 |
| ছবি : ফাইল ছবি |
চট্টগ্রাম: চট্টগ্রামের এক সময়ের মূর্তিমান আতঙ্ক, পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী ও দুর্ধর্ষ শিবির ক্যাডার, আলোচিত এইট মার্ডার মামলার মৃত্যুণ্ডাদেশপ্রাপ্ত আসামি সাজ্জাদ আলী খান ভারতে গ্রেফতার হয়েছেন।
আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থার (ইন্টারপোল) পক্ষ থেকে বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ পুলিশের সদর দফতরে ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ আসামি সাজ্জাদ আলী খানের গ্রেফতারের বিষয়টি জানানো হয়েছে।
চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার (সদর) বনজ কুমার মজুমদার বাংলানিউজকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
তিনি বাংলানিউজকে বলেন, “সাজ্জাদ ভারতের কোলকাতায় গ্রেফতার হয়েছেন এতটুকু জানি। তবে কখন, কোথা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে সে বিষয়টি আমরা এখনও নিশ্চিত না।”
নাম প্রকাশ না করার শর্তে নগর গোয়েন্দা পুলিশের এক কর্মকর্তা বাংলানিউজকে জানান, গত মঙ্গলবার কোলকাতায় গ্রেফতার হন সাজ্জাদ। তার পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য বৃহস্পতিবার বিষয়টি বাংলাদেশের পুলিশ সদর দফতরকে ইন্টারপোলের পক্ষ থেকে জানানো হয়।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় পুলিশ সদর দফতর থেকে নগর পুলিশের বিশেষ শাখায় সাজ্জাদের বিষয়ে তথ্য চেয়ে একটি চিঠি পাঠানো হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার তারেক আহম্মেদ বাংলানিউজকে বলেন, “সাজ্জাদ ভারতের কোলকাতায় গ্রেফতার হয়েছেন বলে শুনেছি। ইন্টারপোলই বিষয়টি পুলিশ সদর দফতরকে জানিয়েছে। যেহেতু সাজ্জাদ আমাদেরও মোস্ট ওয়ান্টেড আসামি ছিল, তাই তার বিষয়ে আমরা সব ধরনের তথ্য নেব।”
চট্টগ্রামে এক সময়ের মূর্তিমান আতঙ্ক হিসেবে পরিচিত এ সন্ত্রাসী দুবাইয়ে বসেই নগরীর পাঁচলাইশ, চালিত্যাতলী, অক্সিজেন, মুরাদপুর, চকবাজার, বায়েজিদ, হাটহাজারীসহ বিশাল এলাকায় তার আধিপত্য বজায় রেখেছিলেন। তার নামেই এসব এলাকায় চলছে ব্যাপক চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধমুলক কর্মকাণ্ড।
আর এ কাজে সাজ্জাদ এলাকার উঠতি যুবকদের ব্যবহার করছিলন বলে নগর পুলিশের কাছে তথ্য ছিল। তবে সাজ্জাদ মধ্যপ্রাচ্য থেকে কবে ভারতে পাড়ি জমিয়েছেন সে বিষয়ে পুলিশের কাছে কোনো তথ্য ছিলো না।
নগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার তারিক আহম্মদ খান বাংলানিউজকে বলেন, “সাজ্জাদের নামে দীর্ঘদিন ধরে চাঁদাবাজি হচ্ছে বলে আমাদের কাছে খবর আছে। বিশেষত জমি কেনাবেচাকে কেন্দ্র করে এ চাঁদাবাজিটা হচ্ছে। আমরা বিভিন্ন সূত্রে খবর পেলেও কেউ সরাসরি আমাদের কাছে অভিযোগ নিয়ে আসেননি।”
গত আগস্ট মাসের মাঝামাঝিতে নগরীর বায়েজিদ বোস্তামি থানার অক্সিজেন এলাকায় চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার হারুয়ালছড়ি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ইকবাল হোসেন চৌধুরীর বাড়িতে ঢুকে গুলি চালান একদল ক্যাডার। এ সময় তারা চেয়ারম্যানের মালিকানাধীন একটি নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের মালিকের গাড়িতেও আগুন ধরিয়ে দেন।
এ ঘটনার পর শিবির ক্যাডার সাজ্জাদের নাম অনেকদিন পর আবারও আলোচনায় উঠে আসে। নগর পুলিশ কর্মকর্তারাও সাজ্জাদের বিষয়ে তৎপর হন।
নগরীর অক্সিজেন মোড় থেকে হাটহাজারী উপজেলার সঙ্গে সংযোগ সৃষ্টিকারী অক্সিজেন-কুয়াইশ সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়া ওই এলাকায় চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (চউক)‘অনন্যা’ নামে একটি আবাসিক এলাকা গড়ে তোলার কাজে হাত দিয়েছে।
মূলত সংযোগ সড়ক এবং আবাসিক এলাকা পাল্টে দিয়েছে ওই এলাকার দৃশ্যপট। বর্তমানে ওই এলাকায় দ্রুত জমির দাম বাড়ছে। এতে নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের মালিকরা ওই এলাকায় জমি কেনাবেচা নিয়ে প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ শুরু করেন। ফলে ওই এলাকায় জায়গা জমি কেনা বেচাকে কেন্দ্র করে একটি চক্রও গড়ে ওঠে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, জমি দখলকে কেন্দ্র করে শিবির ক্যাডার সাজ্জাদের নির্দেশে তার সহযোগীরা ব্যাপক অপরাধমুলক কর্মকাণ্ড এবং বেপরোয়া চাঁদাবাজিতে জড়িয়ে পড়েন। জমির মালিকদের কাছ থেকে বিক্রির সময় টাকা আদায়ের পাশাপাশি ক্রেতার কাছ থেকেও টাকা আদায় করছেন সাজ্জাদ বাহিনীর ক্যাডাররা।
গত বছরের আগস্টে সাজ্জাদের দুই সহযোগী সরওয়ার ও ম্যাক্সনকে একটি একে-৪৭ রাইফেলসহ বায়েজিদ এলাকা থেকে গ্রেফতার করে বায়েজিদ বোস্তামি থানার তৎকালীন ওসি এ কে এম মহিউদ্দিন সেলিম।
এ বিষয়ে নগরীর কোতোয়াwল থানায় দায়িত্বরত ওসি এ কে এম মহিউদ্দিন সেলিম বাংলানিউজকে বলেন, “সাজ্জাদ সবসময় কিছু উঠতি যুবককে সন্ত্রাসী কাজে লাগান। আমি দায়িত্ব পালনকালে তারা এলাকা ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। এখন শুনছি আবারও এলাকায় এসে চাঁদাবাজি শুরু করেছেন।”
পুলিশ সূত্র জানায়, সাজ্জাদ সর্বশেষ ২০০১ সালের ৩ অক্টোবর বন্দুকযুদ্ধের পর তার সহযোগী ও দুর্ধর্ষ শিবির ক্যাডার দেলোয়ার হোসেন ওরফে আজরাইল দেলোয়ারসহ নগরীর চালিতাতলী এলাকা থেকে গ্রেফতার হন। ওই সময় তার কাছ থেকে পুলিশ একটি একে-৪৭ রাইফেল উদ্ধার করে।
২০০৫ সালে আজরাইল দেলোয়ার জামিনে মুক্তি পান। এরপর র্যাবের ‘ক্রসফায়ারে’ আজরাইল দেলোয়ার নিহত হন।
তিন বছর জেল খেটে দেলোয়ারের আগেই সাজ্জাদ ২০০৪ সালে জামিনে মুক্তি পান। এরপর কুমিল্লার তৎকালীন জামায়াতের সাংসদ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের গাড়িতে করে পুলিশের গ্রেফতার এড়িয়ে কারাগার প্রাঙ্গY ত্যাগ করেন সাজ্জাদ।
২০০৪ সালে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির মুখে তৎকালীন জোট সরকার র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) গঠনের পর সাজ্জাদ আলী খান দুবাইয়ে পালিয়ে যান।
যেভাবে সাজ্জাদের উত্থান
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০০০ সালে খুন হন পাঁচলাইশ এলাকার ওয়ার্ড কমিশনার লিয়াকত আলী। লিয়াকত হত্যাকাণ্ডে নেতৃত্ব দেন সাজ্জাদ ও আরেক দুর্ধর্ষ শিবির ক্যাডার জসিম উদ্দিন ওরফে ফাইভ স্টার জসিম। মূলত এ ঘটনার পরই অপরাধ জগতে সাজ্জাদের নাম ছড়িয়ে পড়ে।
এর কিছুদিন পর নগরীর বহদ্দারহাট মোড়ে মাইক্রোবাসে ব্রাশফায়ারে ছাত্রলীগের ৮ নেতাকে হত্যা করে শিবির ক্যাডাররা। এ হত্যাকাণ্ডেরও নেতৃত্ব দেন সাজ্জাদ।
আলোচিত এইট মার্ডারের ঘটনায় অভিযুক্ত শিবিরের আরেক ক্যাডার নাছির উদ্দিন ওরফে গিট্টু নাছির এবং ফাইভ স্টার জসিম পরবর্তীতে র্যাবের ক্রসফায়ারে নিহত হন।
এরপর নিজের দল জামায়াত ক্ষমতার অংশীদার হিসেবে থাকলেও পরিস্থিতি প্রতিকূল দেখে সাজ্জাদ আর দেশে ফেরেননি।
বাংলাদেশ সময় : ২৩৫৫ ঘণ্টা, নভেম্বর ০৮, ২০১২
আরডিজি/এসএইচ/ সম্পাদনা: প্রভাষ চৌধুরী, নিউজরুম এডিটর