 |
| লাল বৃত্ত চিহ্নিত জানালা দিয়ে ইমরানকে ফেলে দেওয়ার অভিযোগ স্বজনদের।ছবি: সোহেল সরওয়ার /বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম |
চট্টগ্রাম: বোনের জন্য ওষুধ নিয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ার্ডে ঢোকার সময় ইমরান (১৭) নামে এক তরুণকে বাধা দেন প্রবেশপথে কর্তব্যরত নিরাপত্তারক্ষী। এ নিয়ে ওয়ার্ডের ফটকে দারোয়ানের সঙ্গে সামান্য বাকবিতণ্ডা হয় ইমরানের।
এর জের ধরে হাসপাতালের কয়েকজন কর্মচারী মিলে পাঁচতলা থেকে ইমরানকে নিচে ফেলে দিয়েছে অভিযোগ করেছেন তার স্বজনেরা। গুরুতর আহত ইমরান এখন চমেক হাসপাতালের ২৬ নম্বর ওয়ার্ডে শুয়ে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন।
মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের পাঁচতলায় ২৭ নম্বর সার্জারি ওয়ার্ডে এ অমানবিক ঘটনা ঘটেছে।
তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, ইমরান নিজেই পাঁচতলা থেকে লাফ দিয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শী লোকজন জনান, চমেক হাসপাতালের মূল ভবনের পঞ্চম তলায় ২৭ নম্বর ওয়ার্ডে বোনের জন্য ওষুধ নিয়ে ঢুকতে চাইলে চিকিৎসকদের রাউন্ড চলছে এ কথা বলে দারোয়ান মোহাম্মদ ইমরানকে (১৭) বাধা দেন। বোনের অসুস্থতা, জরুরি ওষুধ দরকার ইত্যাদি নানা অনুনয়, বিনয় করেও কাজ না হওয়ায় ইমরান দারোয়ানের সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন। এসময় ইমরান দারোয়ানের মাথায় আঘাত করে।
এরপর ক্ষিপ্ত হয়ে দারোয়ান ও ওয়ার্ডের চতুর্থ শ্রেণির ৩-৪ জন কর্মচারী ইমরানকে ওয়ার্ডে ঢুকিয়ে বেদম মারধর করেন। একপর্যায়ে তাকে ওয়ার্ডের পেছনের একটি ‘মিনি ওটি’তে ঢোকান। এরপর বাইরে ভারী কিছু পড়ার শব্দ শুনতে পান তারা। পরে জানা যায় ইমরানকে হাসপাতালের গাড়ির গ্যারেজের ছাদে গুরুতর আহত অবস্থায় পাওয়া গেছে। এরপর চমেক’র শিক্ষার্থীরা ইমরানকে উদ্ধার করে রিকশায় করে জরুরি বিভাগে পৌঁছে দেন।
মঙ্গলবার সকালে ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের ৫৫ নম্বর শয্যায় পেটের তীব্র ব্যথা নিয়ে ভর্তি হয়েছিলেন মহেশখালী উপজেলার কালা গাজীর পাড়া এলাকার নুরুজ্জামানের স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস (২৬)।
ঘটনা জানতে চাইলে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। বাকরুদ্ধ কণ্ঠে বাংলানিউজকে বলেন, ‘আমার জন্য জরুরি ওষুধ নিয়ে এসেছিল ছোট ভাই ইমরান। তাকে ঢুকতে দেননি দারোয়ান। এতে দুজনের মধ্যে বাকবিতণ্ডা হয়েছিল। পরে এ ওয়ার্ডের ২-৩ জন কর্মচারী তাকে গরুর মতো পিঠিয়েছে। আমার হাতের স্যালাইনে রক্ত উঠে গিয়েছিল তাদের ক্ষান্ত করতে পারিনি। কত মিনতি করেছি ভাইকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য। আমাকে সুস্থ করতে এসে ভাইটি মার খেল, হাত ভাঙল। না জানি কপালে কী আছে!’
নগরীর এমইএস কলেজের প্রথম বর্ষের (মানবিক) ছাত্র ইমরানের বাবা মীর কাসেম ছেলে ও মেয়েকে দেখতে বারবার ছোটাছুটি করছিলেন ২৬ ও ২৭ নম্বর ওয়ার্ডে। মেয়ের শয্যার কাছেই তার সঙ্গে কথা হয় বাংলানিউজের।
আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, ‘মেয়েকে বাঁচাতে এসে ছেলেকেই হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে এমনটি স্বপ্নেও ভাবিনি। কেন এমন হলো। প্রার্থনা করি আল্লাহ যেন আমার হায়াত ছেলেকে দিয়ে হলেও সুস্থ করে দেন।’
ইমরানের ব্যাপারে বিকেল ৫টায় চমেক হাসপাতাল পুলিশ ক্যাম্পের (জরুরি বিভাগ) গেলে কর্তব্যরত কনস্টেবল নিবন্ধন বই দেখে বাংলানিউজকে বলেন, ‘আজ হাসপাতালের পাঁচতলা থেকে পড়ে যাওয়া বা ফেলে দেওয়ার কোনো ঘটনা লিপিবদ্ধ করা হয়নি। আমি বিকেলের পালায় দায়িত্ব পালন করতে এসেছি।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কনস্টেবল বলেন, ‘হাসপাতালের কর্মচারী জড়িত থাকলে এমন ঘটনা খাতায় লিপিবদ্ধ হওয়ার কথা নয়।’
চমেক হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. কাজী শফিকুল আলম বাংলানিউজকে জানান, হাসপাতালের পরিচালকের সঙ্গে আমিও দুপুরে আহত ইমরানকে দেখতে গিয়েছিলাম। আমরা তার সঙ্গে আলাপ করেছি। তার চিকিৎসার খোঁজখবর নিয়েছি। হাসপাতাল থেকে তার যাবতীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ওষুধপত্র দেওয়া হচ্ছে।
পাঁচ তলা থেকে ইমরানকে ফেলে দেওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ওরা এমন অভিযোগ করলে তো হবে না। আমরা খোঁজ নিয়ে জেনেছি, সকালে ওই ওয়ার্ডে রাউন্ড (জ্যেষ্ঠ চিকিৎসকদের রোগী দেখা) চলছিল। তখন ইমরান জোর করে ঢুকতে চাইলে দারোয়ান বাধা দেন। এসময় দুজনের ধস্তাধস্তি হয়। একপর্যায়ে ইমরানের আঘাতে দারোয়ানের মাথা ফেটে যায়। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ওয়ার্ডের ২-৩ জন কর্মচারী ইমরানকে ধরে ‘মিনি ওটি’তে দরজা বন্ধ করে দেন। ওই কর্মচারীরা খেয়াল করেনি একটি জানালা খোলা ছিল। ওই জানালা দিয়ে ইমরান লাফ দিলে হাতে আঘাত পায়।
ইমরানকে কারা উদ্ধার জরুরি বিভাগে নিয়ে গেছে জানতে চাইলে উপ-পরিচালক জানান, সে যখন গ্যারেজের ওপর পড়ে তখন পুলিশ ও মেডিক্যালের স্টাফরা তাকে জরুরি বিভাগে নিয়ে আসেন।
এ ঘটনায় কোনো তদন্ত বা দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ ঘটনা অমানবিক। কিন্তু প্রথমে দারোয়ানকে আঘাত করেছে ইমরান। এ হিসেবে সেও দোষী। আগে রোগী সুস্থ হয়ে উঠুক।
উল্লেখ্য, চমেক হাসপাতালে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী ও আয়াদের দুর্ব্যবহার, হয়রানি, ওয়ার্ডের ফটকে জিম্মি করে টাকা আদায়ের ঘটনা প্রতিদিনের বলে দীর্ঘদিন থেকে অভিযোগ করে আসছিলেন রোগী ও স্বজনেরা।
বাংলাদেশ সময়: ১৮ ১০ ঘণ্টা, অক্টোবর ২, ২০১২
এআরএম/আরডিজি