 |
এইডস বর্তমান বিশ্বের এক মহাব্যাধি যা মানব সমাজের জন্য তৈরি করেছে এক বিপর্যয়। ১৯৮১ সালে প্রথম আমেরিকার লস এঞ্জেলেসে এইডস আক্রান্ত লোক শনাক্ত করা হয়। ১৯৮২-’৮৪ সালের মধ্যে এইডস ছড়িয়ে পড়ে পশ্চিম ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়ায়। ১৯৮৩ সালে ভাইরাস শনাক্ত করার জন্য টেস্ট চালু হয়। এশিয়া অঞ্চলে ১৯৮৪ সালে ভারতে এইচআইভি সংক্রামিত লোক শনাক্ত করা হয়।
বাংলাদেশে ১৯৮৯ সালে প্রথম এইচআইভি সংক্রমিত ব্যক্তি সনাক্ত করা হয়। সংখ্যা হিসেবে বাংলাদেশে এইচআইভি সংক্রমণের মাত্রা অনেক কম, কিন্তু সংক্রমণের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ আশংকাজনকভাবে বিরাজমান। তাই এ দেশে যে কোনো সময় এইচআইভি/এইডস মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা প্রবল।
বিশেষ করে দেশের জনসংখার এক বিরাট ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ আমাদের যুবসমাজ এইডস এর ভয়াবহতার শিকার হওয়ার অধিক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
এইচআইভি এর পূর্ণ অভিব্যক্তি হচ্ছে: Human Immuno-deficency Virus. অর্থাৎ এটি এমন এক প্রকার জীবাণু যা মানব দেহে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার অভাব ঘটায়। ভাইরাসটি মানবদেহে রোগ প্রতিরোধকারী কোষসমূহকে ধীরে ধীরে ধ্বংস করে ফেলে।
ফলে মানুষ তার শরীরের স্বাভাবিক রোধ প্রতিরোধ ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে এবং বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে এক পর্যায়ে মারা যায়। এইডস এর পূর্ণ অভিব্যক্তি হচ্ছে: Acquired Immune Deficiency Syndrome। এইচআইভি সংক্রমণের পরিণতি হচ্ছে এইডস।
কেউ এইডস আক্রান্ত হলে তার শরীরে প্রতিরোধমূলক কোনো ব্যবস্থা কার্যকর হয় না। ফলে সেই ব্যক্তি বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ে এবং তার শরীরে নানারকম রোগের লক্ষণ দেখা দেয়। এই অবস্থাকেই এইডস বলা হয়।
এইচআইভি আক্রান্ত হবার পর বহু বছর পর্যন্ত মানুষের শরীরে এর লক্ষণগুলো প্রকাশ নাও পেতে পারে। সাধারণত এইচআইভি সংক্রামণের পর বিভিন্ন প্রকার রোগের লক্ষণ প্রকাশ পেতে ৭-১০ বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে এই সময়ের ব্যবধান ১৫ বছর পর্যন্ত হতে পারে।
আমাদের দেশে এইচআইভি/এইডস আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা কম হওয়ার পেছনে ধর্মীয়, সামাজিক ও পারিবারক অনুশাসন প্রধান ভূমিকা রেখেছে। তবে বিশ্বায়নের যুগে বাংলাদেশও ঝুঁকিপূর্ণ। যে সব কারণে বাংলাদেশে এইচআইভি সংক্রমণের ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ সেগুলো হলো: ধমীয় অনুশাসন মেনে না চলা; বয়ঃসন্ধিকালীন শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন সর্ম্পকে সঠিক জ্ঞান, সর্তকতা ও সচেতনতা না থাকা; এইচআইভি থেকে নিজেকে রক্ষা করার উপায় এবং প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কে অজ্ঞতা ও অসচেতনতা; দলবদ্ধভাবে একই সুঁই-সিরিঞ্জ ব্যবহারের মাধ্যমে নেশা করা।
এইচআইভি/এইডস মহামারি আকারে ছড়ানোর আশঙ্কাগুলোর মধ্যে আরো রয়েছে পার্শ্ববতী দেশসমূহে এইচআইভি/এইডস এর ব্যাপক উপস্থিতি এবং এসকল দেশের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য, মেলামেশা ইত্যাদি কারণে মানুষের ব্যাপক যাতায়াত, অনেক ক্ষেত্রে সন্তানদের নৈতিক চরিত্র গঠনে পিতামাতার করণীয় বুঝতে না পারা, ঝুঁকিপূর্ণ যৌন আচরণে নিরাপত্তা ব্যবস্থা না নেওয়া।
বিশ্বে প্রতিদিন ১৪ হাজারেরও বেশি মানুষ এইচআইভি/এইডস দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছে যার অর্ধেকের বয়স ১৫ থেকে ২৪ বছর। শিশুরাও এই মরণ ব্যাধি দ্বারা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এইডস রোগে মাতা বা পিতার মৃত্যু হলে সেই পরিবারে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিশুরা। সেখানে শিশুরা মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়।
পরিবারের কেউ এ রোগে আক্রান্ত হলে ঐ পরিবারের শিশুরা স্কুলে যেতে পারে না। অন্য শিশুরা তার সাথে খেলাধুলা করে না, এমনকি কথা পর্যন্ত বলে না। ফলে স্কুলের দরজা ঐ শিশুর জন্য বন্ধ হয়ে যায়। বাধ্য হয়ে অনেকে পড়া ছেড়ে রোজগারে নেমে যায়।
সারাবিশ্বে ইতোমধ্যে অসংখ্য শিশু এইচআইভি/এইডস-এ আক্রান্ত হয়েছে এবং এদের মধ্যে এক কোটিরও বেশি এখন এতিম। এইচআইভি আক্রান্ত মায়ের সন্তানের মধ্যে এই ভাইরাস থাকার যথেষ্ট শংকা থেকে যায়। আবার আক্রান্ত মায়ের দুধ পানে মা থেকে সন্তানের মধ্যে এইচআইভি সংক্রামণ হতে পারে।
গর্ভে থাকার সময়, প্রসবের সময় অথবা প্রসবের পরে মায়ের বুকের দুধের মাধ্যমে, হাসপাতালে সংক্রমিত রক্ত গ্রহণ অথবা সংক্রমিত সুঁই-সিরিঞ্জ ব্যবহারের মাধ্যমে শিশু এ ভাইরাস আক্রান্ত হতে পারে।পাচারের শিকার হওয়া শিশুদের নানাভাবে এইচআইভি সংক্রমণের অধিক ঝুঁকির মধ্যে পড়তে হয়।
এইচআইভি পজিটিভ নারী গর্ভবতী হলে সঙ্গে সঙ্গে অভিজ্ঞ চিকিৎসক ও কাউন্সেলরের পরামর্শ নিতে হবে। গর্ভকালে নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট কিছু ঔষধ গ্রহণ করলে (ARV) গর্ভস্থ শিশুর শরীরে এইচআইভি জীবাণু সংক্রমণের ঝুঁকি অনেকটা কমে যায়। অভিজ্ঞ চিকিৎসক এ বিষয়ে সঠিক পরামর্শ দিতে পারেন। এরূপ মায়ের প্রসবকালে অবশ্যই হাসপাতালে ভর্তি হয়ে অভিজ্ঞ চিকিৎসকের সেবা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
আমাদের দেশে এইডস এর ঝুঁকি যেন প্রকোপে পরিণত না হয়, সেই উদ্দেশ্যেকে সামনে রেখে এর বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরিতে অগ্রসর হতে হবে। এইডস প্রতিরোধে যা করতে হবে, তার মধ্যে রয়েছে এডভোকেসি ও সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি এবং শিক্ষার মাধ্যমে এর প্রতিরোধে দক্ষতা বৃদ্ধি করা। এইডস থেকে বাঁচার জন্য এইডস সম্পর্কে সকলকেই জানতে হবে।
বাংলাদেশ ডিক্লারেশন অব কমিটমেন্ট অন এইচআইভি/এইডস এর প্রতি পূর্ণ সমর্থন দিয়েছে। এইডস মহামারি মোকাবিলার মূল বিষয়গুলো এই ডিক্লারেশনে চিহ্নিত করা হয়েছে। মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল এর নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনেও বাংলাদেশ অঙ্গীকারবদ্ধ। এই অঙ্গীকার বাস্তবায়নে এইচআইভি/এইডস প্রতিরোধের জন্য জনসচেতনতা সৃষ্টির বিষয়টিকে উন্নয়ন কৌশলে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।
সরকারের জাতীয় এইডস/এসটিডি প্রোগ্রাম (NASP) দেশব্যাপী এইচআইভি/এইডস কর্মসূচি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। সরকারের পক্ষ থেকে উচ্চপর্যায়ে নেতৃত্ব প্রদান ও কর্মসূচি বাস্তবায়নের সুযোগ সৃষ্টি করার লক্ষ্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীনে এটি প্রতিষ্ঠা করা হয়।
নীতি নির্ধারণ, তথ্য সরবরাহ ও সমন্বয় এবং কর্মসূচি বাস্তবায়নে ঘঅঝচ সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। তবে তা আরও উন্নত ও কার্যকর করা প্রয়োজন। এইচআইভি/এইডস আক্রান্তদের প্রতি অপবাদ ও বৈষম্য নিরসনে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রতিবছর ১লা ডিসেম্বর বিশ্ব এইডস দিবস পালন করা হচেছ।
বাংলাদেশে এইচআইভি/এইডস পরিস্থিতি পর্যালোচনা, ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ, মহামারির জন্য ঝুঁকিসমূহ এবং এ পর্যন্ত বাস্তবায়িত কার্যক্রমগুলো বিশ্লেষণ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে পাঁচটি কর্মসূচিভিত্তিক উদ্দেশ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এগুলো হচেছ: অগ্রধিকারভিত্তিক জনগোষ্ঠীকে সেবা ও সহায়তা প্রদান, বাংলাদেশে এইচআইভি সংক্রমণের ঝুঁকি প্রতিরোধ, স্বাস্থ্য সেবা ব্যবস্থায় নিরাপদ ও নিরাপত্তামূলক কর্মচর্র্চা বৃদ্ধি, এইচআইভি/এইডস নিয়ে বসবাসকারীদের জন্য সেবা ও সহায়তা প্রদান এবং এইচআইভি/এইডস মহামারির প্রভাব কমিয়ে আনা।
এইচআইভি/এইডস নিয়ে বসবাসকারী ও তাদের পরিবারের প্রতি বৈষম্যহীন নীতি গ্রহণ এবং তাদের সকল মৌলিক অধিকার ও স্বাধিকার সংরক্ষণের বিষয়টি জাতীয় এইডস ও এসটিডি বিষয়ক নীতিমালার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এই নীতিমালা অনুসরণ করলে মহামারির নেতিবাচক প্রভাব হ্রাস করা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশকে এইডস মহামারি থেকে মুক্ত রাখতে সকল স্তরের মানুষের সক্রিয় সহযোগিতা ও সরকারের সময়োচিত কর্মসূচি একান্ত প্রয়োজন। আর প্রয়োজন এইডস প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট সকলের দৃঢ় প্রত্যয় ও অঙ্গীকার।
* এটি একটি পিআইডি ফিচার
বাংলাদেশ সময়: ১৬৫৫ ঘণ্টা, নভেম্বর ২৯, ২০১২
এনএস/