পুরোনো দুটো খবর: এক. আওয়ামী লীগ সরকারের অন্যতম প্রকল্প পদ্মাসেতুর অর্থায়নে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে সরকার সহযোগিতা করছে না জানিয়ে ওয়ার্ল্ডব্যাংক প্রকল্পটিতে অর্থায়নের ঋণচুক্তি বাতিল করেছে। দুই. প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদে ঘোষণা দিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে, ওয়ার্ল্ডব্যাংক ও অন্য উন্নয়ন সহযোগীদের আর অনুরোধ নয়, বরং দেশীয় অর্থায়নে পদ্মাসেতু প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে তার সরকার।
আর নতুন খবরটা হচ্ছে: বুধবার অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত জানিয়েছেন, ঋণচুক্তি পুনর্বিবেচনা করতে ওয়ার্ল্ডব্যাংকসহ অন্য উন্নয়ন সহযোগীদের আনুষ্ঠানিক অনুরোধপত্র লিখেছে শেখ হাসিনার সরকার। অর্থাৎ দেশীয় অর্থায়ন নয়, বরং উন্নয়ন সহযোগীদের ঋণেই সরকার সেতুটি করতে চায়। (অবশ্য পরদিন বৃহস্পতিবার অর্থমন্ত্রী ওয়ার্ল্ডব্যাংকের কাছে চিঠি দেওয়ার কথাটা সাংবাদিকদের কাছে অস্বীকার করেছেন।)।
ঋণচুক্তি বাতিলের আগে দুর্নীতি তদন্তে ওয়ার্ল্ডব্যাংকের দুটো প্রস্তাব সরকারের জন্য ‘অসম্মানজনক’ বলে উল্লেখ করে মেনে নেন নি প্রধানমন্ত্রী; এখন ওয়ার্ল্ডব্যাংক’র পুরানো শর্ত মেনে প্রথমত, সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন পদত্যাগ করেছেন আর সংশ্লিষ্ট সচিব তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত স্বেচ্ছায় ছুটিতে গেছেন এবং দ্বিতীয়ত, দুর্নীতি দমন কমিশন এই তদন্তকালে ওয়ার্ল্ডব্যাংকের একটি পর্ষদের কাছ থেকে উপদেশ নেবে বলেও সরকার রাজি হয়েছে।
তো, এই পুরনো আর নতুন খবরের মাঝে তৈরি হওয়া আরেকটি খবর খুব দ্রুতই হারিয়ে যাবে। তাই এখনই সে বিষয়ে কিছু আলাপ সেরে রাখা জরুরি।
খবরটি হচ্ছে, ওয়ার্ল্ডব্যাংক ঋণচুক্তিটি বাতিলের পরে প্রধানমন্ত্রী যখন দেশীয় অর্থায়নে সেতুটি করার ‘পরিকল্পনা’ জানালেন সংসদকে- তার পরপরই একদল অর্থনীতিবিদ মনে করছেন নিজেদের অর্থায়নে পদ্মাসেতুর বাস্তবায়ন সম্ভব এবং এটি অর্থনীতির জন্য মঙ্গলজনক। এই মনে করার খবরটি তারা জানিয়েছেনও জাতিকে। অনেকে তো বলেছেন যে দেশীয় অর্থায়নে চারটি পর্যন্ত পদ্মাসেতু করা সম্ভব। হয়তো সম্ভব ছিল। কিন্তু বলছি; ‘ছিল’। এখন আর নেই। স্বয়ং সরকারই আর চায় না।
তবুও এই বিষয়টি একটু তলিয়ে দেখা জরুরি।পদ্মা সেতু বাংলাদেশের এযাবৎকালের সবচেয়ে বড় প্রকল্প। এ সেতু নির্মাণে প্রাথমিকভাবে ব্যয় হিসেব করা হয়েছে ২৫ হাজার কোটি টাকা। প্রস্তাবিত এ প্রকল্পের ৮৫ থেকে ৯০ ভাগই ব্যয় হবে বৈদেশিক মুদ্রায়। বৈদেশিক মুদ্রা আসার কথা ওয়ার্ল্ডব্যাংক থেকে ১২০ কোটি ডলার, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক- এডিবির কাছ থেকে ৬০ কোটি ডলার, জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা-জাইকার কাছ থেকে ৪১ কোটি ৫০ লাখ ডলার এবং ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংক-আইডিবির কাছ থেকে ১৪ কোটি ডলার। বাকি টাকা দেশের অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে যোগান দেওয়া হবে। দেখা যাচ্ছে যে, পদ্মাসেতু প্রকল্পের অর্থের বেশিরভাগই হবে ঋণ থেকে পাওয়া।
কিন্তু ওয়ার্ল্ডব্যাংক’র ঋণ বাতিলের পর অনেকেই বলছেন শুধু বেশিরভাগ নয়, পুরোটাই দেশীয় অর্থে করা সম্ভব।
যেমন গত ১৮ জুলাই একটি জাতীয় দৈনিকে দেখলাম বুয়েটের অধ্যাপক মোহাম্মদ কায়কোবাদ ‘দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়ন ও পদ্মা সেতু’ শীর্ষক এক প্রবন্ধে লিখেছেন; ‘‘আমরাযদি বিশ্বব্যাংককে বলি দেশে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠার জন্য কিছু ধার দিতে, তা তারা দেবে কি?’’
বাস্তবতা হলো, বর্তমানে বিশ্বব্যাংক ও এডিবির সাহায্যে ক্ষুদ্রশিল্প প্রতিষ্ঠার জন্য প্রকল্প আছে এবং চলছে।
বিনিয়োগের প্রকৃতি সম্পর্কে ধারণায় গলদ এবং দ্বিতীয়ত দেশি এবং বিদেশি অর্থায়নের বাস্তব ও দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ও ফল সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণার অভাব এ মন্তব্যে স্পষ্ট। তো এতো প্রতিষ্ঠিত কলামিস্টরা যখন বিনিয়োগের এই মৌলিক ভিত্তি সম্পর্কে বে-ওয়াকিবহাল তখন আমরা তাকাতে পারি অর্থনীতিবিদদের দিকে। কারণ অনুমিতি অনুসারে ধরে নেওয়া যায় যে, অর্থনীতিবিদরা একটি প্রকল্পের কস্ট-বেনিফিট পর্যালোচনা সুনির্দিষ্ট নিয়ম মেনে করতে পারেন।
কিন্তু হতাশ হতে হয় যখন দেখা যায় এই জায়গাতেও সুচিন্তিত পর্যালোচনার অভাব রয়েছে। ২৪ জুলাই’র সেই একই দৈনিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড ফরাশউদ্দীনের পদ্মাসেতুর অর্থায়ন নিয়ে মতামত; ‘‘বর্তমান পরিস্থিতিতে এবং অর্থনীতিতে সংযুক্তি, গতি ও দক্ষতা এমনকি সামাজিক ন্যায়বিচারের স্বার্থে দ্রুততম সময়ে পদ্মাসেতুর নির্মাণকাজ শুরু করা জরুরি। নিজস্ব অর্থায়নেই কেবল এটি সম্ভব ও সমীচীন। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ এর জনগণ এবং আবারও তাদের মাথার ঘাম পায়ে ফেলা পরিশ্রমের ফসল বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি নাগরিকদের প্রেরিত রেমিট্যান্সের মাধ্যমে পদ্মাসেতু নির্মাণের উজ্জ্বল সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।’’
এই অর্থনীতিবিদের মতামত অবশ্যই আমাদের একটি সবুজ আবেগী স্বপ্নের দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে দেয় এবং হৃদয়- গহনে একটুকরো জাতীয়তাবাদী চেতনার সঞ্চার করে। কিন্তু কথা হল, আবেগী চেতনা দিয়ে তো আর অবকাঠামো তৈরি সম্ভব নয়। পদ্মাসেতুর মত একটি ২৫ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়নে আমাদের সুক্ষ্ণাতিসূক্ষ্ণরূপে এর স্বল্পমেয়াদী এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রভাবগুলো নিয়ে ভাবতে হবে।
এ অবস্থায় এই প্রবন্ধে কিছু ধারণা নিয়ে কথা বলা দরকার।
প্রথমেই আসি অধ্যাপক মোহাম্মদ কায়কোবাদের প্রস্তাব প্রসঙ্গে। তিনি পদ্মাসেতু প্রকল্প ও একটি কিংবা একাধিক শিল্প প্রতিষ্ঠার প্রকল্পকে এক করে দেখেছেন যা আদতে এক নয়।
সরকার চালানোর খরচ ও দায় কমাতে, অর্থনীতি এখন চলছে বেসরকারি উদ্যোক্তা বিকাশের মধ্য দিয়ে। উৎপাদন প্রক্রিয়ায় সরকারের সরাসরি অংশগ্রহণের নীতি থেকে আমাদের সরকার অনেক আগেই বেরিয়ে এসেছে। এ অবস্থায় সরকারের পক্ষে বড় কোনো শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা নীতিগতভাবেই হবে না। আর বিকল্প হল ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে উদ্যোক্তাশ্রেণীর বিকাশে সহায়তা করা যা জনাব কায়কোবাদ প্রস্তাব করেছেন। বলা যায়, এটি দরকারি প্রস্তাব এবং এই প্রস্তাবের সাথে একমত না হবার কারণ নেই। ধরে নিলাম, দক্ষিণবঙ্গে বড় বড় কারখানা স্থাপিত হল, ব্যাপক কর্মসংস্থানও হল কিন্তু শিল্পের কাঁচামালের এবং সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ বাজরের জন্য দেশের অন্যান্য প্রান্তের উপর নির্ভরশীল হয়ে রইল। এই অবস্থায় উদ্যোক্তাদের বাজার ও কাঁচামালের সরবরাহের জন্য যে সুবিধা আবশ্যক হয়ে দেখা দেবে তা হল কম সময়ে এবং স্বল্প খরচে যাতে পরিবহন চালিয়ে যাওয়া যায় সে মানের যোগাযোগ ব্যবস্থা যার মধ্যে আবার পড়ে উন্নতমানের রাস্তা, সেতু ইত্যাদি।
এই প্রাথমিক সমস্যাও ধরে নিলাম সমাধান হয়ে গেল। তারপরেও দেখা গেল দক্ষিণবঙ্গের জনগণের ক্রয়ক্ষমতা বেড়ে যাওয়ার পরও কিছু আউটপুট উদ্বৃত্ত রয়ে গেল। সে উদ্বৃত্ত দেশের অন্যান্য প্রান্তের চাহিদা পূরণের জন্য স্বাভাবিকভাবেই শিল্প মালিকেরা পাঠাতে চাইবেন। সেখানেও যখন তার যোগাযোগ ব্যবস্থা শক্তিশালী হবে না তখন সে পাঠাতে পারবে না। অর্থাৎ একজন কারখানামালিক তখনই উৎপাদনে আসবেন যখন তার বাজার, কাঁচামাল সংগ্রহ ও ফাইনাল গুডের বাজারজাতকরণ সহজ ও সাশ্রয়ী হবে। ঠিক এই জায়গায়ই অবকাঠামোর গুরুত্ব। আর এই অবকাঠামো স্বভাবতই রাস্তাঘাট সহ সব ধরণের যোগাযোগ ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ, পানি, শহর পরিকল্পনা (এমনকি প্রশাসনিক স্থাপনার খরচ) যার জন্য কোনো বেসরকারি উদ্যোক্তা এগিয়ে আসতে না চাওয়ারই কথা এবং বেসরকারী বিনিয়োগে অবকাঠামো নির্মাণও বাণিজ্যিক প্রকল্প হিসাবে নিলে এসব সার্ভিসের যে খরচ দাঁড়াবে তা কিনে আর কোন উদ্যোক্তা ব্যবসা করতে পারবে না। অবকাঠামোতে বিনিয়োগের সাথে মূল বিনিয়োগের পার্থক্য বুঝতে আমরা একটা উদাহরণের আশ্রয় নিতে পারি।
ধরা যাক, কোরিয়ার হুন্দাই বাংলাদেশের গাইবান্ধার প্রত্যন্ত এলাকায় কারখানা খুলতে চাচ্ছে। এখন কারখানা সঠিকভাবে চলার জন্য দরকার মূল শহরের সাথে স্বভাবতই রাস্তাঘাট সহ সব ধরণের যোগাযোগ ব্যবস্থা সংযোগ, বিদ্যুৎ, গ্যাস ইত্যাদির সুবিধা। এখন এই সুবিধা যদি কোনো বেসরকারী প্রতিষ্ঠান দেয় তাহলে বেসরকারী প্রতিষ্ঠানকে অবশ্যই তার খরচের চেয়ে বেশি রিটার্ন পেতে হবে। আর বাজার ন্যূনতম সুদ-হার যদি ১২ শতাংশ হয় তাহলে বেসরকারী প্রতিষ্ঠানটির খরচসহ উঠিয়ে নিতে হবে নিদেনপক্ষে ১৭-১৮ শতাংশ। আর যদি হুন্দাইকে অবকাঠামো ব্যবহারের জন্য এই হারে টাকা গুণতে হয় তাহলে হুন্দাই-এর খরচ যে পরিমাণে করবে তাতে হয়ত সে বাজার ধরতে না পেরে বিনিয়োগেই আসবে না। এইখানেই বাজার অর্থনীতির কাঠামোর বিনিয়োগ বাড়াতে জনগণের টাক্স খরচে রাষ্ট্রের শক্তিশালী ভূমিকা। সাধারণত দুনিয়ায়জুড়েই এই অবকাঠামো নির্মাণের কাজটা এভাবেই রাষ্ট্র করে দেয়। রাষ্ট্র নিজ ব্যবস্থাপনায় অবকাঠামো নির্মাণ করে দিলে হুন্দাইয়ের মত অনেক প্রতিষ্ঠানই বিনিয়োগে আগ্রহী হবে। এজন্যই “অবকাঠামো” আর কারখানা-উৎপাদন বলে দুটো ভাগ করতে আমরা দেখি:একটা প্রায় শুন্য নাফা আর অন্যটা থেকে মুনাফা।
এখন আসি ফরাশ উদ্দীন’র মতামত প্রসঙ্গে। তিনি দাবি করেছেন, দেশের জনগণ জেগে উঠেছে। তারা নিজদের শ্রমেই পদ্মাসেতুর অর্থায়ন করবেন। তিনি অবশ্য তার মূল প্রবন্ধে দেখিয়েছেন কিভাবে দেশি উৎস থেকে পুরো অর্থের সংস্থান হবে। তিনি দেশি উৎসের ৪০ শতাংশ বা ১২০ কোটি ডলার অর্থায়নের প্রস্তাব রেখেছেন প্রবাসীদের কাছ থেকে বন্ড ইস্যুর মধ্যমে। আর বাকি ৬০ শতাংশ আসবে বিজিএমইএ বা বিকেএমইএ এর কাছে বন্ড বা ডিবেঞ্চার ইস্যু করে । কয়েকটি ব্যাংকের সিন্ডিকেট করে কিংবা ইনস্যুরেন্স ফান্ডও ব্যবহার করা যেতে পারে বলে তিনি প্রস্তাব দিচ্ছেন।
এই প্রস্তাবটি যদি কোনো রাজনৈতিক নেতার কাছ থেকে আসত তাহলে মেনে নেওয়া যেত। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যংকের একজন সাবেক প্রধান নির্বাহী যখন এইভাবে বলেন তখন দুশ্চিন্তা হওয়ার কারণ আছে বৈকি।
কেন? কারণ বিশ্লেষণে আবার শিল্পায়নের দিকেই যাই। যেখানে শিল্প-মালিক বিনিয়োগে উৎসাহিত হচ্ছে না পর্যাপ্ত অবকাঠামোর অভাবের কারণে। এই সমস্যার সমাধান হিসেবে আনতে পারি এই অবকাঠামো নির্মাণ যার কারণে উদ্যোক্তা উৎপাদন প্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে উদ্বুদ্ধ হতে পারেন। কিন্তু যদি এমন হয় যে কারখানা-মালিক অবকাঠামো পাচ্ছেন ঠিকই কিন্তু তাকে বিনিময়ে অনেক বেশি চার্জ পরিশোধ করতে হচ্ছে, তাহলে তো দেখা যাচ্ছে, অবকাঠামো সে পাচ্ছে ঠিকই কিন্তু হয় সে এটি ব্যবহার করতে পারছে না অথবা তার ব্যয় হচ্ছে এমন যে ব্যবসা উৎপাদন প্রজেক্ট নন-ভায়াবল বা অবাস্তব।
এই অবস্থায় পতিত হওয়া স্বাভাবিক এবং এর জন্যই বড় প্রকল্প এবং অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগকে আলাদা হিসেব-নিকেশের আওতায় এনে কস্ট-বেনিফিট পর্যালোচনা করা হয়। সাধারণ বাজার সুদের_হারে ঋণ নিয়ে সেতু করার সমস্যা হল এইটাই। পাশাপাশি, অভ্যন্তরীণ অর্থায়নের আরো কিছু সমস্যা রয়েছে।
বাংলাদেশের মত মধ্যম শ্রেণীর অর্থনীতিগুলোর বিনিয়োগ-পুঁজির স্বল্পতা প্রকট। তাই দেশি এবং বিদেশি বিনিয়োগ এখানকার অর্থনীতির দ্রুত উন্নয়নে বিরাট ভুমিকা রাখে। যারা দেশের বাইরে আছে তাদের টাকা কিন্তু বিভিন্ন চ্যানেলে দেশে আসছে এবং বিভিন্ন খাতে খরচ হচ্ছে। এখন সরকার অভিবাসী জনগণের কাছ থেকে বন্ড ইস্যু করে বিদেশি মুদ্রা সংগ্রহ করতে পারবে তখনই, যখন তা প্রবাসীদের কাছে তুলনামূলক বেশি লাভজনক বিবেচিত হবে। বর্তমানের রাষ্ট্রের ডলার বন্ড বিক্রি থেকে ২০১০ সালে সংগ্রহ হয়েছিল ৯৭ কোটি ৪২ লাখ টাকা, আর ২০১১ সালে এর চেয়ে সামান্য বেশি। অর্থাৎ মাত্র ১৩ কোটি ডলার। এই তথ্য দেখে কারও উৎসাহিত হবার ন্যূনতম কারণ নেই। প্রাক্তন গভর্নরেরও তা অজানা থাকার কথা না। সাবেক গভর্নরের দ্বিতীয় প্রস্তাব হল কয়েকটি ব্যাংকের কাছ থেকে সিন্ডিকেট করে ধার নেওয়া। এবং তৃতীয় প্রস্তাবটি ছিল ইন্সুরেন্স কোম্পানির কাছ থেকে টাকা নেওয়া। এই দুইটির ক্ষেত্রেই ফলাফল প্রায় এক। তা হল, অর্থনীতির সিংহভাগ পুঁজি সরকারের কাছে চলে আসবে; ব্যবসা বা কারখানা পুঁজি পাবে না। এর প্রত্যক্ষ ফল হল অর্থনীতি কার্যত একটি কৃচ্ছসাধন প্রক্রিয়ার দিকে যাবে, বাজার চাহিদা কমে যাবে ও ফলত অর্থনৈতিক কার্যক্রমে ভাটার টান লাগবে। বেসরকারি উদ্যোক্তার জন্য ব্যাংকে ফান্ডের সরবরাহ কমে যাওয়া ও বিনিয়োগ প্রবাহ স্তিমিত হয়ে পড়া একই কথা।
আর যদি আমাদের অর্থনীতি এই ধাক্কাগুলো সমাধান করতেও পারে তাহলে যে সমস্যাটি প্রকট হয়ে উঠবে তা হল, সরকার বাজার থেকে ফান্ড সংগ্রহ করলে এর সুদও হবে বাজারমূল্যের সমান বা তার চেয়ে কিছু বেশি। তার মানে হল ঋণের দায়, সুদ-খরচা বেশি। তাহলে বেশি খরচার প্রকল্পের বিনিয়োগ ব্যবহার খরচও বেশিই হওয়ার কথা। ব্যবহার খরচ বেশি হওয়ার মানে আবার সেতুর উপর দিয়ে চলাচলকারী যানের পরিবহন খরচ বেশি হওয়া। ঢাকা ও অন্যান্য বাজারে ওই পণ্যের বাজারমুল্য বেশি হওয়া ইত্যাদি। এবং দীর্ঘমেয়াদে যা জাতীয় অর্থনীতিতে বয়ে আনতে পারে দীর্ঘমেয়াদী মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ মন্দা ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থবিরতা।
আর অপরদিকে বিদেশি অর্থায়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল এটা অবকাঠামো হলেও এক অর্থে বিনিয়োগ। দেশের ভেতরকার অর্থনৈতিক কার্যক্রম তো চলবেই তার উপর আবার নতুন করে কয়েক বিলিয়ন ডলার অর্থনীতিতে যুক্ত হবে। আর পরিশোধের ক্ষেত্রেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রয়েছে যথেষ্ট সময় নেওয়ার সুযোগ। অর্থাৎ প্রকল্পটির ঋণ পরিশোধ করার সময়ের মোটামুটি আগেই প্রকল্প থেকে সুবিধা প্রাপ্তি শুরু হয়ে যায়। আর একটা বিষয় যা ‘পাবলিক ফাইন্যান্স’এ জোর দিয়ে পড়ানো হয় তা হল ‘ইন্টারজেনারেশনাল ইক্যুইটি’ বা আন্তঃপ্রাজন্মিক সাম্য। এই তত্ত্বে বিশ্বাস করা হয় যে, বড় বড় দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্প যেহেতু অনেকদিন ধরে চলতে থাকবে তাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও তার দায় কিছুটা বহন করা উচিত। তাছাড়া এই তত্ত্বে আরো স্বীকার করা হয় যে, বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বর্তমান প্রজন্ম থেকে তুলনামূলক ভালো অবস্থায় থাকবে। তাই তার জন্য কিছুটা দায় বহন করা অপেক্ষাকৃত কম কষ্টকর হবে। নিজেদের অর্থে দেশীয় টাকায় যদি