 |
ঢাকা: দেশে এবার ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। কৃষকের মুখে হাসি থাকার কথা। তার বদলে ক্ষুব্ধ তারা। কারণ উৎপাদিত ধান ন্যায্যমূল্যে বিক্রি করতে পারছেন না। দেশের বিভিন্নস্থানে তাই কৃষকরা প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে উঠেছেন।
কৃষকদের অভিযোগ, তাদের উৎপাদিত ধান সরকার কিনছে না। সরকার নির্ধারিত ধানের ক্রয়মূল্যের চেয়ে তাদের উৎপাদন খরচ বেশি। তাই, এবার ধানের বাম্পার ফলন ফলিয়ে উল্টো মাথায় হাত পড়েছে তাদের।
তারা অভিযোগ করেছেন, ধানের দাম বাড়লেও তাদের কোনো লাভ হয় না। সে লাভ যায় মধ্যস্বত্ত্বভোগীদের ঘরে। কারণ, তারা কম দামে ধান কিনে বেশি দামে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করে।
তেমনি আবার সরকার নির্ধারিত দামে ধান বিক্রি করতে গেলে তাদের উৎপাদন খরচ উঠছে না।
এদিকে, সরকারের খাদ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনামন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক একটি আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে বলেছেন, বর্তমানে দেশের খাদ্যগুদামগুলোতে প্রচুর ধান মজুদ রয়েছে। ফলে, সরকার চাইলেও ধান কিনে গুদামজাত করতে পারছে না।
এবারের বাম্পার উৎপাদন সূত্রে ধান বিদেশে রফতানি করার কোনো পরিকল্পনা সরকারের আছে কিনা জানতে চাইলে মন্ত্রী জানান, জুলাই-আগস্ট মাসে দেশে অনেক সময় প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘটনা ঘটে। সে ধরনের অবস্থার উদ্ভব হলে তখন ক্ষতিগ্রস্তদের সাহাযার্থে গুদামজাত চালের দরকার পড়বে। সে কারণে, সরকার বিদেশে চাল রফতানি করার কোনো চিন্তাভাবনা এখন পর্যন্ত করেনি।
কৃষকরা জানান, সরকার উৎপাদিত বোরো ধানের ক্রয়মূল্য নির্ধারণ করেছে প্রতি মণ ৭২০ টাকা। অথচ প্রতিমণ বোরো ধান উৎপাদনে খরচ পড়েছে অন্তত সাড়ে ৬শ টাকা থেকে ৭শ টাকা।
তারা অভিযোগ করছেন, তারপরেও সরকারি ক্রয় কেন্দ্র তাদের কাছ থেকে ধান কিনছে না। ফলে, বিক্রি করতে সরকারি ক্রয় কেন্দ্রে নিয়ে আসা ধান ফেরত নিয়ে যেতে হচ্ছে। তারা ধানচাষে আর উৎসাহবোধ করছেন না। এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে আগামীতে হয়তো অনেক কৃষক আর ধান উৎপাদন করবেন না।
তারা আরও অভিযোগ করেছেন, তাদের এই অসহায় অবস্থার সুযোগ নিচ্ছে ফড়িয়া মধ্যস্বত্ত্বভোগীরা।
ফড়িয়ারা সিন্ডিকেট তৈরি করে কৃষকদের কাছ থেকে প্রতিমণ ধান কিনছেন ৩শ টাকা দরে। এছাড়া শুকনো ধান ৪শ থেকে ৫শ টাকা দরে কিনে মজুদ শুরু করেছেন। এ পরিস্থিতির মুখে কৃষকরা এখন দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
এদিকে, সরকারি ক্রয় কেন্দ্রে ধান বিক্রি করতে ব্যর্থ হয়ে ক্ষুদ্ধ কৃষকরা দেশের বিভিন্ন এলাকায় ইতোমধ্যে বিক্ষোভ করতে শুরু করেছেন। জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনেও সম্প্রতি টুকরিতে ধান নিয়ে এসে বিক্ষোভ করে গেছেন কৃষকরা।
ধানের মূল্য মণপ্রতি সাড়ে ৮শ টাকা নির্ধারণের দাবিতে তারা কোথাও কোথাও সড়ক অবরোধ পর্যন্ত করছেন। বাংলানিউজসহ বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে এসব খবর প্রকাশিতও হয়েছে।
এ বিষয়ে বাংলানিউজের গাইবান্ধা জেলা প্রতিনিধি হেদায়েতুল ইসলাম বাবু জানান, সম্প্রতি গাইবান্ধায় রাস্তার ওপর ধানের বস্তা ফেলে সড়ক অবরোধ করেন সাধারণ কৃষকরা।
ধানের দাম ৮শ ৫০ টাকা নির্ধারণ এবং কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান ক্রয়, সেই সঙ্গে সব ধরনের কৃষি উপকরণের দাম কমানোর দাবিতে শত শত কৃষক গাইবান্ধা-সুন্দরগঞ্জ-রংপুর সড়ক অবরোধ করেন।
এসময় ওই সড়কে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায় এবং দু’পাশে প্রচুরসংখ্যক যানবাহন আটকা পড়ে।
মাগুরা জেলা প্রতিনিধি রূপক আইচ জানান, চলতি বোরো মৌসুমে বাম্পার ফলন ফলিয়েও মাগুরার কৃষকদের মুখে হাসি নেই। সার, বীজ, কীটনাশকের উচ্চমূল্যের পাশাপাশি কৃষি শ্রমিকের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির ফলে কৃষকরা চরম হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন।
মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার ঝামা গ্রামের কৃষক আশুতোষ বিশ্বাস নিজের ২ বিঘা জমিতে বোরো ধানের চাষ করেছেন। ধান হয়েছে ৬০ মণ। অথচ বিরাজমান পরিস্থিতির কারণে সব ধান বিক্রি করেও তার উৎপাদন খরচও ঠিকমত উঠবে না বলে জানালেন।
তিনি আরও জানান, বীজতলা তৈরি, সেচ, জমি চাষ, সার, কীটনাশক, শ্রমিকের মজুরি মিলে তার খরচ হয়েছে প্রায় ৩০ হাজার টাকা। অথচ ৫০০ টাকা দরে ৬০ মণ ধান বিক্রি করে তিনি পাবেন ওই ৩০ হাজার টাকাই।
গত ৩১ মার্চ যশোরের কেশবপুর উপজেলার ভাণ্ডারখোলা উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে চ্যানেল আইয়ের ‘হৃদয়ে মাটি ও মানুষ’ অনুষ্ঠানের উদ্যোগে ‘কৃষি বাজেট কৃষকের বাজেট’ শীর্ষক কৃষিখাত নিয়ে তৃণমূল কৃষক পর্যায়ের প্রাক বাজেট আলোচনার আয়োজনে নিজেদের হিস্যা ও অধিকার নিয়ে মতামত ব্যক্ত করেন যশোর, কেশবপুর, সাতক্ষীরার তালাসহ ও আশপাশের কয়েকটি উপজেলার প্রায় ১০ হাজার কৃষিজীবী নারী-পুরুষ।
হৃদয়ে মাটি ও মানুষ অনুষ্ঠানের উপস্থাপক শাইখ সিরাজের উপস্থাপনায় এখানে উন্মুক্ত আলোচনায় কৃষকরা ইউরিয়ার বাড়তি মূল্যের কথা তুলে ধরে বলেন, ধানসহ কোনো ফসল উৎপাদনেই তারা কোনোভাবে লাভবান হতে পারছেন না।
এ অবস্থা চলতে থাকলে কৃষি আবাদ থেকে সরে দাঁড়ানো ছাড়া তাদের সামনে আর কোনো বিকল্প থাকবে না বলে জানান তারা।
এসময় হতাশা ব্যক্ত করে কৃষকরা বলেন, গত ১ বছর ধরে কৃষক তার উৎপাদিত অধিকাংশ পণ্যেরই ন্যায্য মূল্য পাচ্ছে না। অথচ ইউরিয়া ও ডিজেলের মূল্য বেড়েছে। সরকার সেচের ক্ষেত্রে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দেওয়ার কথা বললেও কৃষকরা বিদ্যুৎ পাচ্ছেন না।
তাদের অভিযোগ, বিদ্যুতের সংযোগ পেতে একদিকে তাদের হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে, অপরদিকে, ঘণ্টায় ঘণ্টায় লোডশেডিংয়ের কারণে জমিতে স্বাভাবিক সেচও দিতে পারছেন না।
তারপর দেশে চলমান তাপদাহে ক্ষেতের ফসল পুড়ে নষ্ট হচ্ছে।
উন্মুক্ত প্রাকবাজেট আলোচনায় কৃষকরা ধানের দাম মণপ্রতি ১ হাজার ও পাটের দাম মণপ্রতি ২ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবি জানান।
কৃষকরা ছাড়াও দেশের কৃষক এবং বামপন্থি সংগঠনগুলো ধানের মূল্যবৃদ্ধির দাবিতে সভা-সমাবেশ করতে শুরু করেছে।
গত মঙ্গলবার রাজধানী ঢাকার সেগুনবাগিচার কার্যালয়ে আয়োজিত এক সভায় উৎপাদক কৃষককে বাঁচাতে ধান-চালে মূল্য সহায়তা, সরকারি ক্রয়নীতি ঘোষণা এবং তাদের কাছ থেকে সরাসরি ধান-চাল কিনতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানায় বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি।
ঢাকা মহানগর কমিটির সভায় সংগঠনটির নেতা সাইফুল হক অভিযোগ করে বলেন, ‘এ বছর আমন ধানের মণ প্রতি উৎপাদন খরচ ৫শ থেকে ৬শ টাকা হলেও দেশের অধিকাংশ স্থানে উৎপাদন খরচের চেয়ে অনেক কম দামে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে কৃষক সম্প্রদায়।’
তিনি বলেন, ‘কৃষি বাজারে ধানের দাম যখন বাড়বে, তখন অধিকাংশ চাষীর কাছেই আর বিক্রি করার মতো ধান থাকবে না।’
তিনি সরকারের প্রতি দ্রুত চাল কেনার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘সরকার বিলম্বে ধান-চাল সংগ্রহ শুরু করলে তার দ্বারা প্রকৃত চাষীর পরিবর্তে ফড়িয়া, আড়তদার, ব্যবসায়ী ও চাতালের মালিকেরাই লাভবান হবেন।’
এক্ষেত্রে সরকারি ভর্তুকি এ সমস্ত মধ্যস্বত্বভোগীদেরই পকেটে যাবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
অন্যান্য কৃষিপণ্যেরও ন্যায্যমূল্য কৃষকরা পায়নি উল্লেখ করে সাইফুল হক বলেন, ‘এ বছর কৃষকেরা পাট, আখ, আলুসহ অধিকাংশ কৃষিপণ্যেরই তেমন ন্যায্য দাম পাননি। এ অবস্থা চলতে থাকলে আগামী বোরো ফসলসহ কৃষি উৎপাদনে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।’
এছাড়াও রেশনিং ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে সরকারি গুদামের বর্তমান খাদ্যশস্য গরিবদের মধ্যে বণ্টনের আহ্বান জানান তিনি।
এছাড়াও বাংলাদেশ কৃষক সমিতি রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে সমাবেশ করে ধানের ন্যায্যমূল্য নির্ধারণের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।
কিন্তু এখনো এ বিষয়ে সরকারের কোনো ঘোষণা পাওয়া যায়নি। তাহলে এখন কৃষকদের সামনে কী করণীয় সে বিষয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট কোনো মহলই কিছু বলছেন না। সে কারণে কৃষকদের চোখে এখন শুধুই অন্ধকার।
বাংলাদেশ সময়: ১৬৫০ ঘণ্টা, ২৮ মে, ২০১২
সম্পাদনা: আহ্সান কবীর, আউটপুট এডিটর