ঢাকা: বাংলাদেশের আকাশে শনিবার সন্ধ্যায় ঈদ-উল ফিতরের চাঁদ দেখা যায়নি। ফলে পুরো ৩০টি রোজা পূর্ণ করে আগামী সোমবার উদযাপিত হবে পবিত্র ঈদ-উল ফিতর।
শনিবার সন্ধ্যা ৭টা ২০ মিনিটে দেশের কোথাও শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখা যায়নি বলে আনুষ্ঠানিকভাবে জানায় জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি। এ ঘোষণায় দেশবাসী জেনে যান, রোববার নয়, সোমবার সারা দেশে উদযাপিত হবে এবারের ঈদ-উল ফিতর।
এর আগে ঈদ-উল ফিতরের তারিখ নির্ধারণের জন্য সন্ধ্যা ঠিক পৌণে ৭টায় বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সভাকক্ষে শুরু হয় জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির ওই বৈঠক। ধর্মপ্রতিমন্ত্রী ও কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. শাজাহান মিয়া এতে সভাপতিত্ব করেন। ধর্মসচিব কাজী হাবিবুল আওয়াল, প্রধান তথ্য কর্মকর্তা (পিআইও) আমিনুল ইসলাম, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক শামীম এম আফজাল ও বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতিব মাওলানা সালাউদ্দিন আহমেদসহ কমিটির সদস্যরা এতে উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠক শেষে ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শাহজাহান মিয়া সাংবাদিকদের জানান, দেশের সাতটি বিভাগীয় এবং ৬৪টি জেলা কার্যালয় থেকে চাঁদ দেখার চেষ্টা করা হয়েছে। আবহাওয়া দফতর থেকেও পর্যবেক্ষণ চালানো হয়েছে। কিন্তু কোথাও চাঁদ দেখার খবর পাওয়া যায়নি।
তাই সোমবার ঈদ-উল ফিতর উদযাপনের সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। তিনি দেশবাসীকে ঈদের শুভেচ্ছা জানান।
এদিকে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির বৈঠকে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বিভাগীয় ও জেলা কার্যালয়, আবহাওয়া অধিদফতর, মহাকাশ গবেষণা ও দূর অনুধাবন প্রতিষ্ঠান (স্পারসো) থেকে পাওয়া তথ্য পর্যালোচনা করা হয়েছে।
শনিবার দেশের কোথাও শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখা না যাওয়ায় এ বছর বাংলাদেশে ৩০ রোজা পালন করতে হবে। সোমবার থেকে শাওয়াল মাস গণনা শুরু হবে এবং ওই দিন সারা দেশে ঈদ উল ফিতর উদযাপিত হবে।
দীর্ঘ ১১ মাস অপেক্ষা আর এক মাস সিয়াম সাধনার পর মুসলমানদের প্রধান এ ধর্মীয় আনন্দ-উৎসবকে বরণ করে নিতে সারা দেশেই চলছে সাজ সাজ রব। রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস পবিত্র রমজান শেষে অনাবিল খুশির সওগাত নিয়ে আসছে ঈদ। ঘরে ঘরে বইছে খুশির বন্যা। পথে ঘাটে বাজারে অলিতে গলিতেও উৎসবমুখর মানুষের ঢল নেমেছে।
ধনী-গরিব, ছোট-বড়, শত্রু-মিত্র সবাইকে এক কাতারে দাঁড় করায় ঈদ। এদিক থেকে ঈদ শুধু আনন্দের বার্তাই বহন করে না, সবাইকে সম্প্রীতি আর সৌহার্দ্যের বন্ধনে আবদ্ধ করে।
ঈদের আনন্দ থেকে কেউ বঞ্চিত হতে চান না। তাই কষ্ট হলেও প্রিয়জনদের সঙ্গে ঈদে শামিল হতে ইতিমধ্যে রাজধানী ছেড়েছেন লাখো মানুষ। গত একমাস ঈদের প্রস্তুতি নিতে চলেছে কেনাকাটা। যে যার সাধ্যমতো কেনাকাটাও সেরে নিয়েছেন।
নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতি, পথে পথে নানা বিড়ম্বনা, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার মধ্যেও দেশের মানুষ এখন ঈদ আনন্দ অনুভব করছেন।
রাজধানীসহ দেশের প্রধান প্রধান মসজিদ এবং ঈদগাহে ঈদ জামাতের প্রস্তুতিও এরই মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বিরোধী দলীয় নেতা ও বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ পৃথক বাণীতে দেশবাসীকে ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।
ঈদকে কেন্দ্র করে বেশিরভাগ মানুষ শেষ করেছেন ঈদের মূল কেনাকাটা। পরিবারের পাশাপাশি আত্মীয়-স্বজন ও দরিদ্রদের জন্যও সাধ্যমত কেনা হয়েছে নতুন পোশাক। ঈদের দিন অতিথি আপ্যায়নের জন্য চাল, তেল, মসলা, মুরগি, মাংস
আর ঈদ আয়োজনের অন্যতম প্রধান উপাদান সেমাই কেনার কাজও সারা।
অবশ্য শনিবার ‘চানরাত’ পর্যন্ত মার্কেটগুলোতে চলবে বিক্রি।
ঈদ উপলক্ষে ঢাকা মহানগর সেজে উঠেছে মনোরম সাজে। রোববার ঈদের দিনে বিভিন্ন সরকারি ভবনে আলোকসজ্জা করা হবে। এছাড়া প্রধান সড়কগুলো ‘ঈদ মোবারক’ লেখা ও কালেমাখচিত পতাকা দিয়ে সাজানো হবে। হাসপাতাল, এতিমখানা ও কারাগারগুলোতে উন্নতমানের খাবার পরিবেশনসহ বিশেষ আয়োজন রাখা হবে।
ঈদের আনন্দকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে বিভিন্ন চ্যানেলে পরিবেশিত ঈদের বিশেষ অনুষ্ঠানমালা। বিভিন্ন চ্যানেল ঈদের আগের রাত থেকে শুরু করে ৫দিন থেকে সপ্তাহব্যাপী বিশেষ অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করেছে।
ঈদ-উল ফিতরের প্রধান জামাত জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে সকাল সাড়ে ৮টায় অনুষ্ঠিত হবে। তবে আবহাওয়া প্রতিকূল থাকলে প্রধান জামাত সকাল ৯টায় বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে আয়োজন করা হবে।
এজন্য জাতীয় ঈদগাহে পর্যাপ্ত নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। মহিলাদের ঈদের নামাজ আদায়ের জন্য আলাদা ব্যবস্থা রাখা হবে। এছাড়া বিদেশি রাষ্ট্রদূত ও কূটনীতিবিদদের নামাজের জন্য আলাদা জায়গা সংরক্ষণ করা হবে।
অন্যদিকে ঈদের দিন বিভিন্ন হাসপাতাল, কারাগার, শিশু সদন, সামাজিক প্রতিবন্ধী কেন্দ্র, সেফ হোমস, ভবঘুরে কল্যাণ কেন্দ্র, দু:স্থ কল্যাণ কেন্দ্রে উন্নতমানের খাবার পরিবেশন করা হবে।
রাজধানীতে ঈদের প্রধান জামাত ইমামতি করবেন বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতিব প্রফেসর মাওলানা মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন। ঢাকা সিটি করপোরেশন এরই মধ্যে এ ব্যাপারে প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। আর জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে সকাল ৭টা, ৮টা, ৯টা, ১০টা ও ১১টায় মোট ৫টি ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হবে।
এছাড়া ঢাকা সিটি করপোরেশন রাজধানীর প্রতিটি ওয়ার্ডে ৪টি করে মসজিদ, মাঠ ও ঈদগাহে মোট ৩৬০টি ঈদের জামাতের আয়োজন করেছে।
সারা দেশের মধ্যে সর্ববৃহৎ ঈদ জামাতটি অনুষ্ঠিত হবে কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায়।
‘রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ।’ নজরুলের সেই আনন্দের শিহরণ জাগানিয়া কালজয়ী এ গান ধনী-গরিব, শিশু-কিশোর, তরুণ-যুবক প্রৌঢ়-বৃদ্ধ—সবার মনেই যেনো আনন্দের বার্তা নিয়ে আসে। রোববার সন্ধ্যা থেকে অনেকের মুখেই শোনা যাবে এ গানের সুর।
ঈদের আগের সন্ধ্যায় বেতার ও টেলিভিশনেও বেজে উঠবে আনন্দের এ সুর-গান। তবে মিলনের আকুতি, ঈদের খুশির বার্তা আগে থেকেই সবার মনে মোহন বাঁশির মতো বেজে উঠেছে।
বহু বছর আগে আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম এ কথাই তার গানে বলেছেন, ‘আজ ভুলে যা সব হানাহানি, হাত মেলা হাতে।’
বাংলাদেশ সময়: ১৯২০ ঘন্টা, আগস্ট ১৮, ২০১২
এসএআর/ সম্পাদনা: অশোকেশ রায়, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর