 |
প্রিয় কবি,
জন্মদিনের শুভেচ্ছা নিন। আপনি তিতাসের স্মৃতিকাতর এক কাব্য কারিগর আর আমি পদ্মা পারের বাসিন্দা। তাই আপনার মত আমিও স্রোতস্বিনী নদীর প্রতি প্রচণ্ড টান অনুভব করি। স্কুল জীবনে পাঠ্যবইয়ে থাকা আপনার লেখা ‘তিতাস’ কবিতাটি পড়েছিলাম, অসম্ভব রকমের মুগ্ধ হয়েছিলাম। কবিতার যে মাদকতা যে ব্যাখ্যাহীন আবেশ-আসর আছে, আছে পাঠককে অনির্বচনীয় আনন্দ প্রদানের ক্ষমতা সেটি বুঝেছিলাম কেমন করে জানি। তবে কবিতার কারিগর হিসেবে এর পুরো কৃতিত্বটাই ছিল আপনার।
“আমার মায়ের সোনার নোলক হারিয়ে গেল শেষে
হেথায় খুঁজি হোথায় খুঁজি সারা বাংলাদেশে।
নদীর কাছে গিয়েছিলাম, আছে তোমার কাছে?
-হাত দিওনা আমার শরীর ভরা বোয়াল মাছে।” (নোলক)
এরকম অসংখ্য কালজয়ী কবিতারই স্রষ্টা আপনি। যখন প্রথমবারের মত নোলক কবিতাটি পড়েছিলাম তখন নিজের মায়ের কথা মনে করে কান্না পেয়েছিল। এই ভালোবাসার কান্না তৈরি করার কৃতিত্বটাও কিন্তু আপনার।
আপনার ‘সোনালি কাবিন’র অন্যতম সম্পদ এর শব্দ সম্ভার। যেদিন প্রথম খুলে পড়ছিলাম সেদিন চোখে পড়েছিল কয়েকটি লাইন, বিস্মিত হয়েছিলাম আপনার অসাধারণ কাব্যভাষা দেখে।
"আমারতো কপিলে বিশ্বাস..
প্রেম কবে নিয়েছিলো ধর্ম কিংবা সংঘের শরণ?
মরণের পরে শুধু ফিরে আসে কবরের ঘাস।
যতক্ষণ ধরো এই তাম্র বর্ণ অঙ্গের গড়ন
তারপর কিছু নেই, তারপর হাতে ইতিহাস। (সোনালি কাবিন, সনেট-৪)
কবি,
এই চিঠিটি কেবল আপনাকে শুভেচ্ছা জানাতে লিখছি, তা নয়। আমার অন্যতম প্রিয় কবি হিসেবে আপনার প্রতি মনের মধ্যে যে ক্ষোভ জ্বলছে, তীব্র যন্ত্রণা হচ্ছে তা প্রকাশ করতেই হাতে কলম ধরেছি। কৈশোরে `তিতাস` পড়ে যতটা মুগ্ধ হয়েছিলাম, স্বাধীনতা বিরোধী জামায়েত ইসলামী`র সাথে আপনার দহরম-মহরম দেখে ঠিক ততটাই ব্যথিত হয়েছিলাম। যখন জামায়াতের কাছ থেকে সম্মাননা গ্রহণ করেছিলেন, আপন মনে মাথা নিচু করেছিলাম। শুধু লজ্জা, ক্ষোভ কিংবা অপমানে নয়, যে বিশ্বাস তিলে তিলে গড়ে উঠেছিল, যে ভালবাসা তৈরি হয়েছিল, তা এক নিমেষেই ভেঙে খান-খান হয়ে গিয়েছিল বলে।
আপনি একসময় সর্বহারা মানুষের জন্য কাজ করতেন, বুর্জোয়া ও মৌলবাদের বিপক্ষে কথা বলতেন; শ্রেণীদ্বন্দ্ব আর বস্তুবাদ নিয়ে তুমুল যৌবন অতিবাহিত করেছেন। সেই আপনিই কিনা সম্প্রতি মৌলবাদের খোঁজে অন্ধকারে আশ্রয় নিলেন! মানতে পারিনি। নিজেকে কোনভাবেই বোঝাতে পারিনি।
গত ১১ ই মার্চ রাতে দেশের শিল্পীদের নিয়ে চার দলীয় জোটের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এক সভায় আপনি উপস্থিত ছিলেন, সেটাতে আমার আপত্তি ছিল না। মাননীয় প্রধান বিরোধীদলীয় নেত্রীর ঠিক পাশেই আপনি বসে বক্তব্য রেখেছিলেন, সেটাতেও আমার কোন আপত্তি নেই। আমার আপত্তি, আপনি জামায়াত ঘরানার কবি সাহিত্যিক হিসেবে প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন।
শুনেছিলাম, আপনি একজন মুক্তিযোদ্ধা। নিজেও বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে একাধিকবার দাবি করেছিলেন, যদিও আসলে কতটুকু যোদ্ধা ছিলেন সে ব্যাপারে অনেকেই সন্দেহ পোষণ করে থাকেন। যাই হোক, একজন মুক্তিযোদ্ধা হয়ে আপনি কীভাবে জামায়াতের ছায়ায় আশ্রয় নিলেন, আমার বোধগম্য নয়।
আমি প্রথমে ভেবেছিলাম আপনি হয়তো ধর্মকর্মে মন দিয়েছেন, মেনে নিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু কিছুদিন পরেই আপনার দুরভিসন্ধি প্রকাশ পেল। যারা বাংলাদেশকে অস্বীকার করেছিল, এ দেশের ২ লাখ মা বোনের ইজ্জত লুণ্ঠনের নায়ক ছিল, এদেশের আবাল বৃদ্ধ-বনিতার রক্তে হাত রাঙিয়েছিল- আপনি তাদের পক্ষ নিলেন, অত্যন্ত সচেতন ভাবে। একজন ব্র্যান্ড আ্যামব্যাসেডরের ভুমিকায় নামলেন, প্রকাশ্যভাবে। এসব দেখে আমি খুব কষ্ট পেয়েছিলাম।
আপনি এক সাক্ষাতকারে আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘তাদের (পাকিস্তানি ও রাজাকারদেরও) অসংখ্য লোক মারা গেছে’। একজন মুক্তোযোদ্ধার কণ্ঠে এ ধরনের আক্ষেপ আছে- বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। আপনার প্রথম কাব্যগ্রন্থ হচ্ছে লোকলোকান্তর তারপরে হচ্ছে কালের কলস, সোনালি কাবিন। এই বইগুলোর মধ্য দিয়ে আপনার যে কাব্য ব্যক্তিত্ব বা চরিত্র তৈরি হয়েছে পরবর্তীকালে তা ক্রমশ বদলে যাচ্ছে। এটাকে বদলে যাওয়া বলব নাকি বিবর্তন নাকি অধ:পতন বলব আমি সন্দিহান হয়ে পড়েছি।
আপনি যে মৌলবাদী ও স্বাধীনতা বিরোধীচক্রের ছায়ায় আশ্রয় নিয়েছেন, তাতে একটা বিষয় খুব স্পষ্ট হয়ে গেছে, আপনি এখন আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাস করেন না এবং এক সাক্ষাৎকারে মুক্তিযুদ্ধকে আপনি পাকিস্তানের ঐক্য রক্ষার প্রচেষ্টা বলে মনে করেন-তা স্বীকার করেছিলেন।
আপনি একজন অসুস্থ্য মানুষের মতই দাবি করেছিলেন, কলকাতার মেয়েরা একাত্তরে আপনার লেখা কবিতা ব্লাউজের ভেতর ঢুকিয়ে রাখত।
ধন্যবাদ আপনাকে, আপনার বিবর্তনের মধ্য দিয়ে আর কিছু না হোক, অন্তত একজনের প্রগতিবাদের মুখোশ উন্মোচিত হয়েছে।
প্রিয় আল মাহমুদ,
আপনাকে আমরা অতীতে গণমানুষের কবি হিসেবে যেমন দেখেছি, আমরা আবারও আপনাকে সেইরূপে দেখতে চাই। এখনও সুযোগ রয়েছে, আপনি ফিরে আসুন আমাদের মাঝে আমাদের হয়ে, বাঙালির হয়ে, বাংলাদেশের হয়ে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারণকারী হিসেবে। স্বাধীনতা বিরোধী চক্রকে বয়কট করে আপনি প্রমাণ করুন, মুক্তিযোদ্ধারা চিরকাল মুক্তিযোদ্ধাই থাকে।
আমাদের প্রত্যাশা, আপনার হাতের ছোয়ায় আমরা আবারও মুক্তবুদ্ধিকে ছড়িয়ে দিতে পারব আনাচে কানাচে। আপনার সৃজনশীলতায়, আমরা আবারও গণমানুষের গান গাইব। আমরা আশা করছি, আপনার ফিরে আসার মধ্য দিয়ে বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ হয়ে উঠবে আরো গৌরবময়, আরো শ্বাসত, আরো সত্য। অপেক্ষায় থাকলাম।
ভাল থাকবেন।
নিবেদক
সিয়াম সারোয়ার জামিল
ব্লগার ও সংবাদকর্মী।
বাংলাদেশ সময়: ১৯০০ ঘণ্টা, ১১ জুলাই, ২০১২
সম্পাদনা: এম জে ফেরদৌস