 |
| ছবি: সোহেল সরওয়ার/বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম |
চট্টগ্রাম: ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত থাকার দায়ে আবুল কালাম আজাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকারের বিরুদ্ধে দেওয়া রায় ইতিহাসে দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। ঐতিহাসিক এ রায়ের মাধ্যমে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে যে গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে তা প্রমাণিত হয়েছে। মহান মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদ হওয়ার বিষয়টি এখন আদালতে প্রমাণিত। এ তথ্য এখন প্রতিষ্ঠিত।’
একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাহরিয়ার কবির শুক্রবার দুপুরে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়ের সময় এসব কথা বলেন।
তিনি মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার কার্যক্রম শুরু করার বিষয়টি বর্তমান মহাজোট সরকারের অনেক সাফল্যের মধ্যে অন্যতম বলে আখ্যায়িত করেন।
এ সময় তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন অন্যান্য মামলাগুলো এ বছরের মধ্যেই সম্পন্ন করার দাবি জানান। পাশাপাশি ট্রাইব্যুনালের জনবলসহ বিভিন্ন ঘাটতি পূরণ এবং নিরাপত্তা জোরদারের জন্য সরকারের প্রতি দাবি জানান।
শাহরিয়ার কবির বলেন, `বাচ্চু রাজাকারের রায় আন্তর্জাতিক আইনে একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন হয়ে থাকবে।`
সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির বলেন, ‘১৯৯১ সাল থেকে গত ২১ বছর ধরে আমরা একাত্তরের মানবতাবিরোধী, গণহত্যাকারী ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবি জানিয়ে আসছে। শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে শুরু হওয়া সে আন্দোলন আমরা চালিয়ে যাচ্ছি। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল বাচ্চু রাজাকারের বিরুদ্ধে রায় ঘোষণার পর আমাদের সে অপেক্ষার অবসান ঘটেছে। অমর একুশে’র পাশাপাশি আমাদের জাতীয় জীবনে আরেক “একুশ’ যুক্ত হল।’
সাম্প্রদায়িকবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম এই পথিকৃৎ আরও বলেন, ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আমাদের দেশীয় আদালত এবং এটা আমাদের দেশীয় আইন দ্বারা পরিচালিত। আইনজীবী ও তদন্তকারী সংস্থার সদস্যরা বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা সত্বেও নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে তাদের কার্যক্রম সম্পন্ন করেছে।’
প্রাবন্ধিক শাহরিয়ার কবির বলেন, ‘পৃথিবীর অনেক জাতি তাদের ওপর সংঘটিত গণহত্যার বিচার এমনকি স্বীকৃতিটুকুও পায়নি। মেক্সিকো, আর্মেনিয়া, লাওস, ভিয়েতনামসহ বিভিন্ন দেশে গত ১০০ বছরের বিভিন্ন সময়ে গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে। আমেরিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ এসব গণহত্যার সঙ্গে জড়িত থাকায় এসব দেশে সংঘটিত গণহত্যার স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে না। আমাদের দেশের এ রায় এসব জাতির জন্য অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। কেননা এখন তারা এ রায়কে দৃষ্টান্ত ধরে তাদের ওপর সংঘটিত গণহত্যার বিচার করতে পারবে।’
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ দেওয়া বাচ্চু রাজাকারের রায় প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো বিভ্রান্তিমূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বলে অভিযোগ করেন প্রথিতযশা সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির।
তিনি বলেন, ‘বিচার কার্যক্রমে আসামি উপস্থিত আছেন কিনা তা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে বিচারের রায়। আর বাচ্চু রাজাকারের রায়ে মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে।’
এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন,‘আন্তর্জাতিক কয়েকটি গণমাধ্যম আসামীর অনুপস্থিতিতে বিচারপ্রক্রিয়া গ্রহণযোগ্য নয় বলে উল্লেখ করেছেন। যা একেবারেই ভিত্তিহীন। কেননা পৃথিবীর বহু দেশে আসামির অনুপস্থিতিতে বিচার কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়েছে। এমনকি ন্যুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রধান আসামীসহ অনেকের অনুপস্থিতিতে বিচার হয়েছে, বিচারের রায়ে তাদের মধ্যে অনেকের ফাঁসিও হয়েছে।’
সম্প্রতি ট্রাইব্যুনালের এক বিচারপতির স্কাইপ কেলেঙ্কারিকে ফৌজদারী অপরাধ বলেও আখ্যায়িত করেন দেশের এই বুদ্ধিজীবী।
মতবিনিময় সভায় শাহরিয়ার কবির বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের সমালোচনা করে বলেন, ‘ জিয়াউর রহমান ’৭৫ পরবর্তী সময়ে হত্যাকারীদের বিচারের বদলে পুরস্কৃত এবং বিভিন্ন অপরাধ থেকে মুক্তি দিয়ে দায়মুক্তির সংস্কৃতি চালু করেছিলেন। ট্রাইব্যুনালের ঐতিহাসিক রায়ের মাধ্যমে আমরা সে দায়মুক্তির সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসেছি।’
চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব সভাপতি আলী আব্বাসের সভাপতিত্বে এবং জ্যেষ্ঠ সহ সভাপতি রাশেদ রউফের সঞ্চালনায় মতবিনিময় সভায় বক্তব্য দেন প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মহসিন চৌধুরী, কবি ও সাংবাদিক ওমর কায়সার।
সভায় অন্যদের মধ্যে প্রেস ক্লাবের অর্থ সম্পাদক শুকলাল দাশ, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মুল কমিটির চট্টগ্রাম বিভাগীয় কাউন্সিলর শওকত বাঙালি উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাদেশ সময়: ১৪ ২৪ ঘণ্টা, জানুয়ারি ২৫, ২০১৩
এসজি/টিসি