৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২০, বৃহস্পতিবার মে ২৩, ২০১৩ ১২:৩৭ এএম BDST banglanew24
11 Jul 2012   02:36:52 AM   Wednesday BdST
E-mail this

মিরসরাই ট্রাজেডি:

সন্তানের স্মৃতি মনে পড়লে কলিজা ফেটে যায়


মিরসরাই করেসপন্ডেন্ট
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
সন্তানের স্মৃতি মনে পড়লে কলিজা ফেটে যায় মিরসরাই ট্রাজেডি:

চট্টগ্রাম: যে দিনের শোক আজো তাড়া করছে মিরসরাইয়ের প্রতিটি ঘরে। সেই মিরসরাই ট্রাজেডির এক বছর পূর্তি বুধবার। বছর ঘুরে আসল সেই দুঃসহ দিন। গত বছরের এই দিনে প্রায় অর্ধশত সন্তানের লাশের ভার বইতে হয়েছে পিতা-মাতার কাদে। একটি মাত্র দ‍ুর্ঘটনাই কেড়ে নিয়েছে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের।

গত ১১ জুলাই দুর্ঘটনায় সন্তানের স্মৃতি মনে আগলে রেখেছেন মিরসরাইয়ের মায়েরা। সেসব স্মৃতি মনে করে আজো ঘরের কোনে নীরবে কেঁদে বুক ভাসান সন্তানহারা পিতা-মাতা। সহপাঠী ও শিক্ষক-শিক্ষিকারাও খোঁজে বেরান হারিয়ে যাওয়া প্রতিটি ‘নক্ষত্রকে’।

মঙ্গলবার হতাহত পরিবারের খবর নিতে সরেজমিনে আবুতোরাব এলাকায় গেলে, নিহত ৬ষ্ট শ্রেনীর শিক্ষার্থী তোফাজ্জল হোসেনের পিতা জহির উদ্দিন ছেলের স্মৃতি চারণ করতে গিয়ে বলেন, ‘আমার এক মেয়ে পানিতে ঢুবে মারা গেছে। আবুতোরাব ট্রাজেডি অপর ছেলেকে আমাদের কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে। তার (তোফাজ্জলের) ব্যবহৃত জিনিসের প্রতি চোখ পড়লে বুকটা হু-হু করে কেঁদে উঠে। রাস্তা দিয়ে ছেলে মেয়েদের দৌঁড়-ঝাপ দেখলে মনে হয় আমার তোফাজ্জল ফিরে এসেছে।’

তিনি বলেন, তোফাজ্জল বেঁচে থাকতে বাড়ির সামনের পুকুরে মাছ ছেড়েছে। এখন সেই মাছ বড় হলেও বিক্রি করতে ইচ্ছে করছে না।

তোফাজ্জল হোসেনের রুমে গিয়ে দেখা যায় ঠিক আগের মতোই তার বই-খাতা টেবিলে পড়ে আছে। বেড়ার পেরেগে তার স্কুল ড্রেস ও কাপড়-ছোপড় ঝুলছে। ছেলের শেষ চিহ্ন হিসেবে এসব বুক দিয়ে আগলে রেখেছেন তার মা হাসিনা আক্তার।

অশ্রুভরা নয়নে তিনি বলেন, ছেলের (সন্তানের) স্মৃতি বুকে পাথর চেপে রেখেছি, মনে পড়লে কলিজা ফেটে যায়।

নিহত পঞ্চম শ্রেনীর শিক্ষার্থী রিয়াজ উদ্দিনের মা মর্জিনা আক্তার বলেন, ‘দুর্ঘটনা পরবর্তী ছেলের মৃত্যুর খবর সবাই আমার কাছ থেকে আড়াল করতে চেয়েছে কিন্তু মায়ের মন বলে কথা। তবুও ঘরের দেয়ালে টাঙিয়ে রাখা সন্তানের ছবিতে চোখ পড়লে মনে হয় সে ফিরে আসবে।’

স্যাটেলাইন চ্যানেলে ছেলের মৃত্যুর খবর দেখে পিতা নুরুল আলম প্রবাসের মাটিতে পাগল প্রায় হয়ে পড়ে আছেন বলে জানান তিনি।

তিনি বলেন, শিশুকাল থেকে রিয়াজের শিশুদের প্রতি অধিক স্নেহবোধ ছিল। অবসর সময়ে সে খেলাধুলা ও মায়ের সঙ্গে গল্প করতে পছন্দ করতো। এসব কথা বলতে বলতে অশ্রুজলে কন্ঠ স্তব্ধ হয়ে আসে তার।

কান্নাই তাদের চির সাথী:

একমাত্র সন্তান (ছেলে) হারানোর যন্ত্রনায় পঙ্গুত্বকে বরণ করে মানসিক রোগী হিসেবে বেঁচে আছেন আবুতোরাব কলেজের ২য় বর্ষের শিক্ষার্থী ইফতেখার হাসান মাহমুদের পিতা কামরুল আহসান মাহমুদ।

মা রোকেয়া বেগম বলেন, দুর্ঘটনা পরবর্তী আবুতোরাব এলাকায় বাড়তি মানুষের কোলাহলে সন্তানের অনুপস্থিতি তেমনটা অনুভব হয়নি। তখন মনে হতো আমার ছেলে কোথাও গেছে, আবার ফিরে আসবে। ধীরে ধীরে যখন আমরা একা হয়ে গেলাম তখন প্রতিটা মুহূর্ত দূর্বিসহ হয়ে উঠেছে।’

পরিবারের একমাত্র ছেলে সন্তান হিসেবে তার ওপর আমাদের অনেক আশা-ভরসা ছিল। কিন্তু এখন আর কিছুই আর অবশিষ্ট রইলনা। আমরা কি নিয়ে বাঁচবো, কিসের আশায় বাঁচবো।

বাবা কামরুল আহসান বলেন, পরিবারের অন্যান্যদের শান্ত রাখতে ঘরে আমি কান্না করতে পারিনা, স্বস্তি পেতে বাইরের নিবৃত্বে গিয়ে কান্না করতে হয়।

মা রোকেয়া বেগম বলেন, দুর্ঘটনায় যারা পরিবারের একমাত্র সন্তানকে হারিয়েছে ওইসব পরিবারে শোক আর হতাশাই এখন চির সঙ্গী। তাই বাংলানিউজের মাধ্যমে বিষয়টি বিবেচনার জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রতি অনুরোধ জানান তিনি।

প্রতিক্ষার যেন শেষ নেই :

চালকের সামান্য অবহেলায় সন্তান চলে গেছে না ফেরার দেশে। একমাত্র সন্তানের পথ চেয়ে মরিচিকায় চোখ রেখে অপেক্ষার প্রহর গুনছেন মা-বাবা। এই প্রতিক্ষার কি কোনো শেষ আছে ?

নিহত ৮ম শ্রেনীর শিক্ষার্থী তাকিউল্লাহ মাহমুদ শাকিলের মা পারভিন আক্তার ও বাবা ছাদরুল আমিন মহমুদ ফারুক বলেন, শাকিল আমাদের মরিচিকার মধ্যে ফেলে চলে গেছে। মারা যাওয়ার পর রাস্তা-ঘাটে শিশুদের দেখলে একবার মনে হয় শাকিল ফিরে আসবে। আবার মনে হয় ছেলেকে চিরতরে হারিয়ে ফেলেছি।

মা পারভিন আক্তার ছেলের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, ‘গত (২০১১ সালের) বছরের এই দিনে (১০ জুলাই) শাকিলের পোষা পায়রা বাক-বাকুম করে ডাকলে সে (শাকিল) আমাকে দেখিয়ে বলে মা আমি কি অনেক ভাগ্যবান ? জবাবে আমি বললাম হ্যা বাবা। কিন্তু কে জানতো পরদিনই তার ভাগ্যে মৃত্যু লেখা রয়েছে।’

তিনি বলেন, সন্তান বেচে থাকতে প্রতিরাতে তার মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুমোতে যেতাম। কিন্তু এখন রাত কাটে কান্না করতে করতে। এসব বলতে বলতে কন্ঠ স্তব্ধ হয়ে আসে তার।

শুধু তোফাজ্জল হোসেন রিয়াজ উদ্দিন, ইফতেখার হাসান, কামরুল আহসান, তাকিউল্লা মাহমুদ নয় দুর্ঘটনায় নিহত প্রতিটি পরিবারেই একই অবস্থা বিরাজ করছে। দুর্ঘটনা পরবর্তী এক বছর অতিবাহিত হলেও প্রিয় বন্ধুকে হারিয়ে সহপাঠীরাদের মাঝে আজও যেন স্বস্তি ফেরেনি।

বুধবার মিরসরাই ট্রাজেডির এক বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে নিহতদের রুহের মাগফেতার কামনা করে পরিবারগুলোতে মিলাদ-মাহফিল, দুস্তদের মাঝে খাদ্য বিতরণ ও অন্যান্য ধর্মালম্বীদের বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, গত বছরের ১১ জুলাই মিরসরাইয়ের আবুতোরাব-বড়তাকিয়া সড়কে পিকআপ খাদে পড়ে ৪৪ জন শিক্ষার্থীসহ মোট ৪৫ জন নিহত ও প্রায় অর্ধশতাধিক আহত হয়। সড়ক দ‍ুর্ঘটনায় এক সঙ্গে এত শিক্ষার্থী নিহতের ঘটনা ইতিহাসে যেমন বিরল, তেমনি এই শোকের শেষ কবে তাও যেন কারোরই জানা নেই।

বাংলাদেশ সময়: ০২১০ ঘণ্টা, জুলাই ১১, ২০১২
প্রতিবেদন: মু. রিগান উদ্দিন/সম্পাদনা: বেনু সূত্রধর,নিউজরুম এডিটর

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Bookmark and Share
REVE Systems
VISA Center Inc
Holy Hajj BD
RehabHousing.com

জাতীয়

8877
Kaspersky Lab - Antivirus Software [ Bangladesh ]
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম | এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন

ফোন: +৮৮০ ২ ৮৪০২১৮১, ৮৪০২১৮২ আই.পি. ফোন: +৮৮০-৯৬১২১২০০০০ নিউজ রুম সেল: +৮৮-০১৭২৯০৭৬৯৯৬, ০১৭২৯০৭৬৯৯৯ ফ্যাক্স: +৮৮০ ২ ৮৪০ ২৩৪৬
ইমেইল: news.bn24@gmail.com, editor.banglanews@gmail.com, editor@banglanews24.com    বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম    এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন

বাংলায় লেখা হলে ইউনিকোডে পরিবর্তন করে ইমেইল করুন    কপিরাইট © 2013 সকল স্বত্ব ® সংরক্ষিত    একটি ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেড প্রতিষ্ঠান