 |
| ছবি: বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম |
শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দান থেকে: প্রচণ্ড বৃষ্টি ও কাদা মাড়িয়ে উপমহাদেশের বৃহত্তম ঈদের জামাত কিশোরগঞ্জ শহরের ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে অনুষ্ঠিত হয়েছে। এবারে ১৮৫তম জামাতে প্রায় ৩ লাখ মুসল্লি অংশ নেন।
এ ঈদ জামাত উপলক্ষে শহরের ঈদমেলা বসেছে। বিভিন্নস্থানে নির্মিত করা হয়েছে তোরণ, রাস্তার দু’পাশে শোভা পাচ্ছে রঙ বে-রঙের পতাকা ও ব্যানার। জামাতের আগে ও পরে গোটা শহর পরিণত হয় জনসমুদ্রে।
বৃহত্তম এ ঈদের জামাতে ইমামতি করেন ইসলাহুল মুসলেমিন পরিষদের চেয়ারম্যান ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম এর মহাসচিব মাওলানা মো. ফরিদ উদ্দিন মাসউদ। সকাল ১০টায় ঈদের জামাত শুরু হলেও সকাল ৯টার মধ্যে বিশাল ঈদগাহ ময়দানে তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না। মুসল্লিরা দলে দলে ঈদগাহে আসার সময় লাব্বায়িক আল্লাহুমা লাব্বায়িক ধ্বনিতে চারদিক মুখরিত করে তোলেন।
এ মাঠের রেওয়াজ অনুযায়ী জামাত শুরুর ৫ মিনিট, ৩ মিনিট ও ১ মিনিট আগে নামাজের প্রস্তুতি হিসেবে শটগানের গুলি ছোড়া হয়। নির্ধারিত সময়ের আগেই মাঠ ও তার আশপাশের রাস্তা, ফুটপাত, বাড়ি ঘরের আঙিনায় মুসল্লিরা জামাতে শরীক হন। জামাত শুরু হওয়ার পরও মুসল্লিরা দলে দলে আসতে থাকেন। স্থান সংকুলান না হওয়ায় অসংখ্য মুসল্লি পাশের আজিম উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে জামাতে নামাজ আদায় করেন।
শোলাকিয়া ঈদগাহে পবিত্র ঈদুল ফিতরের জামাত আদায়ের জন্য দেশের দূর দূরান্তের মুসল্লিরা ঈদের ২/৩ দিন আগে ঈদগাহের মিম্বর, আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি, বিভিন্ন মসজিদ ছাড়াও আবাসিক হোটেলে গিয়ে ওঠেন। অনেকে ঈদের দিন ভোরে ট্রেন, বাসসহ বিভিন্ন যানবাহনে ঈদগাহে আসেন।
ঈদগাহে আসা মুসল্লিদের সুবিধার্থে শোলাকিয়া স্পেশাল দু’টি ট্রেন ময়মনসিংহ থেকে কিশোরগঞ্জ এবং ভৈরব থেকে কিশোরগঞ্জের উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসে।
লন্ডন প্রবাসী আলহাজ মাওলানা আবু বক্কর সিদ্দিক (৪৫)। ৪৮ বছর ধরে এ মাঠে নামাজ পড়তে আসেন ময়মনসিংহের কাশোর গ্রামের মো. আখতার হোসেন মন্ডল (১১১), গাজীপুর জেলার ভবানীপুর থেকে নামাজ পড়তে এসেছিলেন ইসমাইল হোসেন (৫০)।
এছাড়াও এসেছেন রাজশাহী জেলার পবা থেকে মো. নূর হোসেন নুরু (৫২), ময়মনসিংহ জেলার ভালুকা থেকে রুস্তম আলী (৮১), বগুড়া জেলা থেকে ইছহাক উদ্দিন (৫৫)।
এ ধরণের অসংখ্য লোকের খোঁজ পাওয়া যায় যারা দীর্ঘদিন ধরে এখানে নামাজ পড়তে আসছেন। তাদের একটাই বিশ্বাস, পরপর ৩ বার এ মাঠে নামাজ আদায় করলে হজের সওয়াব পাওয়া যায়। জনশ্রুতি আছে, এ মাঠে পরপর ৩টি ঈদের জামাত আদায় করলে এক কবুল হজের সওয়াব পাওয়া যায়।
যেকারণে শোলাকিয়া মাঠ গরীবের মক্কা নামে পরিচিত। এবারের জামাতে বৃহত্তম ময়মনসিংহের ৬টি জেলা ছাড়াও ঢাকা, গাজীপুর, বগুড়া, রাজশাহী, সিলেট, হবিগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলা থেকে অসংখ্য মুসল্লি শোলাকিয়া মাঠে নামাজ আদায় করেছেন।
নামাজ আদায় করেন জেলা প্রশাসনের উর্ধতন কর্মকর্তা, বিভিন্ন মিডিয়ার সাংবাদিক, এলাকার বিশিষ্ট ব্যক্তিরা এ জামাতে অংশ নেন।
নারীদের জন্য পৃথক একটি জামাত অনুষ্ঠিত হয় কিশোরগঞ্জ এস.ভি সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে। এতে ইমামতি করেন মাওলানা মোহাম্মদ ছানাউল্লাহ।
শোলাকিয়া সম্পর্কে জনশ্রুতি আছে , শোলাকিয়া ঈদগাহের প্রথম বড় জামাতে সোয়া লাখ মুসল্লি অংশ নিয়েছিলেন। মতান্তরে, মুঘল আমলে এখানে অবস্থিত পরগনার রাজস্ব পরিমাণ ছিল সোয়া লাখ টাকা। উচ্চারণের বিবর্তনে সোয়ালাখিয়া থেকে বর্তমান শোলাকিয়া নামে ঈদগাহটি পরিচিতি লাভ করে।
১৯৫০ সাল থেকে ওয়াকফ দলিলমূলে হয়বতনগর জমিদার বাড়ির দেওয়ান মান্নান দাদ খান থেকে বংশানুক্রমিকভাবে বড় ছেলেরা শোলাকিয়া ঈদগাহের মুতাওয়াল্লির দায়িত্ব পালন করে আসছেন। বর্তমানে দেওয়ান ফাত্তাহ দাদ খান মঈন মুতাওয়াল্লি ও দেওয়ান মো. রউফ দাদ খান নায়েবে মুতাওয়াল্লির দায়িত্ব পালন করে চলেছেন।
১৯২৮ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম বড় জামাতের ইমামতি করেন শোলাকিয়া সুফি সৈয়দ আহমদ। আন্তর্জাতিক ও বরকতময় ঈদগাহে যুগে যুগে খ্যাতনামা আলেমরা ইমামের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। ২ শতাধিক কাতার সম্বলিত শোলাকিয়া ইদগাহে প্রতি বছর লাখ লাখ মুসল্লির সমাবেশ ঘটে।
ঈদের নামাজ মাঠে পড়া সুন্নতে মোয়াক্কাদহ এবং যে জামাতে মুসল্লি যত বেশি হয়, সওয়াবও তত বেশি হয় এবং গোনাহ মাফ হয়। এ বিশ্বাস থেকেই ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা এ মাঠে নামাজ পড়তে আসেন।
আড়াইশ বছরের পুরানো শোলাকিয়া ঈদগাহ ঐতিহ্যের তুলনায় উন্নয়ন ও সংস্কারের ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে আছে। শোলাকিয়া ঈদগাহকে শোলাকিয়া আন্তর্জাতিক ঈদগাহ নামকরণ ও মুসল্লিদের সুবিধার্থে মাঠের পরিসর বৃদ্ধি এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের দাবি দীর্ঘদিনের।
বিশ্ব মানবতার শান্তি ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে ভাষা সৈনিকসহ যেসব মুক্তিযোদ্ধা জীবন দিয়েছেন সেসব বীর শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ দোয়া করা হয়। এছাড়াও দেশ, জাতির উন্নতি, সমৃদ্ধি ও মুসলিম উম্মাহর সংহতি ও ঐক্য কামনা করে দোয়া করা হয়।
ঈদুল ফিতর উপলক্ষে শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানসহ কিশোরগঞ্জ শহরকে বিশেষভাবে সাজানো করা হয়। রাস্তার দু’পাশে টাঙ্গানো হয় রঙ বে-রঙের পতাকা, কালেমা লেখা ব্যানার ও আলোকসজ্জা করা হয়।
এ ছাড়াও ঈদুল ফিতরের বিশেষ আকর্ষণ শোলাকিয়া ময়দানের সামনে অনুষ্ঠিত ঈদ মেলা। মেলায় ওঠা বিশেষ ধরনের সুন্নতি লাঠি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। প্রিয় নবী হযরত মোহামম্দ (স) এর সুন্নত পালনের উদ্দেশ্যে হাজার হাজার মুসল্লি এ লাঠি কিনে বাড়ি ফিরেছেন।
জামাত আগত দূর দূরান্ত থেকে আসা মুসল্লিদের তৃষ্ণা কমাতে দলমত নির্বিশেষে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী ও এলাকাবাসী মুসল্লিদের মধ্যে বিশুদ্ধ খাবার পানি, শরবত, খুরমা ও মিষ্টি বিতরণ করেছেন।
বাংলাদেশ সময় : ১৩৪১ ঘণ্টা, আগস্ট ২০, ২০১২
সম্পাদনা : প্রভাষ চৌধুরী, নিউজরুম এডিটর, / সুকুমার সরকার, কো-অর্ডিনেশন এডিটর
kumar.sarkerbd@gmail.com