 |
| ছবি: বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম |
চট্টগ্রাম: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) শাটল ট্রেনের প্রত্যেক বগিতে ২৪টি করে আসন নিজেদের দখলে নিয়েছে ছাত্রলীগ। আসনগুলো অঘোষিতভাবে ছাত্রলীগের সদস্যদের জন্য ‘সংরক্ষিত’ রাখা হচ্ছে।
সাধারণ শিক্ষার্থীদের কেউ এসব আসনে বসতে চাইলে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা তাদের বিভিন্নভাবে হেনস্তা করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ছাত্রলীগের এমন লাগামহীন আচরণে সাধারণ শিক্ষার্থীরা অতীষ্ট হয়ে পড়েছেন।
সাধারণ শিক্ষার্থীরা জানান, দীর্ঘদিন ধরে শাটল ট্রেনে ছাত্রলীগ নামধারীরা আসন দখল করে থাকলেও সম্প্রতি অসহনীয় পর্যায়ে চলে গেছে। প্রতিনিয়তই তাদের লাঞ্ছিত হতে হয় ছাত্রলীগের হাতে।
কলা ও মানব বিদ্যা অনুষদে অধ্যয়নরত রেফায়েত আলম নামে চতুর্থ বর্ষের এক ছাত্র বাংলানিউজকে বলেন, ‘প্রতিদিনই ট্রেনে চড়ে চট্টগ্রাম শহর থেকে ক্যাম্পাসে আসা-যাওয়া করি। যদি ভুল করে পেছনের সিটে বসেও যাই, তাহলে জুনিয়র কিছু ছেলে খুবই বাজে আচরণ করে। কিছু বললে অপমানিত হতে হয় তাদের হাতে।’
সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের চলাচলের প্রধান মাধ্যম শাটল ট্রেনের প্রতিটি বগির দু’পাশে ১২টি করে চব্বিশ সিট ছাত্রলীগের সদস্যদের জন্য সংরক্ষিত! সিটগুলোতে কোনো সাধারণ শিক্ষার্থী বসলে তাদের তুলে দেওয়া হয়। আর কেন তুলে দেওয়া হয় জানতে চাইলে সইতে হয় অপমানসহ মারধর।
ছাত্রলীগের শাটল ট্রেনের বগি সংগঠন ‘একাকার’র কর্মী ও পদার্থ বিদ্যা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র রাসেল বাংলানিউজকে বলেন, ‘বগি সদস্য ছাড়া পেছনের সিটগুলোতে বসা নিষেধ। এখানে কেউ বসে না। বসলেও উঠে যেতে হয়।’
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, ট্রেনের বগিগুলোতে সংগঠনটি নিজ নিজ বৈশিষ্টমণ্ডিত স্লোগান এবং নাম লিখে চিকা মেরেছে। এর মধ্যে দোস্ত, সিক্সটি নাইন, ভার্সিটি এক্সপ্রেস (ভিএক্স), একাকার, সাম্পান, অলওয়েজ, ককপিট, খাইট্টা খা, ওরিওর্স, ফাটাফাটি, ইউরেকা, ফাইট ক্লাব, এপিটাপ, সিএফসি এবং কনকর্ডসহ আরো বাহারি নাম। এদের আবার বিভিন্ন উপ গ্রুপও আছে বলে জানা গেছে।
বাহারি নামের এসব বগির দু’পাশের চারটি (১২ আসন) করে মোট আটটি সিট প্রতিটিই তাদের সদস্যদের জন্য সংরক্ষিত। ভিএক্স বগিতে গিয়ে দেখা যায় ‘অনলি ফর মেম্বার অব ভার্সিটি এক্সপ্রেস’ অন্যগুলোতে আছে ‘এসব সিট বগি মেম্বারদের জন্য সংরক্ষিত’ জাতীয় নানা লেখা।
চবি ছাত্রলীগ শাখার এক নেতা জানান, এসব বগি সংগঠনের দায়িত্বে দুই থেকে তিনজন করে পদপ্রাপ্ত নেতা রয়েছেন। আর এক একটা বগি নিয়ন্ত্রণ করছেন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের সদ্য ঘোষিত কমিটিতে স্থান পাওয়া সম্পাদকীয় পদের নেতারাও।
এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের মধ্যে আন্তকোন্দলও রয়েছে দাবি করেন নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই ছাত্রলীগ নেতা।
ছাত্রলীগ কর্মী রাসেল বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ছাত্রই জানে এসব আসন বগি সদস্যদের জন্য। অনেকে বসে না। আর যারা বসে তারাও উঠে পড়ে। বেশি প্যাচাল করলে ঝামেলা হয়।’
তবে কোন সদস্যের গেস্ট হয়ে থাকলে তারা বসতে পারেন বলে জানান ছাত্রলীগের ‘একাকার’ বগির কর্মী দাবি করা এই ছাত্র।
কিন্তু ‘ট্রেনে যারা এসব করছে এরা ছাত্রলীগের কেউ নয়’ দাবি করে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এম এ খালেদ চৌধুরী বাংলানিউজকে বলেন, ‘ছাত্রলীগের নাম ব্যবহার করে ট্রেনে এসব কর্মকাণ্ড করছে এক শ্রেণির ফায়দা লুটেরা।’ এদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য তিনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে দাবি জানান।
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ফের জোরেসোরে শুরু হয়েছে শাটল ট্রেনে ছাত্রলীগের বগিভিত্তিক রাজনীতি। সরকার সমর্থিত এ ছাত্রসংগঠনের নেতা-কর্মীরা বিভিন্ন বগির ভিতরে বাইরে লিখছেন তাদের নানা গ্রুপ এবং উপ-গ্রুপের নাম।
সংগঠনটির এমন তৎপরতায় আন্তকোন্দলে যে কোনো সময় বড় ধরনের সংঘর্ষের আশংকা করছেন সাধারণ শিক্ষার্থীসহ সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, ক্যাম্পাসে অভ্যেন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও ট্রেনের বগি দখলসহ আধিপত্যকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের বিভিন্ন গ্রুপ উপ-গ্রুপের মধ্যে বেশ কয়েকটি রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এসব সংগঠনকে নিষিদ্ধ করে। বিভিন্ন সময় এসব সংঘর্ষে হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে। বহিষ্কৃতও হয়েছেন অনেক শিক্ষার্থী।
গত বছরের মে মাসে এসব সংগঠনের নাম মুছে নতুন রং দেওয়া হয় ট্রেনে। এসব নাম মুছে সেখানে লেখা হয় বগি নিরুৎসাহিত মূলক বিভিন্ন স্লোগান।
চবির এমবিএর ছাত্র রুহুল আমিন বাংলানিউজকে বলেন, ‘বগিভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করে দেওয়ায় সংঘর্ষের ঘটনা কিছুদিন কমছিলো। সম্প্রতি আবার শুরু হয়েছে এসব কার্যকলাপ।’
তিনি বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞা জারি করেও এসব বন্ধ করতে পারছে না প্রশাসন। এখনই কোন ধরণের কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে তা আবার আগের মতোই বেপরোয়া হয়ে উঠবে। ঘটতে পারে বড় ধরণের সংঘর্ষ।’
শাটল ট্রেনের বগি রাজনীতি সম্পর্কে ছাত্রলীগ চবি শখার সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম আরিফুল ইসলাম বাংলানিউজকে বলেন, শাটল ট্রেনের বগিগুলো মূলত বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে সংস্কৃতি চর্চা করে থাকে। কিন্তু বর্তমানে বগিকে কেন্দ্র করে অপ্রীতিকর ঘটনা খুবই দুঃখজনক।’
তবে ছাত্রলীগ সভাপতিকে বারবার ফোন করেও পাওয়া যায়নি।
প্রসঙ্গত, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গত তিন বছরে বগিভিত্তিক সংগঠনগুলোর মধ্যে বড় ধরণের ১০টি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে আহত হয়েছেন প্রায় ৫০ জন। এসব ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন মেয়াদে বহিষ্কৃত হয়েছেন প্রায় ২৪ শিক্ষার্থী। এর মধ্যে সকলেই ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত বলেও সূত্র জানায়।
বিশ্ববিদ্যালয় পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মো. রফিকুল ইসলাম বাংলানিউজকে জানিয়েছেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসনের নিষেধ থাকা স্বত্ত্বেও এ ধরনের কার্যক্রম হচ্ছে। তবে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে আমরা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের ব্যবস্থা করবো।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর আবুল হাসনাত সেলিমুল্লাহ বাংলানিউজকে বলেন, ‘প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করেও যারা বগিতে সিট দখলসহ উচ্ছৃংখল কার্যক্রম পরিচালনা করছে তাদের ব্যাপারে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকরী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
বাংলাদেশ সময়: ২০১৪ ঘণ্টা, জুলাই ১০, ২০১২
এমবিএম/সম্পাদনা: আহমেদ জুয়েল, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর