 |
পাটগ্রাম (লালমনিরহাট): রোববার ঠিক কাকডাকা ভোর। এসময় লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ বাজারের ‘গদি ঘরে` আসতে থাকেন লোকজন। আসেন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাও (ওসি)।
উপস্থিত হন ক্ষমতাসীন দলের কিছু নেতাকর্মী এবং একটি সাংস্কৃতিক সংগঠনের লোকজন।
আর সবার মধ্যে ‘মধ্যমনি’ হয়ে উপস্থিত ছিলেন ওই গদি ঘরের মালিক এবং কালীগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নুরুজ্জামান আহমেদ।
ঠিক এসময় এ আসরে এসে উপস্থিত হন নিকাহ রেজিস্ট্রার (কাজী) কাজী আদেল। কারণ, নানা নাটকীয়তকার পর এখানে বিয়ে হবে জুয়েল-আরফিনার। নানা আনুষ্ঠানিকতা শেষে একপর্যায়ে শেষ হয় বিয়ের কাজ। নববধূকে নিয়ে বাড়ি ফিরে যান জুয়েল। অন্যরাও ফিরে যান, যে যার মতো।
আর ঠিক সেই সময়ই বাড়িতে ফজরের নামাজ শেষে আরফিনার বাবা আজিজার রহমান স্ত্রীকে ঘুমাতে বলে বের হন ঘর থেকে।
তারপর বাড়ির পেছনের একটি গাছে দড়িতে ঝুলে আত্মহত্যা করেন তিনি।
দিনের আলো ফোটার পর তার মৃত্যুর খবর চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।
চল্লিশোর্ধ আজিজার রহমানের বাড়ি লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার ভুল্যারহাট এলাকায়।
জানা গেছে, জুয়েল ও আরফিনার পরিবারের মধ্যে মাসখানেক ধরে বিয়ের কথাবার্তা চলছিল। সেই সূত্র ধরে দু’জনে শনিবার এক জায়গায় দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন। আর এটাই ছিল যেন জঘন্যতম (!) তাদের অপরাধ!
এদের দুজনকে একসঙ্গে কথা বলতে দেখে কয়েকজন বখাটে তাদের আটক করে মোবাইল ফোন ও টাকা কেড়ে নিয়ে ওই দু’জনকে তুলে দেয় একটি সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাধারণ সম্পাদকের হাতে।
এরপর সেখান থেকে তাদের পাঠানো হয় উপজেলা চেয়ারম্যানের কাছে। সেখান থেকে থানা।
এভাবে সারারাত পার হওয়ার পর রোববার সকালে ‘শালিস বৈঠকে’ তাদের বিয়ে দেওয়া হয়। একমাত্র মেয়ের বিয়ে এভাবে চাননি বাবা আজিজার রহমান। সে কারণে ক্ষোভে-অপমানে ফাঁসিতে ঝুলে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন তিনি।
এদিকে, খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আরফিনা স্থানীয় একটি কলেজের স্নাতক শ্রেণির ছাত্রী।
তিনি উপজেলার দলগ্রামের নানা বাড়িতে থেকে লেখাপড়া করতেন। আর মাহমুদুল হক জুয়েলের বাড়ি একই উপজেলার শুকানদিঘী এলাকায়।
পেশায় ব্যবসায়ী জুয়েলের বাবা এনতাজ আলী উপজেলা আনসার ও ভিডিপি কর্মকর্তা।
পুলিশ, এলাকাসী ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, আরফিনার বাবা আজিজার রহমানের অসুস্থতার খবর পেয়ে নানা বাড়ি থেকে আরফিনা নিজেদের বাড়িতে যাওয়ার জন্য বের হন। আর তার সঙ্গে জুয়েলও যেতে চান আরফিনার বাড়িতে।
ফলে দু’জনে মোটরসাইকেলে রওয়ানা দেন ভুল্যারহাটের উদ্দেশে। মাঝপথে তুষভাণ্ডার রেল স্টেশনের পশ্চিমের রেল গেটের পাশে দাঁড়িয়ে শনিবার বিকেলে দু’জনে কথা বলতে থাকেন।
আর এ দৃশ্য দেখে তাদের কাছে এসে আজেবাজে কথা শুরু করেন ওই এলাকার বখাটে যুবক আলী ও হিরু।
একপর্যায়ে জুয়েলের কাছে থাকা একটি মোবাইল ফোন সেট ও কিছু টাকা অস্ত্রের মুখে লুটে নেয় ওই দুই যুবক। আর শেষে স্থানীয় ‘অন্বেষা সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী’ নামে একটি সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ও কালীগঞ্জ উপজেলা ছাত্রলীগের আহ্বায়ক ও কালীগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নুরুজ্জামান আহমেদের ছেলে রাকিবুজ্জামানসহ কয়েকজনের হাতে তুলে দেওয়া হয় জুয়েল-আরফিনাকে।
পরে দু’জনকে নিয়ে যাওয়া হয় ওই সংগঠনে। এরপর জুয়েলকে নানাভাবে বিয়ের জন্য চাপ দেওয়া হয়। কিন্তু তিনি তার বাবার মতামত ছাড়া বিয়েতে রাজি হচ্ছিলেন না।
নানা দেনদরবার করেও বিষয়টি সেখানে সুরাহা করতে না পারায় শেষ পর্যন্ত তাদের পাঠানো হয় উপজেলা চেয়ারম্যানের কাছে। সেখানেও জুয়েল তার সিদ্ধান্তে অনড় থাকায় শনিবার দিনগত রাত ৩টার দিকে জুয়েল ও আরফিনাকে নিয়ে যাওয়া হয় কালীগঞ্জ থানায়।
থানাতেও নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকায় জুয়েলকে একপর্যায়ে ওসির নির্দেশে হাজতে ঢুকিয়ে রাখা হয়, সকালে ভ্রাম্যমাণ আদালতের সামনে হাজির করার জন্য।
তবে ভোরের দিকে জুয়েলের বাবা উপজেলা চেয়ারম্যানের কাছে খবর পাঠান তাদের বিয়ে দিয়ে দিতে। ফলে, শেষ পর্যন্ত উপজেলা চেয়ারম্যানের গদি ঘরে তাদের বিয়ে হয়।
এদিকে, রোববার দুপুরে সরেজমিন ভুল্যারহাটে আরফিনাদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, পুলিশ আজিজার রহমানের লাশের সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি করছে।
আর পাশেই তার স্ত্রী তানজুমা বেগম ডুকরে ডুকরে কেঁদে বারবার মুর্ছা যাচ্ছেন।
তার পরিবারের লোকজন বাংলানিউজকে জানান, এক ছেলে ও এক মেয়ের বাবা ছিলেন মধ্যবিত্ত কৃষক আজিজার।
সমাজের আর দশজন বাবার মতোই তারও স্বপ্ন ছিল ধুমধাম করে মেয়ের বিয়ে দেবেন। সে অনুয়ায়ী ছেলেও দেখে রেখেছিলেন। দুই পরিবারের মধ্যে বিয়ের কথাবার্তাও অনেক দূর এগিয়েছিল।
কিন্তু ‘মানুষের হাতে আটক হওয়ার’ অপবাদ সহ্য করতে না পেরে তিনি আত্মহত্যার পথ বেছে নেন বলে জানান আরফিনার পরিবারের লোকজন।
ঘটনার সঙ্গে পুলিশসহ প্রভাবশালীরা জড়িত থাকায় প্রকাশ্যে কেউ কিছু বলতে রাজি হননি।
মৃত আজিজার রহমানের মামা মনির উদ্দিন উপজেলা চেয়ারম্যানের গদি ঘরে ওসিসহ অন্যান্যদের উপস্থিতিতে ওই বিয়ের কথা স্বীকার করে বলেন, ‘বিষয়টি মেনে নিতে না পেরে আজিজার আত্মহত্যা করেছে।’
অন্বেষা সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর সাধারণ সম্পাদক ও কালীগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যানের ছেলে রাকিবুজ্জামান আহমেদ এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘জুয়েল ও আরফিনাকে এলাকার লোকজন আকট করে অন্বেষায় দিয়েছিল। পরে আমরা তাদের পুলিশে দিয়েছি।’
আজিজার রহমানের আত্মহত্যা প্রসঙ্গে তিনি দাবি করেন, ‘তার মাথায় সমস্যা ছিল। তাই, তিনি আত্মহত্যা করে থাকতে পারেন।’
এ বিষয়ে কথা বলতে রোববার থানায় গিয়ে কালীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমীরুজ্জামানকে পাওয়া যায়নি।
বিকেলে একাধিকবার তার মোবাইল ফোনে কল করা হলেও তিনি তা রিসিভ করেননি। অপরদিকে, কালীগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যানও ফোন কল রিসিভ করেননি।
এদিকে, স্থানীয়রা বাংলানিউজের কাছে প্রশ্ন করে জানতে চান, যে বিয়ে পারিবারিকভাবেই হতো, সেখানে ‘আটক নাটক’ না করলেই কি হতো না? আর এই নাটক করতে গিয়ে দুই পরিবারের আনন্দকে বিষাদে পরিণত করার দায়ীদের কি বিচারের গোড়ায় দাঁড় করানো হবে? আর সেই বাবা আজিজার রহমান, যিনি ক্ষোভে-অপমানে আত্মহত্যার পথ বেছে নিলেন নাকি তাকে জোর করে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য করা হলো, তার বিচার কি হবে কখনো? এ প্রশ্নই রেখেছেন, হত্যভাগ্য আরফিনার পরিবারের সদস্যরা!
বাংলাদেশ সময়: ০৪৪৯ ঘণ্টা, মে ২১, ২০১২
সম্পাদনা: আশিস বিশ্বাস, অ্যাসিস্ট্যান্ট আউটপুট এডিটর