১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২০, শনিবার মে ২৫, ২০১৩ ১১:৩৩ পিএম BDST banglanew24
27 Jun 2012   03:56:15 AM   Wednesday BdST
E-mail this

‘ও আল্লাহ তুমি আমার মায়রে ফিরাই দাও’


সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
‘ও আল্লাহ তুমি আমার মায়রে ফিরাই দাও’
ছবি: উজ্জল ধর / বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

চট্টগ্রাম: ‘মায়রে (মাকে) বারবার কইছিলাম, আমার সঙ্গে চলে যাইতে। আব্বা রাজি হয়নাই। বলছে, এখানে ভাড়া কম, খরচ কম। মায়রে আমি হারাই ফেললাম। ও আল্লাহ, তুমি আমার মায়রে ফিরাই দাও।’

মঙ্গলবার গভীর রাতে নগরীর খুলশী থানার উত্তর পাহাড়তলী ওয়ার্ডের আকবর শাহ এলাকায় রেলওয়ের পাহাড় ধসে নিহত হাসনা বানু’র ছেলে টুটুল কাঁদতে কাঁদতে এসব কথা বলছিলেন। টুটুলের মত এমন কান্না ওই পাহাড়ের নিচে বসবাসকারী অনেকের ঘরে ঘরে।

বছরের পর বছর ধরে টুটুলের মতই কাঁদছেন চট্টগ্রামে পাহাড় ধসে স্বজন হারানো অনেকেই। এরপরও পাহাড়ের নিচের বসতি সরেনা আর তাদের কান্নাও থামেনা। দরিদ্র, ভূমিহীন, অসহায় মানুষগুলোর কাছে মৃত্যুই যেন একমাত্র প্রতিকারবিহীন নিয়তি।

মঙ্গলবার রাত ১১টার দিকে মায়ের মাটি চাপা পড়ার খবর পেয়ে টুটুল যখন ঘটনাস্থলে আসেন তখন তার মায়ের লাশ মাটির নিচ থেকে টেনে তুলছিলেন দমকল বাহিনীর কর্মীরা। নিজের চোখের সামনে মায়ের লাশ তোলার মর্মান্তিক এ দৃশ্য দেখে স্থির থাকতে পারেননি তিনি। এসময় তার বিলাপে ভারী হয়ে উঠে ওই এলাকার পরিবেশ।

গার্মেন্টস কর্মী টুটুল জানায়, সে তার পরিবার নিয়ে নগরীর ফিরোজ শাহ কলোনিতে থাকে। মা-বাবাকে বারবার তার সঙ্গে যেতে বললেও খরচ বাড়বে বলে তারা যায়নি।

টুটুলের সৎ বোন শাবনাজ তার বাবা-মায়ের সঙ্গেই থাকত। শাবনাজ জানায়, মঙ্গলবার দুপুরের দিকে তাদের বাড়ির পাশে পাহাড়ের উপর থেকে একটি বড় গাছের শেকড় ভেঙ্গে পড়ে। এরপর তারা ভেবেছিল, আর হয়ত পাহাড় পড়বেনা। সন্ধ্যার দিকে যখন পাহাড় ধসে পড়ে, তখন মা হাসনা বানু ও বাবা আজগর আলী মিলে তারা দৌঁড়ে উপরে উঠে আসেন। কিন্তু পরক্ষণেই দু’জন তার মামাত বোনকে বাঁচানোর জন্য নিচে নেমে যায়। এসময় দু’জনের উপরই পাহাড়ের খন্ড এসে পড়ে। এতে আজগর আলী আহত হয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন আর তার মা মারা যান।

স্থানীয় ব্র্যাক স্কুলের পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্রী শাহনাজ হারিয়েছেন মা আর তারই সমবয়সী রানু নামে আরেক মেয়ে হারিয়েছেন তার বড় বোনকে। মঙ্গলবার রাতে শানু নামে প্রায় ১৬ বছর বয়সী তার বড় বোনের লাশও উদ্ধার করা হয়েছে।

রানু’র মা কাঁদতে কাঁদতে বাংলানিউজকে বলেন, ‘আমার ঘর আছিল মাঝখানে। আমি মেয়েরে ভাইয়ের ঘরে পাঠাইছি আমার জন্য একটা সুপারি আনতে। মেয়ে সুপারি নিয়ে আসতে পারেনাই, মাটি এসে তার উপর পড়ছে। আমি আমার মেয়েরে মাইরা ফালাইছি।’

মারা গেছে তরকারী বিক্রেতা মিজানের এক বছর বয়সী মেয়ে উর্মিও। মিজানের স্ত্রীও আহত অবস্থায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন।

