 |
ঢাকা: ‘‘দেয়ালে ও মেঝেতে রক্ত আর রক্ত। কাদের মোল্লার নেতৃত্বাধীন অবাঙালি বিহারি বাহিনীর নির্যাতন ক্যাম্প ঢাকার মিরপুরের গ্রাফিক আর্ট ইনস্টিটিউটের ১৭ ডিসেম্বর’৭১ এর দৃশ্য এটি। একই দিন রায়েরবাজার বধ্যভূমি, মিরপুর বাংলা কলেজ ও লেক এবং শিয়ালবাড়ী বধ্যভূমিতেও দেখেছি ক্ষতবিক্ষত অসংখ্য লাশ। এর প্রায় সবই কাদের মোল্লার অপকীর্তি।’’
ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিতে এসে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ‘মিরপুরের জল্লাদ বা কসাই’ হিসেবে পরিচিত আব্দুল কাদের মোল্লার নৃশংস-নির্মম নির্যাতনের এ রকমই মর্মস্পর্শী বর্ণনা দিয়েছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা শহিদুল হক মামা। তিনি বলেন, ‘‘এ দুঃখ, এ বেদনা, এ দৃশ্য দেখে স্বাভাবিক থাকতে পারি নাই।’’
তিনি অভিযোগ করেন, কাদের মোল্লা মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে প্রত্যক্ষ নেতৃত্ব দিয়ে ও সরাসরি সম্পৃক্ত থেকে কবি মেহেরুন্নেসাসহ তার মা-ভাইকে হত্যা, বুদ্ধিজীবীদের হত্যা, মিরপুরের নূর হোসেনসহ তার পরিবারের সদস্যদের হত্যা, বাংলা কলেজের ছাত্র পল্লবসহ সাত জনকে হত্যা করেছেন। তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু মন্টু ও বাড়ির পাশের তোরাব আলীকে কাদের মোল্লারা হত্যা করে বলেও জানান শহিদুল।
মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে দ্বিতীয় সাক্ষী শহিদুল হক মামা ছিলেন মহান মুক্তিযুদ্ধে কেরানীগঞ্জের মুক্তিযোদ্ধাদের গ্রুপ মামাবাহিনীর প্রধান।
মঙ্গলবার কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে বিচারপতি এ টি এম ফজলে কবীরের নেতৃত্বাধীন ৩ সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে-২ সাক্ষ্য দেন তিনি। তিন ঘণ্টার সাক্ষ্যে কাদের মোল্লার যুদ্ধাপরাধের নানা ঘটনা তুলে ধরে তার শাস্তি দাবি করেন মিরপুর শত্রুমুক্ত করার অভিযানেও নেতৃত্ব দেওয়া এই মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার।
শহিদুল হক মামা বলেন, ‘‘১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের পরদিন ১৭ ডিসেম্বর গ্রাফিক আর্ট ইনস্টিটিউটে যাই। সেখানকার দেয়াল ও মেঝেতে রক্ত আর রক্ত। সেখানকার বিহারি ও রাজাকার-আলবদরদের গ্রেফতার করি। তাদের স্বীকারোক্তি মোতাবেক রায়েরবাজার ইটের ভাটার বধ্যভূমিতে ছুটে যাই। নিজ হাতে অসংখ্য বুদ্ধিজীবীর ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার করেছি। ছোট একটি বস্তাভর্তি মানুষের চোখ পাই। চোখগুলো মাটিচাপা দেই।’’
তিনি বলেন, ‘‘রায়েরবাজারে এখন যেখানে বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ সেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সাংবাদিক, চিকিৎসকদের চোখ বেঁধে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করেছে ওরা। তাদের বীভৎস লাশগুলো পড়েছিল ডোবা-নালা, পানিতে, ইটের স্তুপের মাঝে। এ দুঃখ-বেদনার এ দৃশ্য দেখে স্বাভাবিক থাকতে পারি নাই।’’
মামা বলেন, ‘‘মিরপুর বাংলা কলেজে গিয়ে দেখলাম, অসংখ্য লাশ। পাশের লেক থেকেও লাশের দুর্গন্ধ। লেকের পানিতে ভাসছিল লাশ আর লাশ। সেসব লাশও উদ্ধার করলাম। শিয়ালবাড়ী বধ্যভূমিতে গিয়েও দেখলাম করুণ দৃশ্য।’’
তিনি বলেন, ‘‘মিরপুরে আমার নিজের বাড়িতেও কিছুই ছিল না। সেখানে গিয়ে দেখলাম, চারিদিকে ধ্বংসস্তুপ। সব কিছু লুটপাট করে নিয়ে বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল কাদের মোল্লারা।’’
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাত থেকে ১৯৭২ সালের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত মিরপুর, রায়েরবাজার, কেরাণীগঞ্জ, সাভারসহ ঢাকার বিভিন্ন স্থানে নৃশংসতা চালিয়েছেন এই কাদের মোল্লা। ২৫ মার্চ মধ্যরাত থেকে তিনি বিহারি ও অবাঙালিদের সঙ্গে নিয়ে বাঙালিদের নিধনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। বিশেষ করে মিরপুর ও মোহাম্মদপুর ছিলো তার নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা। মিরপুর ছাড়াও শিয়ালবাড়ী ও রূপনগরে অনেক মানুষকে তার প্রত্যক্ষ মদদে মাটি চাপা দেওয়া হয়। কেরানীগঞ্জের শহীদনগরেও তিনি অনেক গণহত্যা চালিয়েছেন।
কাদের মোল্লার সহযোগীদের মধ্যে হাসিব হাশমী, আব্বাস চেয়ারম্যান, হাক্কা গুণ্ডা, নেহার ও আক্তার গুণ্ডার নাম উল্লেখ করে শহিদুল জানান, মুক্তিযুদ্ধের প্রথম দিকেই কাদের মোল্লা অবাঙালিদের নিয়ে নিজস্ব ওই সশস্ত্র বাহিনী গঠন করেছিলেন। এ বাহিনী মিরপুরের বিভিন্ন এলাকা থেকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষকে ধরে এনে শিয়ালবাড়ী, রূপনগর, বালুঘাটসহ বিভিন্ন স্থানে গুলি করে নির্বিচারে হত্যা করে। আর তার হাতে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের লাশ উদ্ধার হয় রায়েরবাজার ইটভাটার বধ্যভূমিতে।
শহীদুল হক মামা তার সাক্ষ্যে মিরপুর এলাকায় কাদের মোল্লার যুদ্ধাপরাধের ঘটনাগুলো তুলে ধরেন। সাক্ষ্যে তিনি বলেন, “একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ঢাকার মিরপুর ও মোহাম্মদপুরে জামায়াত, ইসলামী ছাত্র সংঘ, রাজাকার ও আলবদর বাহিনীর পাশাপাশি অবাঙালি বিহারিদের নিয়ে কাদের মোল্লা মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে নেতৃত্ব দেন। ওই দুই এলাকায় যে সকল মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনা ঘটেছে তা থেকে আব্দুল কাদের মোল্লা কোনোভাবেই বিচ্ছিন্ন ছিলেন না।”
এর আগে গত ৩ জুলাই প্রথম সাক্ষী বীর মুক্তিযোদ্ধা মোজাফফর আহমেদ খান সাক্ষ্য দেন। তার সাক্ষ্যের মধ্যে বের হয়ে এসেছিল, কেরানীগঞ্জের শহীদনগর গ্রামের ভাওয়াল খান বাড়ি ও খাটারচরসহ পাশের আরো দু’টি গ্রামের অসংখ্য লোককে কাদের মোল্লার নেতৃত্বে গণহত্যার ঘটনা।
বাংলাদেশ সময় : ২০০৫ ঘণ্টা, জুলাই ১০, ২০১২
জেএ/সম্পাদনা : অশোকেশ রায়, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর ; জুয়েল মাজহার, কনসালট্যান্ট এডিটর jewel_mazhar@yahoo.com