মালয়ালম কথাসাহিত্যিক ভৈকম মুহম্মদ বশীরের প্রয়াণ দিবস ১৯৯৪ সনের ৫ জুলাই। ১৯০৮ সালে ভারতের কেরালায় জন্মগ্রহণ করেন ভৈকম মুহম্মদ বশীর। বশীর তাঁর নামের প্রথমাংশ ‘ভৈকম’ গ্রহণ করেন তারই নিজ গ্রামের নামানুসারে।
মালয়ালম ভাষার শ্রেষ্ঠ এই কথাসাহিত্যিক তেমন কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মধ্য দিয়ে যাননি। বশীর কিশোর বয়সেই স্বাধীনতা আন্দোলনে যুক্ত হন। বিচিত্র জীবন যাপন তাঁর সাহিত্যে ফেলেছে প্রভাব। সক্রিয় ছিলেন গান্ধীবাদী রাজনীতিতে। রাজনীতির কারণে জেল খেটেছেন। করেছেন সাংবাদিকতা। জাহাজের খালাসি হয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন এশিয়া, আফ্রিকা এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশ।
জীবনের একটা সময়(১৯৫৩-১৯৫৮) মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে কাটিয়েছেন মানসিক হাসপাতালে। আর হাসপাতাল বাসের সময়েই লিখেছেন বড়গল্প বা ছোট উপন্যাস ‘পাতুম্মার ছাগল’। হিন্দু সন্যাসীদের সাথেও জীবনের একটা পর্ব অতিবাহিত করেছেন মুহম্মদ বশীর। জাতপাত, সাম্প্রদাযিকতা ও মানুষের উপর শোষণ-নিপীড়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার ভৈকম মুহম্মদ বশীরের সাহিত্যকর্ম।
আর এ সকল ব্যক্তিগত তথ্য বশীরের সাহিত্য পাঠেই জানা যায়। গল্পের কাহিনী চলতে চলতেই বশীর বলে ফেলেন তাঁর নিজের জীবনের গল্প। কিন্তু এই ব্যক্তিগত আখ্যান তাঁর সাহিত্য কর্মে ফেলে না কোন বিরূপ প্রভাব। বরঞ্চ তাঁর সাহিত্যর্মে ব্যক্তিক অভিজ্ঞতা দেয় এক ভিন্নমাত্রা। বশীর হয়ে ওঠেন সার্বজনীন। বশীরের গল্পপাঠে পাঠক খুঁজে পান তাদের নিজের জীবন বা এই অঞ্চলের জাতীয় জীবন।
১৯৪৪-এ প্রকাশিত ‘বাল্যসখী’ উপন্যাস পাঠক মহলে বশীরকে করে তোলে পরিচিত। এর আগেই প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর ‘প্রেমলিখনম’ বা ‘প্রেমপত্র’। এরপর ক্রমশই হয়ে উঠেছেন মালয়ালম ভাষার কিংবদন্তি কথাসাহিত্যিক। ভৈকম মুহম্মদ বশীরের বিখ্যাত রচনার মধ্যে ‘প্রেমপত্র’, ‘বাল্যকালসখী’, ‘নানার হাতি’, ‘পাতুম্মার ছাগল’, ‘দেয়াল’ এবং ‘আশ্চর্য বেড়াল’ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। ‘দেয়াল’ গল্প অবলম্বনে আদুর কৃষ্ণান নির্মাণ করেন তাঁর বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘মাথিলাকাল’। দেশি-বিদেশি নানান পুরস্কারে ভূষিত হয় ‘মাথিলাকাল’।
মানুষের মানবেতর কঠিন জীবনের ছবি বশীরের লেখনিতে উপস্থাপিত হয়েছে মানবিকতার দরদ নিয়ে। নির্মম স্যাটায়ার করে বশীর তুলে আনেন জীবনের প্রকৃত মর্মশ্বাস। সহজ সাবলীল ভাষায় আন্তরিকতা নিয়ে বশীর সমাজের মানুষের অন্বেষণ করেন তাঁর সাহিত্যে। প্রথমপাঠে বা বশীরের সাহিত্য পাঠের শুরুতে বশীরের হালকা ও নির্ভার ভাষা তাঁর সাহিত্যকে তরল-হালকা বোধ হতে পারে। কিন্তু বশীরের লেখা মনযোগ দিয়ে পড়লে বোঝা যায় হালকা চালে বশীর কী গভীর জীবনবোধ তুলে আনছেন তাঁর সাহিত্যে।
জীবন নিয়ে কৌতুক করেন বশীর। কৌতুকে, শ্লেষে সমাজিক মানুষের অন্তর্গত গভীর মানসের নিখুঁত ছায়াপাত বশীরের সাহিত্যে। বশীরের গল্পের এক চরিত্র যেন বশীরের হয়েই বলে ওঠে— ‘কৌতুক আসলে জীবনেরই সুবাস’। স্মিত হাসিতে কৌতুক; হালকা-দুলকি চালে বশীরের গদ্য নারীর সামাজিক অবস্থা, পণপ্রথা, যৌতুক, ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা, বর্ণভেদ, নারী-পুরুষের সম্পর্কের জটিলতা সহজ সাবলীল ভাবে রূপায়ন করে।
কথ্যরীতিতে গল্প বোনেন বশীর। আর এই কথ্যরীতির কারণেই বশীর পাঠকের সাথে গড়ে তোলেন গভীর অন্তরঙ্গ সম্পর্ক। সবকিছু নিয়েই গল্প বানান বশীর। মুসলমান বাড়ির বিড়াল, মুরগিপালন, সন্যাসীর সাথে আড্ডা, পরনিন্দা, গাভীর দুধ দোয়ানো, চাষাবাদ, সাম্পদায়িক হানাহানি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি, ইতিহাস-পুরান থেকে শুরু করে পারমাণবিক যুদ্ধ কোন কিছুই বাদ যায় না। এবং সকল প্রসঙ্গই বশীরের ব্যক্তিগত জীবনের অভিজ্ঞতা জারিত হয়ে গল্পে ঠাঁই পায়। হয়ে ওঠে মানুষের গল্প, আমাদের নিত্যদিনের গল্প।
পাঠক ধন্ধে পড়ে যান, কোনটা বশীরের নিজের জীবনের সত্য গল্প আর কোনটা বানানো? কোনটা বা বশীরের আর কোনটা বা পাঠকের গল্প। এই রহস্যের উদঘাটন রীতিমতো অসম্ভবপর! আজগুবি ঘটনা বা অলৌকিকতা নিয়েও গল্পের জাল ফাঁদেন বশীর। ছিল রুমাল হয়ে গেল বেড়াল! আশ্চর্য বেড়াল বশীরের জাদুটোনায় দুম করে হয়ে যেতে পারে হুলো বেড়াল। এই ধরণের জাদুময়তা আছে বশীরের সাহিত্যে।
কিন্তু আশ্চর্য ঘটনা বা অলৌকিকতা নিয়ে গল্পের ভেতরে কাহিনী সাজালেও বশীরের কৃতিত্ব অন্যখানে। তিনি নানারকম আপাত তুচ্ছ ঘটনা বা ভূতের গল্পের রোমাঞ্চ অথবা অলৌকিকের আলাপনের ফাঁকে পাঠককে ঠিকই নিয়ে যান তার অভীষ্ট গন্তব্যে। বশীরের গল্পের প্রকৃত জমিন আমাদের বাস্তব পার্থিব জীবনে। কেননা বশীরের সাহিত্যের লক্ষই লৌকিক জাগতিক জীবন।
সমাজের নিচুতলার মানুষ ভৈকম মুহম্মদ বশীরের সাহিত্যের প্রধান উপজীব্য। সাধারণ মানুষের আটপৌরে জীবন, তাদের নিত্যদিনের ব্যবহারিক জীবনের ছবি বশীরের গল্প-উপন্যাসে হয়ে ওঠে দরদমাখা শিল্পীর হাতের কারুকাজ। যেন সমাজের নির্জলা ছবি! সাধারণ মানুষের আপাত তুচ্ছ জীবন বশীরের সাহিত্যে হয়ে ওঠে বাঙ্ময়, পায় শিল্পের মর্যাদা।
তাইতো ভৈকম মুহম্মদ বশীর আজ মালয়ালম ভাষার সীমানা ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়েছেন বিশ্বের বিভিন্ন ভাষাভাষী পাঠকের মাঝে। ভৈকম বশীরের রচনা বাংলা এবং ভারতীয় ১৮টি ভাষা ছাড়াও ইংরেজি, ফরাসি, চেক, চাইনিজ ও জাপানিজ ভাষায় অনুবাদ হয়েছে।
বাংলাদেশ সময়: ০০৩০ ঘণ্টা, ০৫ জুলাই, ২০১২
এমজেএফ, শিল্প-সাহিত্য, বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম