ঢাকা : চলতি বছরের শুরুর দিকে পশ্চিম মিয়ানমারে একজন বৌদ্ধ মহিলা ধর্ষিত হওয়ার পর খুন হন। এ ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসন ৩ জন রোহিঙ্গা মুসলিমকে আটক করে।
এর এক সপ্তাহ পরের ঘটনা খুবই নির্মম!
সরকারি বাহিনী ও বৌদ্ধদের ভয়াবহ আক্রমণে ১০ জন মুসলিম খুন হন! আসলেই কী ১০ জন খুন হন?
সত্য বলতে ওখানে কী ঘটেছে তা বিশ্বের কাছে অজানাই রয়ে যায়!
আরাকান ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া বঞ্চিত নাগরিকদের ভাষ্যমতে, ১ জন বৌদ্ধ মহিলা খুনের অজুহাত ধরে শুরু হয় সংখ্যালঘু মুসলিম নিধনের ভয়ংকর পরিকল্পনা!
সরকারের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার ছাড়ার জন্য আগে থেকেই চাপ দেয়া হচ্ছিল। এ ঘটনার পর সেটাকে আনুষ্ঠানিকতায় রূপ দেয় বৌদ্ধবান্ধব সরকার! অনেক রোহিঙ্গা তাদের মাতৃভূমি ছেড়ে পালিয়ে যায়। আর যারা জন্মভূমির মায়া ছাড়তে পারেনি তাদের ভাগ্যে কী ঘটেছে তা বিশ্বমিডিয়ায় খানিকটা উঠে এসেছিল, যা ভাবতেই গা শিউরে ওঠে!
পালিয়ে যাওয়াদের কেউ আশ্রয় নেয় প্রতিবেশী দেশগুলোতে, বিশেষ করে বাংলাদেশে! আর যারা আশ্রয় পায়নি তাদের স্বপ্ন হারা চোখের অশ্রুনদীকে তাচ্ছিল্য করে ভাসিয়ে নিয়ে যায় সর্বনাশা নাফ নদী কিংবা বঙ্গোপসাগর!
সেখানকার অবস্থা জানতে চাইতেই ডুকরে কেঁদে ওঠেন মোহাম্মদ ইসলাম। পরিবার নিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা এ অধিকার বঞ্চিত রোহিঙ্গা নাগরিক বলেন, “সেটা এক ভয়ংকর জনপদ, যেন মৃত্যুর নগরী! ওখানে পাতা ঝরার চেয়েও মূল্যহীন মানুষের প্রাণ!”
সংঘাতের সময়কার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, “তারা (বৌদ্ধ গোষ্ঠী ও সরকারি বাহিনী) গুলি করছিল আর আমরা ইটের টুকরা দিয়ে তা প্রতিহত করছিলাম। লাশ আর রক্তে ভাসছিল সে লড়াইয়ের ময়দান!”
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো রাখাইন অঞ্চলের মানুষদের নিয়ে প্রতিবেদনে বরাবরই বলে এসেছে, নিজ দেশে অবহেলিত রোহিঙ্গাদের নেই কোনো মৌল অধিকার, নেই মাথা গোঁজার এতটুকুন আশ্রয়, আর ওরা জানেও না কোথায় আশ্রয় মিলবে!
রোহিঙ্গাদের গল্প পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম নির্মম গল্প, জন্মস্থান ছেড়ে পালিয়ে যাওয়াদের গল্প। মাতৃভূমির নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিতদের গল্প। অবহেলিত জীবনের নির্মম দৃষ্টান্ত পশ্চিম মিয়ানমারের সংখ্যালঘু মানুষের গল্প!
আন্তর্জাতিক গণহত্যা বিশেষজ্ঞ পরিষদের (আইএজিএস) সাবেক সভাপতি অধ্যাপক উইলিয়াম স্কেবাস বলেন, “যখন দেখা যাবে জনগণের নাগরিক পরিচয় অস্বীকার করার চেষ্টা চলছে, সরকারের নিজ ইচ্ছানুযায়ী মৌল মানবাধিকারের বিরুদ্ধে কর্মকাণ্ড চলছে, যখন নাগরিকদের ইতিহাসকে অস্বীকার করা হবে, যখন মাতৃভূমির অধিকার অস্বীকার করা হবে- তখন মনে করতে হবে, ভয়ংকর গোপন গণহত্যার পরিকল্পনা হচ্ছে। যেটা চলছে বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ মিয়ানমারে।”
তিনি বলেন, “পালিয়ে বেড়ানো এসব মানুষরা খাদ্য, চিকিৎসা, বাসস্থানসহ প্রয়োজনীয় অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়! রোগ, মহামারি আক্রান্ত হয়ে শেষ পর্যন্ত মৃত্যুতে আশ্রয় পায়! এটা কি পরোক্ষভাবে গণহত্যা নয়! মিয়ানমার সরকার এমন গোপন গণহত্যাই চালাচ্ছে! যেটা বিশ্বশক্তিগুলো দেখেও না দেখার ভান করছে!”
উল্লেখ্য, তিন দশক ধরে মিয়ানমার থেকে দলে দলে পালিয়ে বেড়াচ্ছে রোহিঙ্গারা। অন্তত যে মৌল মানবাধিকারটি নিশ্চিত করার কথা ছিল মিয়ানমার সরকারের সেটা করছে বাংলাদেশ। ভিনদেশে অনুপ্রবেশ অবৈধ হলেও মানবাধিকার বিবেচনায় বাংলাদেশ গত তিন দশক ধরেই এ বিষয়টি বিবেচনা করে আসছে। বর্তমানে বাংলাদেশে ৪ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী রয়েছে।
বাংলাদেশ সময় : ২০১৫ ঘণ্টা, ডিসেম্বর ১১, ২০১২
সম্পাদনা : হুসাইন আজাদ, নিউজরুম এডিটর