 |
দিনাজপুর: ১৯৭১ সালের ২৭ মে দিনাজপুরের নবাবগঞ্জে ৩ জন আদিবাসী নারীকে হত্যা করে রাজাকার-আলবদরেরা।
কিন্তু স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও এসব রাজাকার-আলবদরের এখনও বিচার হয়নি।
কিন্তু মে মাস আসলে ওই এলাকার মানুষজনের মনে ওই নারকীয় হত্যার দৃশ্য ভেসে ওঠে।
স্বাধীনতা যুদ্ধের আগে এবং পরে এ অঞ্চলে শালবাগানের রমরমা এলাকা হিসেবে পরিচিতি ছিল।
শালবাগানের পাশাপাশি আম-জাম, কাঁঠালসহ নানা ধরনের গাছের সমারোহে বনজঙ্গলে পরিপূর্ণ ছিল চকনওদা, হরিনানপুর এবং দাড়িয়াসহ ৮নং মামদুপুর ইউনিয়নটি। চকনওদা গ্রামের পাশেই আদিবাসী পাড়া।
এ পাড়াটিতে প্রায় ২০/২৫টি পরিবারের শতাধিক লোকজনের বসবাস ছিল।
চকনওদা গ্রামের আদিবাসীর পাড়ার ৬০ বছরের বৃদ্ধ জাদু হাসদা বাংলানিউজকে জানান, ১৯৭১ সালের ২৭ মে দুপুর ১ টায় এই গ্রামে হঠাৎ করে নবাবগঞ্জ থানার পাশের ৭নং দাউদপুর ইউনিয়নের হায়াতপুর গ্রামের তৎকালীন স্বাধীনতা বিরোধী পাকি বাহিনীর দোসর হিসেবে পরিচিত এমাজউদ্দিন, আকরাম হোসেন, ইসলাম ও নঈম উদ্দীনের সমন্বয়ে ২০/২৫ জনের একটি অস্ত্রধারী নরপশু রাজাকার-আলবদর বাহিনী চকনওদা গ্রামের আদিবাসী পাড়ায় হামলা চালায়।
এ সময় ওইসব পরিবারের পুরুষেরা বাইরে ছিলেন। ফলে, রাজাকার-আলবদর বাহিনীদের লুটপাটে নারীরা বাধা দিলে তারা নারীদের রাইফেলের বাট, লাঠি, ছোরা দিয়ে অমানুষিক শারীরিক নির্যাতন করে।
শারীরিক নির্যাতনের ফলে অন্ধ আদিবাসী ম-ল হাসদার স্ত্রী গৃহবধু ফুলমনি ঘটনাস্থলেই মারা যান।
এরপর আদিবাসী চরণ হাসদার মেয়ে, তরুণী জয়মনি ও ফুলমনি হাসদাকে তারা জোর করে ধরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে আলবদর বাহিনীর সঙ্গে তাদের টানাহেঁচড়া হয়।
টানাহেঁচড়া করার পরও আদিবাসী তরুণীরা তাদের সঙ্গে যেতে না চাইলে আলবদর বাহিনীর সদস্যরা তাদের জবাই করে।
এঘটনা আদিবাসী পরিবারের সদস্যরা দেখতে পেয়ে সকলেই হতবাক হয়ে যান।
এদিকে, রাজাকার-আলবদররা যাওয়ার সময় বলেছিল- ‘হত্যা করা ৩ জন মহিলার লাশ পড়ে থাকবে। কেউ দাফন করতে পারবে না।’
আদিবাসী পল্লীতে লাশ ৩টি ২৪ ঘণ্টা রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকার পর স্থানীয় কিছু লোকজনের সাহায্যে আদিবাসীরা লাশগুলো মাটি চাপা দেন।
এঘটনার পর আদিবাসী পল্লীর ২০/২৫টি পরিবার জীবন বাঁচাতে পর্যায়ক্রমে দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যায়।
ঘটনার পর রাজাকার ও আলবদর বাহিনীর সদস্য এমাজ, আকরাম, ইসলাম ও নঈমউদ্দীন বাহিনী স্বাধীনতা যুদ্ধ চলার সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীদের সাহায্যে ওই এলাকায় ব্যাপক তাণ্ডব ও লুটপাট করে।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আদিবাসীরা আবার চকনওদা গ্রামের আদিবাসী পল্লীতে ফিরে আসলেও তাদের ঘরবাড়ি এবং মালামাল আর ফেরত পাননি।
যুদ্ধ শেষে ওই সব রাজাকার-আলবদর বাহিনীর সদস্যরা কিছুদিন পালিয়ে থাকলেও পরে তাদের আবার আত্মপ্রকাশ ঘটে এবং পর্যায়ক্রমে তারা ওই এলাকার জামায়াতে ইসলামের নেতৃত্ব দিতে শুরু করে।
আদিবাসী হত্যাকারী হিসেবে এলাকায় এখনও পরিচিত।
ইসলাম কিছুদিন আগে মারা গেছে এবং নঈম উদ্দীন গত ৪ বছর ধরে বাকশক্তি হারিয়ে শয্যাশায়ী অবস্থায় বিছানায় পড়ে রয়েছে।
তবে এমাজ উদ্দিন ও আকরাম ওই এলাকার লেবাজধারী জামায়াত নেতা হিসেবে এখনও চলাফেরা করছে।
আদিবাসী পল্লীর সদস্য এবং সে সময়ের হত্যাযজ্ঞের সাক্ষী লগেন হাসদা (৬০), জাদু হাসদা (৬২) ও চরণ হাসদ-র (৬৫) অভিযোগ, এতগুলো লোক হত্যা করেও ওই রাজাকার-আলবদররা দিব্বি চলাফেরা করছে।
তাদের ক্ষোভ, কোনো সরকারই ক্ষমতায় থেকে রাজকার-আলবদরদের কোনো বিচার করেনি।
বাংলাদেশ সময়: ২২০২ ঘণ্টা, মে ২৬, ২০১২
সম্পাদনা: আশিস বিশ্বাস, অ্যাসিস্ট্যান্ট আউটপুট এডিটর