 |
খাগড়াছড়ি: পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়িতে দিনদিন বাড়ছে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা। যে বয়সে শিশুদের বই হাতে স্কুলে যাওয়ার কথা সে বয়সে এখানকার শিশুরা জড়িয়ে পড়ছে ঝুঁকিপূর্ণ বিভিন্ন পেশায়।
পরিবারে অভাবের কারণে বাধ্য হয়ে শিশুরা গাড়ির হেলপার, হকার, দোকান কর্মচারী, কারখানার শ্রমিক, গৃহকর্মীর কাজ করছে।
ছোট্ট শহরটিতে আজকাল শিশুশ্রম আশঙ্কাজনকভাবে বাড়লেও তা প্রতিকারের উদ্যোগ নেই কোনো মহলের।
পাহাড়ে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলো ব্যাপক কাজ করলেও শিশুশ্রম নিয়ে তারা যেন উদাসীন।
দারিদ্র্য, সামাজিক অসচেতনতা ও প্রশাসনের নজরদারির অভাবে খাগড়াছড়ির জেলা শহর ছাড়াও বিভিন্ন উপজেলা ও গ্রামীণ জনপদে শিশুশ্রম চোখে পড়ে।
খাগড়াছড়ি পৌর শহরের ৪, ৫ ও ৮ নম্বর ওয়ার্ডে শিশুশ্রমিকের সংখ্যা ২শÕ ৭৬ জন। এর মধ্যে ছেলে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা ২১৫ জন আর মেয়ে শিশু ৬১ জন।
সম্প্রতি খাগড়াছড়ির বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ইয়ুথ ভলান্টিয়ার গ্রুপের উদ্যোগে শিশুশ্রমের ওপর ৩ দিনব্যাপী চালানো এক জরিপে এসব তথ্য উঠে আসে।
একদল তরুণ-তরুণী এ জরিপ চালিয়ে দেখেছেন, অল্প টাকা দিয়ে বা না দিয়ে বেশি খাটানো যায় বলে শিশুদের শ্রমিক হিসেবে রাখতেই বেশি আগ্রহ মালিকদের।
অন্যদিকে, শিশুশ্রমের জন্য দায়ী বেশ কিছু কারণ উঠে এসেছে এই জরিপে।
শিশুদের অভিভাবক ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অনেক বাবা মা আর্থিক অস্বচ্ছলতার কারণে শিশুদের বিভিন্ন পেশায় পাঠাচ্ছেন। অনেকে পারিবারিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখতে নিজের শিশু সন্তানকে কাজে লাগাচ্ছেন। এছাড়া রয়েছে ভিন্ন কিছু কারণও।
অভিভাবক বা মাতৃ-পিতৃহীন শিশুদের ক্ষেত্রে শিশুশ্রম বেছে নেওয়ার ঘটনা বেশি।
তবে, খাগড়াছড়ির পুনর্বাসিত বাংলাদেশি গুচ্ছগ্রামগুলোতে শিক্ষার অভাব ও দরিদ্রতার কারণে শিশুশ্রমের চিত্র আরও ভয়াবহ। বিশেষ করে শিশুর উপার্জিত অর্থের ওপরই নির্ভরশীল এখানকার দরিদ্র পরিবারগুলো।
জরিপ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের সভাপতি দুলাল হোসেন বাংলানিউজকে জানান, ২৭৬ জন শিশু শ্রমিকের মধ্যে ১৬৭ জন শিশু প্রাইমারির গণ্ডী পার হওয়ার আগে স্কুল ছেড়ে দেয় এবং ৪৯ জন হাইস্কুলে যাওয়ার সুযোগ পেলেও মাধ্যমিক স্তর পেরুতে পারেনি। স্কুল তো দূরের কথা! অ, আ, ক, খ পড়তে শেখার সুযোগ পায়নি এমন শিশুর সংখ্যা ৬০।
৩টি ওয়ার্ডের গড় পরিসংখ্যান অনুযায়ী কেবল খাগড়াছড়ি পৌরসভায় শিশু শ্রমিকের সংখ্যা দাঁড়াচ্ছে ৭শÕ ৩৬ জনে। এ চিত্র থেকে পুরো জেলার অবস্থা সহজেই অনুমেয়।
এমনকি প্রশাসনিক কর্মকর্তা, যারা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে জ্বালাময়ী বক্তব্য রাখেন, তারাও শিশুশ্রম নিয়ে সচেতন নন। তাদের বাসায়ও শিশু শ্রমিকদের কাজ করতে দেখা যায়।
ঘরের কাজকর্ম ছাড়াও তাদের শিশু সন্তান দেখাশোনা এবং স্কুল থেকে আনা-নেওয়ার কাজে ৬ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের দায়িত্ব পালন করতে হয়।
শহরের নারিকেল বাগানে ওয়েল্ডিং কারখানায় কর্মরত ১৩ বছরের রিপন দে জানায়, Ôক্লাস টু পর্যন্ত পড়েছি। অভাবের কারণে বাবা স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়ে এ কারখানায় কাজে দিয়েছেন। এখান থেকে যা পাই তা দিয়েই পরিবারের খরচ চালাই।Õ
ওই ওয়েল্ডিং কারখানা মালিক গোপাল চন্দ্র দাশ জানালেন, Ôএসব কাজকর্মে অপেক্ষাকৃত কম বয়সীরাই আগ্রহী হয়। বয়স্করা এ পেশায় আসতে চায় না। তবে আমরা শিশুদের শ্রমিক হিসেবে রাখতে আগ্রহী নই।Õ
খাগড়াছড়িতে শিশুশ্রম সম্পর্কে খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক আনিস-উল-হক ভূঁইয়া জানান, শিশুশ্রম বেআইনি হওয়া সত্ত্বেও অল্প বেতনে খাটানো যায় বলে শিশুদের কাজে রাখতে মালিক পক্ষ বেশি আগ্রহী।
শিশুশ্রম বন্ধে সবার সচেতনতা দরকার। এ ব্যাপারে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও আশ্বাস দেন তিনি।
বাংলাদেশ সময়: ১৬২৩ ঘণ্টা, মে ১৪, ২০১২
প্রতিবেদন: অপু দত্ত/সম্পাদনা: শিমুল সুলতানা, নিউজরুম এডিটর