 |
বেনাপোল (যশোর): দেশের সর্ববৃহৎ স্থলবন্দর বেনাপোলে আমদানি পণ্যের শুল্ককর ফাঁকিসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে গত ২ দিনে দু’দফায় ২১টি সিঅ্যান্ডএফ (ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরোয়ার্ডিং)এজেন্টের লাইসেন্স সাময়িক স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে।
কাস্টমসের অতিরিক্ত কমিশনার কাজী মোস্তাফিজুর রহমান স্বাক্ষরিত একটি চিঠি বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বেনাপোল কাস্টমস হাউসে এসে পৌঁছালে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ ৫টি লাইসেন্স সাময়িক স্থগিত করেন। এর আগে ৩১ জুলাই বেনাপোল কাস্টমস হাউসের ১৬টি লাইসেন্স সাময়িক স্থগিত করা হয়।
সাময়িক স্থগিত হওয়া সিঅ্যান্ডএফ লাইসেন্সগুলি হচ্ছে, মেসার্স সানি এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স সানি ট্রান্স লিমিটেড, মেসার্স কে.এস.কে. সিন্ডিকেট প্রা. লি. ও মেসার্স এম.এস. এন্টারপ্রাইজ, ওভারসিস ট্রের্ডিং করপোরেশন, বকুল অ্যান্ড ব্রাদার্স, আহাদ এন্টারপ্রাইজ, সুলতান এন্টারপ্রাইজ, তানভির এন্টারপ্রাইজ, শাহাজান এন্টারপ্রাইজ, হুদা ইন্টারন্যাশনাল, আযাদ কিয়াফোর্ড এজেন্সি, ইসলাম অ্যান্ড ব্রাদার্স, শফিক অ্যান্ড ব্রাদার্স প্রা. লি., মৌসুমী অ্যান্ড সন্স, বিএম করপোরেশন, মাস্টার করপোরেশন, আল মামুন এন্টারপ্রাইজ ও আল মদিনা ট্রেডিং।
এছাড়া প্রগেসিভ ইন্টারন্যাশনাল নামে একটি সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠানের মালিক তার লাইসেন্সটি স্থগিতের আবেদন জানালে ওই লাইসেন্সটিও সাময়িক স্থগিত করা হয়।
এদিকে, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যবসায়ী বাংলানিউজকে জানান, রাজস্ব ফাঁকি, ঘুষ বাণিজ্য ও জালিয়াতির মাধ্যমে কাস্টমস ও বন্দর কর্মকর্তারা দুর্নীতিবাজ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে রাতারাতি কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন।
তিনি জানান, দুর্নীতিবাজ কাস্টমস, বন্দর ও সিঅ্যান্ডএফ ব্যবসায়ীদের কালো থাবায় এভাবে প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সরকার।
এর ফলে, এবার বেনাপোল বন্দরে রাজস্ব আয়ের টার্গেট পূরণ হয়নি। ঘাটতি ছিল ১৯৪ কোটি টাকা।
তিনি আরও জানান, গত অর্থ বছরে বেনাপোল স্থলবন্দরে শুল্ক ফাঁকির অভিযোগে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৫ শতাধিক পণ্য চালান আটক করা হয়।
কিন্তু আটকের পর এসব পণ্য চালানের অধিকাংশই কাস্টমস কর্মকর্তারা গোপন সমঝোতায় ও প্রভাবশালীদের হুমকি-ধামকির কারণে ছেড়ে দেন।
মাঝে-মধ্যে দু-একটি চালান আটক হলেও লোক দেখানো তদন্তে কাস্টমস ও বন্দর কর্মকর্তারা বিপুল পরিমাণে অর্থ বাণিজ্য করে দুর্নীতিবাজ ব্যবসায়ীদের বাঁচিয়ে দেন।
এছাড়াও কালো তালিকার প্রভাবশালী অনেক ব্যবসায়ী রয়েছেন ধরা-ছোঁয়ার বাইরে।
এবিষয়ে বেনাপোল কাস্টমস গোয়েন্দা শাখার কর্মকর্তা আবু তৈহিদ হাওলাদার বাংলানিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘বেনাপোল বন্দরে আমদানি বাণিজ্যের ওপর কড়াকড়ি আরোপ করায় এ বন্দরের অনেক ব্যবসায়ী এখন ভোমরা ও সোনামসজিদ বন্দর দিয়ে আমদানি করছেন। সেখানে আমদানি বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বেশি দুর্নীতি হচ্ছে। অপরাধের প্রমাণপত্র নষ্ট করতে আমদানি পণ্যের সহস্রাধিক ফাইল সাতক্ষীরার ভোমরা কাস্টমস অফিস থেকে গায়েব হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
উল্লেখ্য, সরকার প্রতি বছর শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে বেনাপোল বন্দরের অবকাঠামো উন্নয়ন করছে। রাজস্ব ফাঁকি রোধে ইতোপূর্বে সরকারের কয়েকজন প্রভাবশালী মন্ত্রী বেনাপোল বন্দর এলাকা একাধিকবার পরিদর্শনে আসেন।
এসময় কাস্টমস ও বন্দর কর্মকর্তাদের বৈঠকে সতর্ক করে দেন। কিন্তু এত কিছুর পরও এখানে দুর্নীতি কমেনি বরং দিন দিন বেড়েই চলেছে।
এদিকে, বেনাপোল কাস্টমস পরিসংখ্যান শাখা সূত্রে জানা যায়, চলতি ২০১২-১৩ অর্থবছরে বেনাপোল বন্দরে রাজস্ব আদায়ের টার্গেট নির্ধারণ করা হয়েছে ২,৬২০ কোটি টাকা।
বেনাপোল কাস্টমস হাউসের যুগ্মকমিশনার ফাইজুর রহমান বাংলানিউজকে জানান, বিভিন্ন অনিয়ম ও রাজস্ব ফাঁকির সঙ্গে সর্ম্পৃক্ত থাকায় এসব লাইসেন্সগুলো সাময়িক স্থগিত করা হয়েছে। আরও বেশ কয়েকটি লাইসেন্স স্থগিতের প্রক্রিয়াধীন।
বেনাপোল বন্দরের অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে জানতে চাইলে কাস্টমস হাউসের কমিশার মাসুদ সাদিক বাংলানিউজকে জানান, বেনাপোল বন্দরের অনিয়ম ও দুর্নীতি নতুন কিছু নয়।
তবে আগের চেয়ে অনিয়ম কমেছে বলে দাবি করেন তিনি।
বাংলাদেশ সময়: ১৩৪৬, আগস্ট ০৩, ২০১২
সম্পাদনা: আশিস বিশ্বাস, অ্যাসিস্ট্যান্ট আউটপুট এডিটর