 |
পত্রিকা মাধ্যমে জেনেছি বৃহদন্ত্রে ক্যানসার ধরা পড়ার পর গত বছর ১৪ সেপ্টেম্বর হুমায়ূন আহমেদ চিকিৎসার জন্য নিউইয়র্কে যান। সেখানে মেমোরিয়াল স্লোয়ান-ক্যাটারিং ক্যানসার ইনস্টিটিউটে দুই দফায় তাঁকে ১২টি কেমো দেওয়া হয়। ১২ জুন ম্যানহাটনের বেলভিউ হাসপাতালে অনকোলজি বিশেষজ্ঞ ডা. জেইন ও ক্যানসার সার্জন জজ মিলারের নেতৃত্বে তাঁর শরীরে অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়। ১৯ জুন হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে নিউইয়র্কের কুইন্সের ভাড়া বাসায় ফেরেন। তবে বাসায় ফেরার পর আকস্মিকভাবেই তাঁর অবস্থার অবনতি হতে থাকে। পুনরায় তাঁকে ওই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। দ্বিতীয় দফায় ২১ জুন তাঁর শরীরে অস্ত্রোপচার করা হয়। এরপর থেকেই তিনি নিবিড় পরিচর্যায় ছিলেন।
হুমায়ূন আহমেদ নিজভাষায় দেশের বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের ওপর তিনি আস্থা রাখতে পারেননি। তাই সুস্থ হতে পাড়ি জমিয়েছিলেন সুদূর নিউইয়র্ক। সঙ্গে ছিল আত্মীয়স্বজন আর দেশবাসীর দোয়া। কেমোথেরাপি শেষে গত ১১ মে তিনি দেশে আসেন। টেলিভিশনে তাকে দেখে আর কথা শুনে আমার মনে হয়েছিল এ যাত্রায় ক্যান্সারকে তিনি পরাজিত করলেন। তার মৃত্যু সংবাদ শোনার একদিন আগেও জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ড. এম এ মোমেন এর বরাতে জেনেছি তার অবস্থার উন্নতি হচ্ছে। এই যদি অবস্থা হয় তাহলে কী এমন হলো যে আমাদের শ্রেষ্ঠ কথাসাহিত্যিককে পরপারেই চলে যেতে হলো!
আমি জাতিসংঘের অঙ্গ সংগঠন ইউএনডিপির ফরেনসিক প্যাথলজিস্ট হিসেবে কাজ করতাম। কাজেরস্থল ছিল সামোয়ার রাজধানী আপিয়া। সে সময় কিডনি অপারেশনের পর হাসপাতালের নিবিঢ় পরিচর্যায় এক রোগী মারা গেলে আমার ডাক পড়ে। আমি ময়নাতদন্ত শেষে কিডনি সার্জনকে দায়ী করে প্রতিবেদন দাখিল করি। ঘটনাক্রমে সেই বিশেষজ্ঞ সার্জন একজন আমেরিকান হওয়ায় স্বাস্থ্য বিভাগের মহাপরিচালক আমাকে ডেকে পাঠান। আমি আমার প্রতিবেদনে অটল থাকলে তিনি বৃহদাকার তদন্তের আদেশ দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ওই আমেরিকান বিশেষজ্ঞ সার্জন আমার শরণাপন্ন হলে আমি পেশাগত কারণে প্রতিবেদনের স্বপক্ষে যুক্তি আর ময়নাতদন্তে প্রাপ্ত আলামত তার কাছে উপস্থাপন করি। তিনি আমার যুক্তি মেনে নিয়ে সবার অগোচরে চিরদিনের মতো হাসপাতাল ত্যাগ করেন।
কৃতিত্ব জাহিরের জন্য আমি এ ঘটনা উপস্থাপন করছি না। আসলে আমি হুমায়ূন আহমেদের অকাল মৃত্যু মেনে নিতে পারছি না। তার অপারেশনকালীন ও অপারেশন-পরবর্তী জটিলতায় মানুষ্য-সৃষ্ট কোনো ভুল ছিল কিনা তা নিশ্চিতভাবে পরিহার করতে চাই।
শোনা যায়, তিনি অজানা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন। তাই যদি হয়, তা কেন আমাদের মেনে নিতে হবে? অপারেশন-পরবর্তী পরিচর্যা তো চিকিৎসারই অংশ। উন্নত বিশ্বে যে হাসপাতাল ভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে ব্যর্থ সেটি তো চিকিৎসা সেবা প্রদানে অনুপযুক্ত বিবেচ্য হওয়ার কথা।
সব কিছু বিবেচনায় রেখে আমি হুমায়ূন আহমেদের মৃতদেহের সঠিক রিপোর্ট ও সঠিক ময়না তদন্ত বাঞ্ছনীয় মনে করছি। মনে রাখতে হবে, হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন সমগ্র বাঙালি জাতির সম্পদ। তার মতো প্রতিভাবানকে হাজার বছরের ‘ফুটন্ত ফুল’ হিসেবে বিবেচনা করলে ভুল হবে না।
লেখকঃ এমবিবিএস, এমসিপিএস, ডিএলএম, এলএলবি, এফআরসিপি, পিএইচডি; অধ্যাপক ও সিনিয়র ফরেনসিক কনসালট্যান্ট, ইউনিভার্সিটি টেকনোলজি মারা, মালয়েশিয়া।
ইমেইল: nasimul@salam.uitm.edu.my
বাংলাদেশ সময়: ১৫১৫ ঘণ্টা, জুলাই ২১, ২০১২
সম্পাদনা: রানা রায়হান, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর