৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২০, বুধবার মে ২২, ২০১৩ ৫:২৭ এএম BDST banglanew24
13 Sep 2012   05:46:30 PM   Thursday BdST
E-mail this

তসলিমা নাসরিনকে খোলা চিঠি


সিয়াম সারোয়ার জামিল, অতিথি লেখক
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
তসলিমা নাসরিনকে খোলা চিঠি

প্রিয় তসলিমা,
শুভেচ্ছা নেবেন। জানি, দীর্ঘ নির্বাসিত জীবনে খুব একটা ভালো নেই আপনি। ১৮ বছর ধরে আপনি দেশের বাইরে থাকলেও আপনাকে নিয়ে বিতর্ক এতটুকু কমেনি। বরং নিত্য নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করে আপনি বারবার আলোচনায় এসেছেন, সংবাদপত্রের মুখরোচক খবর হয়েছেন। হয়তো সবসময় এমনটাই চেয়েছেন। স্বেচ্ছায় যদি চেয়ে থাকেন, তবে নিঃসন্দেহে সফল হয়েছেন স্বীকার করতে হবে। তবে মাঝখানে কিছুকাল বিতর্কের মন্দাকাল চলছিল আপনার। কিছুতেই যেন গরম খবর হচ্ছিল না। আপনি ছলচাতুরির আশ্রয় নিলেন। ভারতীয় বাংলাভাষী কথাসাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ করে আবারো আলোচনায় নিয়ে এলেন নিজেকে। আবারো বড় ধরনের মসলাদার বিতর্ক তৈরি করতে সক্ষম হলেন আপনি। আপনি বিতর্ক ভালবাসেন, জানি। কিন্তুটা বিতর্ক তৈরি করতে এতোটা বেপরোয়াভাবে উঠে পড়ে লাগবেন, তা কখনো ভাবিনি।

তসলিমা,
একসময় আমি আপনার বড় ভক্ত ছিলাম। আপনাকে সম্মানের আসনে বসিয়েছিলাম। তবে এখন আর আপনার প্রতি কোন প্রকার ভক্তি নেই, শ্রদ্ধা নেই। আপনার নারীবাদী বক্তব্য আমাকে আকর্ষণ করতো। আপনার স্পষ্ট ভাষা আমাকে সাহস যোগাত। প্রচলিত কুসংস্কারাচ্ছ্ন্ন সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে আপনার দ্রোহ, আমাদের আলোর পথ দেখাতে পারত। আপনার আপোসহীনতা আমাদের আদর্শ হতে পারত, কিন্তু হয়নি। হয়নি কারণ, আপনি নিজে কখনোই কোনো নির্দিষ্ট আদর্শ কিংবা নিয়ম-শৃঙ্খলার ভিতরে থাকেননি। বারবারই আপনি উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করেছেন। আপনি বারবার নিজেকে সম্মানিত রাখতে ব্যর্থ হয়েছেন। আপনি বিতর্কিত থেকে অধিকতর বিতর্কিত হতে চেয়েছেন। নিজের বই নিষিদ্ধ করার দায়টা আপনি সুনীলের ওপর চাপাতে চেয়েছেন। শুধু দায় চাপিয়েই আপনি ক্ষান্ত হননি, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ তুলে বিতর্কের সর্বশেষ সংস্করণ বাজারে ছেড়েছেন। বরাবরের মতনই খুব নির্লজ্জভাবে কোনো প্রকার প্রমাণ ছাড়াই আপনি এ অভিযোগ এনেছেন।

আপনার এই মসলাদার অভিযোগ আমরা মেনে নিতাম, যদি আপনি পরিষ্কার একজন মানুষ হতেন। আপনাকে বিশ্বাস করতাম, যদি আপনি আমাদের বিশ্বাস রক্ষা করতেন। সত্যি বলতে আপনি কারো বিশ্বাস রাখার যোগ্য নন। কারণ, আপনি কিছুদিন আগেই সালমান রুশদীর বিরুদ্ধে ঠিক একই রকমের ভুয়া অভিযোগ তুলেছিলেন। আপনার চিরাচরিত স্বভাবই হলো মানুষের ব্যক্তিগত বিষয়কে রাস্তায় টেনে নামানো। মানুষ যেসব বিষয়ে আঘাতপ্রাপ্ত হয়, আপনি সেসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করে আনন্দ লাভ করেন। আপনি জনবিচ্ছিন্ন একজন মানুষ হিসেবেই বাঁচতে চেয়েছেন। আপনি শুধু নিজেকে নিয়েই ভাবতে জানেন। নিজের সুখ, নিজের কর্মকান্ড ছাড়া অন্যকিছু কখনই আপনার ভাবনায় আসেনি।

মনে পড়ে, ২০০৮ সালের ২৬ আগস্ট দৈনিক `আমাদের সময়` পত্রিকায় আপনি "প্রিয় স্বদেশ আমার, আমি ফিরবই" শিরোনামে একটা নিবন্ধ লিখেছিলেন। একই বছর আপনার শান্তিনগরের ফ্ল্যাটে আপনার জন্মদিনও উদযাপিত হয়েছিল। সেখানে আমার যাবার সৌভাগ্য হয়েছিল। সেসময় ঢাবির শিক্ষক রোবায়েত ফেরদৌস, দীপায়ন খীসা, শামীমা বিনতে রহমান প্রমুখরা আপনার দেশ প্রত্যাবর্তনের লক্ষ্যে একটা কমিটিও গঠন করেছিলেন। আমরা আশাবাদী হয়েছিলাম, আপনি ফিরে আসবেন। কারণ তখনও পর্যন্ত আমি আপনার ভক্ত ছিলাম। তখনও আমি আপনাকে বিশ্বাস করতাম। এখন আর বিশ্বাস করি না। এখন আশাবাদী হতে ভয় লাগে। কারণ, এখন আমরা জানি, আপনি শুধু নিজ স্বার্থই হাসিল করতে জানেন। স্বার্থ হাসিলের জন্য কখনও কখনও স্ব-উদ্যোগে মৌলবাদীদের উস্কে দিতেও দ্বিধা করেন না।

নব্বইয়ের দশকে যখন শহীদজননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে আন্দোলন তুঙ্গে, যখন যুদ্ধাপরাধী মৌলবাদী জামায়াত-শিবির এবং ফতোয়াবাজ চক্রের বিরুদ্ধে গোটা দেশ ঐক্যবদ্ধ ; যখন জামায়াত-শিবির ক্রমশই কোনঠাসা হয়ে পড়ছিল;  ঠিক সে সময়েই আপনি প্রকাশ করলেন "লজ্জা"। আপনি বাজারে বিতর্কের উপাদান ঢেলে দিলেন প্রাণ খুলে। ধর্মীয় অনুভূতি কাজে লাগিয়ে মাথা তুলে দাঁড়ালো কোনঠাসা মৌলবাদীরা। গর্তের ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো হিংস্র গোষ্ঠী। হরতাল, নৈরাজ্যকর, পরিস্থিতি সৃষ্টি করে নিজেদের হিংস্র চেহারা রাজপথে দেখাতে উঠে পড়ে লেগেছিল তারা। বোকা জনগণ তাদের সায় দিয়েছিল, ধর্মীয় হুজুগের কারণে। যুদ্ধাপরাধীরা শেষ পর্যন্ত হাত গলে বেরিয়ে গিয়েছিল। এসবের জন্য দায়ী ছিলেন আপনিই। নানা ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে আপনি দেশত্যাগ করলেন বটে কিন্তু যুদ্ধাপরাধীদের পুনর্জীবিত করে গেলেন।

আপনি এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টুইটারকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছেন। প্রায় প্রতিদিনই মুখরোচক লাগামহীন বক্তব্য দিচ্ছেন রাজনৈতিক নেতাদের মত। গত ১লা বৈশাখে আপনি আপনার স্ট্যাটাসে লিখেছিলেন, "আমার বেশিরভাগ বন্ধুই বয়সে আমার চেয়ে বেশ বড়। এদের অনেকেই মারা গেছেন আবার অনেকেই মরণাপন্ন। আমার জগৎ বিরান হতে চলেছে। বন্ধুত্ব তরুণদের সঙ্গে করতে হয়।" আমরা তরুণরা আবারও আশাবাদী হয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, তরুণদের জন্য কিছু করবেন। তাদের নিয়ে আপোসহীনতার সংগ্রাম করতে মাঠে নামবেন আপনি। কিন্তু পরক্ষণেই ভাবলাম, আপনি আসলে তরুণদের কি শেখাবেন? তরুণদের আপনি নতুন কি শোনাবেন? নারীবাদ আর পুরুষ বিরোধিতার আড়ালে শুধুই কি নাস্তিক্যবাদ আর মিথ্যে যৌন হয়রানির অভিযোগ? নাকি আপনার বিচিত্র যৌন সম্ভোগের সুড়সুড়ি জাগানো গল্প?

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে আমরা বহুকাল আগে থেকেই চিনি। তিনি তো বিতর্কহীনভাবে ঠিকই লিখে চলেছেন। নাস্তিক্যবাদের আলোচনা কিংবা যৌনতা তো তার উপন্যাসেও রয়েছে। কই তাকে নিয়ে তো বিতর্ক হচ্ছে না? এর কারণ কি? কারণ হলো তিনি কাউকে সরাসরি আক্রমণ করে লিখেননি। তিনি তার লেখায় কাউকে ব্যক্তিগতভাবে আঘাত করেননি। কারো ব্যক্তিগত সম্পর্ক-ব্যক্তিগত আলোচনা রাস্তায় টেনে নামাননি। আর আপনি? সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র তৈরি করে বিতর্কিত হয়েই হেঁটে চলেছেন। কথাসাহিত্যিক অরুন্ধতী রায়ের কথাই যদি বলি। তিনিও তো বিতর্কিত মানুষ, তবে তিনি বিতর্কিত রাষ্ট্র ও প্রশাসনের কাছে। সরকার তার বক্তব্যকে ভয় পায়। জনগণ কিন্তু তাকে ঠিকই ভালবাসে। কারণ, তিনি জনগণের কথাই বারবার বলেছেন। জনগণের পক্ষেই বারবার সাফাই গেয়েছেন। আপনাকে কখনোই তো বিতর্কহীনভাবে জনতার পক্ষে কথা বলতে দেখিনি। সুড়সুড়ি ছাড়া কি আপনি কথাই বলতে পারেন না?

আপনি নাকি বারবার নিগৃহীত হয়েছেন। বারবার যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। তাই এসব যৌন সুড়সুড়ি দেয়া গল্পই বারবার লিখেন!নারীর প্রতি এত দরদ উথলে পড়ে আপনার। কই আপনাকে তো কখনো নারীকল্যাণে কোনো প্রতিষ্ঠান গড়তে দেখিনি? সাজসেবামূলক কাজে আপনি কখনো নেমেছেন---এমন খবর পাইনি। আপনার বয়ান শুধু লেখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, এখনও তাই আছে। আপনার পুঁজি হলো যৌন সম্ভোগের গল্প, ব্যক্তিগত সম্পর্ক আর নাস্তিক্যবাদের নোংরা ব্যবহার।

তসলিমা,
আপনার সব কর্মকান্ডের সাথে দ্বিমত পোষণ করি, ঠিক তা কিন্তু নয়। আমি মুক্তমতে বিশ্বাসী মানুষ। স্পষ্ট ভাষায় কথা বলাটাকেই সমর্থন করি। কিন্তু আপনাকে বুঝতে হবে, যেরকম মুক্তিবুদ্ধির চর্চাকেন্দ্র হিসেবে বাংলার মাটিকে আমরা দেখতে চাই, সেরকমটা এখনও সম্ভব নয়। এখনও মুক্তবুদ্ধিকে সাফ মেনে নেওয়ার মত পরিবেশ-মন মানসিকতা বাঙালির মধ্যে তৈরি হয়নি। সেটা তৈরি হবেই, এনিয়ে আমি যথেষ্ট আশাবাদী। তবে সময় লাগবে। তড়িঘড়ি করে সময়টা পরিবর্তন করতে খাল কেটে কুমির আনার কোনো প্রয়োজন নেই। ব্যক্তিগতভাবে, ধর্মীয় অনুভুতিকে আক্রমণ করে শুধু মানুষের শত্রুই হওয়া যায়, মানুষের ভালবাসা পাওয়া যায় না। নারীজাতির প্রতি যদি সত্যিই আপনার ভালবাসা থাকে, তাহলে এখনই নারীর পাশে এসে দাঁড়ান। আপোসহীনতার গল্প যদি বলেন, স্পষ্টভাবেই সাধারণ মানুষের ভাষায়  কথা বলুন। বাঙালিরা আপনাকে নিশ্চয়ই গ্রহণ করবে। আপনি আবার ফিরে আসবেন মাতৃভূমিতে। আমাদের বিশ্বাস, আপনি বাঙালি নারীর কল্যাণে কাজ করতে পিছপা হবেন না।
ভাল থাকবেন।

সিয়াম সারোয়ার জামিল, কবিও ব্লগার
siam33jamil@gmail.com

সম্পাদনা: জুয়েল মাজহার, কনসালট্যান্ট এডিটর
jewel_mazhar@yahoo.com

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Bookmark and Share
REVE Systems
VISA Center Inc
Holy Hajj BD
RehabHousing.com

শিল্প-সাহিত্য

8877
Kaspersky Lab - Antivirus Software [ Bangladesh ]
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম | এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন

ফোন: +৮৮০ ২ ৮৪০২১৮১, ৮৪০২১৮২ আই.পি. ফোন: +৮৮০-৯৬১২১২০০০০ নিউজ রুম সেল: +৮৮-০১৭২৯০৭৬৯৯৬, ০১৭২৯০৭৬৯৯৯ ফ্যাক্স: +৮৮০ ২ ৮৪০ ২৩৪৬
ইমেইল: news.bn24@gmail.com, editor.banglanews@gmail.com, editor@banglanews24.com    বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম    এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন

বাংলায় লেখা হলে ইউনিকোডে পরিবর্তন করে ইমেইল করুন    কপিরাইট © 2013 সকল স্বত্ব ® সংরক্ষিত    একটি ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেড প্রতিষ্ঠান