 |
| ছবি : সুমন্ত চক্রবর্তী /বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম |
সংস্কৃতি বিকাশ কেন্দ্র, ঢাকা থেকে: বাংলা ভাষার তরুণ কবিদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয় ‘কবিতাতর্ক: কবিতা কেন’। ১৬ জুন শনিবার সন্ধ্যা ছয়টার পর রাজধানীর পরীবাগের সংস্কৃতি বিকাশ কেন্দ্রে এ আলোচনা বা তর্ক শুরু হয়।
এতে অংশ নেন কবি মুজিব মেহদী, সাখাওয়াত টিপু, শামীম রেজা, সোহেল হাসান গালিব, পিয়াস মজিদ, তানজিল রিমন, গোলাম নবী সজল, দীপক রায়, ইকতিজা আহসান, কুয়াশা, সরকার সজিব, পলাশ, জহির মুহাম্মদ, সৈকত মল্লিক, প্রবীর সাহা, আল-জাহিদ, মুফাখখারুল মুন, রণজিত মজুমদার, সোমেশ্বর অলি, শুভ্রনীল সাগর, সুদীপ্ত সাইদ, লাইজু প্রমুখ।
এছাড়া পরে এসে যোগ দিয়েছেন কবি রঞ্জন শুভ্র, মাহবুব কবির, মনজুরুল আহসান ওয়ালী, শোয়েব সর্বনাম প্রমুখ।
বাংলানিউজের পক্ষ থেকে অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ফেরদৌস মাহমুদ। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন বাংলানিউজের হেড অব নিউজ মাহমুদ মেনন, ওয়েব ইন চার্জ আবিদুর রহমান রাসেল ও এমজে ফেরদৌস।
কবিতাতর্কের শুরুতে আলোচনা করেন কবি মুজিব মেহদী। এরপর একে একে সব কবি তুমুল আলোচনায় মেতে ওঠেন। কবিতাদের সেই আলোচনার বিশেষ অংশ তুলে ধরা হলো।
মুজিব মেহদী: কবিতা একটি ভাষিক শিল্পকর্ম। মানুষের একাকিত্ব উদযাপনের জন্য কবিতা প্রয়োজন। কবিতা মাত্রই সামাজিক। সব কবিতা সবার জন্য নয়। কবিতার তাৎপর্যভেদে একেকটি কবিতা একেকজনের জন্য। আত্মসত্তার অনুসন্ধান করে কবিতা। জাতীয় চেতনাও নির্মাণ করছে কবিতা। কবিতা বিপ্লবের ভাষিক প্রেরণা দিয়েছে, সমাজের অপ্রাপ্তি-বঞ্চনার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর শক্তি দিয়েছে। কবিতা হচ্ছে মানসপ্রান্তরে সব্জি চাষের মতো। কবিতা গেরিলা কায়দায় সমাজে প্রভাব ফেলে। আর এসব কারণেই কোনো ধরনের বৈষয়িক সাফল্য না পেলেও কবিতা বেঁচে থাকে, নিষ্ঠ কবির শব্দ সাধন চলে।
সোহেল হাসান গালিব: একাকিত্ব বিনাসী একটি বিষয় থাকে কবিতায়। কিন্তু প্রাচীন কবিতার সঙ্গে আধুনিক কবিতার মূল পার্থক্য এর মূলেই। যখন কৃত্যের সঙ্গে শিল্পের বিচ্ছেদ ঘটে তখনই প্রশ্ন উঠতে শুরু করে কবিতা কী কাজে আসছে? একটি কবিতায় শিল্পশর্ত কতটুকু পূরণ করছে তা কবিতার কাঠামো দিয়ে বিচার করে। কিন্তু বর্তমান সময়ে কবিতার সামাজিক তাৎপর্য একটি দূরবর্তী বিষয় হয়ে গেছে। প্রত্যক্ষভাবে সামাজিক চেতনা খুঁজে পাওয়া যায় না। কিন্তু কবিতা ব্যক্তি চেতনার সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে কাজ করে। আর ব্যক্তি সমাজের অংশ তাই কবিতার সামাজিক তাৎপর্য থেকেই যায়।
শামীম রেজা: সব কবিই ভাষার ভেতর অক্সিজেন দেওয়ার কাজটি করে থাকেন। ভাষাকে টিকিয়ে রাখেন কবি। তাই কবিতা প্রয়োজন। ‘বাবুরনামা’য় আমরা দেখি, সম্রাট বাবর পর্যন্ত পদ্মাপাড়ের এ ভাষাকে তাচ্ছিল্য করেছেন। কিন্তু বাংলার বিকাশকে শেষ পর্যন্ত কেউ রুদ্ধ করতে পারেনি। কবিই এ ভাষাকে টিকিয়ে রেখেছেন।
সাখাওয়াত টিপু: প্রচলিত ভাষার রূপ অনুসন্ধান ব্যাকরণের কাজ। সাহিত্যের ভাষা ও শাসনকাঠামোর ভাষা এক নয়। হুমায়ূন আহমেদকে তার উপন্যাসের ভাষা পরিবর্তন করতে বলা হয়েছে। মানুষ পরমাত্মার সঙ্গে যোগাযোগ করতে চায়। সেজন্যই কবিতায় আশ্রয় নেয়।
রঞ্জন শুভ্র: কবিতার কোনো উপযোগিতা নেই। মানুষের জীবনে এর কোনো প্রয়োজন নেই। তাই আমি এ আলোচনায় যেতে চাই না। উত্তরও দিতে পারছি না। তবে আমার মনে হয়, কবিতার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার খাতিরেই কবিতার প্রয়োজন রয়েছে। এখানে কবিতার উপযোগিতা।
মাহবুব কবির: কবিতা লিখি আমার জন্য। আমার জন্য লেখাটাই অন্যের জন্য হয়ে যায়। কবিতা একটি শিল্প মাধ্যম। আর এ শিল্প পশুত্বকে মনুষ্যত্বে পরিণত করেছে। সেটা হতে আগুন জ্বালিয়ে দলবদ্ধভাবে পুঁথি পাঠ করা থেকে শুরু করে এখন কবিতা এ পর্যায়ে এসেছে। আমাদের কবিতায় রাজনৈতিক দলের কথা নেই, উন্নয়ন সংস্থার কাজে লাগছে না, তাই হয়ত প্রশ্ন আসছে কবিতা কেন?
সাখাওয়াত টিপু: ভাষা টিকে থাকে উৎপাদন কাঠামোর ভিত্তিতে। এটা যখন কোনো ভাষায় ব্যাহত হয় তখন সে ভাষার মৃত্যু ঘটে। মানুষের মুখের ভাষাটাই আদি ভাষা। আদি ভাষা বা মুখের ভাষার সঙ্গে লেখার ভাষার একটা পার্থক্য থাকেই। তবে এটা খুব সামান্য। কিন্তু আদি রূপের ভাষা হতে লিখিত ভাষার দূরত্ব বেশি হলে সে ভাষার মৃত্যু ঘটে। আবার আইন করেও ভাষার মৃত্যু ঘটানো সম্ভব। ধর্মীয় শাসনের সংস্কৃত ভাষা তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। রাষ্ট্রীয় বা চলতি ভাষার কাজ রূপ অনুসন্ধান। সাহিত্যের ভাষা ও শাসনকাঠামোর ভাষা এক নয়। মানুষ ভাষার মাধ্যমে আত্মার সঙ্গে পরমাত্মার যোগাযোগ ঘটাতে চায়। কারণ অভাবই ভাষার জন্ম দেয়। সেজন্যই কবিতা বা শিল্পের নানা মাধ্যমকে মানুষ ভাষায় আশ্রয় করে।
রণজিত মজুমদার: আমার মনে হয়, ‘কবিতা কেন’ এই প্রশ্নটা আরও বৃহত পরিসরে ভাবা উচিৎ। কারণ আলোচনা চলে যাচ্ছে সাহিত্যের অন্যান্য শাখার মধ্যে কবিতার প্রয়োজনীয়তা কী এমন একটি প্রসঙ্গের ভেতর। কিন্তু আসলে ‘কবিতা কেন’ প্রশ্নটি কি স্রেফ সেটাই বোঝাচ্ছে। আমার মনে হয়, সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি ও আপামর মানুষের প্রয়োজনেই কবিতার উদ্ভব। আমাদের কেউ একজন বললেন, কবিতা ভাষাকে অক্সিজেন দেয়, কিন্তু কবিতাকেই অক্সিজেন দেওয়া প্রয়োজন। কবিতার অবস্থা ভালো নয়। আর ভাষার চর্চা করে মধ্যবিত্ত শ্রেণি। এছাড়া ভাষা কর্মের সঙ্গে সম্পর্কিত। কর্মের ধরনের পরিবর্তনের সঙ্গে ভাষাও পরিবর্তিত হয়। কবিরা ভাষার পরিবর্তনের সঙ্গে তেমন ভূমিকা রাখে না।
কুয়াশা: চর্চাপদ থেকে মধ্যযুগ পেরিয়ে কবিতা বর্তমান পর্যায়ে এসেছে। রাজনীতি সমাজ প্রেম ভালোবাসা দ্রোহসহ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে কবিতা অবদান রেখেছে। আর কবিতায় প্রতিনিয়ত শব্দের চাষ হয়। যা সাহিত্যের অন্যান্য শাখায় দেখা যায় না। আজকার প্রকাশ মাধ্যম সীমিত হওয়ার কারণে ফেসবুক-ব্লগ বড় অবদান রাখে। অপরিচিত লেখকদের জন্য পত্রিকায় সুযোগ-জায়গা কম থাকে। ফেসবুক-ব্লগে কবিতা-পাঠকদের মধ্যে নিজেকে পরিচিত করা যায়।
রণজিত মজুমদার: ভাষা টিকে থাকে সাধারণ মানুষের তৎপরতার মধ্য দিয়ে। প্রতিদিন যে ভাষা পরিবর্তিত হচ্ছে মানুষের মুখে মুখে, সেটাই ভাষায় উঠে আসে কবিতায়। কবি বা কবিতা ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা। একজন কবি তার কর্মে জাতির ভবিষ্যৎ বর্ণনা করতে পারেন। আর বর্তমান সাহিত্যের মধ্যে ভবিষ্যতের প্রকাশ দুর্বল। কবিতারও দায়িত্ব আছে।
পিয়াস মজিদ: প্রথাগত সকল বৃত্ত ছিন্ন করে বের হতে হবে। আবার ফিরে আসতেও হবে। ব্লগ-ফেসবুক নতুন একটি দরজা। এটাকে মেনে নিতে হবে। শুধু কাগজে ছাপার ভাষা সাহিত্য হবে, তা ভাবার কারণ নেই। ফেসবুক-ব্লগের ভাষাও আন্দোলনের ক্রিয়া হিসেবে কাজ করে। স্বৈরাচারী মনোবৃত্তি না রেখে এই নতুন দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে হবে।
গোলাম নবী সজল: কবিতার প্রয়োজনীয়তা আছে, ছিল ও থাকবে। কবিতার অর্থ খুঁজে নিতে হয়। কবি তার কবিতা যেভাবে লিখেছেন তার চেয়েও ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারেন পাঠক। সাধারণের মধ্যে কবিতা চর্চা থাকে না বলেই মনে হয় কবিতার জনপ্রিয়তা নেই। তবে কোনো না কোনো সময় কবিতার প্রভাব মানুষের কাছে যায়। সাধারণ মানুষ সেটা গ্রহণ করে।
শোয়েব সর্বনাম: ‘কবিতা কেন’ এমন প্রশ্নের উত্তর আসলে কোনো কবিই দিতে চান না। কারণ গোপনে সবাই সিদ্ধান্ত নিয়ে রাখেন কেন তিনি কবিতা লিখছেন। কবি বুদ্ধিজীবী হতে পারেন আবার নাও পারেন। তবে বুদ্ধিজীবী হওয়ার জন্য কবিতা সহায়ক।
তানজিল রিমন: কাউকে উদ্দেশ্য করে কবিতা লিখি না। সামনে ঘটে যাওয়া ঘটনাটা সহজভাবে প্রকাশ না করে কবিতার মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়, আরও সুচারুভাবে।
শুভ্রনীল সাগর: আমি কবিতা লিখি। আর এর মাধ্যমে মস্তিষ্কের চেতনা আর প্রবাহকে আমি আঁকতে চাই মাত্র।
হিজল জোবায়ের: কবিতার ব্যাপ্তি শুধু মানুষের মধ্যে আবদ্ধ নয়। আমাদের আলোচনায় কবিতার উপযোগিতা কয়েকটি জায়গায় বেঁধে ফেলা হয়েছে। এটা ঠিক নয়। কবিতার ব্যাপ্তি বহুদূর বিস্তৃত। অপরাপার বিমূর্ত মাধ্যমের মতো বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে কবিতাকে বিবেচনা করা উচিত।
সুদীপ্ত সাইদ: জগতটা যেন দরজাবদ্ধ দোতলা বাড়ি। তার তালা খোলার চাবি হচ্ছে কবিতা। কবিরা ওপরের অবস্থান থেকে সমাজের নানা সমস্যাকে দেখতে পান। সেগুলোই তার কবিতায় প্রকাশ করেন।
বাংলাদেশ সময়: ১৮২৪ ঘণ্টা, জুন, ২০১২
সম্পাদনা : ফেরদৌস মাহমুদ, শিল্প-সাহিত্য সম্পাদক