 |
| ছবি: ফাইল ফটো |
ঢাকা: রাতারাতি ধনী হওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে গ্রাহকদের কাছে হাজার কোটি টাকা নিয়ে নিঃস্ব করে পথে বসিয়েছিল যুব কর্মসংস্থান সোসাইটি (যুবক)। বিতর্কিত প্রতিষ্ঠান যুবকের মতো প্রতারণার ফাঁদ পেতে গ্রাহকদের কাছে টাকা হাতিয়ে নিয়েছে মাল্টিলেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) কোম্পানি ইউনিপেটুইউ।
অধিক মুনাফার লোভে জমিজমা, বাড়ি-গাড়ি বিক্রি করে এসব এমএলএম কোম্পানিতে বিনিয়োগ করে অনেকে এখন নিঃস্ব। এ কাতারে রয়েছেন শিক্ষিত-অশিক্ষিত মানুষ, সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবীরা। ক্ষতিগ্রস্তদের কেউ কেউ হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছেন, ঘর ভেঙ্গেছে অনেক নারীর। টাকা ফেরতের দাবিতে অনেকে রাজপথে অনশন করেছেন।
বিনিয়োগকারীদের দাবি, নানা সময়ে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে ওঠা বিভিন্ন এমএলএম প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রাহকদের হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট করছে সরকারি উদাসীনতায়।
জানা গেছে, যুবক হাউজিং অ্যান্ড রিয়েল এস্টেট ডেভেলপমেন্ট, যুব কর্মসংস্থান উদ্যোগ, যুবক কর্মসংস্থান সোসাইটি, যুবক টেলিবার্তা, জে.কে হ্যাচারি- এসব খাতে দেড় কোটি গ্রাহকের কাছে হাজার হাজার কোটি টাকা নিয়েছিল যুবক।
২০০৫ সালে যুবকের অবৈধ ব্যাংকিং কার্যক্রম, দুর্নীতি ও অর্থ দুর্বৃত্তায়নের খবর প্রকাশ হলে ব্যবসা বন্ধ করতে বাধ্য হয় তারা। ২০০৬ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক তদন্ত করে যুবকের বিরুদ্ধে অবৈধ ব্যাংকিংয়ের প্রমাণ পায়। ওই বছরের ২৪ মে বাংলাদেশ ব্যাংক যুবকের অবৈধ ব্যাংকিং কার্যক্রম বন্ধ করে ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে আমানতকারীদের বিনিয়োগকৃত অর্থ ফেরতের নির্দেশ দেয়।
এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হোসাইন আল মাসুমসহ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা হয় এক হাজারেরও বেশি মামলা। মামলায় যুবকের হোসাইন আল মাসুম, সৈয়দ রাশেদুল হুদা চৌধুরী ও লোকমান হোসেনকে গ্রেফতারও করা হয়। কিন্তু কয়েক মাস পরে জামিনে মুক্তি পেয়ে গ্রাহকদের টাকা ফেরত না দিয়ে সরকারের প্রভাবশালীদের ম্যানেজ করে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যান বলে অভিযোগ উঠেছে।
আমানতকারীদের আবেদনের প্রেক্ষিতে ২০১০ সালের ১ এপ্রিল এক গেজেটের (নং-অস/অবি/ব্যাংকিং/প্রঃশাঃ-৩/বিবিধ-৩/২০০৯-৩৫) মাধ্যমে সরকার যুবকের গ্রাহকদের জমাকৃত অর্থ পরিশোধ, হয়রানি বন্ধ ও স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বিক্রি-হস্তান্তরে স্থগিতাদেশ ও প্রশাসক নিয়োগের আদেশ দেয়। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. ফরাসউদ্দিনকে প্রধান করে তদন্ত কমিশন গঠন করে ১২০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলে।
ড. ফরাসউদ্দিন কমিশনে যুবকের গ্রাহকরা পাওনা অর্থ চেয়ে ২ লাখ ৬৭ হাজার ৩৩০ জন গ্রাহকের আবেদনে ২ হাজার ১৪৭ কোটি ৭৭ লাখ টাকা দাবির কথা উল্লেখ করা হয়। এছাড়া এর সম্পত্তির পরিমাণ ৩ হাজার কোটি টাকা বলে কমিশনের কাছে প্রতীয়মান হয়।
এ কমিশনের সুপারিশে যুবকের গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধে একটি স্থায়ী কমিশন গঠন এবং তার আগে যাবতীয় সম্পত্তি সরকারের জিম্মায় রাখতে বলা হয়। সুপারিশ অনুযায়ী, সাবেক যুগ্ম-সচিব রফিকুল ইসলামকে চেয়ারম্যান করে ২০১১ সালের শুরুতে ২ বছরের জন্য ‘যুবক কমিশন’ গঠন করা হয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের আওতাধীন এ কমিশন গ্রাহকদের পাওনা ফিরিয়ে দিতে কাজ করছে।
যুবকে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন, গত বছর এপ্রিলে তাদের তালিকা তৈরি করে যুবক কমিশনের ওয়েবসাইটে (www.jubokcommission.com) দেওয়া হয়। ফরাসউদ্দিন কমিশন যুবকের গ্রাহকদের আবেদনের ভিত্তিতে তালিকাটি করেছিল। ওই সময় যুবক কমিশনের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম বলেছিলেন, টাকা ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়াটিই শুরু করতে হবে। কমিশনের ওয়েবসাইটে গ্রাহকরা নিজ জেলা ও যে খাতে বিনিয়োগ করেছিলেন, সেই খাতের ঘরে ক্লিক করার পর কোড নম্বর দিয়ে তথ্য জানতে পারবেন।
কিন্তু এতে শেষ পর্যন্ত ইতিবাচক কোনো ফল পাননি প্রতারিত বিনিয়োগকারীরা।
শেষ পর্যন্ত হতাশার চরম পর্যায়ে উপনীত বিনিয়োগকারীরা অর্থ ফেরতের দাবিতে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালনও করেছেন।
গ্রাহকরা অভিযোগ করেন, সরকারি তদারকি না থাকায় যুবক তার সম্পদ গোপনে বিক্রি শুরু করেছে। ইতিমধ্যে কুমিল্লার জমি, রাজধানীর ধানমণ্ডির বাড়ি, মেঘনা সি ফুডস, জে কে হ্যাচারি, যুবক ফোন, যুবক ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট লি. বিক্রি করে ফেলেছে তারা।
যুবক কর্তৃক ক্ষতিগ্রস্ত কর্মী ও সদস্যদের অর্থ আদায় সংগ্রাম কমিটির সভাপতি জান্নাতুল ফেরদৌস কাজল বাংলানিউজকে বলেন, ‘‘ছয় বছর ধরে আমাদের পাওনা টাকা ফেরত পাওয়ার জন্য সরকারের বিভিন্ন মহলের দ্বারে দ্বারে ঘুরছি। কিন্তু কেউ আমাদের টাকা ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারেননি। এখন আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে।’’
তিনি কমিশনের কার্যক্রম দ্রুত বাস্তবায়ন করে যুবকের বিক্রি করা সম্পদ উদ্ধার ও অবিক্রিত সম্পদ সরকারের আয়ত্বে এনে রমজানের আগে টাকা ফেরতের দাবি জানান। অন্যথায় বাংলাদেশ ব্যাংক ঘেরাও করা হবে বলে জানান।
অপরদিকে ইউনিপেটুইউ’র অবৈধ লেনদেনের অভিযোগে দুদকের জব্দকৃত ৪১৯ কোটি টাকা ফেরত পেতে এর গ্রাহকরাও অনশন কর্মসূচি পালন করছেন। রোববার গ্রাহকরা অর্থমন্ত্রীর বাড়ি ঘেরাওয়ের জন্য গেলে ৭/৮ জন বিনিয়োগকারীকে আটক করে পুলিশ।
ইউনিপেটুইউ’র বিনিয়োগকারীরা জানান, ২০০৯ সালে মালয়েশিয়ানভিত্তিক কোম্পানি ইউনিপেটুইউ (বাংলাদেশ) লিমিটেড নামে যাত্রা শুরু করে। আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণ ব্যবসা পরিচালনার কথা বলে জনসাধারণের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করতে গেলে তাদের প্রতারণা স্পস্ট হয়ে ওঠে। প্রাথমিক পর্যায়ে গ্রাহকদের সর্বনিম্ন ২১ হাজার টাকা বিনিয়োগে মাসিক ৪২শ’ করে টাকা দেওয়া হতো। কিন্তু মূলধন না খাটিয়ে অবৈধ ব্যাংকিংয়ের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ইউনিপেটুইউ’র অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করে।
২০১১ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি দুর্নীতি দমন কমিশন ৪২১ কোটি টাকাসহ ইউনিপের অ্যাকাউন্ট জব্দ করে। প্রতিষ্ঠানটির প্রধানসহ এজেন্টদের বিরুদ্ধে প্রতারণার মামলা হয়। পুলিশ এ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানের এমডি মুনতাসির হোসেন ইমন, জিএম জমসেদুর রহমান এবং সিও মুকিত আল মাহমুদকে গ্রেফতার করেছে। কিন্তু বাকি কর্মকর্তারা পলাতক রয়েছেন।
ইউনিপেটুইউ মেম্বার্স ক্লাব লিমিটেডের সভাপতি সরওয়ার মোর্শেদ বাংলানিউজকে জানান, ৬ লাখ গ্রাহকের ৬ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ রয়েছে। তারা সরকারের কাছে কমিশন গঠন করে ৪১৯ কোটি টাকা ফেরত দেওয়ার দাবি করেন।
তিনি পলাতক কর্মকর্তাদের গ্রেফতার ও শাস্তি দাবি করেন, যাতে আর কেউ প্রতারণার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের অর্থ হাতিয়ে নিতে না পারে। একই সঙ্গে এমএলএম কোম্পানির জন্য নীতিমালা প্রণয়ন ও কঠোরভাবে বাস্তবায়নের দাবি জানান তিনি।
বাংলাদেশ সময়: ১১৫৪ ঘণ্টা, জুলাই ১৬, ২০১২
এমআইএইচ/ সম্পাদনা : অশোকেশ রায়, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর