 |
খুলনা: দামুদর মুক্তময়ি মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে বাণিজ্য বিভাগে এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে আইরিন (১৫)। এক বুক কষ্ট নিয়ে সকালে সে পরীক্ষা দিতে গেছে। পরীক্ষার আগে সবাই যখন মা বাবার পায়ে সালাম করে দোয়া নিয়েছে তখন সে পারেনি তার বাবার পায়ে সালাম করতে। পারেনি বাবাকে বলে যেতে। কেবল কবরের কাছে গিয়ে দু’চোখ ভেজা অশ্রু ফেলে অব্যক্ত ভাষায় বাবার কাছে দোয়া চেয়েছে। আর মাকে জড়িয়ে ধরে বুক ভাসিয়ে কেঁদেছে।
রোববার মাধ্যমিক পরীক্ষার (এসএসসি) প্রথম দিন খুলনার ফুলতলা উপজেলার দামুদর পূর্বপাড়া গাঙকুল গ্রামের হরতালের আগে নাশকতায় নিহত বাসচালক বদর আলী বেগের বাড়িতে এ হৃদয়বিদারক দৃশ্য সবার চোখে অশ্রু ঝরায়।
উল্লেখ্য, গত বছরের ২১ এপ্রিল সারা রাত গাড়ি চালানোর পর রাজধানীর খিলগাঁওয়ে ঈগল পরিবহনের বাসে ধরিয়ে দেওয়া আগুনে ঘুমন্ত অবস্থায় দগ্ধ হয়ে মারা যান বাসটির চালক বদর আলী বেগ।
অতি দরিদ্র পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী বদর আলীর মৃত্যুর পর আকাশ ভেঙে পড়ে তাঁর পরিবারের উপর। স্ত্রী হাওয়া বেগম দিশেহারা হয়ে পড়েন তিন ছেলে মেয়ে নিয়ে। বিশেষ করে উদ্বেগে পড়ে যান তাঁর দশম শ্রেণী পড়ুয়া ছোট মেয়ে আইরিনকে নিয়ে। কিন্তু তার এতো দুঃশ্চিন্তার অবসান ঘটে গত ২৬ মে। ওই দিন বদর আলীর পরিবারের প্রতি সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান। অসহায় পরিবারটিকে নগদ দুই লাখ টাকা সহায়তা দেন তিনি।
এ দিন বদর আলী ছাড়াও সংগ্রামী মানুষ হযরত আলীর পরিবারকে আর্থিক অনুদান প্রদান করেন তিনি। ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনারের কার্যালয়ে আয়োজিত সহায়তা প্রদান অনুষ্ঠানে সেদিন আরও উপস্থিত ছিলেন বসুন্ধরা গ্রুপের প্রধান উপদেষ্টা মাহবুব মোর্শেদ হাসান, বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কমের এডিটর-ইন-চিফ আলমগীর হোসেন, দৈনিক কালের কণ্ঠের সম্পাদক ইমদাদুল হক মিলন, বাংলাদেশ প্রতিদিনের সম্পাদক নঈম নিজাম, দ্য ডেইলি সানের (তৎকালীন) ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক জামিলুর রহমান, বসুন্ধরা গ্রুপের মিডিয়া উপদেষ্টা মোহাম্মদ আবু তৈয়ব, ডিএমপি কমিশনার বেনজীর আহমেদ প্রমুখ।
পরীক্ষা দিতে যাওয়ার আগে আইরিনের সঙ্গে কথা হয় বাংলানিউজের। এসময় আইরিন বসুন্ধরা গ্রুপের প্রতি কৃজ্ঞতা স্বীকার করে বলে, “বসুন্ধরার টাকা না পেলে আমার এসএসসি পরীক্ষা দেওয়া হতো না।”
আবেগ আপ্লুত কণ্ঠে আইরিন বলে, “বাবার ইচ্ছা ছিল আমাকে এসএসসি পরীক্ষা দেওয়াবেন। আজ বাবার ইচ্ছা পূরণ হতো না, যদি না বসুন্ধরা গ্রুপ এ সহযোগিতা করতো।”
আইরিন বাংলানিউজের মাধ্যমে বসুন্ধরা গ্রুপের কাছে দাবি জানায়, “লেখাপড়া শেষে আমি যেন বসুন্ধরা গ্রুপে চাকরির সুযোগ পেয়ে দেশ ও মানুষের কল্যাণে কাজ করতে পারি।”
আইরিনের মা হাওয়া বেগম কান্না জড়িত কন্ঠে বাংলানিউজকে বলেন, “তাঁর (বদর আলী) উপার্জনের টাকা দিয়েই সংসার চলত। আর কোনো উপার্জনের পথ ছিল না। বড় মেয়েটার বিয়ে হয়েছে। বেকার ছেলেটার ভবিষ্যৎ কী এখনো বলতে পারছি না। বর্তমানে বসুন্ধরা গ্রুপের দুই লাখ টাকা ব্যাংকে রেখে লাভের টাকায় সংসার কোন রকমে চালাচ্ছি।
তিনি বাংলানিউজকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, “স্বামীর মৃত্যুর পর সবার আগে বাংলানিউজ আমাদের বাড়িতে এসেছে। আমাদের আর্তনাদ তুলে ধরেছে। যার কারণে আমরা সাহায্য পেয়েছি। ”
তিনি আরও বলেন, “বসুন্ধরা গ্রুপের জন্য আমাদের মতো গরিব মানুষের দোয়া ছাড়া আর কিছু দেওয়ার নেই। তাই আল্লাহর কাছে দোয়া করি, যারা আমাদের দুঃখের সময় পাশে থেকেছেন তাদের যেন আল্লাহ মঙ্গল করেন।”
বদর আলী বেগের প্রতিবেশী দামুদর পূর্বপাড়া গাঙকুল গ্রামের ব্যবসায়ী মো. মুন্না বাংলানিউজকে বলেন, “বসুন্ধরা গ্রুপ অসহায় মানুষকে সহযোগিতা করে যা বিভিন্ন সময় পত্রিকায় দেখেছি। এবার প্রতিবেশী বদর আলীর পরিবারকে সহায়তার মাধ্যমে খুলনায়ও বসুন্ধরা গ্রুপ তাদের মহানুভবতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করল।”
অপর এক প্রতিবেশী ফুলতলা উপজেলার মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান সামসুন্নাহার কুমকুম বলেন, “বদর আলী বেগ অতি সহজ-সরল দরিদ্র মানুষ ছিল। তার মৃত্যুতে পরিবারটি আসহায় হয়ে পড়েছিল। বাংলানিউজে খবর ছাপা হওয়ার পর হতদরিদ্র এই পরিবারটির পাশে বসুন্ধরা গ্রুপ যে মানবিক সহযোগিতা করেছে তা খুলনাবাসী আজীবন মনে রাখবে।”
উল্লেখ্য, বদর আলীর মৃত্যুর খবর ওইদিন বিকেল ৩টায় বাংলানিউজে প্রচার হওয়ার পর তাৎক্ষণিক বাংলানিউজের খুলনা প্রতিনিধি ছুটে যান তার বাড়িতে। পরে সন্ধ্যায় নিহত বদর আলীর পারিবারিক অবস্থার পূর্ণ বিবরণ দিয়ে ‘হাসিনা-খালেদা রাজনীতি করে আমার স্বামীরে মেরে ফেলেছে’ এই শিরোনামে সংবাদ তৈরি করে প্রকাশ করে যা পাঠকের মানবতাবোধে নাড়া দিতে সক্ষম হয়।
বাংলাদেশ সময়: ০৮৩০ ঘণ্টা, ফেব্রুয়ারি ৩, ২০১৩
সম্পাদনা: হুসাইন আজাদ, নিউজরুম এডিটর-eic@banglanews24.com