 |
গোমড়া মুখে ঈদের অনুষ্ঠান তৈরি করছি। ঈদ অনুষ্ঠানের রেসিপি উচ্ছ্বাস-আনন্দে ভরপুর, আর মনটা সংশয়ে ভরা। ঈদ উৎসবে দর্শকদের আনন্দে মাতিয়ে রাখতে যে আয়োজনের ডালা, সেখানে কতোজন দর্শক উঁকি দেবেন, যারা ঢুঁ মারবেন তারা কতোক্ষণ টেলিভিশনের সঙ্গে থাকবেন? এই সংশয়ে, জমজমাট অনুষ্ঠান তৈরি করেও, মন খুশিতে নেচে উঠছে না। ব্যাপারটা নতুন জামা পরার পরেও শিশুর মুখ ভার করে থাকার মতো। কেউ নতুন জামাটি দেখে সুন্দর না বলা পর্যন্ত শিশুর মুখে হাসি ফোটে না।
আমাদের টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে যারা ঈদের অনুষ্ঠান তৈরি করছেন, তাদেরও পরম চাওয়া দর্শকরা অনুষ্ঠান দেখুক, মুগ্ধ হোক। এবার ঈদে সংবাদভিত্তিক চ্যানেল ছাড়া বাকি ১৯টি চ্যানেলে ৩শ’র বেশি নাটক আর টেলিফিল্ম দেখানো হবে। চ্যানেলগুলো ঈদ আয়োজনকে সাতদিন পর্যন্ত বিস্তৃত করেছে। নাটকের বাইরেও সব চ্যানেলেই গান, ট্রাভেল শো, গান, তারকা আড্ডাসহ রকমারি অনুষ্ঠান রয়েছে। সংবাদ চ্যানেলগুলোও তৈরি হচ্ছে নিজেদের মতো করে ঈদ-আয়োজন নিয়ে। এই মুহূর্তে চ্যানেলগুলোতে ঐসব অনুষ্ঠানের ‘প্রমো’ প্রচার হচ্ছে। এসব দেখে আশ্বস্ত হওয়া যায় যে, ঈদ-বিনোদনের অফুরন্ত খোরাক থাকছে চ্যানেলগুলোতে। কিন্তু কোনোভাবেই নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না, দর্শকরা ঐ খোরাকে ঈদের ছুটিতে বুঁদ হয়ে রইবেন কিনা।
সংশয় জাগে এজন্য যে, স্বাভাবিক সময়েও দেশের মোট দর্শকের প্রায় ৭০ ভাগ ভারতীয়সহ বিদেশি চ্যানেল দেখেন। দেশীয় চ্যানেলের দর্শক মাত্র ৩০ ভাগ। রাজধানীসহ সারাদেশে ক্যাবল অপারেটররা ৭৫টি বিদেশি চ্যানেল গ্রাহকদের দেখাচ্ছেন। এরমধ্যে ৫০টিই ভারতীয় চ্যানেল। পে-চ্যানেল প্রায় ৪০টি। অগ্রিম টাকা দিয়ে যেগুলো দেখানোর স্বত্ব কিনে আনা হচ্ছে।
ক্যাবল অপারেটরদের সংগঠন ‘কোয়াব’ বলছে তারা বিভিন্ন সময়ে বিদেশি চ্যানেল, বিশেষ করে ভারতীয় চ্যানেলের বিষয়ে গ্রাহকদের নিরুৎসাহিত করার উদ্যোগ নিয়েছিল। কয়েকটি চ্যানেল সরবরাহ করা বন্ধ করেও দিয়েছিল। সরকারিভাবেও ২০০৮ সালে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল কয়েকটি বিদেশি চ্যানেলের উপর। কিন্তু দর্শকদের চাপের মুখে ও ব্যবসায়িক কারণে ক্যাবল অপারেটররা ঐ অবস্থান থেকে সরে আসতে যেমন বাধ্য হয়েছিল, তেমনি সরকারও অজ্ঞাত কারণে বাধ্য হয়েছিল ঐ নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে। তারপর দেশে একে একে চ্যানেলের সংখ্যা বাড়লেও কমেনি বিদেশি চ্যানেলের প্রতাপ।
নারী দর্শকরা সনি, জি-বাংলা, স্টার প্লাস, স্টার জলসা’য় নেশাতুর হয়ে আছেন। আর শিশুরা আসক্ত হয়ে পড়েছে হিন্দি কার্টুন চ্যানেলগুলোতে। এগুলো থেকে তারা সহজেই হিন্দি ভাষার দূরপাঠ নিচ্ছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশের চ্যানেল ভারতে দেখানোর নানা উদ্যোগের কথা শোনা গেলেও, বাস্তবতা হচ্ছে ভারত সরকার এ বিষয়ে অনুমতি দেওয়ার আইনটিকে আরো কঠোর করেছে। ২০ লাখ রুপির লাইসেন্স ফি’র পাশাপাশি যুক্ত করেছে বাৎসরিক কর। সেই সঙ্গে যে চ্যানেলটি ওখানে সম্প্রচার করা হবে, সেখানে ঐ চ্যানেলের অফিস থাকতে হবে।
আইনি কাঁটাতার ও কঠিন শর্ত পূরণ করে বাংলাদেশের টেলিভিশন চ্যানেলগুলো ভারত পাড়ি দেবে এটা দূরাশা। কিন্তু নিজ আকাশে কেন দেশীয় চ্যানেলগুলোকে ভারতীয় চ্যানেলের সঙ্গে কঠিন লড়াইয়ে পড়তে হবে?
প্রশ্ন উঠতে পারে, মুক্ত আকাশে খোলা জানালায় ভারতীয় চ্যানেলকে রুখবো কেন? উত্তর হলো, আপত্তিটা সকল ভারতীয় এবং বিদেশি চ্যানেলের বেলাতে নয়। যে চ্যানেলগুলো আমাদের প্রাত্যহিকতায়, সংস্কৃতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে সেই চ্যানেলগুলো সম্প্রচার করাতেই আপত্তি তোলা হচ্ছে। যে চ্যানেলগুলোর নাটক, ধারাবাহিকের মূল বক্তব্য প্রতিহিংসা, পরকিয়া, পারিবারিক বিরোধ, তা আমাদের জীবনে কোন ইতিবাচকতা যোগ করে না।
উপরন্তু ঐসব চ্যানেলের মাধ্যমে বাংলাদেশের বাজার দখলে নিচ্ছে ভারতীয় পোশাক। এখন ঢাকা-চট্টগ্রামে ভারতীয় পোশাক ও অলংকারের এক্সক্লুসিভ শোরুম খোলা হচ্ছে একের পর এক। আর সেই শোরুমগুলোর ফিতা কেটে যাচ্ছেন ভারতীয় নায়ক-নায়িকারাই।
এটা স্যাটেলাইট চ্যানেলের মাধ্যমে এক ধরনের বাণিজ্যিক আগ্রাসন। সংস্কৃতি যে ঐ আগ্রাসনের বাইরে আছে, তা বলা যাবে না। আমাদের নাটক নির্মাণের ঢঙ, অভিনেতা-অভিনেত্রীদের পোশাক, রিয়েলিটি শো তৈরিতে সেই প্রভাব লক্ষ্যণীয়। স্থানীয় নির্মাতাদের সস্তা যুক্তি, ভারতীয় চ্যানেলে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া দর্শকদের চোখ ফেরাতেই এই কৌশল। কিন্তু এই কৌশলে তারা সফল হননি, তার প্রমাণ হলো দর্শকরা এখনো ভারতীয় চ্যানেলমুখিই আছেন।
সাধারণভাবে বলা হয়, সকাল, দুপুর, রাত, তিন বেলাতেই দর্শকরা বিদেশি চ্যানেলের সঙ্গে থাকেন। তবে সন্ধ্যার পর বিদেশি চ্যানেলে উপর একেবারে হুমড়ি খেয়ে পড়েন দর্শক। অর্থাৎ আমাদের এখানে যখন পিক-আওয়ার, তখন ভারতীয় চ্যানেলগুলোতে শুরু হয় ধারাবাহিক এবং রিয়েলিটি শো। এই সময়টায় দেশীয় চ্যানেলগুলোতে যতো ভাল অনুষ্ঠানই দেওয়া হোক না কেন, দর্শকদের একটি বড় অংশ সেদিকে ফিরেও তাকান না। তাই অনুষ্ঠান নিমার্তারা তাদের প্রচার সময়টা নিয়ে একটু বিব্রত থাকেন। পরখ করে দেখে নেন তার অনুষ্ঠানটি যখন প্রচার হবে, সেই সময়টায় ভারতীয় চ্যানেলগুলোতে জনপ্রিয় (!) কোন অনুষ্ঠানটি রয়েছে। সেই হিসেব করে তিনি তার অনুষ্ঠানের দর্শকের একটা ধারণা তৈরি করে নিতে পারেন।
এবার ঈদের অনুষ্ঠান সাজাতে গিয়েও নির্মাতাদের ভাবনায় থাকার কথা ছিল যে, তার অনুষ্ঠানটি যখন প্রচার হবে, তখন স্বদেশি অন্য কোন চ্যানেলে কি অনুষ্ঠান রয়েছে? কিন্তু যেহেতু দর্শকরাই দেশবিমুখ তখন সেই ভাবনার সুযোগ কোথায়?। দর্শক যদি স্বদেশি চ্যানেলমুখি থাকতেন তাহলে দেশীয় নির্মাতাদের মেধার প্রতিযোগিতা আরো তীব্র হতো। আর যাদের নিয়ে অনুষ্ঠান তৈরি হচ্ছে তাদের অনেকেও কিন্তু অংশ নেয়ার বিষয়ে সায় দেবার আগে অনুষ্ঠানটি কখন প্রচার হবে, তা জেনে নিচ্ছেন। কেউ কেউ বলেও বসছেন- ঐ সময়ে যদি অন এয়ার দাও তখন দেখবে কে? সবাইতো তখন সিরিয়াল দেখবে! একান্ত পেশাদার অভিনেতা-অভিনেত্রীর বাইরে বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিক ও ব্যবসায়ীরা একথা বলছেন। অর্থাৎ ভারতীয়সহ বিদেশি চ্যানেলের এই আগ্রাসনটি এখন প্রকাশ্য। অপেক্ষা তাই প্রতিরোধের।
প্রতিরোধের সেই উদ্যোগটি নেবার দায়িত্বটি সরকারেরই। ক্যাবল অপারেটরা ব্যবসায়িক কারণেই ওদিকে পা মাড়াবেন না আর। তাই এই মূহুর্তে দর্শকদের উপরই ভরসা রাখতে চাই প্রথম। বিশ্বাস করি, দর্শকরা সাড়া দিলে প্রতিরোধ বা বর্জন যাই বলি না কেন, সেই উদ্যোগে সহজেই সাফল্য মিলবে। তাই দর্শকদের প্রতি অনুরোধ, এবারের ঈদ বিনোদনে দেশীয় চ্যানেলের সঙ্গেই থাকুন। করুণা করে হলেও থাকুন। দিব্যি দিয়ে বলতে পারি, আপনার বিনোদনে এক ফোঁটাও কমতি পড়বে না।
তুষার আবদুল্লাহ, বার্তাপ্রধান, সময় টেলিভিশন
বাংলাদেশ সময় ১৯১৮ ঘণ্টা, আগস্ট ১১, ২০১২
এমএমকে; সম্পাদনা:জুয়েল মাজহার, কনসালট্যান্ট এডিটর jewel_mazhar@yahoo.com