৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২০, সোমবার মে ২০, ২০১৩ ১১:৩৬ পিএম BDST banglanew24
29 Jul 2012   06:41:12 PM   Sunday BdST
E-mail this

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি


এম জে ফেরদৌস
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি

পিতা ঠাকুরদাসের হাত ধরে লাইটপোস্টের লেখা পড়তে পড়তে কলকাতা আসেন ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। অত্যন্ত দরিদ্র ছিল তার পরিবার। প্রায় নিঃসম্বল অবস্থায় আধুনিক শিক্ষার আকর্ষণে, মহানগরীর মহাকোলাহলের টানে হাঁটতে হাঁটতে আসেন কলকাতায়। কলকাতা এসে শুধু নগরীর বিদ্বৎসমাজেই নয়, পুরো বাংলাভাষা ও সাহিত্যের প্রধান রূপকারের বিজয়মাল্য বরণ করেন। ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় হয়ে যান ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। সাগরের মতোই বিশাল হৃদয় ও পাণ্ডিত্য দিয়ে অবদান রাখেন বাংলা গদ্য নির্মাণে। আপন হাতে গড়ে তোলেন বাংলাভাষার ব্যাকরণ। সারা জীবন নিয়োজিত ছিলেন পুরনো-জীর্ণ সমাজ বদলাবার সমাজ-সংস্কার কাজে।
বিদ্যাসাগরের অর্ধ শতাব্দীকাল পরে জন্মগ্রহণ করেন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, তিনি সাহিত্যেও বিধবাকে বিবাহ দিতে পারেননি। আর ঈশ্বরচন্দ্র বিধবাকে বিবাহ দিয়েছেন বাস্তব জীবনেই। শুধু বিধবা বিবাহই প্রচলন করেননি বাল্য বিবাহ রদে গড়ে তুলেছিলেন আন্দোলন।

উনবিংশ শতকের সবচাইতে হৃদয়বান এই মানুষটিকে নিয়ে রবীন্দ্রনাথের ভাষ্য—
‘তিনি পল্লী আচারের ক্ষুদ্রতা, বাঙালী জীবনের জড়ত্ব, সে বলে ভেদ করিয়া একমাত্র নিজের গতিবেগের প্রাবল্যে কঠিন প্রতিকূলতার বক্ষ বিদীর্ণ করিয়া হিন্দুত্বর দিকে নহে, সাম্প্রদায়িকতার দিকে নহে-করুণার অশ্রুজলপূর্ণ উন্মুক্ত-অপার মনুষত্বের অভিমুখে আপনার দৃঢ়নিষ্ঠ একাগ্র একক জীবনকে প্রবাহিত করিয়া লইয়া ছিলেন।’
অসাম্প্রদায়িক বিদ্যাসাগরের ১৮ বছর পরে জন্মেও বাংলার সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় অসাম্প্রদায়িক ছিলেন না। বিদ্যার সাগর করুণারও সাগর ছিলেন। চিনতে ভুল করেন নি মাইকেল মধুসূদন দত্ত। ‘করুণাসাগর’ উপাধি মাইকেল-এরই দেয়া।     

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বাংলাভাষার, বিশেষত বাংলা গদ্যের বিকাশের ক্ষেত্রে প্রধান পুরুষ। বিদ্যাসাগরের প্রধান কীর্তিও বাংলা গদ্য। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন—

‘বাংলাভাষাকে পূর্বপ্রচলিত অনাবশ্যক সমাসাড়ম্বর ভার হইতে মুক্ত করিয়া তাহার পদগুলির অংশযোজনার সুনিয়ম স্থাপন করিয়া, বিদ্যাসাগর যে বাংলা গদ্যকে কেবলমাত্র সর্বপ্রকার-ব্যবহার-যোগ্য করিয়াই ক্ষান্ত ছিলেন তাহাই নহে, তিনি তাহাকে শোভন করিবার জন্যও সর্বদা সচেষ্ট ছিলেন। গদ্যের পদগুলির মধ্যে একটি ধ্বনি সামঞ্জস্য স্থাপন করিয়া, সৌম্য এবং সরল শব্দগুলি নির্বাচন করিয়া, বিদ্যাসাগর বাংলা গদ্যকে সৌন্দর্য ও পরিপূর্ণতা দান করিয়াছেন। অন্বয় এনেছিলেন রামমোহন, বিদ্যাসাগর আনলেন অংশযোজনার সুনিয়ম।’
তিনিই প্রথম বাংলাভাষার পূর্ণাঙ্গ ব্যাকরণ লিখেছেন, যা মূলত সংস্কৃত ব্যাকরণেরই প্রসারণ হলেও আজ অব্ধি বাংলাভাষার ব্যাকরণ এই আদলেই রয়েছে।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ হলো বর্ণপরিচয়। শিক্ষিত আধুনিক বাঙালি জাতি বিনির্মাণে এ বইয়ের ভূমিকা সর্বাধিক প্রণিধানযোগ্য।

আধুনিক শিক্ষা প্রচলনের পূর্বে মুকুন্দরামের চন্ডীমঙ্গলসহ কিছু কাব্যে শিশু শিক্ষার যে চিত্র পাওয়া যায় তাতে দেখি- পাঁচ বছরের শিশুকে গুরুর পাঠশালায় হাতেখড়ি দেয়া হতো। সেখানেই গুরুর কাছে মুখে মুখে শোনা এবং হাতে লেখা পুথি থেকে ভাষা ও নীতিশিক্ষা পেত। এছাড়াও ব্যবসা ও জমিজমার হিসাব-নিকাশ, শ্লোক-বাক্য ইত্যাদি মুখস্ত করত। মুদ্রণযন্ত্র স্থাপিত হওয়ার পর প্রথম একটি বাধা ছিল পাশ্চাত্যের যন্ত্রে মুদ্রিত গ্রন্থপাঠে জাত যাবে-এ রকম কুসংস্কার। অন্যদিকে দেখা যায়- রাধাকান্ত দেব রচিত বাঙ্গালা শিক্ষাগ্রন্থ বইটিতে বর্ণমালা, ব্যাকরণ, ইতিহাস, ভূগোল, গণিত ইত্যাদি বিষয়ের সমাবেশ ঘটেছে ও বইটির পৃষ্ঠাসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৮৮! শিক্ষাজীবন শুরু করার জন্য এ রকম ঢাউস ও গুরুগম্ভীর বই শিশু বা বৃদ্ধ সবার জন্যই অনোপযুক্ত।
বিদ্যাসাগরের বর্ণ পরিচয় রচনার পূর্বে বর্ণমালা শেখার যেসব বই রচিত ও প্রকাশিত হয়েছিল তার অধিকাংশই শুধুমাত্র শিশুর বাংলা প্রথম পাঠের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। রামমোহন রায়ের ‘গৌড়ীয় ব্যাকরণ’, ‘শিশুবোধক’, ‘বঙ্গবর্ণমালা’ এবং হ্যালহেডের ‘এ গ্রামার অফ দি বেঙ্গল ল্যাঙ্গুয়েজ’সহ অন্যান্য বইয়ের মধ্যে বিদ্যাসাগরের পূর্ববর্তী বাংলাভাষা শিক্ষার প্রথম পাঠ হিসেবে সর্বাগ্রে নাম করতে হবে বিদ্যাসাগরেরই সুহৃদ পন্ডিত মদনমোহন তর্কালঙ্কারের শিশুশিক্ষা প্রথম ভাগ বইটির।

ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে বাংলা শিশু শিক্ষা পুস্তক লেখার প্রবল জোয়ার লক্ষ্য করা যায়। কারণ ঔপনিবেশিক ইংরেজ সরকার তাদেরই প্রয়োজনে একটি শিক্ষিত শ্রেণী গড়ে তুলতে চেয়েছিল। শাসনকাজের প্রয়োজনে শাসিত প্রজাদের মধ্যে যেমন ইংরেজি জানা একটা শ্রেণীর প্রয়োজন তেমনি শাসক ইংরেজ শক্তি ও তাদের দোভাষী এই শিক্ষিত শ্রেণীরও প্রয়োজন দেখা দিল বাংলাভাষা চর্চার। ভাষাশিক্ষা ব্যতিরেকে উন্নত জ্ঞানার্জন ও তা চর্চার কোনো বিকল্প নাই। তাই ঊনবিংশ শতকে মহাসমারোহে বাংলা ভাষা চর্চার দ্বার উন্মুক্ত হয়।

ব্রাহ্মীলিপি থেকেই বিবর্তিত হয়ে বাংলা বর্ণমালার উদ্ভব হয়েছে। তিন হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলেছে বিবর্তন প্রক্রিয়া। মূলত বিদ্যাসাগরের হাতেই বাংলা বর্ণমালার যথাযথ উন্নতি হয়েছে, যে মৌলিক উন্নয়নের পর পরবর্তী সার্ধশতবছরে মাত্র কিছু সংস্কারমূলক কাজ হয়েছে। ১৭৬৮ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হ্যালহেডের বইয়ে স্বরবর্ণের সংখ্যা ছিল ১৬। পরবর্তী প্রায় ১০০ বছর মদনমোহনের শিশুশিক্ষা প্রথম ভাগ পর্যন্ত স্বরবর্ণের সংখ্যা ১৬টিই ছিল। বিদ্যাসাগর এই সংখ্যা কমিয়ে ১২তে নামালেন। ব্যঞ্জনবর্ণ ছিল ৩৪টি। বিদ্যাসাগর তাতে নতুনভাবে ছয়টি বর্ণ যুক্ত করেন। তিনি ভূমিকায় লিখলেন:

‘বহূকালাবধি বর্ণমালা ষোল স্বর ও চৌত্রিশ ব্যঞ্জন এই পঞ্চাশ অক্ষরে পরিগণিত ছিল। কিন্তু বাঙ্গালা ভাষায় দীর্ঘ ঋৃ-কার ও দীর্ঘ ৯৯ কারের প্রয়োজন নাই। এই নিমিত্ত ঐ দুই বর্ণ পরিত্যক্ত হইয়াছে। আর সবিশেষ অনুধাবন করিয়া দেখিলে অনুস্বার ও বিসর্গ স্বরবর্ণ মধ্যে পরিগণিত হইতে পারে না। এই নিমিত্ত ঐ দুই বর্ণ ব্যঞ্জনবর্ণ মধ্যে পঠিত হইয়াছে।’

শতাধিক বছরব্যাপী শিশুর প্রথম পাঠ হিসেবে বিদ্যাসাগরের বর্ণ পরিচয় বইটি প্রায় একচ্ছত্র প্রাধান্য বজায় রেখেছিল।

কি ভাষা কি সাহিত্য অথবা সমাজ-সংস্কার সর্বক্ষেত্রই উনিশ শতকে আধুনিক শিক্ষিত বাঙালি মানস-উদয়ের কালে ইশ্বরচন্দ্রের হাতে পরম যত্নে লালিত হয়েছে। সুমহান হৃদয়ের অধিকারী এই মানুষটিরও সীমাবদ্ধতা ছিল। বিপ্লবী-বিদ্রোহী ছিলেন, কিন্তু ছিলেন জনজীবন বিচ্ছিন্ন। পিতার হাত ধরে গ্রাম থেকে এসেছিলেন শহরে শিক্ষার্জন করতে। কিন্তু গ্রামের কৃষক হারিয়ে গেল তাঁর জীবন থেকে।

ইংরেজদের সাথে সময়ে সময়ে বিরোধে লিপ্ত হয়েছেন কিন্তু ইংরেজ শাসনকে প্রশ্নবিদ্ধ করেননি। কেননা ইংরেজ শাসনে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের খুঁটিতেই বাঁধা ছিল শিক্ষিত সমাজ। তাই দেখা যায় পুরো ভারতবর্ষ জুড়ে অসংখ্য কৃষক বিদ্রোহ হচ্ছে ঊনবিংশ শতাব্দী ব্যাপী, কিন্তু সেই বিদ্রোহ উঠে আসছে না বাংলা গদ্যে-সাহিত্যে। নীল বিদ্রোহের পক্ষে তো নয়ই বিপক্ষেও দাঁড়িয়েছেন উনিশ শতকের মহান জোব্বা পরিহিত পণ্ডিতেরা। এই দায় বিদ্যাসাগরেরও আছে। এসকল সীমাবদ্ধতাই ঊনবিংশ শতাব্দীর যুগ-সীমাবদ্ধতা। বিদ্যাসাগরদের মতো উচ্চবর্ণের শিক্ষিত বাঙালির সীমাবদ্ধতা। এর থেকে পুরোপুরি মুক্ত ছিলেন না মহৎপ্রাণ বিদ্যাসাগরও। তা সত্ত্বেও এই কীর্তিমান মহামানবের কাছে বাঙালি ঋণী থাকবে আজীবন। আজ ২৯ জুলাই তাঁর মৃত্যু বার্ষিকীতে সেই ঋণ স্বীকার করাই এ লেখার উদ্দেশ্য।

বাংলাদেশ সময়: ১৮২০ ঘণ্টা, ২৯ জুলাই, ২০১২
সম্পাদনা: রানা রায়হান, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Bookmark and Share
REVE Systems
VISA Center Inc
Holy Hajj BD
RehabHousing.com

শিল্প-সাহিত্য

8877
Kaspersky Lab - Antivirus Software [ Bangladesh ]
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম | এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন

ফোন: +৮৮০ ২ ৮৪০২১৮১, ৮৪০২১৮২ আই.পি. ফোন: +৮৮০-৯৬১২১২০০০০ নিউজ রুম সেল: +৮৮-০১৭২৯০৭৬৯৯৬, ০১৭২৯০৭৬৯৯৯ ফ্যাক্স: +৮৮০ ২ ৮৪০ ২৩৪৬
ইমেইল: news.bn24@gmail.com, editor.banglanews@gmail.com, editor@banglanews24.com    বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম    এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন

বাংলায় লেখা হলে ইউনিকোডে পরিবর্তন করে ইমেইল করুন    কপিরাইট © 2013 সকল স্বত্ব ® সংরক্ষিত    একটি ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেড প্রতিষ্ঠান