 |
কক্সবাজার: কক্সবাজারের রামু উপজেলায় ২৯ সেপ্টেম্বরের বৌদ্ধ বসতি ও বৌদ্ধবিহারে হামলার ঘটনাটি সরেজমিনে দেখে গেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সোমবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রামু পরিদর্শনে নগদ অনুদানসহ নানা ত্রাণসামগ্রী প্রদান করেছেন। সেখানে এক সভায় বক্তব্যও রাখেন তিনি। কিন্তু এরপরও রামুর ক্ষতিগ্রস্ত বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের আতঙ্ক কাটেনি। বরং প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে তাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে নতুন শঙ্কার।
বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের লোকজনের অভিমত, প্রধানমন্ত্রী তাদের সহায়তা দিয়েছেন। এছাড়াও সরকারের বিভিন্ন দফতরের পক্ষ থেকে নগদ অর্থ ও অন্যান্য ত্রাণ সহায়তা পেয়ে এখন নতুন জীবন সাজাতে শুরু করেছেন তারা। পুড়ে যাওয়া মন্দিরগুলোও পুনর্নির্মাণের ঘোষনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এতে বৌদ্ধ সম্প্রদায় ধর্মীয় উপাসনালয় ফিরে পাওয়ার আশায় স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন। তবে হামলার সুষ্ঠু বিচার ও তাদের নিরাপত্তা নিয়ে আবারো শঙ্কা কাটেনি তাদের।
২৯ সেপ্টেম্বর রাতের হামলায় পুড়ে যাওয়া বসত-বাড়িগুলোর মধ্যে রয়েছে অতিন্দ্র বড়ুয়ার বাড়িটিও। তার মেয়ে রামু ডিগ্রি কলেজের প্রদর্শক ববিতা বড়ুয়া বাংলানিউজকে জানান, প্রধানমন্ত্রী রামুতে এসে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন, এটা তাদের জন্য অনেক বড় পাওয়া। প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন বৌদ্ধমন্দির ও বসত-ঘরে সেদিনের হামলার ভয়াবহতা দেখে তাকেসহ আরো অনেককে বুকে নিয়ে শান্তনা দিয়েছেন। 
এরপরও ববিতার অভিযোগ, পুলিশের অবহেলায় এতো বড় নিন্দনীয় ঘটনা ঘটেছে। এ নিয়ে তার মতো পুরো বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের আক্ষেপ থাকলেও জনসভায় প্রধানমন্ত্রী পুলিশের অবহেলা এবং সেদিনের ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কিছুই বলেননি। এতে আসল অপরাধীরা ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থাকতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তিনি আরো অভিযোগ করেন, ওই রাতে ‘তৌহিদী জনতা’র নামে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের লোকজন হামলা চালিয়েছে।
তাদের বাড়িতে দুটি পরিবার বসবাস করতো। কিন্তু সহায়তা দেওয়া হয়েছে একটি পরিবারকে বলেও আক্ষেপ করেন ববিতা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বড়ুয়া বাংলানিউজকে বলেন, ঘটনার জন্য পুলিশের ব্যর্থতা দায়ী। এর সঙ্গে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াতসহ ইসলামী অন্যান্য দলের কর্মী, রোহিঙ্গাসহ বিভিন্ন মানুষের সংশ্লিষ্টতা ছিল। তাদের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী কোনো কথা বললেন না। এতে ঘটনায় সরাসরি জড়িতরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। হুমকি দিচ্ছে। এতে শঙ্কিত না হয়ে পারা যায় না।
রামু কেন্দ্রীয় সীমা বিহারের সহকারী পরিচালক প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু বাংলানিউজকে জানান, তাদের এ দুর্দিনে প্রধানমন্ত্রী ছুটে আসায় বৌদ্ধ সম্প্রদায় আনন্দিত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের তিনি পর্যাপ্ত সহায়তাও দিয়েছেন। এর ফলে
আক্রান্তরা নতুন করে জীবনযাত্রা শুরু করছেন। তবে তিনি অভিযোগ করেন, খিজারী হাই স্কুল মাঠের জনসভায় দেওয়া প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য পুরো বৌদ্ধ সম্প্রদায়কে হতাশ করেছে।
হতাশার কারণ জানতে চাইলে তিনি জানান, ২৯ সেপ্টেম্বরের সহিংসতার ঘটনায় জড়িতদের পাশাপাশি বৌদ্ধ সম্প্রদায় শুরু থেকেই স্থানীয় রাজনীতিবিদদের অবহেলা এবং পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর চরম ব্যর্থতাকে দায়ী করে আসছিলেন। কারণ, সহিংসতা চলাকালে পুলিশ তাদের নিরাপত্তা দিতে কোনো ভূমিকা পালন করেনি। এক ঘণ্টা, আধ ঘণ্টা পর পর এক একটা মন্দিরে ওই রাতে অগ্নিসংযোগ ও হামলা চালানো হয়। এতো দীর্ঘসময় ধরে চলা সহিংসতা রোধে কেন পুলিশ ভূমিকা রাখেনি? জেলা পুলিশের ভূমিকাও রহস্যজনক ছিলো অভিযোগ করে তিনি বলেন, সবকিছু যখন জ্বলে-পুড়ে ছারখার হয়ে যায় তখনই ঘটনাস্থলে পুলিশসহ অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী আসতে শুরু করে।
প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু আরো অভিযোগ করেন, সোমবার প্রধানমন্ত্রী রামুতে পৌঁছে সীমা বিহারে গেলে সেখানে বিহারের ভিক্ষু ও বৌদ্ধ নেতারা এসব ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীকে অবহিতও করেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী জনসভায় রাজনৈতিক নেতা এবং পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে ঘটনায় নির্দোষ প্রমাণের চেষ্টা করেন এবং স্থানীয় সাংসদকে হামলার ঘটনায় দায়ী করে বক্তব্য দেন। এ কারণে সহিংস এ ঘটনার বিচারকাজ ব্যাহত হবে বলে মনে করেন তিনি।
প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু আরো বলেন, ক্ষতিগ্রস্তরা এখন ত্রাণমুখী নন। তারা চান আস্থা আর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রেখে এলাকায় বসবাস করার পরিবেশ। ভবিষ্যতে যেন কেউ এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি করতে না পারে।
কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে আসল অপরাধীরা পার পাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বলেন, তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশের আগে এ ঘটনায় কাউকে জড়িয়ে রাজনৈতিক কাঁদা ছোড়া-ছুড়ি তারা চান না। তারা চান, যারা জড়িত তাদের চিহ্নিত করে সুষ্ঠু বিচার। অপরাধীরা যে দলেরই হোক তাদের শাস্তি হোক।

বাংলাদেশ বুড্ডিস্ট ফেড়ারেশন (যুব) কক্সবাজার জেলা শাখার নির্বাহী সভাপতি সুরেশ বড়ুয়া বাঙালি বাংলানিউজকে জানান, প্রধানমন্ত্রী রামুতে এলেও আস্থার পরিবেশ আসেনি। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের মাধ্যমে সুষ্ঠু বিচার বাধাগ্রস্ত হবে। এখানো বৌদ্ধ সম্প্রদায়কে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। হুমকি দাতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
ক্ষতিগ্রস্ত মেরংলোয়া এলাকার এক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করে বাংলানিউজকে বলেন, ‘‘ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের অনেকেই প্রকাশ্যে ঘুরছেন। এক নেতা ঘুরে ঘুরে হুমকি দিচ্ছেন। অথচ আমাদের নীরবে মেনে নিতে হচ্ছে। এর চেয়ে অসহায়বোধ আর কি হতে পারে?’’
বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের লোকজনের দাবি, এ হামলার ঘটনায় জড়িতদের সনাক্ত করে সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার করা হোক। হামলাকারীরা কেবল একটি রাজনৈতিক দলের নয়। ওখানে সকল দলের লোক আছেন। ঘটনার ছবি ও ভিডিও ফুটেজ এখন সবখানে পৌঁছে গেছে। এরপরও তারা প্রকাশ্যে রয়েছে!
বাংলাদেশ সময়: ১৯০৮ ঘন্টা, অক্টোবর ১০, ২০১২
নুপা আলম/ সম্পাদনা: অশোকেশ রায়, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর, আহ্সান কবীর, আউটপুট এডিটর