 |
ঢাকা: আল মারুফ খান দ্বিতীয়বারের মতো চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। অতি সম্প্রতি পুঁজিবাজারের বিভিন্ন বিষয় ও এর সমস্যা নিয়ে তিনি খোলামেলা কথা বলেছেন ‘বাংলানিউজ’-এর সঙ্গে। বাংলানিউজের পক্ষ থেকে তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন স্টাফ করেসপন্ডেন্ট শেখ নাসির হোসেন ।
বাংলানিউজ : বর্তমানে পুঁজিবাজার অস্থিতিশীল হওয়ার কারণ কী বলে আপনি মনে করেন?
আল মারুফ খান : বর্তমানে বাজার অস্থিতিশীল হওয়ার একাধিক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য যেটা মনে হয়, সেটা হচ্ছে- সাম্প্রতিক সময়ে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো তাদের ত্রৈমাসিক যে আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, দেখা যাচ্ছে যে এগুলোর বেশিরভাগই নেতিবাচক। বিশেষ করে ব্যাংকগুলোর ত্রৈমাসিক আর্থিক প্রতিবেদন অনেক খারাপ এসেছে। ফলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক ধরনের হতাশা দেখা দিয়েছে।
অন্যদিকে বর্তমানে আইপিও সংক্রান্ত বাজারে অনেক বিতর্ক শুরু হয়েছে। এটা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নানা ধরনের সংশয়ের সৃষ্টি করছে।
এছাড়া সম্প্রতি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার জন্য নতুন যেসব কোম্পানি আসছে, তাদের সম্পর্কে পত্র-পত্রিকায় যেসব তথ্য দেখা যায় তাতেও বিনিয়োগকারীরা হতাশ হচ্ছে।
সম্প্রতি অরিয়ন ফার্মার আর্থিক প্রতিবেদনে ভুল তথ্য প্রদান নিয়ে ডিএসই ও এসইসি’র মধ্যে যে মুখোমুখি অবস্থানের সৃষ্টি হয়েছে তাতেও বিনিয়োগকারীরা সন্তুষ্ট নয়।
সবকিছু মিলিয়ে গত দুই সপ্তাহ ধরে বাজার স্থিতিশীল হওয়ার চেয়ে অস্থিতিশীল হওয়ার সংবাদই বেশি ছিল। এসব কারণে সম্প্রতি বাজার অস্থিতিশীল হয়েছে বলে আমি মনে করি।
বাংলানিউজ : অনিয়মের জন্য ব্রোকারেজ হাউজগুলোর কী ধরনের শাস্তি হওয়া উচিত?
আল মারুফ খান : কোনো ব্রোকারেজ হাউজ অনিয়ম করলে তাদের বিরুদ্ধে আমরা কিছু শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়ে থাকি। যেমন- ওই হাউজের ট্রেড সাসপেন্ড বা বন্ধ করে রাখা হয়। এরপর এনফোর্সমেন্টের দায়িত্ব যেহেতু এসইসি’র কাছে তাই এসইসি তদন্ত করে গুরুত্ব বিবেচনা করে হাউজের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়।
আমরা যখন কোনো অভিযোগের সত্যতা পাই তখন প্রাইমারি রেগুলেটর হিসেবে কমিশনকে অবহিত করি। কমিশন এরপর গুরুত্ব বিবেচনা করে ব্যবস্থা নেয়। ব্যবস্থা হিসেবে হাউজগুলোকে জরিমানা করা হয়, তাদের লাইসেন্স বাতিল করাসহ আরও বিভিন্ন ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।
বাংলানিউজ : ব্রোকার হাউজের অনিয়মের কারণে অন্য শাস্তি না দিয়ে লেনদেন বন্ধ করা হয় কেন?
আল মারুফ খান : অনিয়মের জন্য হাউজগুলোর লেনদেন বন্ধ করা হয় মাত্র ২ দিনের জন্য। কারণ এই সময়ের মধ্যে ওই হাউজের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের তদন্ত করা হয়। তদন্তে যদি অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে এসইসি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে। সুতরাং সংক্ষেপে বলা যায়. অভিযোগের তদন্ত করার জন্য ব্রোকারেজ হাউজের লেনদেন বন্ধ করা হয়।
বাংলানিউজ : কোনো অভিযোগের ভিত্তিতে যখন হাউজের লেনদেন বন্ধ করে দেওয়া হয় তখন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা কতটুকু ক্ষতিগ্রস্ত হয়?
আল মারুফ খান : দেখুন, হাউজের লেনদেন বন্ধ করে দিলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা তো ক্ষতিগ্রস্ত হবেই। তবে সেই সঙ্গে এটাও দেখতে হবে যে, সঠিক সময়ে যদি হাউজগুলোর অনিয়মের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, সেক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বেড়ে যায়। ওই বিষয়ে তাদের শঙ্কা থেকে যায়। তাই হাউজের লেনদেন বন্ধের কারণে বিনিয়োগকারীরা একটু ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তা সবার জন্য সুফল বয়ে আনে।
এর আগে শেয়ার কেলেঙ্কারির জন্য আল-আরাফা সিকিউরিটিজ এবং ডন সিকিউরিটিজের লেনদেন বন্ধ করা হয়েছিল। সেখানে কিন্তু বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। কিন্তু তারপরও ওই হাউজগুলোতে শৃঙ্খলা ভঙ্গের বিষয়টি সমাধান না হওয়া পর্যন্ত বিনিয়োগকারীদের সংশয় কাটছিল না।
বাংলানিউজ : ব্রোকার হাউজগলোর বিভিন্ন অনিয়মের জন্য বিদ্যমান আইনগুলোকে কি যথাযথ বলে আপনি মনে করেন?
আল মারুফ খান : হ্যাঁ, বর্তমানে বিদ্যমান আইনগুলো এ ধরনের অপরাধের জন্য যথাযথ। আইনগুলো যথাযথভাবে প্রয়োগ করলেই কিন্তু অনেক অনিয়ম কমে যায়। কিন্তু আমরা তো বিদ্যমান আইনগুলোই প্রয়োগ করতে পারি না।
যেমন- কোনো অপরাধ প্রমাণে বিষয়ে সাক্ষী একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কোনো হাউজের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে সাক্ষী হিসেবে ওই হাউজের ব্যাংক স্টেটমেন্টটা খুবই দরকার। কিন্তু কমিশন অনেক সময় ব্যাংক স্টেটমেন্ট জোগাড় করতে পারে না। এ সমস্যাটি সমাধানের জন্য ব্যাংক অধ্যাদেশে পরিবর্তন আনা হচ্ছে। এছাড়া আদালতের শরণাপন্ন হলে বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হয়। এ প্রেক্ষিতে আমি মনে করি যে, বিদ্যমান আইনই যথেষ্ট, তবে এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া আরও সহজ হওয়া উচিত।
বাংলানিউজ : পুঁজিবাজারের বিভিন্ন অনিয়মের বিচার এসইসি কি সঠিকভাবে সম্পন্ন করতে পারছে?
আল মারুফ খান : অনেকে বলেন, এসইসি বিভিন্ন অভিযোগের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিচ্ছে না। কিন্তু এখানে দেখতে হবে যে, ওই অপরাধের সপক্ষে এসইসি কোনো প্রমাণ পাচ্ছে কি না। অন্যদিকে এ ধরনের বিচারে আলাদা আদালতের (দ্রুত ট্রাইব্যুনাল) প্রয়োজন থাকলেও তা নেই। তাই বাধ্য হয়ে প্রচলিত নিয়মে বিচার করতে গিয়ে বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘ হয়। আবার যাকে আইনজীবী নিয়োগ দেওয়া হয়, তিনি হয়তো এ বিষয়ে সম্যক ধারণা রাখেন না। এছাড়া সক্ষম আইনজীবী নিয়োগ দেওয়ার মতো অর্থও এসইসি-কে দেওয়া হয় না। তাহলে এসইসি কীভাবে দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবে?
বাংলানিউজ : দেখা যাচ্ছে যে, পুঁজিবাজারে এখন ধারাবাহিক দরপতন চলছে । এ অবস্থায় বাজারে স্থিতিশীলতা আনয়নে কী কী করা হতে পারে?
আল মারুফ খান : পুঁজিবাজারে ‘ধারাবাহিক দরপতন চলছে’ এমনটি আমি বলবো না। সূচক ৪ হাজার থেকে সাড়ে ৪ হাজারের মধ্যে ওঠানামা করছে। আপনারা লক্ষ্য করবেন যে, সূচক ৫০০/৬০০ পয়েন্ট কমলেও আবার কিন্তু ওই পরিমাণ সূচক বাড়ছে। সুতারাং ধারাবাহিক দরপতন না বলে সূচকের ওঠানামা স্থিতিশীল করতে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে।
বর্তমান দামে যদি কেউ শেয়ার ক্রয় করে, তবে তারা ভবিষ্যতে ভাল মুনাফা করবে -এমন আশাবাদী বিনিয়োগকারীও কিন্তু বাজারে আছে। তা না হলে শেয়ারগুলো কে কিনছে?
ডিএসই ও এসইসি’র মধ্যকার সঙ্কট দূর হলে বাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে।
এছাড়া ‘বাজার থেকে জঙ্গি অর্থায়ন হচ্ছে কি-না’ -এটা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক বিরাজ করছে। বাজার সংশ্লিষ্টদের এ বিষয়টি পরিস্কার করতে হবে এবং বাজারে গুজব ছড়ানো বন্ধ করতে হবে।
বাংলানিউজ : বাজার থেকে গুজব থেকে বিতাড়ণের উপায় কী বলে আপনি মনে করেন?
আল মারুফ খান : বাজারে দুই ধরনের লোক আছে। এক শ্রেণীর লোক গুজব ছড়ায় এবং তারাই লাভবান হয়। আর অন্য শ্রেণী গুজবে কান দিয়ে শেয়ার ক্রয় করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে এবং তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আর এ গুজব ছড়ানোর জন্য যে তথ্য দরকার তা আমরা স্টক এক্সচেঞ্জ, এসইসি ও কোম্পানির ইনসাইডাররা যেমন- পরিচালক, কর্মচারী, অডিটরসহ ওই প্রতিষ্ঠানের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সরবরাহ করে কি না -তা খতিয়ে দেখতে হবে।
এছাড়া তথ্য ফাঁসের বিষয়ে দেশে আইন থাকলেও তাদের ধরার জন্য কোনও চেষ্টা বা সরঞ্জাম আমাদের নেই। এসব অপরাধ ধরতে কিছু তদন্ত করতে হয়, কিছু টেকনোলজি ব্যবহার করতে হয় যা আমদের নেই। এ সমস্যাগুলো কাটিয়ে উঠতে পারলে গুজবের সমস্যাটি কাটিয়ে ওঠা যাবে।
বাংলানিউজ : এসইসি সম্প্রতি অতিরিক্ত প্রিমিয়াম নিয়ে ঘন ঘন আইপও’র অনুমোদন দিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখছেন?
আল মারুফ খান : প্রথম কথা হলো, আমরা যদি পরিসংখ্যান দেখি তাহলে দেখবো যে, ২০১০ সালে এসইসি সর্বোচ্চ ২৫/২৬টা আইপিও অনুমোদন দিয়েছিল। অন্যদিকে চলতি বছরে ১৬/১৭টা আইপিও অনুমোদন দিয়েছে এসইসি। সুতরাং বলা যায়, মাঝখানে আইপিও অনুমোদন দেওয়া বন্ধ ছিল, আবার একমাসে অনেকগুলো আইপিও অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, এটা সেকেন্ডারি মার্কেটে প্রভাব ফেলেছে।
কোম্পানির মৌল ভিত্তির ওপর প্রিমিয়াম নির্ধারণ নির্ভর করে। যদি একটি ৬ টাকার কোম্পানির শেয়ার ১ টাকায় বিক্রি হয়, তবে সেটা কি বাজারের জন্য ভাল লক্ষণ? সুতরাং ভাল কোম্পানিগুলোকে সব সময় প্রিমিয়াম দিতে হবে।
তবে এটা সত্য যে, আন্তর্জাতিক মানের অপব্যবহার করে বর্তমানে অনেক দুর্বল ভিত্তির কোম্পানি আইপিও-তে আসার চেষ্টা করছে। এমনকি কিছু এসেছেও। এ বিষয়টি সমাধানের জন্য আমরা কর্পোরেট গর্ভনেন্স গঠন করেছি। এরা বিভিন্ন কোম্পানির অনিয়ম খতিয়ে দেখছে।
বাংলানিউজ : আপনি সিএসই’র প্রেসিডেন্ট হিসেবে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন। গত এক বছরে আপনার উল্লেখযোগ্য সাফল্যগুলো সম্পর্কে সংক্ষেপে বলুন।
আল মারুফ খান : আমি মনে করি, গত এক বছরে আমার সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো- আমি স্টক এক্সচেঞ্জকে সমালোচনার ঊর্ধ্বে রাখতে পেরেছি। এসইসি’র সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে বাজার উন্নয়নে যা যা করার তা-ই আমি করেছি, বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট কোনো ইস্যু আমরা অমীমাংসিত রাখিনি, সিএসই’র সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য প্রচুর সময় দিয়েছি। কারণ যখন ডি-মিউচ্যুয়ালাইজেশন বাস্তবায়ন হবে তখন যেন স্টক এক্সচেঞ্জকে কোনও সমস্যায় পড়তে না হয়। গত এক বছর আমি ব্যয়ের বিষয়েও সচেতন ছিলাম। এছাড়া ডেরিভেটিভ মার্কেট, এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ড চালু, ইসলামিক ইনডেক্স চালু করার চেষ্টা করেছি।
বাংলানিউজ : আগামী এক বছরে বিনিয়োগকারীদের জন্য কি করবেন?
আল মারুফ খান : আগামী এক বছর স্টক এক্সচেঞ্জের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি সিএসই’র সার্ভিলেন্স বিভাগকে আরও শক্তিশালী করা হবে। যা বিনিয়োগকারীদের জন্য সুফল বয়ে আনবে।
বাংলাদেশ সময় : ঘণ্টা, নভেম্বর ২৭, ২০১২
এসএনএইচ/সম্পাদনা : সোহেল রহমান, সিনিয়র নিউজরুম এডিটর; জুয়েল মাজহার, কনসালট্যান্ট এডিটর eic@banglanews24.com