স্থানীয় বাসিন্দা ও বিদ্যুৎ মিস্ত্রি ফজলুল হক বাংলানিউজকে জানান, রেলওয়ে পাহাড়ের নীচের জায়গাগুলো অবৈধভাবে দখল করে ঘর তুলে ইয়াছিন নামে আওয়ামীলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ও স্থানীয় বাজার কমিটির সভাপতি সেগুলো ভাড়া দিয়েছেন।

পাহাড়ের নিচে প্রায় ৩০ লাইন কলোনি আছে। প্রতি কলোনিতে ৫-৬টি ঘর আছে। এর মধ্যে শুধু ইয়াছিনের ভাড়া ঘর আছে ৩৫ থেকে ৪০টি। প্রতিটি রুমের ভাড়া ১ হাজার ২শ টাকা বলে তিনি জানান।

উত্তর পাহাড়তলী ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আব্দুস সাত্তার সেলিম বাংলানিউজকে বলেন, ‘এখানে যারা থাকেন তারা কেউ রিক্সা চালান, কেউ দিনমজুর, কেউ তরকারি বিক্রেতা আবার কেউ গার্মেন্টসে চাকুরী করে। তাদের দারিদ্রতার সুযোগ নিয়ে একটি মহল পাহাড়ের নিচে তাদের ঘর ভাড়া দিয়ে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে।’

স্থানীয়রা জানান, গত তিনদিন ধরে পুলিশ, পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটি ও ওয়ার্ড কাউন্সিলরের পক্ষ থেকে কয়েক দফা মাইকিং করে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারীদের সরে যেতে বলা হয়েছিল। কিন্তু তাদের কেউই সরে যাননি।

স্থানীয়দের বর্ণনামতে, পাহাড়ের নিচে প্রায় ৩০ টি লাইনের মধ্যে মাটি চাপা পড়ে তিনটি লাইনে ৬টি করে ১৮টি কাঁচা বসতঘর সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছে। এতে তিনজনের লাশ উদ্ধারের পরও আরও বেশ কয়েকজন মাটি চাপা অবস্থায় থাকতে পারে বলে স্থানীয়রা জানান।

উল্লেখ্য চট্টগ্রাম নগরজুড়ে থাকা ১৩টি পাহাড়ের মধ্যে কমপক্ষে পাঁচটি পাহাড় আছে যেগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে জেলা প্রশাসন।

১৩টি পাহাড়ের মালিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আছে, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন, রেলওয়ে, ওয়াসা, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, গণপূর্ত বিভাগ, জমিয়াতুল উলুম ইসলামিয়া মাদ্রাসা, এ কে খান গ্রুপ, ইস্পাহানি গ্রুপ, জেমস ফিনলে এবং জনৈক হারুন খান, মীর মো.হাসান এবং সৈয়দ জিয়াদ হোসাইন।

গত পাঁচ বছরে এসব পাহাড়ের নিচে বসবাসকারী ১৫৮ জন বাসিন্দা পাহাড় ধসে মর্মান্তিকভাবে মৃত্যুবরণ করেছেন।

এর মধ্যে ২০০৭ সালের ১১ জুন নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ১২৭ জন, ২০০৮ সালের ১৮ আগস্ট লালখান বাজারের মতিঝর্ণা পাহাড় ধসে ১১ জন, ২০১১ সালের ১ জুলাই বাটালি পাহাড়ের রিটেইনিং দেয়াল ধসে ১৭ জন এবং সর্বশেষ গত ১৭ জুন নগরীর ফিরোজ শাহ কলোনিতে একজন সহ নিহত হয়েছেন। এছাড়া বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন সময় আরও দু’জন পাহাড় ধসে নিহত হয়েছেন।

বাংলাদেশ সময়: ০৩৫২ ঘন্টা, জুন ২৭, ২০১২
 আরডিজি/সম্পাদনা: বেনু সূত্রধর, নিউজরুম এডিটর

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Bookmark and Share
REVE Systems
VISA Center Inc
Holy Hajj BD
RehabHousing.com

জাতীয়

8877
Kaspersky Lab - Antivirus Software [ Bangladesh ]
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম | এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন

ফোন: +৮৮০ ২ ৮৪০২১৮১, ৮৪০২১৮২ আই.পি. ফোন: +৮৮০-৯৬১২১২০০০০ নিউজ রুম সেল: +৮৮-০১৭২৯০৭৬৯৯৬, ০১৭২৯০৭৬৯৯৯ ফ্যাক্স: +৮৮০ ২ ৮৪০ ২৩৪৬
ইমেইল: news.bn24@gmail.com, editor.banglanews@gmail.com, editor@banglanews24.com    বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম    এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন

বাংলায় লেখা হলে ইউনিকোডে পরিবর্তন করে ইমেইল করুন    কপিরাইট © 2013 সকল স্বত্ব ® সংরক্ষিত    একটি ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেড প্রতিষ্ঠান