ঢাকা: বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলোর কর্মপরিবেশ তদারকিতে আন্তর্জাতিক কমিটি গঠনের লক্ষ্যে প্রণীত চুক্তিতে স্বাক্ষরের সর্বশেষ সময়সীমা পার হয়ে গেছে।
‘অ্যাকোর্ড অন ফায়ার অ্যান্ড বিল্ডিং সেইফটি ইন বাংলাদেশ’ নামের ওই চুক্তিতে ইতিমধ্যেই ২৫টি আন্তর্জাতিক খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান স্বাক্ষর করেছে। কিন্তু এ উদ্যোগে ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাপক সাড়া দিলেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর তরফে খুব একটা সাড়া পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের একক বৃহত্তম বাজার যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর এ চুক্তিতে স্বাক্ষর না করাকে দুঃখজনক বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
রানা প্লাজা ধসের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের শ্রমিকদের প্রতি আন্তর্জাতিক ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়বদ্ধতার বিষয়টিকে সামনে রেখেই এই চু্ক্তির উদ্যোগ নেয় প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক শ্রম সংগঠনগুলো।
চুক্তি অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে বছরে ৫ লাখ ডলারের একটি তহবিলে জমা দিতে হবে। ওই তহবিলের অর্থ একটি তদারকি কমিটি গঠনে ব্যয় হবে, যারা বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলোর অগ্নি ও অবকাঠামো নিরাপত্তা ব্যবস্থার মান স্বাধীনভাবে পরিদর্শন করবে। একই সঙ্গে কারখানাগুলোতে উৎপাদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শ্রমিক ও ব্যবস্থাপকদের প্রশিক্ষণের জন্যও এ তহবিলের অর্থ খরচ করার কথা চুক্তিতে বলা হয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ ইউরোপীয় ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে মার্কস অ্যান্ড স্পেন্সার, কেয়ার ফোর চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। এছাড়া সুইডেনের খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ‘এইচ অ্যান্ড এম’ এবং ইতালিয়ান ফ্যাশন হাউজ বেনোতোও এ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। আর ডেডলাইন পেরিয়ে যাওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে চুক্তিতে স্বাক্ষর করে অ্যাবেরকোম্বি অ্যান্ড ফিচ।
তবে পিভিএইচের মত মার্কিন প্রতিষ্ঠান এতে স্বাক্ষর করলেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রধান খুচরা বিক্রেতা জায়ান্ট ওয়ালমার্ট, গ্যাপ, টার্গেট ও জেসি পেনি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেনি।
চুক্তির বিষয়ে নিজেদের কিছু ওজর আপত্তি উল্লেখ করে ওয়ালমার্ট বলেছে তারা তাদের নিজেদের মত করেই বাংলাদেশে পরিদর্শন কার্যক্রম চালাবে। তবে বাংলাদেশের সাম্প্র্রতিক দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে আছে ওয়ালমার্ট। কারণ বিশ্বের সবচেয়ে বড় খুচরা বিক্রেতা এ প্রতিষ্ঠানটি একই সঙ্গে বাংলাদেশের অন্যতম একক বৃহত্তম তৈরি পোশাক ক্রেতা প্রতিষ্ঠান।
ওয়ালমার্টের মত অপর মার্কিন প্রতিষ্ঠান গ্যাপও একই অযুহাত দেখিয়ে জানিয়েছে, তারা চুক্তি স্বাক্ষর করতে রাজি, কিন্তু কিছু কৌশলগত সমস্যার জন্য এতে তারা স্বাক্ষর করতে পারছে না।
মূলত বাড়তি আইনি দায় এড়িয়ে যেতেই মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলো চুক্তিতে স্বাক্ষর করছে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। চুক্তি অনুযায়ী যেসব খুচরা ক্রেতা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ থেকে পণ্য কিনবে, তারা তাদের সরবরাহকারী কারখানার কর্মপরিবেশ পরিদর্শন, ভবনের অবকাঠামোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট শ্রমিক ও ব্যবস্থাপকদের প্রশিক্ষণের জন্য দায়ী থাকবে।
তবে ওয়ালমার্ট ও গ্যাপ স্বাক্ষর না করলেও যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান যেমন, অ্যাবেরকোম্বি অ্যান্ড ফিচ এবং পিভিএইচ এ চুক্তিতে ইতিমধ্যেই স্বাক্ষর করেছে, যা সাধুবাদ পেয়েছে আন্তর্জতিক অঙ্গনে।
এ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের এই খুচরা বিক্রেতা জায়ান্টগুলো দেশটির মানবাধিকার ও শ্রম অধিকার সংগঠনগুলোর দিক থেকে অব্যাহত চাপের মুখে রয়েছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর এ অবস্থানের সমালোচনা করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও শ্রম অধিকার সংস্থাগুলো।
ইতিমধ্যেই ইন্টারন্যাশনাল লেবার রাইটস ফোরাম ও ইউনাইটেড স্টুডেন্ট অ্যাগেইন্সট সুইটশপ ‘গ্যাপ ডেথট্রাপ’ নামে একটি ওয়েবসাইট খুলে সেখানে বিধ্বস্ত ও পুড়ে যাওয়া কারখানার ছবি পোস্ট করে গ্যাপের প্রতি ওই চুক্তিতে স্বাক্ষরের আহবান জানিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যেহেতু বাংলাদেশের অধিকাংশ কারখানাই ছোটো এবং উৎপাদন খরচ কমানোর ক্ষেত্রে তারা খুবই চাপে থাকে, তাই বিশ্বের খুচরা বিক্রেতাদের সমন্বয়ে প্রনীত একটি অভিন্ন ও সুনির্দিষ্ট চুক্তি ছাড়া এটা আশা করা খুবই অবাস্তব, যে ওই কারখানাগুলো যথাযথ নিরাপত্তা মান বজায় রাখতে সক্ষম হবে।
এ প্রসঙ্গে ইউনিভার্সিটি অব নর্থ ক্যারোলিনার পলিটিক্যাল সায়েন্টিস্ট লেনা মোসলি বলেন, এমনকি যদি সব খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানও একই ছাতার নিচে আসে তারপরও বর্তমান পরিস্থিতি সাপেক্ষে এগুলো বাস্তবায়ন খুবই কঠিন হবে।
বাংলাদেশ সময়: ১৮০০ ঘণ্টা, মে ১৮, ২০১৩
সম্পাদনা: রাইসুল ইসলাম, নিউজরুম এডিটর/জেডএম