১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২০, শনিবার মে ২৫, ২০১৩ ৫:৪৮ এএম BDST banglanew24
25 Sep 2012   06:47:08 PM   Tuesday BdST
E-mail this

মুস্তাইন সুজাত-এর গল্প

বাতেন মিয়ার নিয়তি


মুস্তাইন সুজাত
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
বাতেন মিয়ার নিয়তি মুস্তাইন সুজাত-এর গল্প

ঈশান কোণের কলার ঝোপটা হঠাৎ কেঁপে উঠলো বার কয়েক। রাতের নিকষকালো নিস্তব্ধতা ভেদ করে একটা বাদুড় উড়ে গেল ওই দিকটায়। পাখার ঝাঁপটায় পাশের গাছগুলো আন্দোলিত হলো কিছুটা। সেই সাথে বারান্দার কাঠের ফাঁক থেকে গোটা কয়েক চামচিকা উড়ে গেল চিক চিক শব্দে। গোয়ালের পেছনে দাঁড়িয়ে শিয়ালটা নিজের উপস্থিতি জানান দিলো অসতর্কতায়। খোঁয়াড়ের হাঁস-মুরগিগুলো ডানা ঝাপটাতে ব্যস্ত। দূরে শিরিশ গাছের মগডালে বসে যমকুলিটা ডাকছে এক নাগাড়ে। পেঁচাটাও বিদ্যুৎ খুঁটির মাথায় বসা অভ্যেসমত। চাঁদ মধ্য আকাশে নিজের সরব উপস্থিতি ঘোষণায় ব্যস্ত। সদ্য অমাবস্যা ঘোর কাটিয়ে পূর্ণিমার পথে। আশ্চর্যজনকভাবে কয়েক মিনিট তন্ময় হয়ে চাঁদটাকে দেখছে বাতেন মিয়া। অথচ এর আগে এই অদ্ভুত সুন্দর চাঁদ কিংবা আকাশের দিকে কখনো এক মুহূর্তের জন্যও তাকাননি। নিতান্তই প্রয়োজন এক পশলা বৃষ্টি কিংবা সন্ধ্যা রাতে ঝকঝকে আকাশে আদমসুরত দেখার কৌতূহল ছাড়া।

ভরা পূর্ণিমাতেও গাঁয়ের পুবদিকের বিশাল তেঁতুল তলাটা থাকে নিকষকালো অন্ধকার। পদ্মার বুকে ভেসে বেড়ানো জাটকার ঝাঁক উপর থেকে দেখতে যেমন ঠিক তেমন কিংবা তারও বেশি কয়লার মতো। ঘন ঝোপঝাড় ও তেঁতুলের চিরল পাতার আবরণ ভেদ করে চাঁদ তার রশ্মি মাটিতে ফেলতে পারে না যুতসইভাবে। বাতেন মিয়া ঠিক গাছের গোঁড়া থেকে কয়েক হাত দূরে দাঁড়িয়ে। দৃষ্টি তার উপর দিকে। পায়ের কাছেই তেঁতুলের মোটা মোটা শিকড়গুলো উটের পৃষ্ঠদেশের মত উবু হয়ে কিছুটা সামনে গিয়ে মাটির ভেতর মুখ লুকিয়েছে স্বলজ্জে। প্রাকৃতিক কর্ম করতে আসা বাতেন মিয়ার হাতের লোটাটা অসতর্কতায় মাটিতে পড়তেই বাস্তবতা তাকে চেপে ধরলো। দমকা হাওয়ার ঝাপটা, অজানা ভয় তাকে গ্রাস করলো সর্বান্তকরণে। ঘাড়ের রগ বেয়ে হিমস্রোত নামতে লাগলো পায়ের দিকে। চারদিকের একটানা ঝিঁঝিঁ পোকার চিৎকার আরও আড়ষ্ট করলো মনকে। খালি লোটাটা মাটিতে পড়েই নিস্তব্ধ রাতের প্রহরকে খান খান করে ভেঙ্গে দিলো। বাতেন মিয়া উবু হয়ে লোটাটা তুলে নিয়ে চারপাশে তাকালো। অন্ধকারে দৃষ্টি খুব একটা দূরে গেল না। লোটা পড়ার শব্দ দূর থেকে আরও দূরে মসজিদের মিনার বেয়ে গ্রামের একমাত্র পাকা বাড়ির দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসলো তার কানে। ভয় উত্তেজনা আর উৎকণ্ঠায় কয়েক ফোঁটা ঘাম জমা হল কপালে। গুনগুন করে গাওয়া চিরচেনা গানটাকেও কেমন যেন কর্কশ শোনালো নিজের কাছে।
 
বছর পনের আগের ঘটনা। ভরা বর্ষায় সোনাইয়ে মাছ ধরার মৌসুম। এক রাতে বাতেন গেল মাছ ধরতে। রাত্রি দ্বিপ্রহর। চারদিকে শুনশান নীরবতা। মাঝে মাঝে শিয়ালের ডাক, রাস্তা আড়াআড়ি দৌড়ঝাঁপ। কোনওদিকে খেয়াল নেই বাতেন মিয়ার। পিঠে কনুই জাল আর বাঁ হাতে মাছ ধরার টুপরি। সাহসে বুকের ছাতিখানা ফুলে আছে ইঞ্চি কয়েক। সোনাইয়ের বুক শিকারি শূন্য। অভিনব কৌশলে ভয়ঙ্কর কুড়ে জাল ফেললো বাতেন। হাত থেকে দড়িটা খুলে শিমুল গাছটি যা নদীর পারে নিম্নাঙ্গ উলঙ্গ করে দাঁড়িয়ে আছে তার একখানা শিকড়ে বাঁধলো। লুঙ্গিটা পেছনে কাছা মেরে নেমে পড়ল কুড়ে। প্রথম ডুবে পার করে দিলো কয়েক মিনিট। কেজি চারেক ওজনের কাল বাউস নিয়ে উপরে ভাসলো। টেংরা, চাপাইলা, নলা মাছে টুপরিটা পূর্ণ করে বাড়ি আসলো। কিন্তু আজ! বাতেন মিয়া রাতের কালো নিস্তব্ধতা, বাদুড়ের ডানা ঝাপটানো, যমকুলির একনাগাড় বিলাপ আর পেঁচার ডাকে ভীত সন্ত্রস্ত! নড়ার শক্তি যেন হারিয়ে ফেলেছে। অদূরের বাঁশ ঝাড়ের মর-মর শব্দকে আরও ভয়ঙ্কর ঠেকছে। হঠাৎ দূরমাঠে দেখা উল্কা পিণ্ডটা উৎস থেকে খানিকটা দূরে গিয়ে একখানা উপবৃত্ত তৈরি করলো। সুরা কালাম পড়ে বাতেন মিয়া নিজের বুকে ফুঁ দিচ্ছে বার-বার। ভেতরের ধুক ধুকানিটা বেড়ে গেছে কয়েকগুণ। কে যেন বুকের ভেতরের ড্রামে দরাম দরাম করে বাড়ি দিচ্ছে। পাশের পুকুরের কালো জল থেকে আসা কৃষ্ণ রশ্মি চোখে পড়ে চারদিকটাকে আরও নিকষকালো করে তুলছে। পুকুর পাড়ে উবু হয়ে থাকা এক একটা নারকেল গাছ আশিতিপর বৃদ্ধের মত দাঁড়িয়ে আছে জীবন সাঙ্গের অপেক্ষায়। বুঝি বা ডাক পরার সাথে সাথে ভবলীলা সাঙ্গ করে ঢুকে যাবে কবর গাত্রে। ওপাড়ের খেজুর গাছটায় ঝুলছে কয়েক থোকা কাঁচাপাকা খেজুর। তারই লোভে নিশি কুটুম্বরা পাখা ঝাপটাচ্ছে গাছের মাথায়। একই জায়গাতে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বাতেন মিয়া।
 
ভাবছে সেদিনের কথা। হেমন্তের ধান কাটার মরসুম প্রায় শেষের দিকে। সবার আঙিনায় ধানের মাচা। মলন মাড়াই, ধান শুকানো অতঃপর কৃষকদের হাতে কাঁচা পয়সা। গ্রামে গ্রামে আসছে যাত্রা পালার দল। পুঁথি পাঠের আসর বসছে বাড়ি বাড়ি। কারো বাড়িতে দুপুর হতেই ঢোলের তাল একনাগাড়ে। লাঠি খেলার আসর বসেছে। ছেলে বুড়া ছুটছে সেদিকে। বাতেন মিয়া লাঠি চালানে সবার উপরে। গায়ে সাদা গেঞ্জি, পরনে ধুতি আর পায়ে নূপুর। হাতে তেল চিটচিটে লাঠিখানা নিয়ে ঢোলের তালে তালে কি সুন্দরই না আস্ফালন! সবাই মুগ্ধ বাতেন মিয়ার খেলা দেখে। আর এভাবেই মুগ্ধ হয়েছিলো লাঠি খেলার ওস্তাদ করিম শেখের ছোট মেয়েটা। শেষে প্রণয়। ঘরে উঠলো নতুন বউ। সংসারের নানা চড়াই উতরাই পেরিয়ে তার পথ চলা। এক মুহূর্তের জন্য দাঁড়ানোর ফুসরত ছিলো না। তটস্থ মাঝির মতো সারা জীবন কেটেছে সংসার লগ্নি বাইতে বাইতে। তবুও হার মানে নি বাতেন মিয়া।

অথচ আজ! একি দশা বাতেন মিয়ার!

সেই সোনাইয়ের চর দখলের লড়াইটা। কি রক্তপাতই না হয়েছিলো সে বছর। করিম গাজীর লাঠিয়াল দলের সর্দার এই বাতেন মিয়া। যে লাঠির কসরত দেখে মুগ্ধ হত হাজারো দর্শক, সেই লাঠিই সর্বগ্রাসী হয়ে উঠেছিলো সেদিন। অসুরের শক্তি যেন পেয়ে বসেছিলো তাকে। দয়া মায়াহীন পাষণ্ড ষাঁড়ের মতো উন্মত্ত ছিলো বাতেন। সেদিনের চর দখলে বাতেনের লাঠি, কত জনের মাথার খুলি যে সে ভেঙেছে নিজেও জানে না। মামলা মোকদ্দমা কোনও কিছুই দমাতে পাড়ে নি।

শেষ রাতে বাতেন মিয়ার নিথর দেহটা আবিষ্কার করে রহিমার মা। সেই সাথে মাথার কাছে উপুড় হয়ে পড়া লোটাটা।

বাংলাদেশ সময়: ১৮০৫ ঘণ্টা, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১২
সম্পাদনা : তানিম কবির, tanimkabir@gmail.com

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Bookmark and Share
REVE Systems
VISA Center Inc
Holy Hajj BD
RehabHousing.com

শিল্প-সাহিত্য

8877
Kaspersky Lab - Antivirus Software [ Bangladesh ]
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম | এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন

ফোন: +৮৮০ ২ ৮৪০২১৮১, ৮৪০২১৮২ আই.পি. ফোন: +৮৮০-৯৬১২১২০০০০ নিউজ রুম সেল: +৮৮-০১৭২৯০৭৬৯৯৬, ০১৭২৯০৭৬৯৯৯ ফ্যাক্স: +৮৮০ ২ ৮৪০ ২৩৪৬
ইমেইল: news.bn24@gmail.com, editor.banglanews@gmail.com, editor@banglanews24.com    বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম    এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন

বাংলায় লেখা হলে ইউনিকোডে পরিবর্তন করে ইমেইল করুন    কপিরাইট © 2013 সকল স্বত্ব ® সংরক্ষিত    একটি ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেড প্রতিষ্ঠান