 |
| পুঁজি হারিয়ে আন্দোলনে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী হারুন। ছবি: নাজমুল হাসান/ বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম |
ঢাকা: অব্যাহত দরপতনের কারণে নিঃস্ব হয়েছেন শেয়ারবাজারের কয়েক লাখ সাধারণ বিনিয়োগকারী। আর এই সুযোগে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বাজার কারসাজিকারীরা।
অপরদিকে, তিলে তিলে সব পুঁজি হারিয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা এখন পাগলপ্রায়।
পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, যারা পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন তাদের অধিকাংশই চাকরি ছেড়ে বা অন্য কোনো কাজ না পেয়ে শেয়ারবাজারে এসেছিলেন। এই নিঃস্ব বিনিয়োগকারীদের একজন নুরুল হক হারুন। বাংলানিউজের কাছে তার শেয়ারবাজারে আসা ও পুঁজি হারানোর মর্মযাতনা বর্ণনা করেছেন। এখানে তার কিছু অংশ তুলে ধরা হলো-
“এখন সংসার তো দূরে থাক, নিজের সন্তানদের পড়াশুনার খরচ চালাতে পারছি না। শেয়ারবাজার পতনের শুরুতে মনে করেছিলাম আবার স্বাভাবিক হবে এ বাজার। তাই আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে ধার-দেনা করে সংসার চালাতাম। ভেবেছিলাম বাজার ভালো হলে শোধ করে দেব। কিন্তু আত্মীয়-স্বজনদের দেনা পরিশোধ করতে পারছি না। এমনকি আমার সন্তানদের পড়াশুনার খরচও মেটাতে পারছি না।’
গত রোববার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ভবনের সামনে বাংলানিউজের কাছে নিজের বর্তমান অবস্থা এভাবেই বর্ণনা করছিলেন পুঁজি হারানো নুরুল হক হারুন। তিনি শেয়ারবাজারে পুঁজি হারানো লাখ লাখ সাধারণ সাধারণ বিনিয়োগকারীর একজন।

তার গ্রামের বাড়ি নোয়াখালীর সোনাইমুড়ির আমকি গ্রামে। তিনি ঢাকার বাসাবোতে এক আত্মীয়ের বাসায় থাকেন। গ্রামের স্থানীয় একটি কলেজ থেকে ১৯৯৫ সালে ডিগ্রি পাস করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে মাস্টার্সে ভর্তি হন। সেখান থেকে এমএ ডিগ্রি নিয়ে ১৯৯৯ সালে ঢাকার একটি রিক্রুটিং এজেন্সিতে চাকরি নেন। এভাবে মোটামুটি ভালোই চলছিল তার পরিবার।
তবে ২০০৩ সালে চাকরি হারিয়ে বন্ধুর পরামর্শে অল্প কিছু টাকা নিয়ে শেয়ারবাজারে আসেন হারুন। প্রথমে আইপিও করে বেশ টাকা জমান তিনি। ঢাকায় তার সংসারও চলছিল অনেক ভালোভাবেই। এরপর বাজার সম্পর্কে ভালো জ্ঞান লাভ করে নিজের সঞ্চিত অর্থ দিয়ে ২০০৬ সালে ১৫ লাখ টাকা দিয়ে সেকেন্ডারি বাজার থেকে প্রথম শেয়ার কেনেন হারুন।
সেখানেও তার ব্যবসায় বেশ ভালো লাভ হচ্ছিল। এ অবস্থায় গ্রামের বাড়ি থেকে আরও টাকা নিয়ে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করেন। ২০১০ সালের বাজার পতনের আগ পর্যন্ত তার পোর্টফোলিওতে মোট ১ কোটি টাকারও বেশি শেয়ার ছিল। কিন্তু কোটি থেকে টাকার পরিমাণ লাখে নামতে সময় লাগেনি। এছাড়া ব্যবসা ভালো না হওয়ায় কয়েকদফায় গ্রামের বাড়ি থেকে টাকা এনে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করেন। কিন্তু তাতেও শেষ রক্ষা হয়নি। শেয়ারের দাম কমতে কমতে এখন তলানিতে পৌঁছেছে। আর তার শেয়ারে দাম কোটি টাকা থেকে কমে মাত্র ১০/১২ লাখ টাকায় নেমে এসেছে।
নুরুল হক হারুন বলেন, “কোনো চাকরি না থাকায় শেয়ারবাজারের আয়ের ওপরই সংসার, সন্তানদের পড়াশুনার খরচ নির্ভর করতো। কিন্তু প্রায় দুই বছর ধরে শেয়ারবাজারে ধারাবাহিক দরপতনের ফলে সংসার ও সন্তানদের ভরনপোষনের জন্য আত্মীয়-স্বজনদের কাছ থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৮/৯ লাখ টাকা ঋণ করেছি। এখন যদি লোকসানেও শেয়ার বিক্রি করি, তাতে ঋণ পরিশোধ করে আমাকে শূন্য হাতে বাড়ি ফিরতে হবে।”
হারুন বাজারের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য সরকারকে দায়ী করছেন। তিনি বলেন, “পঁজিবাজারের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য সরকারই দায়ী। কারণ সরকার বাজার কারসাজিকারীদের বিরুদ্ধে কোনোরকম শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে তৎপর না।”
তিনি আরও বলেন, “বাজার অস্থিতিশীল করার জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং বাজারকারসাজিকারীরা একসঙ্গে কাজ করেছে। এছাড়া তারা বাংলাদেশ ব্যাংককে প্রভাবিত করে ব্যাংকগুলোকে বাজার থেকে তাদের বিনিয়োগ তুলে নেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করেছে। এরপর বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ নিয়ন্ত্রণের নির্দেশ দেয়। যা ছিল বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নরের একটি ভুল সিদ্ধান্ত। আর সেই ভুল সিদ্ধান্তের জন্য আজ লাখ লাখ বিনিয়োগকারী রাস্তার ফকির (ভিখারী)।”
হারুন বলেন, “বাজার যখন ঊর্ধ্বমুখী ছিল তখন ব্যাংকগুলো বাজার থেকে সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকা তুলে নিয়ে গেছে। আর কোম্পানির পরিচালকরা ২৬ হাজার কোটি শেয়ার বিক্রি করে তুলেছে সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা। যার জন্য বাজারে তারল্য সংকট সৃষ্টি হয়েছে। বাজারে ধারাবাহিক দরপতন হচ্ছে। এ মুহূর্তে নিয়ন্ত্রক সংস্থাসহ সংশ্লিষ্টদের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ।”

তিনি বলেন, “এসইসি তার ভূমিকা সঠিকভাবে পালন করছে না। কারণ বাজার পতনের পরও এসইসি কয়েকটি কোম্পানিকে অতিরিক্ত প্রিমিয়াম নিয়ে আইপিওর মাধ্যমে বাজার থেকে টাকা তোলার অনুমোদন দিয়েছে। যা ছিল এ বাজারের জন্য নেতিবাচক। আর সেইসব কোম্পানির শেয়ার এখন বাজারে ফেসভ্যালুর নিচে বিক্রি হচ্ছে। ফলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা শেয়ার কেনার আস্থা পাচ্ছে না।”
প্রধানমন্ত্রীও বাজারকে স্থিতিশীল করতে প্রণোদনা প্যাকেজ দিয়েছেন। যা গত ৭/৮ মাসেও বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। ফলে বাজার কারসাজিকারীরা বারবার সুযোগ নিচ্ছেন। আর এসইসিই তাদের এ সুযোগ সৃষ্টি করে দিচ্ছে বলে মনে করেন নুরুল হক হারুন।
এমতাবস্থায একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক স্থিতিশীল পুঁজিবাজার প্রতিষ্ঠার জন্য সরকারকেই তৎপর হতে হবে। সরকার যদি এগিয়ে না আসে তবে এ বাজার কখনও স্থিতিশীল হবে না। এ মুহূর্তে বাজার স্থিতিশীল করতে সরকার যদি এগিয়ে না আসে তবে মনে করতে হবে সরকারই বাজার স্থিতিশীল করতে চাচ্ছে না বলে মন্তব্য করেন হারুন।
বাংলাদেশ সময়: ১১৪৫ ঘণ্টা, জুলাই ১৬, ২০১২
এসএনএইচ/সম্পাদনা: নজরুল ইসলাম, নিউজরুম এডিটর; আহ্সান কবীর, আউটপুট এডিটর; জুয়েল মাজহার, কনসালট্যান্ট এডিটরjewel_mazhar@yahoo.com