 |
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় [জন্ম ১৮৯৪ সালে ১২ সেপ্টেম্বর তৎকালীন যশোর জেলায় (আদি নদীয়া), ইছামতি নদীর তীরে বারাকপুর নামক এক বর্ধিষ্ণু গ্রামে; আর মৃত্যু ১৯৫০ সালে ১ নভেম্বর ঘাটশিলার বাড়িতে]-এর পূর্বপুরুষের বসতি ছিল চব্বিশ পরগনার বসিরহাটের পানিতর গ্রামে। তাঁর পিতামহ কবিরাজ তারিণীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় বারাকপুরে বসতি গড়েছিলেন। বিভূতির পিতা মহানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায় আর মাতা মৃণালিনী দেবী। অভিভাবকদের ঔদাসীন্য আর অংশত আর্থিক অনটনের কারণে তাঁর বিদ্যানুশীলন ছিল শিথিল; অনেক পাঠশালা-বিদ্যালয় পরিবর্তন করতে হয়েছিল। তবে লেখাপড়ায় বরাবরই তীক্ষ্ণ মেধার স্বাক্ষর রাখতে সমর্থ হয়েছিলেন তিনি। অবশ্য তাঁর শৈশব-কৈশোরের সাফল্য অর্জন সেখানে নয়; স্বভাব-বাউণ্ডুলে, সংসার-উদাসীন, রোম্যান্টিক বাবার সাথে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে বৃক্ষতরুলতা ও প্রকৃতিরহস্যের সন্নিধানে এসে অসাধারণ বোধসম্পন্ন এক মানুষে তিনি ক্রমশ রূপান্তরিত হচ্ছিলেন। তাঁর অলোকসম্ভব চিদ্বৃত্তি ও অনুভবশক্তির পেছনে পিতৃসান্নিধ্যের অবদান অপরিমেয়।
সোনারপুর-হরিণাভি স্কুলে শিক্ষকতা করার সময়ে ‘উপেক্ষিতা’ নামক গল্প লেখেন ১৯২২ সালে; মাসিক প্রবাসীর ১৩২৮ সনের মাঘ সংখ্যায় তা ছাপা হয়- এটিই তাঁর প্রথম রচনা। প্রথম উপন্যাস পথের পাঁচালী প্রকাশিত হয় ১৯২৯ সালে। গল্প-উপন্যাস-ভ্রমণকথা ছাড়াও আরেক ধরনের বাণীশিল্পে তাঁর আসক্তি লক্ষ করবার মতো; তা হলো- দিনলিপি রচনা। এত অনুপুঙ্খ দিনলিপি লেখার অভ্যাস আর কোনো বাঙালি সাহিত্যিকের আছে বলে আমাদের জানা নেই।
বিভূতিভূষণ বেড়াতে অসম্ভব ভালোবাসতেন। শহুরে জীবন ভালো লাগতো না, প্রকৃতি- গ্রামবাংলা তাঁকে প্রচণ্ড আকর্ষণ করতো। অরণ্য-বৃক্ষলতা-পাহাড়-নদী ইত্যাদির সান্নিধ্যে আক্ষরিকভাবে তাঁর মধ্যে প্রতিক্রিয়া দেখা যেত- সে কেবল প্রকৃতিপ্রেম কিংবা প্রকৃতিবিমুগ্ধতা নয়, তারও বেশি কিছু। প্রকৃতির সাথে তাঁর বোধগত একধরনের জৈব সম্পর্ক ছিলো বলে প্রতীয়মান হয়। ভারতের সারান্ডা আর কোলহান ফরেস্টের ভয়ালসুন্দর অরণ্যানী তিনি ভালোমতো ঘুরে দেখেছিলেন। তাঁর কৌতূহলও ছিলো বিশ্বকৌষিক। নিন্দার্থে ও উন্মার্গীয় দৃষ্টিকোণ থেকে তাঁকে বলা যেতেই পারে- গ্রাম্য-নির্বোধ-সরল; কিন্তু বিশেষ অভিনিবেশের সাথে বিবেচনা করলে ধরা পড়ে, আমাদের চারপাশের চেনা গ্রাম্যতা-নির্বুদ্ধিতা ও সারল্য থেকে তাঁর অবস্থান অনেক দূরে। তিনি অতীন্দ্রিয় জগৎ ও পরলোকতত্ত্বে বিশ্বাসী ছিলেন। মৃত্যু সম্বন্ধে তিনি নির্ভয় ও মৃত্যুপরবর্তী জীবন সম্বন্ধে অসংশয়ী ছিলেন; বিশ্বাস করতেন- মৃত্যু কেবল এক জীবন থেকে অন্য জীবনে যাওয়া, যা ইহলৌকিক জীবনেরই সম্প্রসারণ মাত্র। মহাজাগতিক অনুভব ও বোধের বিচ্ছুরণ পাওয়া যায় তাঁর ব্যক্তিচরিত্রে এবং সৃষ্টিকর্মে। মৃত্যুর পূর্বে সাহিত্যিক বাণী রায়কে বলেছিলেন, ‘আমার বিষয়ে যখন লিখবেন, তখন সবাইকে বলে দেবেন আমার কোনো অতৃপ্তি নেই। সব ইচ্ছাই আমার পূর্ণ হয়েছে।... আমার কোনো আকাঙ্ক্ষাই অপূর্ণ নেই। আমি জীবনে তৃপ্ত হয়েছি।’ -এই উপলব্ধি ও প্রত্যয় কেবল অসাধারণ নয়, অলৌকিক।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহিত্যসাধনার কাল আটাশ বছর। উনিশটি উপন্যাস (তন্মধ্যে চারটি কিশোরপাঠ্য; অবশ্য তিনটি উপন্যাসের কিশোর সংস্করণও রয়েছে), দু-শতাধিক ছোটগল্প, তিনটি ভ্রমণকাহিনী, পাঁচটি দিনলিপি, কয়েকটি অনুবাদ এবং কিছু প্রবন্ধ- এই হলো তাঁর সৃষ্টিসম্ভার। তিনি যে পরিশ্রমী লেখক ছিলেন, তা তাঁর রচনাভাণ্ডারই বলে দেয়। সমকালে তিনি ছিলেন পাঠকপ্রিয় (জনপ্রিয় নয়; এ শব্দটি আবেগপ্রসূত- বাস্তবতারহিত); মৃত্যুর প্রায় ষাট বছর পরও তাঁর লেখকখ্যাতি ম্রিয়মাণ হয়নি। উলেখযোগ্য উপন্যাসগুলো হলো : পথের পাঁচালী (১৯২৯), অপরাজিত (১৯৩২), দৃষ্টি-প্রদীপ (১৯৩৫), আরণ্যক (১৯৩৯), আদর্শ হিন্দু-হোস্টেল (১৯৪০), বিপিনের সংসার (১৯৪১), অনুবর্ত্তন (১৯৪২), দেবযান (১৯৪৪), অথৈ জল (১৯৪৭), ইছামতী (১৯৫০), অশনি-সংকেত (১৯৭২)। তাঁর উপন্যাসে কাহিনীর ভিন্নতা ছাড়াও নির্মিতি পেয়েছে মর্ত্যধুলিতে আনন্দস্বরূপের আস্বাদন নিয়ে মনুষ্যজন্মের অন্য এক বৈভব ও সার্থকতা। স্থানের বিপুলতা আর পলায়নপর সময়কে তিনি তাঁর সাহিত্যকর্মে সর্বদা অনুভূতিগোচর করতে চেয়েছেন। অত্যন্ত পরিশ্রমী, নিষ্ঠাবান ও সাহসী লেখক ছিলেন বিভূতিভূষণ। মধ্যবিত্তের সংসারে স্বেচ্ছায় চাকরি ছেড়ে পেশা হিসেবে সাহিত্যব্রত গ্রহণ করেছিলেন এবং সিদ্ধকাম হয়েছিলেন- এ তথ্য সরল-আদর্শিক-উদাসীন-শান্তস্বভাব-পরিব্রাজক এই মানুষটির চরিত্রের ভিন্নতর পৌরুষমহিমা আমাদের সামনে তুলে ধরে। বিয়ের সপ্তাহখানেক আগে ভাবী-পত্নী কল্যাণী চট্টোপাধ্যায় রমাকে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা একটি পত্র থেকে আমরা জানতে পারি তাঁর জীবন-অভিজ্ঞান:
‘আমি এটা বিশ্বাস করি যে মানুষের আয়ু দ্বারা মানুষের বৃহত্তর জীবন মাপা যায় না, এ একটা বিরাট বৃত্ত, হাজার হাজার বছর এর পরিধি। তুমি নেই, আমি নেই। আছে তোমার আত্মা, আমার আত্মা- লক্ষ বছর আগেও তাদের স্থিতিকাল। সে বিরাট vision দিয়ে জীবনকে যে দেখচে, জীবনকে সত্যিকার সে-ই চিনেচে।’
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্মশতবর্ষ আমরা সম্প্রতি পার হয়ে এসেছি। মিডিয়া-আগ্রাসনের কিংবা বিস্তৃতির এই সময়ে অপু-দুর্গার অস্তিত্ব হয়তো প্রায় অসম্ভব; কিন্তু বিভূতির সৃষ্ট সমাজ-নিসর্গ-মানুষের জগচ্ছবির সুগভীর সত্য আজও আমাদেরকে প্রত্যাবর্তনের হাতছানি দিয়ে ডাকে। তাঁর দিয়ে যাওয়া উপলব্ধি এখনও আমাদেরকে শাশ্বত-লৌকিক জীবনপ্রবাহে দৃষ্টি স্থির রাখতে অনুপ্রেরণা যোগায়। পথের পাঁচালী সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘বইখানা দাঁড়িয়ে আছে আপন সত্যের জোরে’। ওই ‘সত্য’ কেবল পথের পাঁচালীতে নয়; তাঁর সব উল্লেখযোগ্য রচনাতেই বিদ্যমান।
ব্যক্তিক মনোজগৎ আর শিল্পপ্রকল্পের স্বাতন্ত্র্য বিভূতিভূষণের বোধ এবং উপলব্ধিকে আলাদা করে পরিবেশন করে। জন্মমৃত্যুচক্রের নিযন্ত্রণকারী অবোধ্য-অদৃশ্য এক দেব-শিল্পী যেন তাঁকে চিনিয়ে দিয়েছে এই পৃথিবীর মিথ্যা-বাস্তবের চেহারা। এ সম্বন্ধে দিনলিপি তৃণাঙ্কুর গ্রন্থে বিবৃত তাঁর জীবনবোধ থেকে আমরা কিছুটা পাঠ নিতে পারি:
‘মনে হয় যুগে যুগে এই জন্মমৃত্যুচক্র কোনো এক দেব-শিল্পীর হাতে আবর্তিত হচ্চে, হয়তো দু হাজার বছর আগে জন্মেছিলাম ঈজিপ্টে, সেখানে নলখাগড়ার বনে, শ্যামল নীল (Nile) নদে রৌদ্রদীপ্ত তটে কোনো দরিদ্র ঘরের মা, বোন, বাপ, ভাই, বন্ধুবান্ধবদের দলে এক অপূর্ব শৈশব কেটেচে, তারপর এতকাল পরে আবার ষাটটি বছরের জন্যে এসেচি এখানে- আবার অন্য মা, অন্য বাপ, অন্য ভাই-বোন, অন্য বন্ধুজন। পাঁচ হাজার বছর পরে আবার কোথায় চলে যাবো কে জানে? এই Cycle of Birth and death যিনি নিয়ন্ত্রণ করেচেন আমি তাঁকে কল্পনা করে নিয়েচি- তিনি এক বড় শিল্পী।... মনে হল আমি দীন নয়, দুঃখী নয়, ক্ষুদ্র নয়, মোহগ্রস্ত জড় মানব নয়, আমি জন্ম-জন্মান্তরের পথিক-আত্মা। দূর থেকে কোন সুদূরে নিত্য নূতন পথহীন পথে আমার গতি- এই বিশাল বিশ্ব, এই বিপুল নীল আকাশ, অগণ্য জ্যোতির্লোক, এই সহস্র সহস্র শতাব্দী- আমার পায়ে চলার পথ, নিঃসীম শূন্য বেয়ে সে গতি আমার ও সারা মানবের যুগে যুগে বাধাহীন হোক।’
বিভূতিভূষণের কাহিনীবয়নের পরিচিত গতির কিঞ্চিৎ বাইরে অবস্থান আরণ্যক-এর গল্পপ্রক্ষেপণ ও পরিবেশনশৈলী; অরণ্যরহস্য এবং অরণ্যবিনাশের কাহিনীর অন্তরালে বিপন্ন-অপরাধী শিল্পী যেন আঁকছেন সভ্যতার আগ্রাসনের ছবি। উপন্যাসে বিবৃত প্রকৃতিচরাচরের শান্ত-স্নিগ্ধতা বিপুল বিশ্বব্যাপী নাস্তির বিপরীতে মহাকালাশ্রয়ী চৈতন্যে দীক্ষার প্রান্তরে হাতছানি দিয়ে ডাকে; যে আহ্বান পার্থিব প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির চিন্তালোকের অন্ধকার থেকে অনেক দূরে এগিয়ে যেতে শক্তি যোগায়। কথাশিল্পী বিভূতির জীবনদর্শন এবং শিল্পাদর্শ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে ছড়িয়ে দিতে থাকে জগৎকে-জীবনকে দেখবার বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি। ১৭ মে ১৯৪৩ সালে লেখা তাঁরই ডায়েরি থেকে আমরা জানতে পারি এই অনুকরণীয় ব্যক্তিটির আত্ম-উপলব্ধির বারতা:
‘সুন্দর জ্যোৎস্না ভেঙেচে নদীজলে- কি অপূর্ব্ব শোভা! ভগবানকে ডেকে বললুম- তোমার নিত্য সঙ্গী হয়ে থাকতে চাই- ঐ সন্ধ্যাতারার মত রহস্যের মধ্যে, জ্যোৎস্নালোকিত আকাশের উদার ব্যাপ্তির মধ্যে, বনপুষ্পের সুবাস ও বিহঙ্গকাকলীর মধ্যে আমায় তোমার খেলার সঙ্গী করে রেখো যুগে যুগে। তুমি আপন মনে বিশ্বের বনতলে নবীন কিশোর সেজে বনফুলের মালা গলায় উদাসী হয়ে বেড়াও- কে তোমায় পোঁছে? কেউ না। সবাই ধন, জন, মান, যশ নিয়ে ব্যস্ত। কে দেখেচে এই জ্যোৎস্নাময়ী নিশার অপূর্ব্ব মনমাতানো শোভা! আমায় দেখবার চোখ দিও জন্মে জন্মে।’
