 |
| ছবি: সোহেল সরওয়ার/বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম |
চট্টগ্রাম: যানজট নিরসনের কথা বলে নগরীর বহদ্দারহাটে ফ্লাইওভার নির্মাণের কাজ শুরু করলেও তা এখন পথচারী ও এলাকাবাসীর মরণফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকা ও এর আশপাশের বাসিন্দা এবং পথচারী মৃত্যুঝুঁকিতে রয়েছে।
নগর পরিকল্পনাবিদেরা বলেছেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতি ও সিডিএ’র যথাযথ তদারকির অভাবে চট্টগ্রামবাসীর স্বপ্নের ফ্লাইওভার এখন প্রতিমুহূর্তের আতঙ্ক। বারবার ঘটছে দুর্ঘটনা।
গত ২৯ জুনের একটি গার্ডার ধসে পড়া, গত বুধবার লোহার অ্যাঙ্গেল ভেঙে স্কুল শিক্ষিকার গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং শনিবার রাতে তিনটি গার্ডার ভেঙে পড়ে ১৪ জনের মৃত্যু সে আতঙ্ক বাস্তব হয়ে উঠেছে।
প্রকৌশলীরা বলছেন, নির্মাণকাজে পদ্ধতিগত ত্রুটি থেকে দুর্ঘটনা ঘটছে। শনিবারও একই কারণে দুর্ঘটনা ঘটে। আগের দুর্ঘটনা থেকে শিক্ষা না নেওয়ার কারণেই এ ধরনের দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে।
নগরীর ব্যস্ততম এলাকা বহদ্দারহাট জংশনে যানজট নিরসনে ফ্লাইওভার নির্মাণের উদ্যোগ নেয় চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)।
২০০৯ সালে এ ফ্লাইওভারের ভিত্তি স্থাপনের পর সিডিএ’র অধীনে ২০১০ সালের ৫ জানুয়ারি থেকে এর নির্মাণকাজ শুরু হয়। ১০৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন এ ফ্লাইওভারের কাজ করছে পারিশা এন্টারপ্রাইজ ও মীর আক্তার এন্টার প্রাইজ নামে দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
ফ্লাইওভার এখন যমদূত:
যানজট নিরসন করে নগরবাসীর স্বাভাবিক চলাচলের সুযোগ তৈরির জন্য ফ্লাইওভার নির্মাণ করার উদ্যোগ নিলেও সেটি এখন মানুষের জন্য যমদূত হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বহদ্দারহাট খাজা রোড এলাকার ইয়াছিন হাজি বাড়ির বাসিন্দা নুরুল আবছার বাংলানিউজকে বলেন, ‘‘সিডিএ চেয়ারম্যান চট্টগ্রামবাসীকে স্বপ্ন দেখিয়ে ফ্লাইওভার নির্মাণ করলেও এখানে ফ্লাইওভার নির্মাণের দরকার ছিল না।’’
বহদ্দারহাট-শাহ আমানত সংযোগ সড়কটি ডাবল লেন করলেই যানজট নিরসন হতো বলে মনে করেন তিনি।
‘‘স্বপ্নের সেই ফ্লাইওভার এখন আমাদের জন্য যমদূত। প্রতিমুহূর্তে আমরা এখন মৃত্যুর অপেক্ষায় থাকি।’’
আবছার জানান, শনিবার রাতে ফ্লাইওভারের গার্ডার ভেঙে পড়ে তার চাচা ইলিয়াস আলী ও ভাগিনা এনামুল হক মারা গেছেন।
ইলিয়াছ নির্মাণাধীন ফ্লাইওভারের পাশে বহদ্দার পুকুরের পাশে বসেছিলেন। আর এনাম পথচারী ছিল বলে জানান তিনি।
গাফিলতি দুর্ঘটনার কারণ:
নগর পরিকল্পনাবিদেরা বলছেন, ফ্লাইওভার নির্মাণের পদ্ধতিগত ত্রুটি, ঠিকাদারের গাফিলতি, সঠিক তদারকিতে দুর্বলতা ও উপযুক্ত নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হওয়াতে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে।
নগর পরিকল্পনাবিদ প্রকৌশলী আলী আশরাফ বাংলানিউজকে বলেন, কর্তৃপক্ষের গাফিলতি ও উদাসীনতার কারণেই এতগুলো প্রাণ ঝরে গেছে।
‘এর আগে আরো দুবার এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু এর থেকে তারা কোনো শিক্ষা নেয়নি। কর্তৃপক্ষ এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সতর্ক হলে এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটত না।’
আগের ঘটনা থেকে শিক্ষা না নেওয়া অপরাধ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘‘আগের ঘটনার পর তাদের শোধরানো প্রয়োজন ছিল। দরকার ছিল প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণের।’’
তিনি বলেন, ‘‘এ অপরাধ অমার্জনীয়। যে ক্ষতি হয়েছে তা অপূরণীয়।’’
নিরাপত্তার অভাবে মৃত্যুকে পরিকল্পিত হত্যা আখ্যায়িত করে আলী আশরাফ বলেন, ‘‘কাজ করার সময় যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখা জরুরি। এর ব্যবস্থা না করা অপরাধ। এর কারণে কারো মৃত্যু হলে তা পরিকল্পিত হত্যা। কারো গাফিলতি আর উদাসীনতার কারণে মানুষ হত্যা হবে তা তো হতে পারে না।’’
এ ছাড়া একটি নির্মাণাধীন ফ্লাইওভারের নিচে বাজার বসানোর জন্যও ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।
এদিকে, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) নির্মাণাধীন বহদ্দারহাট ফ্লাইওভারে গার্ডার ভেঙে হতাহতের ঘটনায় গভীর শোক ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বন্দর নাগরিক অধিকার পরিষদ।
পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রোটারিয়ান মো. ইলিয়াস এক বিবৃতিতে বলেন, ‘‘ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কর্তব্যে অবহেলা, নিম্নমানের কাজ, সিডিএ’র উদাসীনতার কারণে বারবার এ ফ্লাইওভার নির্মাণে দুর্ঘটনা ঘটছে।’’
নিরপেক্ষ তদন্ত, দোষী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং নিহত ও আহত ব্যক্তিদের পরিবারবর্গকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানান তিনি।
সিডিএ’র তদারকি নেই:
গত ২৯ জুন বহদ্দারহাটে নির্মাণাধীন ফ্লাইওভারের একটি গার্ডার ধসে পড়ে। ওইদিন শুক্রবার এবং জুমার নামাজ চলাকালীন এ দুর্ঘটনা ঘটাতে একজন রিকশাচালক সামান্য আহত হলেও বড় ধরনের দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পায়।
এ ঘটনার পর সিডিএ’র প্রধান প্রকৌশলী নাছির উদ্দিন মাহমুদকে প্রধান করে চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এ ঘটনার জন্য কাজের দায়িত্ব পাওয়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অদক্ষতাকে দায়ী করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেতে ৫টি সুপারিশ করেছিল।
কিন্তু এসব সুপারিশ আমলে নেয়নি সিডিএ কর্তৃপক্ষ। ফলে সুপারিশ না মেনেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ চালিয়ে যায়।
এ বিষয়ে কথা বলার জন্য সিডিএ চেয়ারম্যান আবদুচ ছালামের মোবাইলে একাধিকবার ফোন করলেও তিনি রিসিভ করেননি।
অন্যদিকে গার্ডার ভেঙে পড়ার পর চট্টগ্রামের বিভিন্ন রাজনীতিক, সরকারি কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। কিন্তু ঘটনার ২৪ ঘণ্টা পরও ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যাননি সিডিএ চেয়ারম্যন।
বাংলাদেশ সময়: ১৯০০ ঘণ্টা, নভেম্বর ২৫, ২০১২
এমইউ/টিসি