 |
চট্টগ্রাম: একজন শিক্ষার্থীর মোট খরচের ৩৯ শতাংশ ব্যয় হচ্ছে কোচিং করতে গিয়ে। এছাড়া ২৪ শতাংশ ব্যয় হয় যাতায়াত খরচে। বই, খাতা, কলম এবং পোশাকে যাচ্ছে বাকি টাকা।
সম্প্রতি চট্টগ্রামের অপেক্ষাকৃত উন্নত সুযোগ-সুবিধা সংবলিত ১৪টি প্রতিষ্ঠানে চালানো এক গবেষণায় উঠে এসেছে এসব তথ্য। চিটাগাং রিসার্চ ইনিশিয়েটিভ (সিআরআই) এ গবেষণা পরিচালনা করে।
শনিবার শিক্ষার বার্ষিক প্রতিবেদন-২০১২ প্রকাশ উপলক্ষে চট্টগ্রাম চেম্বার মিলনায়তনে ‘হালখাতা চট্টগ্রাম’ প্রকাশনা অনুষ্ঠানে এ তথ্য জানানো হয়।
বিশেষেজ্ঞরা বলছেন, স্কুল শিক্ষাকে বিনামূল্যে ভাবা হলেও প্রতিটি পরিবারকে মোট খরচের বড় একটি অংশ খরচ করতে হচ্ছে কোচিং ও যাতায়াতে। প্রতি পরিবারকে এখাতে প্রতি মাসে মোট ব্যয় করছে ছয় হাজার ৮৪ টাকা।
‘চিটাগাং রিসার্চ ইনিশিয়েটিভে’র সমন্বয়ক ও পিপিআরসির নির্বাহী সভাপতি ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সুশানের বিষয়টি জড়িত রয়েছে। শিক্ষাঙ্গনে শ্রেণিকক্ষের পাঠদানের পুরোপুরি বুঝে উঠতে না পারা বা পাঠদানে ঘাটতির কারণে শিক্ষার্থীরা কোচিং নিতে যান।’
গবেষণার বরাত দিয়ে তিনি বলেন, ‘ ২৯ শতাংশ শিক্ষক কোচিংয়ে জড়িত আছেন। আর ৮১ শতাংশ শিক্ষার্থী কোচিং নিচ্ছে। আর শিক্ষা খাতে মোট খরচের ৩৯ শতাংশ ব্যয় হচ্ছে কোচিংয়ে।’
চট্টগ্রামে ৪০ শতাংশ শিক্ষার্থী প্রাথমিক স্তরে ঝড়ে পড়ে
গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, বন্দরনগরী চট্টগ্রামে এখনো শতকরা ৪০ শতাংশ শিক্ষার্থী প্রাথমিক স্তরেই ঝড়ে যায়। বর্তমানে দেশে প্রাথমিক পর্যায়ে শিশুভর্তির হারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও এখনো এক পঞ্চমাংশ শিশু স্কুলের বাইরে রয়ে গেছে।
প্রাথমিক পর্যায়ে যে শিশুরা পাশ করছে তাদের অর্ধেকেরও কম শিশু মাধ্যমিকে প্রবেশ করতে সক্ষম হচ্ছে। এমনকি যারা ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হয় তাদের মাত্র এক পঞ্চমাংশ দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশুনা চালাতে এবং মাধ্যমিক শিক্ষা সমাপনী সনদ অর্জন করতে পারে বলেও উল্লেখ করা হয়।
এ সর্ম্পকে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ‘নানা কারণে প্রাথমিক স্তরেই ৪০ শতাংশ শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে। বৈষম্যসহ বিভিন্ন কারণে এসব ঘটনা ঘটছে।’
তিনি বলেন, ‘ চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার দিক দিয়ে অপেক্ষাকৃত উন্নত বিদ্যালয়ে গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। এ থেকেই বোঝা যায় যে, গ্রামের বিদ্যালয়গুলো কতটুকু পিছিয়ে আছে।’
স্কুলের বাইরে সময় ব্যয়
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ৮১ শতাংশ মাধ্যমিক শিক্ষার্থী কোচিংয়ে এবং বাসায় লেখা পড়া করে। ৮৭ শতাংশ টিভি দেখে, ৬৮ শতাংশ খেলাধূলা, ৫৪ শতাংশ আড্ডা এবং ১৬ শতাংশ সাইবার ক্যাফেতে সময় ব্যয় করে।’
সহশিক্ষার ঘাটতি
গবেষণা প্রতিবেদনে মাধ্যমিক স্কুলগুলোতে সহশিক্ষার বেশ কিছু সুযোগ থাকলেও তা অপ্রতুল বলে উল্লেখ করা হয়। শিক্ষার গণ্ডি সীমিত হয়ে পড়ছে উল্লেখ করে ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, মানসম্মত শিক্ষার বৃহত্তর আকাঙ্ক্ষা পূরণে শ্রেণিকক্ষের পাঠদানের উন্নতির পাশাপাশি সহশিক্ষার লাগসই ও কার্যকর সুযোগের প্রসার একান্তই প্রয়োজন।’
সামনে এগুবার পথ
প্রতিবেদনে বেশকিছু সংকট সমাধানে করণীয় বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়। এর মধ্যে সব ক্ষেত্রে সুশাসনের ও জবাবদিহিতার ব্যবস্থা করা, অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ সহশিক্ষার উপকরণ জোরদার, শিক্ষকদের প্রণোদনা অর্থাৎ যথার্থ মূল্যায়ন বেতনভাতা বৃদ্ধি এবং প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা ও পারিবারিক খরচের কোনো দিকটি কমানো যায় সে ব্যাপারে আলোচনা করা।’
চট্টগ্রামের বৃহত্তর নাগরিক সমাজের সহায়তায় এসব সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য সংগঠনটির পক্ষ থেকে বেশকিছু অ্যাকশন প্লান নেওয়া হয়েছে বলে জানান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান।
তিনি বলেন, ‘শিক্ষা সাংবাদিকতা পুরস্কার প্রবর্তন, শিক্ষকদের জন্য “শিক্ষক সহায়তা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা”, শিক্ষার্থীদের কোচিং নির্ভরতা কমাতে সহশিক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, সৃজনশীল পদ্ধতি সংক্রান্ত শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং প্রতিবছর শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর বার্ষিক প্রতিবেদন “হালখাতা চট্টগ্রাম” প্রকাশ করা হবে।’
‘মাধ্যমিক শিক্ষা:বাস্তবতা ও করণীয়’ শীর্ষক আলোচনা সভায় অন্যদের মধ্যে বেসরকারি ইস্ট ডেলটা ইউনিভার্সিটির উপাচার্য প্রফেসর সিকান্দার খান,চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. আবুল কাসেম এবং চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রধান শিক্ষা কর্মকর্তা নুরুল আলম নিজামি প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।
বাংলাদেশ সময়: ২০০৪ ঘণ্টা, জুন ৩০, ২০১২
এমবিএম/সম্পাদনা: রানা রায়হান, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর