 |
| ছবি: বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম |
সিডনি (অস্ট্রেলিয়া): ১০ ফেব্রুয়ারি, রোববার। তখন দুপুর দু’টো হবে। আমরা বেশ কয়েকজন তখনও আ্যাশফিল্ড পার্কের সবুজে। সদ্য শেষ হওয়া সিডনি–শাহবাগ সংহতি সমাবেশের উত্তেজনায় সাঁতার কাটছি।
এসময় এক তরুণী-মাকে আসতে দেখলাম। পেরামবুলেটর ঠেলছেন। পাশে হাঁটছে ফুটফুটে এক মেয়েশিশু। হাতে তার বাংলাদেশের ছোট্ট একটা পতাকা। অপরিচিত। তাতে কি? আজকে তো ‘ব’ বলতে সব বাঙালি। আমি খানিকটা এগিয়ে গেলাম।
আমাকে এগিয়ে আসতে দেখে তিনি বললেন, “শেষ হয়ে গ্যাছে না? ইস, আমরা মিস করলাম।”
কেন জানি না। আনন্দে আমার চোখে জল চলে এলো। অনেক চেষ্টায় সেটা চেপে শিশুটির গাল ছুঁয়ে আদর করলাম। মনে মনে ওকে বললাম, মা রে, আমি, তুই, আমরা পৃথিবীর সবচেয়ে ভাগ্যবান। কারণ আমরা দু’জনই বাঙালি মায়ের গর্ভে জন্মেছি।
তরুণী মায়ের দিকে তাকাতেই, তিনি হেসে বললেন, “স্যরি ভাই, ট্র্যাক ওয়ার্ক চলছে। আমার আসতে অনেক দেরি হয়ে গেল।”
আমি বললাম, “কিচ্ছু দেরি হয় নি।” আমি তাকে পুরো ঘটনা বর্ণনা করলাম। এমনকি মেয়েটিকে নিয়ে ‘জয়বাংলা’ এবং ক- তে কাদের মোল্লা তুই রাজাকার, তুই রাজাকার ইত্যাদি স্লোগান দিলাম।
সারাজীবনে কখনও কাউকে কোনো গল্প বলতে গিয়ে এত ভালো লাগেনি। সিডনির সংহতি সমাবেশ বা শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধের এটাই হচ্ছে আসল অর্জন।
২০০১ সাল। ঢাকার রাস্তায় যেদিন প্রথম চারদলীয় জোট সরকারের সমাজকল্যাণ মন্ত্রী আলী আহসান মুজাহিদের গাড়িতে জাতীয় পতাকা উড়তে দেখেছিলাম, সেদিন নিজেকে নপুংসক মনে হয়েছিল। আমি জানি, প্রতিটি সচেতন তরুণের মনে একই প্রতিক্রিয়া হয়ে থাকবে। কি যে কষ্ট, লজ্জা আর অপমান নিয়ে বড় হয়েছি আমরা।
আজ তার অবসানের ইঙ্গিত স্পষ্ট। দীর্ঘদিন পর, অন্তত একবার হলেও আওয়ামী লীগ সংক্ষুব্ধ মানুষের মনের কথা বুঝতে পেরেছে। তারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করেছে। ধন্যবাদ তাদের।
৪২ বছর পরে হলেও চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছে। এরপর থেকেই শুরু হয়েছে জামাত-শিবিরের নর্তন-কুর্দন। গত কয়েক মাসে তারা পুলিশ পিটিয়েছে, গাড়ি পুড়িয়েছে। বিএনপির আঁচলের ছায়ায় থেকে থেকে নধর হয়ে ওঠা দলটির দুঃসাহস আমাদের স্তম্ভিত করেছে। স্বাধীনতার সশস্ত্র বিরোধিতাকারী দলটি ক্রমে বের করেছে তাদের নখদন্ত। একের পর এক চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে শান্তিপ্রিয় বাঙালির প্রতি। এই সবকিছু মিলিয়ে মন বড় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। এখন স্বস্তি। ধন্যবাদ শাহবাগ।
আমাদের প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধ দেখেনি। ৯০’র আন্দোলনের সময় আমার হাফপ্যান্ট পড়ার বয়স। পালিয়ে মিছিলে যেতাম। নয়ত বাসায় বকা খেতে হত। আমার যেমন ছিল, আমি নিশ্চিত তেমনি আরও কোটি বুকেও ছিল। দেশের জন্য কিছু করতে না পাড়ার তীব্র যন্ত্রণা। চোখের সামনে সবকিছু নষ্টদের অধিকারে চলে যেতে দেখবার গ্লানি।
দেখে মনে হচ্ছিল, সবাই হাল ছেড়ে দিয়েছে। রাজনীতিবিমুখ, দেশ সম্পর্কে উদাসীন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে আমাদের প্রজন্মকে। আসলে কিন্তু ভেতরে ভেতরে সবাই কম বেশি ফুঁসছিল। আজ মনে হচ্ছে, সবাই মনে হয় বিচারের রায়ের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। বারুদ তৈরি ছিল, অপেক্ষা ছিল কেবল জ্বলে ওঠবার। এখন জ্বলছে দাবানল। ছড়িয়ে পড়েছে সবখানে।
সিডনির অ্যাশফিল্ডে প্রায় ৪৫০ জনের সমাবেশ স্লোগানে-গানে-কবিতায় সংহতি উচ্চারিত হয়েছে। মেলবোর্ন, অ্যাডিলেইড, ব্রিসবেন, পার্থ সব জায়গাতেই বাঙালি অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়েছে চলমান যুদ্ধাপরাধবিরোধী আন্দোলনের প্রতি।
জানি না, এই আন্দোলন থেকে কি পাওয়া যাবে। কতদিন আমরা মাটি কামড়ে পড়ে থাকতে পারবো। তবে একটা ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। আমরাই এখন শতকরা ৯৯। আমরা এখান থেকে কোনোদিনই খালি হাতে ফিরবো না।
এতদিন মুক্তিযুদ্ধের যে চেতনা কেবল বইয়ে-গল্পে ছিল। আজ বাতাসে সেই চেতনার নেশা অবমুক্ত হয়েছে। আমরা আজ আকণ্ঠ পান করে নিয়েছি সেই অমৃত সুধা। আত্মসন্ধানের সূত্র ধরে শাহবাগে আমরা খুঁজে পেয়েছি জাত্যাভিমানের জ্যামিতি। যেখানে বাঙালি সেখানেই শাহবাগ। আমি থেকে আমরা হয়ে ওঠবার এই গল্পই আমাদের দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ।
বাংলাদেশ সময়: ১৭৫০ ঘণ্টা, ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০১৩
সম্পাদনা: আবু হাসান শাহীন, নিউজরুম এডিটর; eic@banglanews24.com;জুয়েল মাজহার, কনসালট্যান্ট এডিটর