১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২০, শুক্রবার মে ২৪, ২০১৩ ১২:০৩ পিএম BDST banglanew24
20 Jun 2012   10:59:59 PM   Wednesday BdST
E-mail this

জন্মদিনে কালিদাসবন্দনা


নির্মলেন্দু গুণ
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
জন্মদিনে কালিদাসবন্দনা

আমার পিতৃদেব তাঁর সন্তানদের জন্মদিন-সংক্রান্ত সকল প্রাসঙ্গিক তথ্য পঞ্জিকার পাতায় লিপিবদ্ধ করে রাখতেন। বছর শেষে, বাংলা নববর্ষের শুরুতেই নতুন পঞ্জিকা কেনা হতো। তখন নতুন পঞ্জিকার পাতায় পুরনো পঞ্জিকায় লিপিবদ্ধ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো পুনর্লিখিত হতো। আমি খুব ছোটোবেলা থেকেই বাবার এই কাজের সঙ্গে পরিচিত ছিলাম। পঞ্জিকার পেছনে তিনি প্রতিদিন প্রচুর সময় ব্যয় করতেন।

সেই পঞ্জিকাগুলো আমার বাবার টেবিলের একপাশে জমাখরচের খাতা ও তাঁর নিত্যপাঠ্য শ্রীমদভাগবদ গীতার সঙ্গে সযতনে সাজানো থাকতো। বেশি পুরনো হয়ে যাওয়া পঞ্জিকাগুলো চলে যেতো ঘরের ভিতরের একটি বড় ট্রাঙ্কের ভিতরে। ঐ রহস্যময় ট্রাঙ্কের চাবিটি তিনি সর্বদা তাঁর নিজের কাছেই রাখতেন।

ছোটোবেলা থেকেই অন্য ভাইবোনদের তুলনায় আমার ভিতরে কৌতূহল জিনিসটা খুবই প্রবল ছিলো। আমি ছিলাম এবং মনে হয় এখনও সেরকম কৌতূহলতাড়িতই রয়ে গেছি। সেই অনতিক্রম্য কৌতূহলের টানেই আমি লুকিয়ে লুকিয়ে পঞ্জিকার পাতায়, বিভিন্ন তারিখের পাশে লিখে রাখা বাবার ছোট্ট হরফে লেখা নোট পাঠ করে দুটো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানতে পারি।

goonপ্রথম তথ্য : ১৩৫২ বঙ্গাব্দে, আষাঢ় মাসের সপ্তম দিবসে, বৃহস্পতিবার সকাল সাত ঘটিকায় আমার জন্ম। আমার জন্মসকালে যে খুব বৃষ্টি হচ্ছিল, সেই কথাও তিনি পঞ্জিকাপত্রে লিখে রাখতে ভোলেননি। তিথি-নক্ষত্রের কথাও সেখানে লেখা ছিলো, আমি ভুলে গেছি। আমার জন্মদিন ভবিষ্যতে কখনও প্রকাশবিবেচ্য বিষয় হতে পারে, এটা তো আর আমি ভাবিনি। মোটাদাগে যা আমার মনে ছিলো, তাই দিয়েই পরবর্তীকালে ‘আমার ছেলেবেলা’ লিখে আমি তা পাঠকের ওপর চাপিয়ে দিয়েছিলাম। ঠিকুজি লেখকদের জন্য খুব দরকারী হলেও, পাঠকদের জন্য স্বস্তির বিষয় এই যে, সেখানে তিথি-নক্ষত্রের কোনো বালাই ছিলো না।   
 
দ্বিতীয় তথ্য : আমি যাকে আমার একমাত্র বড় ভাই (দাদামণি) বলে জানতাম, তিনি ছাড়াও আমার আরও একজন বড়-ভাই ছিলেন। মাত্র তিন বছর বয়সে ম্যালেরিয়া জ্বরে ভুগে মারা যান। মনে হয় ছোটর মৃত্যু বলে, সে মৃতের স্বীকৃতি পায়নি। তার নাম ছিলো কালিদাস। কালিদাস-প্রসঙ্গটি আমি মনের ভিতরে অনেকদিন লুকিয়ে রেখেছিলাম। কাউকে বলিনি। এতো ছোটো একজন মানুষের পক্ষে এতো বড় একটা ঘটনা মনের ভিতরে চেপে রাখতে পারাটা কম কঠিন ব্যাপার ছিলো না। মনে হয়, দুঃখকে গোপন করার শিক্ষাটা অমি পেয়েছিলাম সেই থেকেই। আমার মায়ের অকাল মৃত্যুর কারণে, তিনি যখন মারা যান, তখন আমার বয়স চার) আমাদের জীবনে আসা নতুন মায়ের কাছ থেকে যে পুরনো তথ্য জানা যাবে না, সেটাও আমি কিছুটা বুঝে গিয়েছিলাম।

পরে একদিন উঠানে রৌদ্রে শুকাতে দেয়া কিছু অপরিচিত ছোটো-আকৃতির জামা-জুতা আমার চোখে পড়ে। আমি সেগুলির খুব কাছে গিয়ে কৌতূহল নিয়ে দেখি। হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে করে কিন্তু সাহস হয় না। তখন বেদনার্ত কণ্ঠে বাবা কালিদাসের অকালমৃত্যুর তথ্যটি আমার কাছে প্রকাশ করেন। কালিদাসের কথা বলতে গিয়ে তাঁর চোখ জলে ভিজে যায়। আমারও খুব কান্না পায়। বাবা লালরঙের মোটা কাপড়ের তৈরি কালিদাসের ফেলে-যাওয়া জুতোজোড়া আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলেন, ধরবি?

আমি বাবার হাত থেকে ঐ জুতাজোড়া গ্রহণ করি। ঐ জুতোজোড়াকে নিজের জুতো মনে করে আমি আমার পায়ের দিকে তাকাই। কালিদাসের জুতো-জোড়ার উপর অধিকার ছাড়তে আমার একটুও ইচ্ছে করে না। আমি বুকের মধ্যে ঐ জুতোজোড়া চেপে ধরি।    

আমার কাণ্ড দেখে বাবা হাসেন, বলেন, ‘তুই তো অনেক বড় হয়ে গেছিস, তোর পায়ে এগুলো লাগবো না। দে ট্রাঙ্কের মধ্যে রেখে দেই।’

পরে কালিদাসের জামা-জুতো এবং খেলনাগুলো কীভাবে, কখন কাশবনের কোমল-কঠোর মাটির ভিতরে বিলীন হয়েছে, তার কোনো স্মৃতি আমার মনে নেই। যতদূর মনে পড়ে, আমি শুধু একবারই ওগুলো দেখেছিলাম। মহাকবি কালিদাসের নামে তিনি তাঁর দ্বিতীয় পুত্রের নাম কেন রেখেছিলেন, সে-প্রশ্ন তাঁকে আমার কখনও করা হয়নি। তবে সুখের বিষয় এই যে, ১৯৮৪ সালের শেষ দিকে তিনি যখন লোকান্তরিত হন, ততদিনে আমার কবিত্বশক্তির ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পেরেছেন বলেই তিনি আমাকে একদিন কথাচ্ছলে জানিয়েছিলেন। ময়মনসিংহের ধোপাখোলায় লেখা ‘স্বাধীনতা, এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো’ কবিতার প্রথম শ্রোতা ছিলেন তিনি। তিনি বলেছিলেন, ‘তোর এই কবিতাটি বাংলাদেশের ইতিহাসের অংশ হয়ে উঠবে।’  

মাঝে-মাঝে মনে হয়, কী জানি কালিদাস বেঁচে থাকলে আমাকে হয়তো কষ্ট করে কবি হতে হতো না। হয়তো আমার পিতার কালিদাস-স্বপ্ন আমার মধ্য দিয়েই কিছুটা পূর্ণতা লাভ করেছে। ‘কালিদাস তো নামেই আছেন, আমিই আছি বেঁচে’-এই রবীন্দ্রকাব্য, মনে হয় আমার ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের চেয়েও বেশি সত্য।
সবাইকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাই।

কামরাঙ্গীর চর
৫ আষাঢ় ১৪১৯ / ১৯ জুন ২০১২

বাংলাদেশ সময় ০০০০, জুন ২১, ২০১২
সম্পাদনা : ফেরদৌস মাহমুদ, শিল্প-সাহিত্য সম্পাদক; জুয়েল মাজহার, কনসালট্যান্ট এডিটর
jewel_mazhar@yahoo.com

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Bookmark and Share
REVE Systems
VISA Center Inc
Holy Hajj BD
RehabHousing.com

শিল্প-সাহিত্য

8877
Kaspersky Lab - Antivirus Software [ Bangladesh ]
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম | এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন

ফোন: +৮৮০ ২ ৮৪০২১৮১, ৮৪০২১৮২ আই.পি. ফোন: +৮৮০-৯৬১২১২০০০০ নিউজ রুম সেল: +৮৮-০১৭২৯০৭৬৯৯৬, ০১৭২৯০৭৬৯৯৯ ফ্যাক্স: +৮৮০ ২ ৮৪০ ২৩৪৬
ইমেইল: news.bn24@gmail.com, editor.banglanews@gmail.com, editor@banglanews24.com    বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম    এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন

বাংলায় লেখা হলে ইউনিকোডে পরিবর্তন করে ইমেইল করুন    কপিরাইট © 2013 সকল স্বত্ব ® সংরক্ষিত    একটি ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেড প্রতিষ্ঠান