জগৎ আর জীবনকে দেখবার এক বিশেষ দৃষ্টি নিয়ে জন্মেছিলেন কথানির্মাতা বিভূতি; অর্জন করেছিলেন অন্যকে দেখাবার শক্তি- আয়ত্ত করেছিলেন পাঠককে আকর্ষণ করবার কৌশল ও সামর্থ্য। তাঁর রচনার পাঠ নিতে নিতে পাঠক যেন অনায়াসে পৌঁছে যান এক ভিন্নতর নতুন-জানা ভুবনের দিকে। সমালোচক বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে- ‘বিভূতিভূষণ তাঁর চোখের দৃষ্টি দিয়ে আমাদেরও চক্ষুষ্মান করে তোলেন যখন তাঁর সৃষ্টিসম্ভারের ভেতর দিয়ে এগিয়ে যেতে থাকি।” [হায়াৎ মামুদ, ‘ভূমিকা’, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়: শ্রেষ্ঠ উপন্যাস, অবসর প্রকাশনা সংস্থা, ঢাকা, প্রথম প্রকাশ: জানুয়ারি ১৯৯৬]
আরণ্যক উপন্যাসের পরিপ্রেক্ষিত, পরিসর-প্রাসঙ্গিকতা ও ধরন সম্বন্ধে লেখক কাহিনী আরম্ভের আগেই জানাচ্ছেন: ‘মানুষের বসতির পাশে কোথাও নিবিড় অরণ্য নাই। অরণ্য আছে দূর দেশে, যেখানে পতিত-পক্ব জম্বুফলের গন্ধে গোদাবরী-তীরের বাতাস ভারাক্রান্ত হইয়া ওঠে, ‘আরণ্যক’ সেই কল্পনালোকের বিবরণ। ইহা ভ্রমণবৃত্তান্ত বা ডায়েরি নহে- উপন্যাস। অভিধানে লেখে ‘উপন্যাস’ মানে বানানো গল্প। অভিধানকার পণ্ডিতদের কথা আমরা মানিয়া লইতে বাধ্য। তবে ‘আরণ্যক’-এর পটভূমি সম্পূর্ণ কাল্পনিক নয়। কুশী নদীর অপর পারে এরূপ দিগন্ত-বিস্তীর্ণ অরণ্যপ্রান্তর পূর্বে ছিল, এখনও আছে। দক্ষিণ ভাগলপুর ও গয়া জেলার বন পাহাড় তো বিখ্যাত।’ বন্য-অশিক্ষিত-দরিদ্র-অসহায় মানুষের অদ্ভুত-অজ্ঞাত জীবনধারা আর প্রকৃতির ভিন্নতর এক মুগ্ধতার আবেশ তাঁর এই কাহিনীর ক্যানভাস। কী এক অনতিক্রম্য-দুর্বোধ্য অপরাধবোধ- অক্ষমতার অসহায়ত্ত যেন তাঁকে দিয়ে লিখিয়ে নিচ্ছে এই গল্পের সব কথামালা! দায় মোচনের আর দায়িত্ব বহনের ভার তাঁকে হয়তো ক্লান্ত করেছে বহুকাল! সেই স্মৃতি তাঁকে তাড়া করছে কি? হয়তো করছে- ভয়ংকরভাবেই করছে।
এই উপন্যাসে লেখক প্রকৃতির নিবিড় রহস্যময়তা, মায়ালোক আর আদিমতায় খুঁজে পেয়েছেন জীবনের গাঢ়তম রূপ; দেখেছেন মানুষের বিচিত্র প্রবণতা আর উপলব্ধির নব নব রূপায়ন। অভিজ্ঞতা আর বিশেষণের নবত্বে তিনি সাজিয়েছেন গোটা কাহিনী। কাহিনীকারের দেখবার আর প্রকাশ করবার দৃষ্টিভঙ্গি অসামান্য। বিপুল বনরাজি- তার সুবিশাল প্রান্তর, গাছগাছালি, পরিচিত-অপরিচিত অদ্ভুত সব লতাপাতা, বিচিত্র পাখির সমাবেশ, বন্য প্রাণীর আনাগোনা, জ্যোৎস্নাশোভিত রাত্রির রহস্যময়তা, নির্জনতার নীরব-অসীম দুরধিগম্যতা, অচিন্ত্যনীয় বিরাটত্ব, অনাস্বাদিত সৌন্দর্য, অজস্র ফল-ফুলের শোভা, দারিদ্র্যপীড়িত নানান স্বভাবের মানুষের উপস্থিতি, জলাশয়ের মোহময় হাতছানি- সব