসুল ইসলাম, সাবেক ডিআইজি (সিআইডি) ফররুখ আহমেদ ও সহকারী পুলিশ কমিশনার মাহমুদুর রহমানসহ ১২ জন এরইমধ্যে সাক্ষ্য দিয়েছেন।
দশ ট্রাক অস্ত্র মামলা
সিআইডির সাবেক ডিআইজির জেরা শেষ
বাংলাদেশ সময় : ১৭৪৪ ঘণ্টা, জুলাই ২৯, ২০১২
আরডিজি/ সম্পাদনা: জাকারিয়া মন্ডল, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর