 |
১
সুমন আজ ঘাস খাবে। সে আজ নভোচারী হবে। ক্যাম্পাসে ওরা গাঁজাকে বলে ঘাস। আর মাতাল হওয়ার কোড হচ্ছে চাঁদে যাওয়া কিংবা নভোচারী হওয়া। মেডিক্যালের লুৎফুস সালাম হোস্টেলে সুমনের রুম থেকে প্রিন্সিপালের অফিসের ছাদ দেখা যায়। জানালা দিয়ে সুমন কয়েকজন নভোচারীকে দেখতে পেল। কামাল, মুক্তা, তপন দা, আজিম ভাই সবাই আছেন। চাঁদে যাওয়ার প্রস্তুতি চলছে। সুমন কালে ভদ্রে ঘাস খেলেও একাই খায়। অথবা ফিফটিন/এ তে ইয়াকুব, অমল, নাঈম ওদের সাথে। সুমন রুম থেকেই গাঁজার গন্ধ পাচ্ছে। আজ ওদের সাথে চাঁদে যেতে মন চাইছে। বদিউল বললো, ‘বস, আপনার হ্যালুসিনেশন হচ্ছে। গন্ধ এখানে আসবে কি করে!’
সুমন বলে ‘আমার হ্যালুসিনেশন হচ্ছে কিনা তা তোর জানতে হবে না। তুই ঘাস খেতে যাবি কিনা তাই বল!’
না বস, আপনিই যান। লিমা সিগারেট চালিয়ে যাওয়ার পারমিশন দিয়েছে। বিনিময়ে প্রমিজ করেছি আর গাঁজা খাবো না।
ঠিক আছে, খাসনে। এমনিতেই চল।
গেলেইতো খেতে ইচ্ছা করবে। লিমা জানতে পারলে ছ্যাঁকা কনফার্ম।
সুমনের মন আরো খারাপ হয়ে যায়। সে মিতালিকে মিস করছে, ঝুমুরকে মিস করছে, মোজাম্মলের চত্ত্বর আর মিছিলের সামনে থাকা শ্লোগান মিস করছে। শালা মানিকও আজ আসছে না। ওর ভাঙা গাড়িটা নিয়ে এলেওতো মারুফ, শেখর আর হালিমদের কাছে ইউনিভার্সিটিতে যেতে পারতো। আজ কী যে হবে! ব্লাড ডোনারদের কাছ থকে কয়েক শলা ঘাস নিয়ে প্রিন্সিপালের ছাদে গিয়ে নভোচারীদের সাথে যোগ দিলেই ভালো। না হয়…
সুমন আর কিছু ভাবতে পারেনা। আজ কিছু একটা হয়ে গেলে সব দোষ বদিউলের। লিমা মেয়েটা ওকে আর দিব্যি দেয়ার সময় পেলো না! হাসপাতাল লবির কয়েন বক্স ফোনটাও কাজ করছে না। নইলে মানিককে ফোন করা যেতো গাড়িটা নিয়ে চলে আসতে। পতেঙ্গায় বিয়ার কিংবা চোলাই মদ কিছু একটাতো পাওয়া যেতোই। ধুর!
২
সুমনতো অবাক। বিরক্তও বটে। টেবিল ঘড়িতে দেখলো ৬টা ৫। সারারাত গ্যালারিতে পড়ে ভোর রাতে ৩টায় এসে ঘুমিয়েছে। এতো সাত সকাল নয়, একেবারে ছয় সকাল। এই ভোর বেলায় কে এলো ঘুম ভাঙাতে! ভেবেছিল বদিউলকে বলবে দরজা খুলে দিতে। কিন্তু দেখলো পাশের বেডে অঘোরে ঘুমাচ্ছে সে। অনিচ্ছায় উঠে গেল দরজায়।
আরে, মিতালি তুমি! তুমি কোত্থেকে? এই সকাল বেলায় ব্যাগ অ্যান্ড ব্যাগেজ!
এই মাত্র বাস থেকে নামলাম সুমন ভাই। আপনার সাথে জরুরি কথা আছে।
জরুরি কথা বলতে ঢাকা থেকে চলে এসেছো? আমিতো কিছুই বুঝতে পারছি না। ছোটন কেমন আছে?
ছোটন ভালো আছে। আমিই ভালো নেই সুমন ভাই। প্লিজ চলুন, আপনার সাথে আমার অনেক কথা আছে। মিতালির চোখ মুখ দু’টোই ফোলা। সারা রাস্তাই যে কাঁদতে কাঁদতে এসেছে দেখেই বোঝা যাচ্ছে।
ঠিক আছে। কার রুমে উঠবে? ফাহিমার? তুমি তাহলে ওর রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে এসো। রাতে বাসে ঘুম হয়েছে বলেতো মনে হচ্ছে না। আমি নয়টায় ক্যান্টিনে থাকবো। ওখানে চলে এসো।
সুমন পাঁচ মিনিট আগেই পৌঁছে যায় ক্যান্টিনে। ভেবেছিল মেয়েদের ব্যাপার, মিতালিরতো দেরি হবেই। এই ফাঁকে নাস্তা সেরে নেবে। কিন্তু মিতালি তখন চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছে। বললো, ‘সুমন ভাই ঝটপট ব্রেকফাস্ট সেরে নিন’।
কেন, কোথাও যাবে?
না। এখানে বসে কথা বলবো না। এখনি আপনার পার্টির ছেলেরা এসে আপনাকে ধরে মিটিং বা মিছিলে নিয়ে যাবে। তার চেয়ে আপনার রুমে গিয়ে কথা বলবো। আমার একটু স্পেস দরকার। এখনতো সবাই ওয়ার্ডে বা ক্লাসে। আপনার রুমই কথা বলার বেস্ট জায়গা। বদিউলতো নিশ্চয়ই ক্লাসে।
রুমে এসে দু’জন মুখোমুখি বসলো। মিতালি সুমনের অগোছালো বিছানায়। আর সুমন চেয়ারে।
আমি ভালো নেই সুমন ভাই। আমার সবকিছু শেষ। আমাদের ব্রেক আপ হয়ে গেছে কাল। আমার মরে যেতে ইচ্ছে করছিল সুমন ভাই। ভাবলাম কষ্টের কথা গুলো আপনাকে বলি। যদি কষ্ট তাতে একটু হলেও কমে। আমি জানি আপনি পেশেন্ট লিসেনার। আমাকে একটু আশ্রয় দিন সুমন ভাই, প্লিজ!’
বলেই ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো মিতালি। সুমন বুঝে উঠতে পারে না ওর কি করা উচিত। ভাবলো হয়তো কাঁদতে দেয়াই ভালো। কান্নায় কষ্টের ভ্যান্টিলেশন হবে। কান্নার থেরাপিউটিক ইফেক্ট অসামান্য। কিন্তু মিতালি কেঁদেই চলছে। ওভার ডোজ হবেনাতো!
একবার ভাবলো মাথায় হাত রেখে একটু আদর করে দেয়। মিতালিকে এক্কেবারে ছোট্ট মেয়েটির মতো দেখাচ্ছে। বায়না ধরে পুতুল না পেয়ে ছোট্ট মেয়েরা যে ভাবে কাঁদে ঠিক সে রকম। ছোটনের কথা ভেবেই আবার হাতটা সরিয়ে নেয়।
মিতালির সাথে প্রথম দেখা সলিমুল্লাহ মেডিক্যালের ক্যান্টিনে বছর দুই আগে। ছোটনের প্রেমিকা। সুমন ঢাকায় আড্ডা দিতে এলেই রাশেদের রুমে উঠে। রাশেদের মাধ্যমেই ছোটনের সাথে বন্ধুত্ব। আর সেই সূত্রে মিতালির সাথেও। ঢাকা ম্যাডিক্যালে পড়ে ফার্স্ট ইয়ারে। সুমন, ছোটন, রাশেদ সেকেন্ড ইয়ারে।
সুমন ঢাকায় যায় বছরে পাঁচ ছয় বার। প্রতিবারই রাশেদের রুমে উঠে। প্রতিবারই সলিমুল্লাহর ক্যান্টিনে আড্ডা। ডিএমসি’র ক্লাশ ফাঁকি দিয়ে মিতালিও আসে আড্ডায়। ওর ক্লাস করা গোল্লায় যায়। মিতালির জীবন দর্শন আর ম্যাচিউরিটি সুমনকে আকৃষ্ট করে। সুমনের কবিতা শুনে মিতালি মুগ্ধ হয়। রাশেদ আর ছোটনের মতো মিতালির সাথেও সুমনের বন্ধুত্ব গাঢ় হয়। নিজদের মধ্যে ছোট খাটো ঝগড়া হলে দু’জনই তার কাছে নালিশ করে। সে মধ্যস্থতা করে সানন্দে।
সুমন ভেবে পায়না মিতালিকে কি বলবে। সেতো কেঁদেই চলছে। সুমন আলতো করে মিতালির মাথায় হাত রাখতেই ও সুমনের বুকে লুটিয়ে পড়লো। সুমন ভাই, প্লিজ আমাকে আশ্রয় দিন। মিতালির চোখে প্লাবন। সুমনের শার্ট ভিজে যায়। ছোটনের কথা আর মনে থাকেনা দু’জনের কারোই।
সেই থেকে শুরু। পরের দশ বারো দিন কেটেছে ঘোরের মধ্যে। দিনের বেলায় কলেজ ক্যান্টিন, মেইন হোস্টেলের ফিফটিন/এ, কফি ইন, তুংফং রেঁস্তোরা কিংবা ওয়ার সিমিটারি। হুড ফেলে রিক্সায় করে ঘোরা। রাতে শহীদ মিনার আর লেডিস হোষ্টেলের পাশে লাভ লেইন। দু’জনের গল্পের শেষ নেই। কখনো মিতালির ছোট বেলার সুইডেনের জীবন, কখনো এরশাদ বিরোধী আন্দোলন, প্রেমের গল্প, যৌনতার গল্প, আবার কখনো আবুল হাসান, খলিল জিবরান। শহীদ মিনারের সিঁড়িতে বসে ঘাসের শলায় টান দিতে দিতে দু’জনেই এক সাথে আবৃত্তি করে ‘পাখি উড়ে চলে গেলে পাখির নরম পালক/ কঠিন মাটিতে পড়ে থাকা ঠিক নয়/ এই ভেবে কষ্ট পেয়েছিলে…’। সুমন অবাক হয়ে দেখে মিতালিও তার সাথে গাঁজায় দম দেয়। ছোটনই নাকি শিখিয়েছে।
প্রথম চুমুটা ছিল ফিফটিন/এ তে, নাঈমের রুমে ডেটিং করার সময়। কে কাকে চুমু খেয়েছিল বলা কঠিন। মিতালি অবশ্য বলে ‘ইস, আমার বয়েই গেছে!’ ও যে এতোটা লজ্জা পাবে সুমন বুঝতে পারেনি। বলেছে, ‘এর চেয়ে বেশি কিন্তু না। ছোটন এর চেয়ে বেশি কিছু পায়নি, আপনিও পাবেন না’।
এরপরও ‘আপনি’?
ওটা ওরকমই থাক। সেই কবে থেকেই আপনাকে সুমন ভাই ডেকে ইউজডটু হয়ে গেছি। ওটা চেঞ্জ করতে পারবোনা।
আমরা যদি বিয়ে করি তবুও না?
তখন দেখা যাবে।
দু’জন দু’জনকে গভীর চুমুতে আবারো জড়িয়ে ধরে। নিঃশ্বাস গভীর হয়।
ঢাকা ফিরে যাওয়ার দিন চুমু খেতেই মিতলি বললো, ‘আর তো কিছুই চাইলেন না। ছোটন পায়নি, তাই বলে আপনি পেতে পারতেন না তাই ভেবে নিয়েছিলেন?’
তবে যে তুমি বলেছিলে…
তা তো আমি বলেছি। কিন্তু আপনিওতো চান নি।
মিতালি বাসে উঠতে উঠতে কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বলে, ‘এসেছিলাম একজনের গার্লফ্রেন্ড হিসেবে। ফিরে যাচ্ছি আরেকজনের হয়ে। নিজের বন্ধুর সাথে কেউ এমন করে? আপনি খুবই খারাপ মানুষ। সামনে কি আছে কে জানে’! দু’জনেই হেসে ওঠে।
৩
সুমন দলে যোগ দিয়েছিল সমাজ পরিবর্তনের লড়াই করার এক আকাশের স্বপ্ন নিয়ে। সমাজ বদলের লড়াইয়ে আত্মদান করা একজন অসীম সাহসী কর্ণেল তার আদর্শ। কিন্তু নীতি আর ব্যাক্তিত্বের সংঘাতে তার দল ক্রমাগত ভাঙছে গত পাঁচ ছয় বছর ধরে। তবুও মেডিক্যাল কলেজে তারা সংগঠনের ঐক্য ধরে রেখেছিল। শোষনহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে তখনো সুমন আর তার বন্ধুরা বিভোর। তখনই এলো মরণ আঘাত। দেশে এরশাদের স্বৈর শাসনের বিরুদ্ধে উত্তাল আন্দোলন। সুমনের দল আবারো ভাঙলো। এক পক্ষ সরকারের ‘বি’টিমে পরিণত হলো। অন্য পক্ষ সরকার বিরোধী শিবিরে গণআন্দোলনের অগ্রভাগে রইলো।
সুমন, তার বন্ধুরা আর জুনিয়রদের নিরঙ্কুশ সংখ্যা গরিষ্ঠ অংশ সরকার বিরোধী গ্রুপে একাত্ব হতে চাইলো। কিন্তু বহু বছর আগে ছাত্রত্ব শেষ করা যেসব সিনিয়ররা ক্যাম্পাসের বাইরে থেকে দলকে নিয়ন্ত্রণ করতেন তারা তখন স্বৈরাচারী সরকারের লেজুড়ে পরিণত হওয়া গ্রুপে ভিড়ে গেছেন। তাদের অব্যাহত চাপ ও হুমকির কাছে শেষ পর্যন্ত সুমনের দলের মেডিক্যাল কলেজ শাখা সেই গ্রুপে নাম লিখিয়েছে। নেতা কর্মী সবার প্রাণের স্পন্দন উবে গেল। সবার মধ্যে হতাশা, অপরাধীভাব, নির্লিপ্ততা।
সুমনের সামনে তার পৃথিবীটা খানখান করে ভেঙে গেল। আর সে মোজাম্মেল চত্ত্বরে দাঁড়িয়ে স্বৈরাচার উৎখাতের শপথ নিতে পারবে না। তার ও বন্ধুদের মুখে থাকবে একজন পথভ্রষ্ট নেতার বুলি। নিজেরাই যে কথা মনে প্রাণে বিশ্বাস করেনা সেকথা বলে আবারো শ্লোগান দেবে। সুমন চেয়েছিল ক্যাম্পাসে দলের পালটা গ্রুপের গোড়া পত্তন করবে। কিন্তু লেখা পড়ার চাপ, ক্যাম্পাসের বাইরে থাকা সিনিয়র ও ক্যাম্পাসে থাকা তাদের অনুগামীদের চাপের মুখে সুমনের সহযোগীরা নিজেদের গুটিয়ে নিল। সুমন অনেকটাই একা।
ক্ষোভ, হতাশা আর অপমানে সুমন নিজেকে গুটিয়ে নিল ক্যাম্পাস রাজনীতি থেকে। সিডাক্সিন আর ইনোকটিন আবার কখনো ঘাস তার নিত্য সঙ্গী। সেই সাথে রাত জেগে নির্মলেন্দু গুণ, আবুল হাসান। ঘুম থকে উঠতেই বেজে যায় এগারোটা বারোটা।
কি রে তোরা এতো জন একসাথে কোত্থেকে এলি? কি ব্যাপার?
সুমনের ঘুম ভাঙে বদিউল, সৌম্য আর জাহেদের ডাকে। সাথে করে নিয়ে এসেছে মুক্তা, কামাল, আবিদ সহ আরো বিশ পঁচিশ জনকে। ফোর্থ ইয়ার থেকে ফার্স্ট ইয়ার।
বস, আপনাকে এরেস্ট করতে এসেছি।
কেন, আমি আবার কি অপরাধ করলাম! তোদের কাছেতো আমার অপরাধের শেষ নেই।
অপরাধতো একটা আছেই সুমন ভাই। ভালোবাসার চেয়ে বড় অপরাধ আর কি হতে পারে!
কি হয়েছে খুলে বল।
বস, আপনি আমাদের সাথে এটা করতে পারেন না। আমাদের রাজনীতির মাঠে রেখে আপনি নিজেকে গুটিয়ে নেবেন তা হয়না। আমরা আপনাকে আবারো মিছিলের সামনে দেখতে চাই। আপনার সিডাক্সিন আর ইনোকটিনকে নির্বাসন দিতে চাই।
আমিতো তোদের কিছুতে বাধা দিচ্ছিনা। আমার সেই সাধ্যইবা কোথায়! আমার ব্রেইন অন্য কোথাও থাকলেও হার্টতো তোদের সাথেই আছে। আমিতো তোদেরই লোক। ছাত্র সংসদ নির্বাচন হলে আমি তোদের প্যানেলেই ভোট দেব। তোদের জন্যই ভোট চাইবো। তোরাতো ভালো করেই জানিস।
না সুমন ভাই। এই কথা বললে হবে না। আপনাকে দেখে পলিটিক্সে এসেছি। আপনি আমাদের মাঠে রেখে চুপসে যাবেন তাতো হয় না। আপনাকে আবার একটিভ হতে হবে।
তোরাতো নিজেদের অবস্থানে থাকতে পারিস নি। তাই আমাকে আমার বিবেক বিসর্জন দিতে বলছিস?
বস, আপনিতো সব কিছুই জানেন। আমাদের করার কিছুই ছিল না। আর যদি ক্যাম্পাসে পার্টি ভাঙে তাহলেতো আমাদের কোন গ্রুপই ক্যাম্পাসে টিকে থাকতে পারবে না। আমরা আজ কিছুই শুনবো না। আপনি যদি আমাদের ছেড়ে থাকেন, ভাববো আমাদের প্রতি আপনার মায়ার পুরোটাই ছিল মেকি।
সুমন চিরদিনই ভালোবাসার ক্রীতদাস। এই এক জিনিসের কাছে সে অনেক কিছুই বিসর্জন দিতে পারে। আজো তার বিবেক বিসর্জন দিল জুনিয়রদের ভালোবাসার কাছে। সে আবার ক্যাম্পাসের রাজনীতিতে জড়িয়ে গেল। ক্যাম্পাসের নোংরা আর বেহায়াপনার রাজনৈতিক সংস্কৃতির কাছে নিজের বেহায়াপনাকে আর বড় মনে হলো না। সুমন আবারো মিছিলের সামনে। ‘ছিয়াত্তুরের ক্ষুদিরাম……’
স্বৈরাচারী সরকার ততোদিনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রূপরেখা নিয়ে সর্বদলীয় আলোচনা আয়োজনে ব্যাস্ত। বড় দল গুলো নির্বাচনে অংশগ্রহণে অসম্মত। সুমনের দল সরকারের অঘোষিত ‘বি’ টিম। সুতরাং তারা নির্বাচনে যাবে। হঠাৎকরেই আগের অবস্থান থেকে সরে গিয়ে একটি বড় দল নির্বাচনে যোগ দেয়ার ঘোষণা দিলো। সুমন সে দিন কী একটা কাজে ক্যাম্পাসের বাইরে। তার দল ভাবলো অন্য দলকে তাদের অবস্থান পরিবর্তনের জন্য হেয় করার এটাই সুবর্ণ সুযোগ। তারা ওই বড় দলটির নেত্রীকে ব্যাঙ্গ করে কার্টুন এঁকে পোস্টার করলো। ক্যাম্পাসে এমনিতেই চাপা উত্তেজনা চলছিলো বেশ কিছুদিন থেকেই। দু’পক্ষেরই যুদ্ধ প্রস্তুতি। এই পোস্টার সেই উত্তেজনায় ঘৃতাগ্নি হলো। যদিও সংখ্যায় সুমনদের দলের পাল্লাটা ভারি ছিল, কিন্তু ব্যাবধান বেশি কিছু না। হয়তো উনিশ বিশ। হাতিয়ারে ছিল প্রতিপক্ষের শক্তি বেশি। তার উপর বাইরের সাহায্য। সুমনদের দলের ক্যাম্পাসের বাইরে তেমন কোন অবস্থান ছিল না।
একরাতের অপারেশনে সুমনদের দলকে ক্যাম্পাস থেকে বের করে দেয়া হলো। মেইন হোস্টেলে আগুন জ্বললো। সুমনদের ব্যাচ তখন সবচেয়ে সিনিয়র বলে ওদের উপর ধকলটা কম গেলেও কাউকে কাউকে অপমানিত হতে হলো ভীষণ। সুমন রেহাই পেয়েছে। কোন এক অজানা কারণে তাকে কেউ অপমান করে নি। বড়জোর বলেছে, ‘সুমনভাই, প্লিজ ওদিকে যাবেন না’। অথবা ‘আপনি থাকতে কেন এমন হলো?’
রাতারাতি ক্যাম্পাস থেকে একটা বড় ছাত্র সংগঠন নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। সুমনের ভালোবাসার মানুষ গুলো সব দিশেহারা। তাদের ক্যাম্পাসে ঢোকার অনুমতি মিললো এই শর্তে যে তারা আর নিজেদের দল করতে পারবে না। যে সব সিনিয়ররা তাদের সরকারপন্থি গ্রুপে যেতে বাধ্য করেছিল তাদের আর ক্যাম্পাসের আশেপাশে দেখা গেল না। দিশেহারা ছেলেগুলো কি ভাবে দিন কাটাচ্ছে সে খবর রাখার প্রয়োজন তারা বোধ করলেন না। সুমন আবারো একা। এই ক্যাম্পাসে আর কোন দিন তার শ্লোগান শোনা যাবে না। মোজাম্মেল চত্ত্বরে দাঁড়িয়ে সে আর কোনদিন সমাজ বদলের লড়াইয়ের ডাক দেবে না। একজন অসম সাহসী কর্ণেলের গল্প বলবে না। ইয়াকুব, অমল, নাঈম, সজল সবাই আসে। বলে, ‘দোস্ত, চল পড়ায় মন দেই। পরীক্ষারতো আর দেরি নেই’। সুমনের কোন কিছুতেই মন বসে না। নিজেকে পরিত্যাক্ত গণিকার মতো মনে হয়।
৪
প্রিন্সিপালের অফিসের লবির সামনে যেতেই চমকে উঠলো সুমন। আরে, এটা কি ঝুমুর! কতোদিন পর দেখছে ঝুমুরকে। আগের চেয়ে আরো বেশি সুন্দরী হয়েছে। এখনো কি আগের মতোই নাচে? দু’জনই দু’জনকে দেখেও না দেখার ভান করে এড়িয়ে গেল। ঝুমুর তাহলে চিটাগাং মেডিক্যালে চান্স পেয়েছে! সুমনের জানা ছিলো না।
জানবে কি করে! ঝুমুরের সাথে দেখা নেই, কথা নেই বেশ কয়েক বছর। দু’জনেই বেড়ে উঠেছে ফেনীতে। দু’জনই শহরের প্রিয় সন্তান। নিজেদের ক্লাসের সেরাদের একজন। একজন মঞ্চ মাতায় কবিতার ছন্দে। অন্যজন নাচের মূর্ছনায়। ঝুমুরের নাচ, কথা বলার ভঙ্গি, হাঁটা সবকিছুই সুমনকে মুগ্ধ করে। সেই মোহ একদিন ভালোবাসা হয়ে যায়। ঝুমুরের সাথে কথা হয় সব সময়। ওর বড় বোন জামিলা আপা সুমনকে স্নেহ করেন বেশ। সেই সুবাদের ঝুমুরদের বাসায় যাওয়া আসা হয়। কিন্তু ইন্টারমেডিয়েট পড়ুয়া সুমন সাহস করে ঝুমুরকে ভালোবাসার কথা বলতে পারে না।
হালিমকে দিয়ে এপ্রোচ করালে কেমন হয়! হালিম সুমনের ভালো বন্ধু। এক সাথে নাচে বলে ঝুমুরের সাথেও ভাব। ইন্টারমেডিয়েট পরীক্ষার পর তাই হালিমের শরণাপন্ন। ঝুমুর তখন ক্লাস টেনে উঠেছে মাত্র। কাজ হলোনা। হালিম এসে বললো, ‘ঝুমুরের সাথে কথা হয়েছে। রাজি হয়নি। ও এখন প্রেমের কথা ভাবছে না। বলেছে তোকে রেসপেক্ট করে, কিন্তু প্রেমিক হিসাবে ভাবে না। কখনো ভাবতে পারবে না বলে দিয়েছে’। সুমনের কনফিডেন্স লেভেল ধপাস করে শুন্যে নেমে আসে। তার আর ঝুমুরের বাসায় যাওয়া হয়নি। দেখা হয়নি। কথা হয়নি। তারপরতো নিজ শহরের মায়া কাটিয়ে মেডিক্যালে। ছুটিতে বাড়িতে গেলেও ঝুমুরের সাথে আর কোন দিন যোগাযোগ হয় না।
ঝুমুরের প্রায় দেড় বছর কেটে গেছে ক্যাম্পাসে। বান্ধবীদের নিয়ে সারা ক্যাম্পাস হেঁটে বেড়ায়। সুমন আগের মতোই মুগ্ধ হয়ে দেখে। সব দলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেই ঝুমুরের ডাক পড়ে। সুমন বন্ধুদের নিয়ে অপলক দেখে। কিছুই বলতে পারে না। সে জানে ঝুমুর তার আগের অবস্থানেই আছে। মেয়েরা সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করলে কোননা কোন ভাবে জানান দেয়। তার ইগো যতোই থাকুক না কেন।
বিকেল পাঁচটা হবে। সুমন ক্যান্টিনে চায়ের কাপে মাত্রই চুমুক দিয়েছে। লাইব্রেরিতে যাবে। পরীক্ষার দেরি নেই বেশি। বন্ধুরা সবাই পড়ায় মন দিয়েছে। আড্ডা দেয়ার তেমন কেউ নেই। তার রাজনীতিতো ক্যাম্পাস থেকে বহিষ্কৃত। পড়াশুনা ছাড়া কীইবা করার আছে! ঊষা এসে বললো, ‘সুমন ভাই, আপনিতো ইদানিং লাইব্রেরি ওয়ার্ক করছেন। আমি আর ঝুমুর আপনার কাছে লাইব্রারিতে ফিজিওলজি পড়তে চাই’। সুমনতো অবাক। মেয়েটা বলেকি!
উষা ঝুমুরের বেস্ট ফ্রেন্ড। সুমনদের ক্লাসের দিপালের প্রেমিকা। দিপাল অন্য একটি ছাত্র সংগঠনের নেতা হলেও লেখাপড়ায় নিয়মিত। আর সুমনতো মৌসুমী পড়ুয়া। পরীক্ষা ঘনিয়ে এলে দুই মাস পড়াশুনা। এই মেয়েটা হঠাৎ করে তার কাছে পড়তে চাইছে কেন! তার অন্য যতোই দক্ষতা থাকুক, ভালো ছাত্র হিসেবেতো কোন সুনাম নেই।
তুমি, মানে তোমারা হঠাৎ করে আমার কাছে! এটা কি তোমার প্ল্যান না ঝুমুরের? আমিতো মোটেও ভালো ছাত্র নই।
আমাদের ভালো ছাত্রের দরকার নেই। আমাদের ভালো টিচারের দরকার। ঝুমুর বলেছে আপনার মতো টিচার নাকি ও কখনো দেখেনি।
ও! ওটা ঝুমুরের বায়াস ফ্যাক্টর। ও যখন ক্লাস নাইনে তখন কিছুদিন ফিজিক্স আর ইলেকটিভ ম্যাথসে হেল্প করছিলাম। আর বাংলায় কিছু নোট।
বলেছে। আপনার টিচিংয়েতো সে মুগ্ধ। লজ্জায় আপনাকে বলতে পারছেনা। আমাকে পাঠিয়েছে।
সেতো অনেকদিন আগের ব্যাপার। আর তখন আমি ভালো স্টুডেন্ট ছিলাম। আমিতো ফিজিওলজির তেমন কিছুই জানি না।
দেখুন সুমন ভাই। পাশ কাটাবেন না। সুযোগ কিন্তু বারবার আসবে না। আপনি পড়াবেন কিনা বলুন। আপনি ফুলটাইম রাজনীতি করেও এক চান্সে সবগুলো পরীক্ষায় পাশ করেছেন। আমরাও পাশ করতে চাই। আমাদের অত বেশি জানার দরকার নেই। পাশ করলেই চলবে। আমরা আজ থেকেই পড়তে চাই।
ঝুমুর কোথায়?
লাইব্রেরিতে।
আচ্ছা যাও। ভেবে দেখি।
ঝুমুর কি তাইলে মত বদলেছে? নইলে এই এপ্রোচের মানে কি! সুমনতো এমন কোন ভালো ছাত্র নয় যে মেয়েরা ওর কাছে পড়তে আসবে।
মিতালির সাথে ব্রেক আপ হয়ে গেছে প্রায় বছর ঘনিয়ে এলো। ঢাকায় ফিরে যাওয়ার পর প্রতি সপ্তাহেই চিঠি দেয়া নেয়া হতো। সুমন কখনো মাসে একবার, কখনো দু’মাসে একবার ডেটিং করতে যায়। বুয়েটের হলে উঠে। রাশেদের রুমে উঠলেই ছোটনের সাথে দেখা হবে। দু’জনই বিব্রত হবে। শেষ কয়েকবার সুমন খেয়াল করলো মিতালি কেমন যেনো একটু বদলে যাচ্ছে। আগের মতো আন্তরিকতা নেই। ঢাকায় গেলে নিজের হাতে রান্না করে খাওয়ায়। ক্যান্টিনে বসে গল্প করে। কিন্তু তেমন করে প্রেমের কথা বলে না। চুমু খায় না। মিতালি কি তাইলে মত বদলেছে?
মিতালির চিঠির ফ্রিকোয়েন্সি সপ্তাহ থেকে দু’সপ্তাহে নেমে আসে। তারপর মাসে একটা। একদিন এলো লম্বা চিঠি। মিতালি লিখেছে, ‘আমি ছোটনের কাছে ফিরে যাচ্ছি। হয়তো আমাকে ক্ষমা করতে পারবেন না। আচ্ছা, আমিতো আপনাকে কখনো ‘তুমি’ করে বলিনি। আপনি বলতে জোর করলেন না কেন? মেয়েরা তার প্রেমিককে হিরো ভাবতে ভালোবাসে। যে জোর করে আদায় করে নিতে পারে। ছোটন আমার ভালোবাসা জোর করে আদায় করে নিচ্ছে। আমি নিরুপায় সুমন ভাই। আমি আপনাকে ভালোবাসি আবার রেসপেক্টও করি। কিন্তু ছোটনের প্রতি ভালোবাসাটা ইদানিং তীব্র হয়ে উঠেছে। কী করবো! মনের উপরতো আর জোর চলে না। আমি লুট হয়ে যাচ্ছি। আমি সত্যি নিরুপায়। আমার বুকের তিল দু’টো ছোটন ছাড়া একমাত্র আপনিই দেখেছেন। ছোটন ছাড়া আর কাউকে যদি বিয়ে করি তাহলে আপনাকেই করবো। সেদিন আর জোর করতে হবে না। এমনিতেই সব কিছু পাবেন, অবশ্য যদি সেই দিন কখনো আসে’।
সুমন জানে সেই দিন আর কখনো আসবে না। সে চিঠির উত্তর দেয়নি। পতেঙ্গা সৈকতে গিয়ে নিজে নিজে কেঁদেছে এক বিকেল। কোন মেয়ের জন্য এই প্রথম কান্না। চোলাই মদ খেয়ে মানিকের গাড়িতে করে ফিরে এসেছে রুমে। বদিউল তখন লিমার সাথে লাভলেইনে ডেটিংয়ে ব্যাস্ত। সুমন নিজেকে আবিষ্কার করে বড় বেশি একা। ক’দিন ঘুমিয়ে কাটায়। সিডাক্সিন, ইনোকটিন। আহা কী শান্তির ঘুম! তারপর আবার গা ঝাড়া দিয়ে উঠে। আবারো মোজাম্মেল চত্ত্বর, কলেজ ক্যান্টিন, ছিয়াত্তুরের ক্ষুদিরাম……
দলের বিপর্যয়ের আগে পর্যন্ত এভাবে দিন কেটে যাচ্ছিল ভালোই। কিন্তু প্রতিপক্ষের সাথে সংঘাতের পর আবারো বিষণ্ন দিন। অনেকের মধ্যে থেকেও একাকী। ঊষার প্রস্তাবকে মনে হলো আশীর্বাদ। ক্ষতি কি এক্সপ্লোর করে দেখতে! কেবলমাত্র পড়াই যদি ঝুমুরের উদ্দেশ্য হতো তবে তার কাছে কেন? দিপাল, অজয়, মন্টু, হোসেন অনেকেইতো ছিল।
সেদিন থেকেই লাইব্রেরির একটা ছোট টেবিল ওদের তিনজনের হয়ে গেল। মাঝে মাঝে দিপাল অন্য টেবিল থেকে এসে ঊষার সাথে গল্প করে যায়। ঝুমুর আর সুমনও গল্পে থাকে। পড়া এগিয়ে যায়। কিন্তু প্রেম এগোয় না। ঝুমুর কিংবা সুমন কেউই প্রসিড করে না। ঊষাও নির্বিকার। দিপালের সঙ্গ আর গাইটনের পাতা ছাড়া আর কিছুতে তার আগ্রহ আছে বলে মনে হয় না।
সুমনের ঘনিষ্ট বন্ধুরা সবকিছুই পর্যবেক্ষণ করছে প্রথম থেকে। আমান বললো, ‘দোস্ত, এনাফ ইজ এনাফ। আর কতদিন আঙুল চুষবি! এবার প্রপোজ কর। খামাখা সময় নষ্ট করে লাভ কি!’
আমিতো একবার প্রপোজ করেছি অনেক বছর আগে। এবারে ওকেই ইনিশিয়েটিভ নিতে হবে।
কচু! তুই জানিস না এসব ব্যাপারে মেয়েরা আগে ইনিশিয়েটিভ নেয় না? ছেলেদেরই নিতে হয়।
আমি পারবো না।
আমান, নাঈম, ইয়াকুব, অজয় ভাবে আর দেরি করা যায় না। আজই অপারেশন করতে হবে। এক গুচ্ছ ফুল নিয়ে বিশ পঁচিশ জন বন্ধু সহ লাইব্রারিতে হাজির। উদ্দেশ্য সুমন আর ঝুমুরকে কংগ্রাচুলেট করবে। ওদের ধারণা এভাবেই প্রেমের সূত্রপাত হবে। যেন স্কুল দিনের দুই বন্ধুর আড়ি ভাঙানো। কি আর করা! ওরা যেহেতু কেউ কাউকে প্রপোজ করবে না, কারোনা কারোতো ফ্যাসিলিটেট করতেই হবে। লাইব্রেরিতে ঢুকেই সুমনদের টেবিল ঘিরে দাঁড়ালো সবাই। ফুলের গোছাটি টেবিলে রেখেই সবাই এক সাথে হাততালি দিয়ে বলে উঠলো ‘কংগ্রাচুলেশনস!’ লাইব্রেরির সবার চোখ তখন সুমনদের টেবিলে। পাশের টেবিলে দিপাল ভেবে পাচ্ছে না কি হচ্ছে। সুমন কিছুই বুঝতে পারছেনা কোথা দিয়ে কি হচ্ছে। ঊষা বিরক্ত, ঝুমুর ক্ষুব্ধ। কেউ কিছু বুঝে উঠার আগেই ঝুমুর বই গুছিয়ে উঠে চলে গেল মুখ কালো করে। পেছনে পেছনে ঊষাও। বন্ধুরা চ্যাংদোলা করে সুমনকে নিয়ে এলো ক্যান্টিনে। ফুলের তোড়া পড়ে রইলো লাইব্রেরির টেবিলে।
‘তোরা আমার এই সর্বনাশটুকু না করলেও পারতি’। সুমনের মুখে আর কোন কথা বের হয় না। নিজেকে ভীষণ অপমানিত লাগছে তার। ঝুমুর এভাবে সবার সামনে দিয়ে চলে না গিয়ে যদি পরে তাকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করতো তাহলেই বরং কম অপমান লাগতো। আমান গান ধরে ‘মিলন হবে কতো দিনে..’। সবার হৈচৈয়ে সুমনের ক্ষোভ চাপা পড়ে যায়।
রুমে ফিরেই দুই সিডাক্সিন। আজ ডিনার করতেও ইচ্ছে করছে না। পেটের খিদা পেটেই থাকে। কাল রাতের ঘুম, ভেঙেছে আজ দুপুরে।
৫
নিজেকে খুব ছোট মনে হয় সুমনের। ঝুমুর নির্ঘাত ভাবছে যে সে প্ল্যান করেই বন্ধুদের দিয়ে এমন নাটক করিয়েছে। ছিঃ। আবার এমনওতো হতে পারে যে ঝুমুর লজ্জা পেয়েই লাইব্রেরি থেকে উঠে গেছে। একবার ভাবলো দিপালকে গিয়ে জিজ্ঞেস করবে। মন সায় দিলনা। সন্ধ্যায় লাইব্রেরিতে গেল। যদি ঝুমুর বা ঊষা আসে।
ডেভিডসনের পাতা উলটানো হয়নি। রাত আটটা পর্যন্ত বসে থেকেছে। ঝুমুর বা ঊষা আসেনি। সুমনের আর বুঝতে বাকি রইলো না। কিন্তু তাহলে ঝুমুর তার কাছে পড়তে চেয়েছিল কেন? সুমন হিসাব মেলাতে পারে না। নিজেকে ভীষণ ছোট আর তুচ্ছ মনে হয়। অপমানিত মনে হয়। ক্যাম্পাসে অন্ধকারে একা একা কিছুক্ষণ ঘুরে বেড়ায়। ব্লাড ডোনারদের কাছে গিয়ে ওদের টুয়েন্টি নাইন খেলা দেখে। ক্যান্টিনে ডিনার সেরে রুমে ফিরে আসে।
সুমন কিছুই ভাবতে পারে না। একবার ভাবে পড়তে বসবে। ধুর! পড়ে কি হবে! সার্জারিতে ফেল কনফার্ম। রহিম স্যারতো বলেই দিয়েছেন, ‘সুমন, চাপা মেরে কেউ কোনদিন এমবিবিএস পাশ করেনি। তুমিও করতে পারবে না’। তারপর আর লাভ বেইলি নিয়ে বসে কি হবে! তার চেয়ে ঘাসের শলায় টান দিয়ে তপনদাদের সাথে চাঁদে যাওয়াই ভালো। অথবা…
এতো করে বললো তাও বদিউল আসেনি সাথে। সুমন একাই হাঁটছে ক্যাম্পাসে। ভীষণ একা সে। অপমানিত, তুচ্ছ, উদভ্রান্ত। গত কয়েকমাসে তার ডিগনিটি, কম্পোজার, ইনটিগ্রিটি সব কিছু ধূলায় মিশে গেছে। আজ কিছু একটা হয়ে গেলে এর চেয়ে বেশি আর কিইবা ক্ষতি হবে। সুমনের পৃথিবীতো ওর সামনেই গুঁড়িয়ে গেছে।
শহীদ মিনারের সিঁড়িতে বসে ঘুটঘুটে অন্ধকার উপভোগ করে। সে কি ঝুমুরকে মিস করছে? সুমনের তা মনে হয়না। ঝুমুরের কাছে সে ছোট হয়েছে বটে, কিন্তু তাকে মিস করছে বলে মনে হয়না। ঝুমুরের সাথেতো তার প্রেমই হয়নি কখনো। কোন মধুর স্মৃতিও নেই। তাহলে তাকে মিস করবে কেন? সুমন আসলে মিস করছে মিতালিকে। শহীদ মিনারের সিঁড়িতে বসে মিতালির আবৃত্তি শোনাকে। সুমন মিস করছে মিতালির গায়ের গন্ধ। ওর বুকের দু’টো তিল। ফিফটিন/এ’র প্রথম চুমু। আজ মিতালির বুকের বোতাম খুলে সেই তিল দু’টোতে চুমু খেতে ভীষণ ইচ্ছে করছে। এতোদিন পর…
সুমন আজ মিছিল আর শ্লোগান মিস করছে। আরেকবার মোজাম্মেল চত্ত্বরে দাঁড়িয়ে সমাজ বদলের লড়াইয়ে শামিল হওয়ার ডাক দিতে ইচ্ছে করছে। কে বলেছে সে আর শ্লোগান দেবেনা ক্যাম্পাসে! যাবে নাকি একবার মোজাম্মেল চত্ত্বরে? সুমন শহীদ মিনারের সিঁড়ি থেকে উঠে দাঁড়ায়। না, মোজাম্মেল চত্ত্বরের দিকে যায় না। কলেজ গেটে বেশ কিছু ফার্মেসি তখনো খোলা। কোথাও বিশটি সিডাক্সিন, কোথাও দশটি ইনোকটিন, কোথাও লারগেকটিল, কোথাও ফেনোবারবিটন আবার কোথাও ফ্রিজিয়াম পাওয়া গেল। সব মিলিয়ে সাতশ’ আশি মিলিগ্রাম। বিভিন্ন ব্রান্ডের। সুমন আজ ঘুমাবে। ওর ঘুমের ভীষণ প্রয়োজন। সে আজ ঘাস খাবেনা, নভোচারীও হবে না। সে আজ ঘুমাবে গভীর।
মোল্লার দোকানের লেবু চা আজ বেশি তেতো লাগছে কেন কে জানে! হয়তো এতো গুলো ওষুধের জন্য নসিয়া হচ্ছে। রুমে গিয়ে শুয়ে পড়াই ভালো। সুমন কলেজ গেটে বমি করে কোন সিন ক্রিয়েট করতে চায় না।
বদিউল তখন ঘুমের ঘোরে। হয়তো লিমার স্বপ্নে বিভোর। সিগারেট কনটিনিউ করার পারমিশন পেয়েছে। ঘুমের মধ্যেও ওর মুখে হাসি লেগে আছে। সুমনের কাপড় চেঞ্জ করতে ইচ্ছে করেনা। জামা জুতো নিয়েই শুয়ে পড়ে। ওর কি সত্যি হ্যালুসিনেশন হচ্ছে? কে যেন কানের কাছে ফিস ফিস করে বলে, ‘সুমন ভাই, আপনি ডাকলেই আমরা চলে আসবো মিছিলে’। দূরে মেইন হোস্টেলের দিক থেকে শ্লোগানের শব্দ ভেসে আসছে ‘ছিয়াত্তুরের ক্ষুদিরাম…’
সুমন শহীদ মিনারের সিঁড়িতে বসে আছে। দূরে নবীন বরণের প্যান্ডেল। অনেক দূরে ঝুমুরের নাচ দেখা যাচ্ছে অস্পষ্ট। ব্যাক গ্রাউন্ডে প্রিয় নজরুল গীতি ‘গোমতির তীরে পাতার কুটিরে আজো সে পথ চাহে সাঁঝে…’। সুমন ক্রমশ ছোট হচ্ছে। সুমন অনু থেকে পরমাণু হয়ে মিশে যাচ্ছে ধূলায়। পেছনে ব্লাড ডোনাররা জুয়া খেলছে। মিতালির বুকের বোতাম খোলা। তিল দু’টো দেখা যাচ্ছে আবছা আলোয়। মিতালির গলায় আবুল হাসান…
পাখি উড়ে চলে গেলে পাখির নরম পালক
কঠিন মাটিতে পড়ে থাকা ঠিক নয়
এই ভেবে কষ্ট পেয়েছিলে…
বাংলাদেশ সময়: ১৭১৬ ঘণ্টা, ০৭ অক্টোবর, ২০১২
সম্পাদনা: এম জে ফেরদৌস mjferdous0@gmail.com