মিলিয়ে আরণ্যক উপন্যাসে বিস্ময়কর অনুভূতির স্বপ্নরাজ্য আর গভীর শান্তি ও আনন্দের মালা সাজিয়েছেন কথানির্মাতা বিভূতি। বোধ করি তিনি অনুভব করেছেন যে, প্রকৃতির এই নিবিড় সান্নিধ্যে মানুষ এক সময় নিজের অজান্তেই ‘একপ্রকার অতল-সমাহিত অতিমানস চেতনা’ দ্বারা প্রভাবিত-পরিচালিত হয়ে নিজেকে ভিন্নরূপে প্রকাশ করতে থাকে। আর এ অনুভবও ‘আসে গভীর আনন্দের মূর্তি ধরিয়া’। যেমন:-
১. “দুর্ভাবনা সত্ত্বেও উদীয়মান চন্দ্রের সৌন্দর্য আমাকে বড় মুগ্ধ করিল।”
২. “জীবনে একবারও সে জ্যোৎস্নারাত্রি দেখা উচিত; যে না দেখিয়াছে, ভগবানের সৃষ্টির একটি অপূর্ব রূপ তাহার নিকট চির-অপরিচিত রহিয়া গেল।”
৩. “অনন্যমনা হইয়া প্রকৃতিকে লইয়া ডুবিয়া থাকো, তাঁর সর্ববিধ আনন্দের বর, সৌন্দর্যের বর, অপূর্ব শান্তির বর তোমার উপর অজস্রধারে এত বর্ষিত হইবে, তুমি দেখিয়া পাগল হইয়া উঠিবে, দিনরাত মোহিনী প্রকৃতিরানী তোমাকে শতরূপে মুগ্ধ করিবেন, নূতন দৃষ্টি জাগ্রত করিয়া তুলিবেন, মনের আয়ু বাড়াইয়া দিবেন, অমরলোকের আভাসে অমরত্বের প্রান্তে উপনীত করাইবেন।”
মানুষের জীবনের ছোটছোট স্বপ্ন আর অনুভূতিগুলোকে বিভূতি কথামালায় সাজিয়েছেন দারুণ মমতায়। সামান্য অথচ কাঙ্ক্ষিত বস্তু না-পাবার যন্ত্রণা, দিনরাত মনে পুষে রাখা স্বপ্নাবলি মানুষকে যে ভিন্ন এক চারিত্রিক মহিমা দান করে, তা বোধকরি বিভূতির মতো করে আর কেউ দেখাতে পারেননি। কয়েকটি নমুনা হাজির করছি:
১. একখানা লোহার কড়াই যে এত গুণের, তাহার জন্য যে এখানে লোক রাত্রে স্বপ্ন দেখে, এ ধরনের কথা এই আমি প্রথম শুনিলাম।
২. বেশ লোকগুলো। বড় কষ্ট তো এদের!
৩. অন্নভোজনলোলুপ সরল ব্যক্তিগুলিকে আমার সে-রাত্রে এত ভালো লাগিল! জীবনের নির্মোহতা আর সঞ্চিত কষ্টের বাড়-বাড়ন্ত থেকে মুক্তির আনন্দ আমরা দেখতে পাই বঞ্চিত গ্রাম্য বয়ঃবৃদ্ধ ধাওতালের চরিত্রের দৃঢ়তায়- ‘বিত্তে নিস্পৃহতা ও বৃহৎ ক্ষতিকে তাচ্ছিল্য করিবার ক্ষমতা যদি দার্শনিকতা হয়, তবে ধাওতাল সাহুর মতো দার্শনিক তো অন্তত দেখি নাই।
একাকীত্বের কষ্ট যেমন আছে, তেমনি রয়েছে এর ভেতরে লুকিয়ে থাকা অপার আনন্দ আর নিরিবিলি দিনযাপনের সুখ-সুখ অনুভূতি। বিভূতি তাঁর ফেলে-আসা দিনরাত্রির ছোটখাটো ঘটনাবলির বিস্ময়কর অনুভবেব সাথে যখন মিলিয়ে দেখেন স্ত্রী-কন্যাদিহারা জয়পালের নিঃসঙ্গ জীবনের আলো-আঁধারির মেলায়, তখন তিনি বুঝতে পারেন কীভাবে কষ্টপীড়িত মানুষগুলো দিনযাপনের বৈচিত্র্যহীন সঙ্গীছাড়া কঠিন পাটাতনে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। জয়পালকে গল্পকথক জিজ্ঞেস করছে- ‘এই যে একা এখানে থাক, কারো সঙ্গে কথা বলো না, কোথাও যাও না, কিছু করও না- এ ভালো লাগে? একঘেয়ে লাগে না?’ নগরের আলো-বাতাস-না-দেখা জয়পাল; জীবনের স্বাভাবিক-বিশাল আনন্দরূপ-না-দেখা জয়পাল, যার কাছে জীবনের অন্য কোনো ধারণা নিরর্থক, কম্পনহীন গলায় জানায়- ‘কেন খারাপ লাগবে হুজুর? বেশ থাকি। কিছু খারাপ লাগে না।’ আবার তিনি প্রকৃতির আদিমতম সন্তান মানুষের অকৃত্রিমতাকে তুলে আনছেন অন্য এক পরিবেশন-কৌশলে। জানাচ্ছেন:
এই মুক্ত জ্যোৎস্নাশুভ্র বনপ্রান্তরের মধ্য দিয়া যাইতে যাইতে ভাবিতেছিলাম, এ এক আলাদা জীবন, যারা ঘরের দেয়ালের মধ্যে আবদ্ধ থাকিতে ভালবাসে না, সংসার করা যাদের রক্তে নাই, সেইসব বারমুখো, খাপছাড়া প্রকৃতির মানুষের পক্ষে এমন জীবনই তো কাম্য।
এ পৃথিবীতে কিছু মানুষ আছে, যারা নিজের সম্বন্ধে তেমন কিছু বলে না; কিন্তু মুখের ভাব থেকেই বোঝা যায়- তারা খুব দুঃখি, এমন এক মানুষ অতিদরিদ্র পণ্ডিত-ধার্মিক-দার্শনিক রাজু পাঁড়ে। সংসারধর্মের চেয়ে ধর্মচর্চা আর জ্ঞানসাধনাই যার প্রধান অবলম্বন।
রাসবিহারী দাম্ভিক ও রাশভারি জমিদার- সামন্তপ্রভূদের সকল স্বাভাবিক প্রতাপ তাঁর মধ্যে বর্তমান; দুঃশাসন ও অত্যাচারে সে অতি কড়া, খুন-ঘরজ্বালানি-মিথ্যেমকদ্দমায় পাকা। তবে লেখক এঁকেছেন এই সামাজিক-আপাত দাপটের অন্তরালে বিরাজমান বর্বর প্রাচুর্যের ভয়ানক ছবি; অপরিচ্ছন-শিল্পকলাগন্ধবর্জিত গৃহপরিবেশ, অশিক্ষিত সন্তানাদি, রুচিহীন প্রতিবেশ, আধুনিক জীবনবোধের অভাব- এসব যে কোনো আভিজাত্যের লক্ষণ নয়- টাকা-পয়সার তাপজনিত কৃত্রিম সামাজিকতা, তা লেখক তাঁর পাঠককে উপলব্ধি করাতে চেষ্টা করেছেন।
গ্রাম্য এক কিশোর নৃত্যশিল্পী ধাতুরিয়ার উচ্চাশা আছে, ক্ল্যাসিক নৃত্যও সে আয়ত্ত করেছে বহু কষ্টে। গ্রামে নৃত্যের তেমন কদর নেই বলে সে কলকাতায় যেতে চায় জীবিকার জন্যে। কাহিনীনির্মাতা বলছেন: ‘ধাতুরিয়া শিল্পী লোক- সত্যিকার শিল্পীর নিস্পৃহতা ওর মধ্যে আছে।’ -এই ধাতুরিয়ার শিল্পপ্রীতি আর নগরমুখিতায় নিশ্চয়ই বিভূতি অন্য কোনো অভিনিবেশের প্রতি আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করে থাকবেন; কে জানে, তিনি হয়তো বলতে চান- মানুষ ক্রমাগত শিল্পের সৌন্দর্যের দিকে ধাবমান আর কর্ষণনির্ভর গ্রামকে দিনদিন গ্রাস করছে আকর্ষণনির্ভর শহর।
এই গ্রাম্য লোকগুলি অতি সরল। তাদের মধ্যে কৃতজ্ঞতাবোধের সামান্যতম অভাব নেই। দায় আর দায়মোচনের ক্ষেত্রে এরা অতি সভ্য; ধার-দেনা পরিশোধের ব্যাপারে অকুণ্ঠ। পাত্র-পরিবেশ আর বর্ণনাকারীর অর্জিত জ্ঞান যে কাহিনী নির্মাণের জন্য অত্যন্ত জরুরি, তা বিভূতির এক অনুভব থেকে জানা আমাদের জন্য সহজ হয়। তিনি লিখছেন: ‘যেখানে-সেখানে যে-কোনো গল্প শোনা চলে না, গল্প শুনিবার পটভূমি ও পারিপার্শ্বিক অবস্থার উপর উহার মাধুর্য যে কতখানি নির্ভর করে, তাহা গল্পপ্রিয় ব্যক্তি মাত্রেই জানেন।’- এই কথার ভেতর দিয়ে কেবল গভীর বনে বসে অশিক্ষিত কোনো এক মহিষ-রাখাল গনু মাহাতোর কাছে শোনা গল্পের তাৎপর্যই উঠে আসে না; লেখকের গল্প বলবার অভিপ্রায় এবং পরিবেশন-পরিবেশ-জ্ঞানের ব্যাপারাদিও আমাদের সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
গল্পকথক সমাজ-বিনষ্টির এক অতি পরিচিত এবং দ্রুত-বিকাশমান প্রবণতা তুলে ধরেছেন অভিজ্ঞতা-বিবরণের অন্তরালে। মোসাহেবি-চাটুকারবৃত্তি আর ঘুষ-প্রদান কালচার অনুধাবন করতে বর্তমান নিমন্ত্রণ-আপ্যায়নপর্বের প্রসঙ্গটি বেশ সহায়ক।
‘নন্দলাল বলিল- কত রুপেয়া হুজুরকে পান খেতে দিতে হবে বলুন, আমি আজ সাঁজেই হুজুরকে পৌঁছে দেব। কিন্তু আমার ছেলেকে তহসিলদারি দিতে হবেই হুজুরের। বলুন কত, হুজুর। পাঁচ- শ’? এতক্ষণে বুঝিতে পারিলাম, নন্দলাল যে আমাকে কাল নিমন্ত্রণ করিয়াছিল তাহার প্রকৃত উদ্দেশ্য কি।’
আলু-পেঁয়াজ বা গমের আটার মূল্য নির্ধারণ করা হয়ে থাকে সাধারণত তার পেছনে বিনিয়োগ করা উৎপাদন-ব্যয়ের উপর ধারণা নিয়ে। কিন্তু যদি ভাবি প্রাকৃতিকভাবে আমরা যেসব উপাদান পাই- যেমন পানি-বাতাস-আলো-তাপ প্রভৃতির গ্রহণ মূল্য কত! -তাহলে! আবার যদি এমন হয় যে আলু কিংবা পেঁয়াজের সৃষ্টিকর্তাকেও দিতে হবে মূল্য কিংবা পারিশ্রমিক, তবে! একটা ছোট কামরা তাপনিয়ন্ত্রিত করবার জন্যওতো আমরা কত খরচ করে থাকি; কিন্তু যখন বৃষ্টি কিংবা বরফ পতনের কালে পৃথিবী শীতল হয়, তখন কি আমরা এর জন্য কোনো মূল্য কিংবা বিল পরিশোধের কথা চিন্তা করি! যদি আলো কিংবা বাতাসের জন্য তার স্রষ্টা মিটার স্থাপন করতেন, তবে সে বিল পরিশোধ করতে গিয়ে আমাদের রাষ্ট্রপ্রধান কিংবা সরকারের কোন গতি হতো! যেখানে এখনও পৃথিবীর অনেকাংশ বিদ্যুতের সুবিধা সম্পসারিত হয়নি (যদিও মোট স্থলভাগের খুবই সামান্য অংশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে জনবসতি), সেখানে এমনি-পাওয়া আলোর দাম কে দেবে! -এমন সব ভাবনা সম্ভবত কথাশিল্পী বিভূতিকে ভাবিয়ে তুলতো। এ-ভাবনারই প্রকাশ দেখি আরণ্যক উপন্যাসের একটি অংশে। উদ্ধৃতি দেওয়া যাক:
১. যে জিনিস যত দুষ্প্রাপ্য মানুষের মনের কাছে তাহার মূল্য তত বেশি। এ কথা খুবই সত্য যে, এই মূল্য মানুষের মনগড়া একটি কৃত্রিম মূল্য, প্রার্থিত জিনিসের সত্যকার উৎকর্ষ বা অপকর্ষের সঙ্গে এর কোনো সম্বন্ধ নাই। কিন্তু জগতের অধিকাংশ জিনিসের উপরই একটা কৃত্রিম মূল্য আরোপ করিয়াই তো আমরা তাকে বড় বা ছোট করি।
২. এদেশের রীতিই নাকি এইরূপ, গ্রামের মেয়ে বা কোনো প্রবাসিনী সখী, কুটুম্বিনী বা আত্মীয়ার সঙ্গে অনেকদিন পরে দেখা হইলেই উভয়ে উভয়ের গলা জড়াইয়া মরাকান্না জুড়িয়া দিবে। অনভিজ্ঞ লোকে ভাবিতে পারে উহাদের কেহ মরিয়া গিয়াছে, আসলে ইহা আদর-আপ্যায়নের একটা অঙ্গ। না কাঁদিলে নিন্দা হইবে। মেয়েরা বাড়ির মানুষ দেখিয়া কাঁদে নাই- অর্থাৎ তাহা হইলে প্রমাণ হয় যে, স্বামীগৃহে বড় সুখেই আছে- মেয়েমানুষের পক্ষে ইহা নাকি বড়ই লজ্জার কথা।
