 |
আর কোনো পেশার সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে না পেরে একদার কবি আহমদ শাহেদ বিভিন্ন লেখকের সাক্ষাৎকার নিয়া বেড়ায়। প্রতি সাক্ষাৎকার ছাপা হলে হাজারদেড়েকের মতো পায়। এই কাজ করতে করতে সে কাহিল। কিন্তু থেমে গেলেই ইনকাম বন্ধ। কবিতাও লিখতে পারে না এখন আর। যে কেউ, মানে যে কোনো সাহিত্য সাময়িকীর সম্পাদকরা এখন তাকে ফরমায়েশ দেয় অমুকের একটা ইন্টারভিউ করো, তমুকের একটা ইন্টারভিউ করো।
ঢাকার প্রায় পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদকরাই একদার কবি। সবারই প্রায় একাধিক বই আছে। এই বই বা একদার কবিতা লেখার চেষ্টা আসলে এ পর্যন্ত আসার সিঁড়ি। এরকমই এক জাদরেল পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক লোকায়ত হাসান। লোকায়ত হাসানের আসল নাম ছিলো হাসানুদ্দিন। বাড়ির লোকজন ডাকতো হাসানুদ্দি বইলা। সে কবে মনে নাই হাসানুদ্দি মফস্বলের পত্রিকায় কবিতা দিতে গেলে সম্পাদক মশাই বলেছিলেন, বাঙালির পোলা, স্বাধীন দেশে কবিতা লেখবা পুরা আরবি নাম লইয়া, এইটা হইলো? কাচুমাচু করছিলো হাসানুদ্দি। তখনই জাতীয়তাবাদের একটু বাতাস লাগে তার মনে। পরে যখন ঢাকার পত্রিকায় তার কবিতা পাঠালো তখন কবিতার নিচে সে লিখল লোকায়ত হাসান। আসলে যে পত্রিকায় লেখা পাঠাইছিলো তার নাম ছিল লোকায়ত। অই নামেই তার কবিতাটা ছাপা হয়েছিলো পত্রিকায়। পত্রিকাটা হাতে নিয়া জন্মদাতার মতো গর্ব হয়েছিলো হাসানুদ্দির। তার মনে হয়েছিলো তার বাপ নয় সে নিজেই নিজের জন্মদাতা। অবশ্য কাছের লোকজন তাকে ধিক্কার দিয়েছিলো। হিন্দুঘেষা বাংলা নাম নিজের নামের আগে লাগানোর কারণে। অনেকে চিনতেও পারে নাই।
যাইহোক লোকায়ত হাসান দেশের অন্যতম প্রচারবহুল সংবাদপত্রের সাহিত্য সম্পাদক। তার বাসাতেই একটা ইন্টারভিউ নিয়া গিয়েছিলো আহমদ শাহেদ। অবশ্য এটা লোকায়ত হাসানের দেয়া অ্যাসায়েনমেন্ট ছিলো। লোকায়ত হাসানের চাররুমের এই বিলাসবহুল ফ্ল্যাট দেখে টাসকি খায় আহমদ শাহেদ। সে ভাবে হাসান কত টাকা বেতন পায়? একরুমের মধ্যেই লোকায়ত হাসানের বাস। বাকি তিনরুম একদম খালি একটা ফার্নিচার পর্যন্ত নাই। তবে লোকায়ত হাসান নিজেকে বাউল টাইপের সাধারণ মানুষ ভাবতে পছন্দ করে। শরীরটাকে নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। কাঁধ পর্যন্ত লম্বাচুল। আসলে বাউলের মতোই লাগে। কথার ফাঁকে ফাঁকে হাসান চুলের মধ্যে হাত চালাতে পছন্দ করে। হাসান অবশ্য এখন আর কবিতা লিখতে পারে না। কবিতা লিখতে না পারলেও তার ক্ষমতা আর জীবনযাপনের কারণে স্টার হয়ে আছে ঢাকার কবিজগতে।
লোকায়ত হাসান তার জীবন যাপন নিয়া অনেক বিতর্কের জন্ম দিয়াছে। এরকমও গল্প জারি আছে তার নামে কোনো মহিলা সাহিত্যমোদি মানে সে কুমারি, তরুণী বা প্রৌঢ় যাইহোক না কেন লোকায়ত হাসানের কাছে একবার যাওয়াই যথেষ্ট। মেয়ে পটাতে খুবই উস্তাদ হাসান। আর মদ গাজা চরস সহকারে নাকি সে ককটেল খাইতে পছন্দ করে। যাইহোক লোকায়ত হাসানের থাকার ঘরটাও দেখার মতো। কী নাই সেখানে। সমসাময়িক সবধরণের যন্ত্রপাতিতে ভরপুর।
আহমদ শাহেদের লেখাটা বিভিন্ন জায়গায় সম্পাদনা করছিলো হাসান। শাহেদ বসে আছে পেছনে। শাহেদ মনে মনে ভাবে ইস এইরকম একটা থাকার বা কাজ করার রুম পাইলে কাম সারছিলো! দিনে অন্তত একটা কইরা গল্প কবিতা লেখা সম্ভব। আড়চোখে চারদিকে তাকাচ্ছিলো সে। ঢাকার বেশির ভাগ সাহিত্য সহযাত্রীদের মতোই শামীমের কোনো কিছুর ঠিক ঠিকানা নাই। ফুটপাত থেকে শুরু করে গুলশান বনানী পর্যন্ত তার দৌড়। তার বন্ধু তালিকায় সদ্য ঢাকায় কবিতা লিখতে আসা তরুণ কবি থেকে শুরু করে রাত বারটার পর প্রেসক্লাবের সামনে রিকশা নিয়া খদ্দের খোঁজা বেশ্যা পর্যন্ত।
‘বিয়া শাদি করছেন নি?’ হঠাৎ জিগায় লোকায়ত হাসান।
‘যেভাবে জিনিসপত্রের, ভাড়াটাড়ার দাম বাড়ছে আর ইনকাম কমছে নিজেই চলতে পারতেছিনা বস, আবার বিয়ার কথা কন?’
‘দূর মিয়া বিয়া করতে কি টাকা লাগে? মালওয়ালা মাইয়া দেইখা বিয়া করলেইতো অয়?’ হাসান বলে।
‘টাকাওয়ালা মাইয়ারাও মালওয়ালা বেটা দেইখাই বিয়া করে বস। আপনার কী অবস্থা’ বলে শাহেদ।
‘আসছে আর যাচ্ছে। দুই নাম্বারটাও বিদেশ চইলা গেছে। আরেকটার লগে চলতেছে, এই আর কি।’ বলে হাসান।
‘এইটার ভাড়া কতো দিতে হয় বস’ বাসাভাড়ার দিকে ইঙ্গিত করলো শাহেদ।
‘তিরিশ হাজার’ বলে হাসান।
জানলার টবে কতগুলা বনসাই করা গাছ আছে। হাসান উঠে গিয়ে টবে পানি দেয়। হাসান এলোমেলো জীবনযাপন করলেও খুবই স্মার্ট। তিরিশ হাজার টাকা যদি বাসাভাড়া হয় শালা বেতন পায় কতো। মনে মনে ভাবে শাহেদ। শাহেদও বিভিন্ন চাকরি করেছে পনের হাজারের উপরে বেতন পায় নাই কোনোদিন। খুবই কষ্টেসৃষ্টে চলতে হয় ঢাকায়। হাসানদের কী এক মেনারিজম আছে ভাবে শাহেদ। এরা খুবই সুচতুর। কর্পোরেট লেভেলে এদের খুবই ভালো সম্পর্ক। কখনোই এরা টাকার অভাবে থাকে না। রাষ্ট্রের সমস্ত ধরনের সুবিধাই এরা পায়। কবি হিসাবে বিভিন্ন জায়গায় তাদের ডাক আসে। এইখানে কবিতা মুখ্য না। এতদিন ধরে আস্তে আস্তে গড়ে তোলা পরিচিতি আর কেরিয়ারই এই পথ প্রসস্থ করে।
ধরেন চা খান বলে একমগ চা শাহেদের দিকে বাড়িয়ে দেয় হাসান। শাহেদ হাত বাড়িয়ে নেয়। চুমুক লাগায়।
আপনারে কিন্তু এই ইন্টারভিউর জন্য মাত্র পনেরশ টাকা দিতে পারবো বস। বলে হাসান।
ঠিক আছে, একটু সময়মতো দিয়েন। এইসবইতো করি, অন্যকোনো কাজ করিনা। বলে শাহেদ।
ঠিক আছে। তাইলে আগামী শুক্রবারে পত্রিকা দেইখেন।
প্রায় সন্ধ্যা হয়ে আসে। শাহেদ বিদায় নিয়া হাসানের ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে আসে। হাসানের ফ্ল্যাট লিফটের ষোল তলায়। লিফটে উঠার সাথে সাথেই হাসানের ফোন বেজে উঠে। শামীম ফোন হাতে নিয়া দেখে তরুণ কবি সুদীপ্ত সামাদ। খুব সম্প্রতি ঢাকায় এসেছে।
‘শাহেদ ভাই, অনেক্ষণ ধইরা আপনাকে রিং দিচ্ছি। পাচ্ছিনা।’ বলে সুদীপ্ত
‘বলো, কেমন চলছে।’ শাহেদ জিগায়।
‘আর বইলেন না খুব সমস্যায় আছি ভাই, আজ রাত্রে কোথায় থাকবো জানি না। পকেটে একটা পয়সা নাই। আমারে একশটা টাকা দিতে পারলে খুবই উপকার হয় ভাই।’
‘মানুষকে ভালবেসোনা, বিপদে পড়লে সে তোমার সাহায্য চেয়ে বসে’ চেশোয়াভ মিউশের কবিতাটার কথা মনে পড়ে শাহেদের। খুব ইচ্ছা করে সুদীপ্তকে সাহায্য করতে। সরাসরি না বলতে তার বুকে কম্পন হয়। ‘আমি তোমাকে একটু পরে ফোন দিচ্ছি সুদীপ্ত। টেনশন কইরো না।’
আচ্ছা বলে ফোন রেখে দেয় সুদীপ্ত। শাহেদের কাছেও টাকা নাই। কার কাছে চাওয়া যায়। সে ভাবতে থাকে। ভাবতে ভাবতে একবার তার ইচ্ছা করে লোকায়ত হাসানকে ফোন দিয়া সুদীপ্তর থাকার ব্যাবস্থা করার চেষ্টা করবে নাকি? এই বিশাল ফ্লাটেতো হাসান একাই থাকে। ততোক্ষণে লিফট নিচে নেমে আসে। লিফট থেকে বেরিয়েই লোকায়ত হাসানকে ফোন দেয় শাহেদ।
‘বস, এক তরুণ কবি, তার থাকার জায়গা নাই আজ রাইতে। আপনার ওখানেকি তাকে একরাইতের আশ্রয় দেয়া যায়?’ আশ্রয় শব্দটা ইচ্ছা করেই ব্যবহার করলো শামীম।
খানিকক্ষণ চুপ থাকার পর লোকায়ত হাসান বলে ‘আমি কেন এই বার্ডেন নেব। তরুণ কবিদের আশ্রয় দেয়া কি আমার দায়িত্ব?’
‘আমি দায়িত্বের কথা ভেবে বলি নাই বস। একটা মানুষ বিপদে পড়লে তারে তো আমরা সহযোগিতা করি।’ বলে শাহেদ।
‘আপনার বাসায় রাখেন না কেনো?’ উল্টা প্রশ্ন করে হাসান।
‘আমার বাসায় আমি আর আমার রুমমেট শুইলে আর জায়গা বাকি থাকে না বস।’ বলে শাহেদ।
‘সরি’ বলে ফোন কেটে দেয় লোকায়ত হাসান।
বিপরীত দিক থেকে দুই চিন্তাস্রোত অনেক্ষণ নির্বাক করে রাখে শাহেদকে। হায় এক কবি তিরিশ হাজার টাকার চাররুমের ফ্ল্যাটে একা থাকে। তিনরুম খালী। আরেক কবির থাকার জায়গা নাই। এই মন্তাজ তাকে বিদীর্ণ করে। মনে মনে বলে সুদীপ্ত তুমি বড়ই বেমানান ভাই লোকায়ত হাসানের ফ্ল্যাটে। কারণ কবি হিসাবে তোমার কোনো নামডাক নাই।
শাহেদের নেয়া ইন্টারভিউটা সাময়িকীতে ছাপা হয়। বেশ বাহবাও পায় শাহেদ বন্ধু বান্ধবদের কাছে। বেশ কিছুদিনপর সে পত্রিকার হিসাব বিভাগে খোঁজ নেয় বিল হয়েছে কিনা জানতে। বিল হয় নাই দেখে সে ফোন দেয় লোকায়ত হাসানকে। লোকায়ত হাসান ক্ষেপে যায় তার উপর।
‘আপনার সাহসতো কম না। আপনি আমাকে ডিস্টার্ব করছেন কেন, বারবার? বিল হইছে কিনা পত্রিকার অফিসে গিয়া খোঁজ নেন?’ বলে হাসান।
‘দেখেন আমি কিন্তু আপনাকেই ইন্টারভিউটা দিয়েছিলাম। আপনি যদি বিল না করেন তাইলে ওরা পেমেন্ট করবো কেমনে?’ বলে শাহেদ।
‘আমি এই বার্ডেন নিতে রাজি না। আগামী সপ্তাহ পত্রিকায় খোঁজ নিয়েন। আমারে এভাবে আর যখন তখন ফোন দিয়েন না।’ ফোন রেখে দেয় হাসান।
সপ্তাহ খানেক পর পত্রিকার অফিসে খোঁজ নেয় শাহেদ। অফিস থেকে বলা হয় বিল হয় নাই। আর লোকায়ত হাসান ইতোমধ্যে সেই পত্রিকা ছেড়ে অন্য একটা নামি পত্রিকায় জয়েন করেছেন। শাহেদ লোকায়ত হাসানের নাম্বারটার দিকে তাকিয়ে থাকে। ফোন করার সাহস পায় না।
বাংলাদেশ সময়: ১৬১০ ঘণ্টা, ০২ অক্টোবর, ২০১২
সম্পাদনা : তানিম কবির, tanimkabir@gmail.com