পদ্মাসেতুর মত একটি প্রকল্প নেওয়া হয় তাহলে তা বর্তমান প্রজন্মের উপর পুরো দায় তৈরি করবে যা থেকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি বর্তমান প্রজন্মের বৈরিভাব পোষণের প্রবণতা তৈরি হতে পারে; এ থেকে আবার ভিন্নমাত্রার রাজনৈতিক সমস্যার উদয় হওয়া আশংকা থেকেই যায়। তাই দেখা যাচ্ছে, যে কোনো তাত্ত্বিক বিচারে এই অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেশীয় অর্থায়নকে সমর্থন করা যায় না।
এবার আসি ওয়ার্ল্ডব্যাংক প্রসঙ্গে। ওয়ার্ল্ডব্যাংকের কাজই হল দুনিয়াজুড়ে গ্লোবাল-পুঁজির বিস্তারের কাজটি দেখভাল করা, সহায়তা করা। রাষ্ট চালানোর প্রাতিষ্ঠানিক খরচ সংকুচিত করে ব্যক্তিখাতকে তথা ব্যক্তিউদ্যোগকে প্রসারিত করা। ব্যক্তি বিনিয়োগ করবে যখন অবকাঠামো অনুকূল থাকবে। এই অবকাঠামোর কাজটা থেকে সরাসরি সুদ-লাভ উসুল সে করবে না, কারণ বাস্তবতা নেই। আর যদি লাভজনক বিনিয়োগ হিসেবে অবকাঠামো নির্মাণ করা হয় তাহলে অবকাঠামো ব্যবহারের খরচ পড়বে বেশি যা আবার ব্যক্তিউদ্যোগকে বাধাগ্রস্ত করবে। তাই ওয়ার্ল্ডব্যাংক যেহেতু বেসরকারিকরণ ও ব্যক্তিউদ্যোগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে কাজ করে থাকে তাই তার একটা স্বার্থই থাকে উন্নয়নশীল ও অনুন্নত অর্থনীতিগুলোতে শক্তিশালী অবকাঠামো নির্মাণে; যাতে উন্নত দেশের উদ্যোক্তারা সে দেশগুলোতে ভবিষ্যতে বিনিয়োগ নিয়ে যেতে পারে।
তাই উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে বৃহৎ অবকাঠামো নির্মাণ তদারকি করা ওয়ার্ল্ডব্যাংকের কর্মবিধির আওতায় পড়ে এবং প্রতিষ্ঠানটি ১৯৬০ এর দশক থেকেই তা করে আসছে। আর এ কাজের জন্য তাদের রয়েছে সুদমুক্ত বিরাট ফান্ড যা থেকে তারা মিনিমাম অপারেশনাল কস্টের (সার্ভিস চার্জ) বিনিময়ে অবকাঠামো নির্মাণে সহায়তা করে। যেমন বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পদ্মাসেতু প্রকল্পের ঋণের সুদহার ছিল দশমিক ৭৫ শতাংশ, তাও আবার শোধ করা শুরু করতে হবে ১০ বছর পর থেকে পরবর্তী ৪০ বছরে; যেখানে মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক অবস্থার সাথে খাপ খাইয়ে এই অর্থ আরো কম মূল্য বহন করবে। তবে এই কাজে ঋণ গ্রহণকারী দেশটিকে আরো কিছু শর্ত মেনে নিতে হয় যা প্রকারান্তরে বেসরকারি খাতের শক্তিশালীকরণের দিকে ধাবিত করে।
প্রায় দুই লক্ষ কোটি টাকার জাতীয় বাজেটের বাংলাদেশে ২৫ হাজার কোটি টাকায় পদ্মাসেতুর মত প্রকল্প বাস্তবায়ন সত্যি আমাদের অভ্যন্তরীণ সম্পদ দিয়েই করার সময় এখনও আসেনি। বেহুদা আবেগ দিয়ে পদ্মাসেতু বানানো যাবে না।
আলাউদ্দীন মোহাম্মদ, শিক্ষার্থী, এমএসএস, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়;
সম্পাদনা:এমএমকে/জুয়েল মাজহার, কনসালট্যান্ট এডিটর
jewel_mazhar@yahoo.com