যদি এভাবে ভাবা হয় যে, আমরা সভ্যতার বিকাশের সাথে সাথে কতটুকু অগ্রসর হয়েছি? হয়তো উত্তর পাওয়া যাবে- প্রযুক্তির কিছু সুবিধা পাওয়া ছাড়া বাস্তবিক অর্থে সামাজিকভাবে আমরা ঠিক আগের জায়গাতেই দাঁড়িয়ে আছে; একটুও না-নড়ে। বাঙালির পাঠাভ্যাস এবং বই-পত্রিকা ক্রয়ের যে প্রবণতা বিভূতি দেখেছেন এখন থেকে প্রায় সত্তর বছর আগে, সে অবস্থা এখনও অপরিবর্তিতই রয়েছে। তিনি জানাচ্ছেন- ‘বিনা পয়সায় দাঁড়াইয়া পড়িয়া লইতে পারিলে কেহ বড়-একটা বই কেনে না’।
আরণ্যক-এ বিভূতি যেন বন-বনান্তরের চিত্রাবলিতে উপস্থাপনের আড়ালে মানব-সভ্যতার এক অনালোকিত ইতিহাস নির্মাণ করে চলেছেন; বয়ঃবৃদ্ধ এক রমনীর চেহারা আর জীবনভারের বর্ণনাসূত্রে লেখক তুলে আনছেন এই বনপ্রান্তরের হাজার বছরের জীবনাচার- তাদের লোকবিশ্বাস-ধর্মাচার-ভগবানপ্রীতি-জীবনবোধ ইত্যাকার যাবতীয় প্রসঙ্গ। লেখক তাঁর অভিমত প্রকাশ করছেন এভাবে : ‘এ অঞ্চলের বনসভ্যতার প্রতীক ওই প্রাচীন বৃদ্ধা’। পৃথিবীতে এক দিকে কোনো কোনো জাতি যখন ভাষা-সাহিত্য, গণিত, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি, স্থাপত্যকলা, নগরপত্তন, বাণিজ্যবিস্তার, যোগাযোগ ও প্রচারমাধ্যম এবং সৌন্দর্য বিকাশে ক্রমাগত অগ্রগতি অর্জন করে চলেছে, তখন কী কারণে কোনো কোনো আদিম জাতি তাদের আদিমতা থেকে একধাপও অগ্রসর হতে পারলো না; পেশা-জীবিকা আর জীবনধারণায় ঠায় দাঁড়িয়ে রইল হাজার হাজার বছর আগের সেই জায়গাটিতেই- তা সত্যিই অতি বিস্ময়ের! কথাশিল্পী বিভূতিভূষণ সেই বিস্ময়ের দুয়ারে হতভম্বের মতো স্থির থাকেন যেন কিছুকাল; আর সংগ্রহ করেন আরণ্যক উপন্যাসের উপাদান।
যাপিত জীবনে আমরা অনন্তকাল থেকে পার করছি সমূহ প্রতিকূলতা; প্রাকৃতিক দুর্যোগ-মহামারী- এমনসব নানান সমস্যার কাল দেখতে দেখতে আর মোকাবিলা করতে করতে অগ্রসর হয়েছে মানব-সভ্যতা। আরণ্যক-এর ক্যানভাসও তারই চিরন্তন সাক্ষ্য বহন করছে। নমুনা:
১. এই সুবিস্তীর্ণ বনপ্রান্তরের মাঝে মাঝে লোক দিক হারাইয়া আগেও পথ ভুলিয়া যাইত- এখন এইসব পথহারা পথিকদের জলাভাবে প্রাণ হারাইবার সমূহ আশঙ্কা দাঁড়াইল, কারণ ফুলকিয়া বইহার হইতে গ্র্যান্ট সাহেবের বটগাছ পর্যন্ত বিশাল তৃণভূমির মধ্যে কোথাও একবিন্দু জল নাই। এক-আধটা শুষ্কপ্রায় কুণ্ড যেখানে আছে, অনভিজ্ঞ দিগ্ভ্রান্ত পথিকদের পক্ষে সে সব খুঁজিয়া পাওয়া সহজ নয়।
২. সকলেরই মুখ শুকাইয়া গেল, এখানে থাকিলে আপাতত তো বেড়া-আগুনে ঝলসাইয়া মরিতে হয়- দাবানল তো আসিয়া পড়িল!
কাহিনীতে আছে খাদ্যাভাবের কথা; আছে কলেরা নামক মহামারীর ছোবলের কথা। কী নির্মমভাবে মহামারীতে গ্রামের অগণিত মানুষ অকালে ঝরে পড়ছে; চিকিৎসার অভাব, খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থানের অভাব- এ জনপদে কী ভয়াবহ ইতিহাস গড়ে তুলছে, তারই বিশ্বস্ত ভাষ্য নির্মাণ করেছেন বিভূতি পরম মমতায় আর অভিজ্ঞতার নির্যাসে।
প্রকৃতপক্ষে আরণ্যক এমন এক উপন্যাস যেখানে জীবনের বৃহৎ পরিসর আছে, বিচিত্র রূপ আছে: পরিবেশন গুণ আর পরিসর-ব্যাপকতার জন্য একে বলা চলে মহাকাব্যিক কাহিনী।
বাংলাদেশ সময়: ১৫৩০ ঘণ্টা, ২৪ জুলাই, ২০১২
সম্পাদনা: এম জে ফেরদৌস