 |
শীতল অনেকদিন ধরেই এ দিনটির জন্য অপেক্ষা করছে। বলতে গেলে দীর্ঘদিন ধরে একা কাটাচ্ছে -এ আবিষ্কারটার জন্য। জানতো কঠিন হবে ব্যাপারটা। কিন্তু লেগে থাকলে যে কিছু অসম্ভব নয়। সব কিছু গুছিয়ে এনেও শেষ পর্যন্ত কাজটা হবে কিনা তা নিয়ে দুশ্চিন্তায়ও সময় কম কাটেনি। সবচেয়ে বড় চিন্তাটা ছিল গিনিপিগ পাওয়া যাবে কিনা তা নিয়ে।
হঠাৎ করেই বলতে গেলে সমস্যাটার সমাধান হয়ে গেল। নির্জন রাজি হয়ে গেল। ওর বড় ভাইয়ের মেয়ে। অথচ ওর কথা একবারও মনে হয়নি শীতলের। কারণ ব্যাপারটা বেশ বিপদজনক। এক্সপেরিমেন্টের সময় যেকোন কিছু ঘটে যেতে পারে। তবে নিজের উপর আস্থা আছে ওর। আর যদি ও সফল হয় তাহলে তো রীতিমতো বিপ্লব ঘটে যাবে। তবে গিনিপিগের কিছু হয়ে গেলে ব্যাপারটা সামলানো বেশ কঠিন হয়ে যায়। এর আগেও সে বেশ কয়েকবার বিপদে পড়েছে। প্রথমবার বিপদে পড়েছিলো মানুষের স্বাদ সম্পর্কিত পরীক্ষাটা করতে গিয়ে। মানুষ যাতে ভাল স্বাদ ও খারাপ স্বাদের পার্থক্য না বুঝে সব পুষ্টিকর খাবারই খেতে পারে - এরকম একটি মহৎ উদ্দেশ্য ছিলো ওর। বিশেষ করে বাচ্চারা শাক-সবজি খেতে চায় না। তাদের যাতে সব খাবারই টেস্টি মনে হয় এরকম একটি আবিষ্কারের চেষ্টা করেছিলো শীতল। আর তার জন্য যে গিনিপিগ পেয়েছিলো, সে ছিলো শীতলের একজন অ্যাসিস্টেন্ট, নাম নাদির। কিন্তু সমস্য দেখা দিলো যখন শীতল জানতে পারলো যে, ওর কাছে পঁচা বাসি ছাড়া আর সব খাবারই খেতে ভাল লাগে। তখনই শীতল ঠিক করলো যে ওকে পঁচা গন্ধযুক্ত বাসি খাবার খাওয়াবে। মস্তিষ্কে সঠিক জায়গায় স্টিমুলেশন দিয়ে তার খারাপ গন্ধ ও স্বাদের কাজ কিছুক্ষণের জন্য ইনঅ্যাকটিভ করে রাখা হলো। তারপর ওকে খেতে দেয়া হলো এক সপ্তাহের পুরানো গলে যাওয়া ভাত। ওকে বলা হলো যে ওটা পায়েস। একটু দুধও ঢেলে দেয়া হলো ওই ভাতে। নাদির পায়েস মনে করে ওটা খেলো। বলল যে স্বাদ ও গন্ধ দুটোই ভালো হয়েছে। গদ গদ হয়ে শীতলকে এটাও বলল যে, স্যার আমার মাও এতো ভালো পায়েস রাঁধতে জানে না। কিন্তু সমস্যা শুরু হলো বিশ মিনিট পর। যখন ফুড পয়জোনিং এর কারণে বাথরুমের সঙ্গে ওর সখ্যতা শুরু হয়ে গেল। শেষ পর্যন্ত নাদিরকে ক্লিনিকে নিতে হলো এবং ওর পরিবারের সদস্যরা শীতলের বিরুদ্ধে হত্যা চেষ্টার মামলা ঠুকে দিলো। শীতলকে কয়েকদিন জেল হাজতেও থাকতে হলো। মানসিক অসুস্থতার সার্টিফিকেট দিয়ে শীতল ওই যাত্রা রেহাই পায়।
সব ব্যবস্থা অবশ্য শীতলের বড় ভাই করেছিলো। এবং এর জন্য শীতলকে প্রায় এক বছর নিয়মিত সাইক্রিয়াটিস্ট এর কাছে যেতে হয়েছিলো। এপরেও বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ঘটনার ফলশ্রুতিতে শীতল আজ একা নির্জন একটি বাড়িতে বাস করে। বর্তমান গবেষণাটা নিয়ে এক্সপেরিমেণ্ট করার সময় ছোট্ট একটি দুর্ঘটনা ঘটে। যার ফলে শীতলের বড় ভাই ওকে রীতিমতো নির্বাসন দেয়। শহরের বাইরে এ বাড়িটায় গত সাত বছর ধরে ওর পৃথিবী। মাঝে মাঝে ভাই ভাবি মেয়েকে নিয়ে দেখতে আসে। দুর্ঘনাটা ছিল এরকম শীতলের গবেষণার বিষয় হলো একটা প্রাণীর ব্রেনে স্টিমুলেশন দিয়ে তার ভালো এবং খারাপ অনুভূতিকে আইডেন্টিফাই করা। যদি আইডেন্টিফাই করা সম্ভব হয় তবে খারাপ অনুভূতিগুলোকে ইনঅ্যাকটিভ করে দেয়া যাবে। ফলে পৃথিবী থেকে খারাপ মানুষ বিলুপ্ত হয়ে যাবে। তাই প্রথমেই বিভিন্ন প্রাণীর উপর এক্সপেরিমেন্ট করে দেখল ও। ইঁদুর থেকে শুরু করে কুকুর, বিড়াল কিছুই বাদ গেল না। একদিন কুকুরের কামড় পর্যন্ত খেতে হয়েছে। কিন্তু বিজ্ঞানের জয়যাত্রাকে সামনে এগিয়ে নিতে যে কোনো কষ্ট স্বীকার করতে রাজি শীতল। অথচ মানুষ কেন যেন ব্যাপারটা বুঝতে চায় না। এক্সপেরিমেন্টের সময় সমস্যা হতেই পারে। কিন্তু পুরো সিস্টেমটাকে বাতিলের খাতায় ফেলে দেওয়া যায় না। মানুষের উপর এক্সপেরিমেন্টের আগে ও চেয়েছিল গরুর উপর ফল কেমন হয় তা দেখতে। দীর্ঘদিন ধরে একটা গরু পুষছিলো ও শুধুমাত্র এ পরীক্ষাটার জন্য। গরুটার ব্রেনে অনুভূতির ভালো জায়গাগুলোকে আইডেন্টিফাই করে যখন ইনঅ্যাক্টিভ করে দিল তখনই গরুটা খেপে উঠলো। বাঁধন ছিড়ে ল্যাব থেকে বের হয়ে এলো। রাস্তার মানুষকে আক্রমণ করে বসলো। তিনজন পথচারী আহত হলো। খোলা গেট পেয়ে একটা বাড়িতে ঢুকে পড়লো এবং তাদের শখের বাগানের বারোটা বাজিয়ে দিলো। দেড় ঘণ্টা চেষ্টার পর গরুটাকে ধরা গেল। এলাকার মানুষ মিটিং ডেকে ওকে এলাকা ছাড়া করলো। তারপর থেকে ও এই বাড়িতেই আছে। পুরো ল্যাবটা শিফ্ট করে গবেষণায় মনোনিবেশ করতে বেশ সময় লেগেছে। তাছাড়া গরুটা ওর অনেক মূল্যবান কাগজপত্র নষ্ট করে ফেলেছিলো। তবে এবার আর সে ভয় নেই। স্বয়ং নির্জন, শীতলের বড় ভইয়ের মেয়ে ওর গিনিপিগ হবে। মাত্র ষোল বছর বয়স। কিন্তু এরই মধ্যে বেশ বুদ্ধিমান আর স্মার্ট হয়ে উঠেছে। শীতলের সাথে ওর মানসিকতা বেশ মিলে। তাই সুযোগ পেলেই চলে আসে ও শীতলের কাছে। এস.এস.সি পরীক্ষা শেষ হয়েছে। তাই রেজাল্ট হবার আগ পর্যন্ত অখণ্ড অবসর। শীতল অবশ্য ওকে গিনিপিগ বানাতে চায়নি। হঠাৎ একদিন এসে বললো, চাচ্চু আমি তোমার এক্সপেরিমেন্টের গিনিপিগ হতে চাই।
-কি বলছিস তুই? জানিস কতটা রিস্কি এটা।
ভয় পাওয়া গলায় বলে উঠেছিলো ও, -হ্যাঁ জানি। কিন্তু তুমিতো গিনিপিগ পাচ্ছ না। আর তাছাড়া তোমার এ এক্সপেরিমেন্টটার ব্যাপারে আমি বেশ ইন্টারেস্টেড।
-কেন?
-আসলে মানুষের মধ্যে ভালো খারাপ দুই-ই থাকে। এটা প্রায়ই সমস্যা সৃষ্টি করে। মানে মাঝে মাঝে কিছু কাজ করার সময় আমাদের কঠোর হওয়া দরকার হয়। তখন ভালো অনুভূতিগুলো বেশ ঝামেলা করে।
-কি বলছিস! আমি তো ভেবেছিলাম শুধু খারাপ অনুভূতিই সমস্যা। ভালগুলো কিভাবে ঝামেলা করে?
-এই সেদিনের ঘটনাটা ধরো না। শিশুপার্কে একটা লোক আমার মোবাইল চুরি করলো। আমি সাথে সাথেই পুলিশ ডাকলাম। কিন্তু লোকটার কাকুতি মিনতি শুনে লোকটাকে ছেড়ে দিতে বললাম। কিন্তু আমি কি কাজটা ঠিক করেছি? এ ঘটনাটা অন্যরা দেখে প্রশ্রয় পাবে না বলো? আর পুলিশের ব্যাপারটা দেখ, ওরা আমার অনুরোধে চোরটাকে ছেড়ে দিলো। কারণ ওদের মধ্যে মায়া-মমতা, বিবেক এ ব্যপারগুলো কাজ করছিলো। তাই ডিউটিতে যাবার সময় যদি ওদের এ অনুভূতিগুলো বন্ধ করে দেয়া যায় তাহলে বুঝে দেখ কতটা ভালো হবে।
-বুঝলাম। কিন্তু একটা মানুষকে বিবেকহীন করে দেয়াটা তো তাকে পশু বানিয়ে দেয়া। এটা কি ভালো হবে। আর গত বছর গরুটাকে নিয়ে কি কাণ্ডটাই না হলো।
-কিন্তু চাচ্চু, মানুষতো গরু না যে, পাগলের মতো করবে। আর এমনি এমনি কি একটা মানুষ আরেকটা মানুষের ক্ষতি করতে পারে। এই আমাকেই দেখ না। মায়া-মমতার দেবী হয়ে বসে আছি। কাউকে কিছু করতে পারি না।
-তোর আবার কার ক্ষতি করতে ইচ্ছে করে?
-এই যে আমাদের এলাকার সেই ফাজিল ছেলেটা। যখন তখন আমাকে ডিস্টার্ব করে। কতবার ভেবেছি ওর নামে পুলিশের কাছে কমপ্লেন করব। কিন্তু যখনই আন্টি আংকেলের কথা মনে হয়, কাজটা আর করতে পারি না। ওনারা এতো ভালো।
-এবার বুঝলাম তোর আসল সমস্যাটা। কিন্তু তুই কি চাস সেটা বুঝতে পারছি না।
-কেন বুঝবে না। খুব সহজ ব্যাপার। তুমি কিছুক্ষণ, এই ধরো এক ঘণ্টার জন্য আমার ভালো অনুভূতিগুলোকে ইনঅ্যাক্টিভ করে দাও। আমি এর মধ্যে পুলিশের কাজটা সেরে আসি। এতে আমার ও কার্যোদ্ধার হবে আর তোমারও গবেষণার কাজটা হবে।
-কি সাংঘাতিক! কিন্তু আমি তো গবেষণাটা করছি মানুষকে ভালো করার জন্য।
-তাহলে গরুটাকে খারাপ করেছিলে কেন?
-আরে বাবা, গরুটাতো পোষা ছিলো। তাই ওটার খারাপ আচরণ গুলো বন্ধ করে দিলেও আমি বুঝতে পারতাম না কাজ হয়েছে কিনা। তাই ওরকম করেছিলাম।
-তো আমাকেও তাই করো। কারণ আমিও তো ভালো। তাই আমার খারাপ আচরণগুলোকে বাদ দিয়ে দিলেও তুমি বুঝতে পারবে না কাজ হয়েছে কিনা।
-তা অবশ্য ঠিক। কিন্তু রিস্ক হয়ে যাবে না।
-কেন হবে? আমি কি পশু নাকি যে, পাগলের মতো করব।
সব কিছু চিন্তা করে শীতলও দেখল যে, নির্জন ঠিক কথাই বলেছে। তাই পরদিন থেকে ওকে নিয়ে কাজ শুরু করে দিলো। টানা দুই সপ্তাহ ওকে পুরোপুরি পর্যবেক্ষণ করে তবে পরীক্ষার দিনক্ষণ ঠিক করল। আজ সেই দিন। সকাল সাতটায় নির্জনকে নিয়ে ও ল্যাবে ঢুকলো। এক্সপেরিমেন্টের জন্য তৈরি করা চেয়ারে ওকে বসিয়ে সিটবেল্ট বেঁধে দিল। তারপর কাজ শুরু করল। মস্তিষ্কের প্রতিটি জায়গা পুনরায় পর্যবেক্ষণ শেষে স্টিমুলেশন দেয়া শুরু করলো। টানা তিন ঘণ্টা কাজ করার পর ও নির্জনকে জিজ্ঞেস করল, কেমন লাগছে মা?
- অন্যরকম কিছুতো লাগছে না। কাজ কি শেষ?
- হ্যাঁ। ভালো করে ভেবে বলতো কোনো শারীরিক অসুবিধা বোধ হচ্ছে কিনা?
- বললাম তো কোন অসুবিধা বোধ হচ্ছে না। এখন আমার বেল্ট খুলে দাও। সময়তো মাত্র এক ঘণ্টা। এর মধ্যে অনেক দূর যেতে হবে।
- এই তো খুলে দিলাম। এবার চল আমরা বের হই।
- আমরা মানে। শুধু আমি যাব। একা।
- এমন বললে তো হবে না। তোকে আমি কিছুতেই এ অবস্থায় একা ছাড়বো না।
এ কথা টা বলার সাথে সাথেই নির্জন হাতের কাছে রাখা পেপার ওয়েটটা দিয়ে ওর মাথায় একটা বাড়ি মারলো। প্রথমে ওর মাথাটা ঘুরে উঠল, পরমুহূর্তেই সবকিছু অন্ধকার হয়ে গেল। যখন জ্ঞান ফিরল দেখল যে, ড্রাইভার আর কেয়ারটেকার ওর সামনে দাঁড়িয়ে। ওর সারা শরীর পানিতে ভেজা। ও প্রথমেই জিজ্ঞেস করল, নির্জন কোথায়?
- গাড়ি নিয়ে বের হয়ে গেছে স্যার- ড্রাইভার বলে উঠল।
- গাড়ি নিয়ে বের হয়েছে মানে। তুমি গেলে না কেন?
- স্যার উনি কোনো কথাই শুনছিলেন না। জোর করে যেতে চাচ্ছিলাম বলে আমাকে হাতের লাঠিটা দিয়ে মারতে এসেছিল। অবস্থা বেগতিক দেখে আমি আর কথা না বাড়িয়ে আপনাকে ডাকতে এসেছিলাম। এসে দেখি আপনি অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছেন।
- কি বলছ তুমি? তাড়াতাড়ি ফোনটা দাও তো।
- স্যার আপনি শুয়ে থাকুন। ডাক্তার খবর দিয়েছি।
- শুয়ে থাকব মানে। তুমি জান কত বড় সর্বনাশ হয়ে গেছে। ফোনটা হাতে নিয়ে শীতল তাড়াতাড়ি ওর ভাবিকে ফোন করলো। সব শুনে আঁতকে উঠলো ওর ভাবি।
- কি বলছো তুমি? কি করেছো তুমি আমার মেয়ের? কোথায় এখন ও?
- ভাবি, তুমি কিছু চিন্তা করো না। ও পুলিশ স্টেশনে যাচ্ছে। তুমি তাড়াতাড়ি ওখানে যাও। আমিও আসছি।
তারপর একটা ব্যাগের মধ্যে প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস নিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে এলো। মাথায় খুব ব্যথা হচ্ছে। কিন্তু এখন আর ওদিকে মন দিল না ও। ভাবতে লাগল নির্জনের কথা। খারাপ কিছু হয়ে যাবে নাতো। যদি এবারও কোনো কিছু হয় তবে ওর গবেষণাই বন্ধ হয়ে যাবে। এতদিন তো ওর বড় ভাই তাও টাকা পয়সা দিতো। কিন্তু এবার তো শীতল ওর মেয়েকে গিনিপিগ বানিয়েছে। ভাইয়া কে এবার আর ম্যানেজ করা যাবে না। এ কথা ভাবতে ভাবতেই ওর বড় ভাইয়ের ফোন এলো। ভয়ে ভয়ে শীতল ফোনটা রিসিভ করল। হ্যালো বলার সাথে সাথেই ওপাশে ওর ভাই যেন গর্জন করে উঠল, আমার মেয়েকে কি করেছিস তুই? যদি আমার মেয়ের কিছু হয় তোকে আমি খুন করব।
- ভাইয়া চিন্তা করো না। সব ঠিক হয়ে যাবে।
- কি ঠিক হবে। তুই জানিস নির্জন এইমাত্র ওর মাকে মেরে পালিয়েছে। ওর পিছে পুলিশ তাড়া করছে।
- ও মাই গড। এখন তোমরা কোথায়?
- তোর ভাবিকে নিয়ে বাসায় যাচ্ছি।
- আর নির্জন কোথায় ?
- জানি না। পুলিশ ওর পিছনে আছে।
কিছুক্ষণের মধ্যে শীতল বাসায় পৌঁছল। দেখল বাসার অবস্থা খুব খারাপ। ওর ভাবিকে স্যালাইন দিয়ে রাখা হয়েছে। তবে নির্জনের লাঠির বাড়ির কল্যাণে এটা হয়নি। নির্জনের লাঠির বাড়িতে যতটা না তার চেয়ে বেশি ভয়ে অসুস্থ হয়ে পরেছে। প্রেসারও বেড়ে গেছে। শীতলের বড় ভাই ওকে দেখেই মারতে তেড়ে আসলো। অন্যরা ধরে ফেলাতে আর মারতে পারল না। পুলিশকে বলল যে, ওকে অ্যারেস্ট করুন। ও-ই হলো আসল ক্রিমিনাল।
- কি ব্যাপার কী? কী করতে চাইছিলেন মেয়েটাকে নিয়ে?
- দেখুন , আমি একজন বিজ্ঞানী। একটা গবেষণায় গিনিপিগ দরকার ছিলো। নির্জন তো নিজেই রাজি হয়ে গেল।
- গিনিপিগের উপর পরীক্ষা করছিলেন নাকি ভাইয়ের উত্তরাধিকারীকে সরিয়ে দিয়ে সব কিছু নিজের করার তালে ছিলেন?
- কি বলছেন আপনি? আমি কেন ওকে সরিয়ে দিতে চাইব? তাছাড়া ও আবার স্বাভাবিক হয়ে যাবে।
- কিভাবে ?
- দেখুন ওর এ অবস্থা আমি করেছি। আবার আমিই পারব ওকে আবার স্বাভাবিক করে তুলতে।
- কিন্তু তার জন্য তো ওকে আগে ধরতে হবে। সেটাতো সম্ভব হচ্ছে না। পাগলের মত গাড়ি চালাচ্ছে। সিগন্যাল তো দূরের কথা কোন মানুষ ও কেয়ার করছে না। অবশ্য এখন ও পর্যন্ত কেউ আহত হয়েছে বলে খবর পাইনি।
- চলুন আমরাও বের হয়ে পড়ি। ও কোন দিকে গেছে খবর নিন।
তারপর শীতল ওর বড় ভাইয়ের কাছে গেল। ‘ভাইয়া আমি জানি তোমার মনের অবস্থা কি । আমার উপর বিশ্বাস রাখ। আমি ওকে সুস্থ করে তুলব।’
- কেঁদে উঠে শীতলের বড় ভাই বললো- তুই কেন আমার মেয়েটাকে নিয়ে এমন একটা কাজ করতে গেলি?
- তুমি চিন্তা করো না। ওতো আমারও মেয়ে।
এ সময় পুলিশ অফিসার টি এসে বলল, খবর পাওয়া গেছে। ওকে ধরে ফেলেছে পুলিশ। গাড়ি থামাচ্ছিল না দেখে চাকায় গুলি করেছিল। তারপরই গাড়িটা অ্যাক্সিডেন্ট করে। তবে আপনাদের মেয়ের তেমন কিছু হয়নি। হাসপাতালে নিয়ে গেছে। চলুন আমরা ও যাই।
তাড়াতাড়ি শীতল, শীতলের বড় ভাই আর ভাবী পুলিশের সাথে হাসপাতালে গেল। গিয়ে দেখল নির্জন ভাল আছে, তবে এখনও জ্ঞান ফেরেনি। আর জানতে পারল যে, নির্জনের গাড়ির সাথে ধাক্কা খেয়ে একটা রিকশা উল্টে গিয়েছিল। রিকশাওয়ালা আর যাত্রী দুজনই আহত হয়েছে। তবে মারাত্মক কিছু কারোরই হয়নি। নির্জন মাথায় আঘাত পেয়েছে। ডাক্তাররা বলছে, মারাত্মক কিছু না। তবে শীতলের চিন্তা অন্যখানে। নির্জনের জ্ঞান না ফিরলে তো বলা যাচ্ছে না ও স্বাভাবিক কিনা। এক ঘণ্টার মধ্যেই ওর স্বাভাবিক হয়ে যাবার কথা ছিলো। কিন্তু আড়াই ঘণ্টা তাণ্ডব চালানোর পর ও স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসেনি। শেষ পর্যন্ত যে ধরা গেছে এতেই রক্ষা। নতুবা আরো কী কী হতো, কে জানে। এ সময় নার্স এসে খবর দিল, নির্জনের জ্ঞান ফিরেছে। ওরা তাড়াতাড়ি কেবিনে গেল। মাকে দেখেই কেঁদে উঠল নির্জন, মা, আই অ্যাম সরি। আমার মাথা কাজ করছিল না তখন।
- ঠিক আছে মা। এখন কেমন লাগছে বল।
- ভালো।
শীতল কেবিনের দরজায় দাঁড়িয়ে দেখছিলো ওদের। নির্জনকে স্বাভাবিক দেখে স্বস্থির নিঃশ্বাস ফেলল। যাক, ও তাহলে ভালো আছে। মাথায় আঘাত পড়াতে স্বাভাবিক অবস্থাটা ফিরে এসেছে। এবার গবেষণাটা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। এক ঘন্টা পরই তো ব্রেনের কার্যক্ষমতা ফিরে আসার কথা ছিলো। এ ব্যাপারটাই ওকে ভাবাচ্ছে। আর সবকিছুতো ঠিকই ছিলো। নির্জনকে তো আগেই সাবধান করেছিল যে, বিপদ হতে পারে। ও-ই তো কথা শুনলো না। আসলে গুরুজনরা ঠিকই বলে, বাচ্চাদের কথা শুনে কোন কাজ করতে হয় না। নতুবা ও তো ঠিক পথেই এগুচ্ছিলো। এসব ভাবতে ভাবতে শীতল এগুচ্ছিলো। হঠাৎ পুলিশ অফিসারটি ওর পথ আটকে দাঁড়াল।
- কি ব্যাপার পালাচ্ছেন নাকি?
- পালাবো কেনো?
- চলুন আমাদের সাথে চলুন। আপনার কাছ থেকে অনেক কিছু জানার আছে।
- অ্যারেস্ট করছেন নাকি আমাকে?
- মনে করুন তাই।
এ সময় শীতলের বড় ভাই এদিকে এগিয়ে আসছিলো। তাকে দেখেই শীতল বলে উঠল, ভাইয়া দেখ ওনারা আমাকে অ্যারেস্ট করতে চাচ্ছেন।
- ঠিকই করছে। আর ও ভালো হতো যদি আমি তোর বিরুদ্ধে কেস করতে পারতাম।
- তুমিও কি চাও ওনারা আমাকে অ্যারেস্ট করুক?
- সেটা করতে পারলে তো বেঁচেই যেতাম। তবে না, তোকে আমি অ্যারেস্ট করাবো না।
- কি বলছেন স্যার আপনি? আপনি ওনাকে ছেড়ে দেবেন।
- হ্যাঁ দেব। তবে তোকে সাবধান করে দিচ্ছি যে, তুই আর আমার সাথে কোনো সম্পর্ক রাখতে পারবি না। আমাদের সাথে কোনো যোগাযোগ ও করবি না।
- নির্জনকে একটা বার দেখতেও দেবে না।
- না। চলে যা। আর কখনো আমাদের কাছে আসবি না। তোর যা কিছু আছে সবকিছুর কাগজপত্র ম্যানেজার সাহেবকে দিয়ে পাঠিয়ে দিবো। নিজেরটা নিজে বুঝে নিবি।
আর কোন বাক্য ব্যয় না করে শীতল ফিরে চলল নিজের বাড়িতে। গবেষণাটাতো আবার শুরু করতে হবে। সমস্যাগুলো কোথায় হয়েছে তা বের করতে হবে। নির্জনকে পেলে ভালো হতো। কিন্তু সেটাতো সম্ভব না। যা-ই হোক ও তো বলতে গেলে এতোদিন একাই ছিলো। এখন ও তাই থাকবে। ও বিজ্ঞানের একজন অকুতোভয় সৈনিক। ওকে এ কাজ থেকে কেউ থামাতে পারবে না। শীতল ধীর পায়ে হেঁটে চলল।
বাংলাদেশ সময়: ১৭৩০ ঘণ্টা, ০৬ অক্টোবর, ২০১২
সম্পাদনা: এম জে ফেরদৌস mjferdous0@gmail.com