 |
ঢাকা: আজ ২৮ এপ্রিল। ঊনিশ শো সাতচল্লিশের এই দিনে মুন্সিগঞ্জ জেলার বিক্রমপুরের রাঢ়িখাল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন প্রথাবিরোধী, বহুমাত্রিক লেখক ও ভাষাবিজ্ঞানী হুমায়ুন আজাদ।
হুমায়ুন আজাদের অনেক সত্তা এবং প্রতিটি সত্তাই গুরুত্বপূর্ণ। তার চিন্তা ও চেতনা উঠে আসে ক্ষুরধার লেখনীতে। সচেতনভাবে সাহস করেই তিনি লিখেছেন। তার লেখার প্রক্রিয়াটি হচ্ছে একটি যৌক্তিক প্রক্রিয়া। চিন্তার জগতে তিনি ছিলেন স্বাধীন। সেই স্বাধীন চিন্তাই একসময় কাল হলো হুমায়ুন আজাদের। তার মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে স্তব্ধ করে দিতেই ২০০৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি তার ওপর হামলা চালায় একদল দুর্বৃত্ত।
সেই নৃশংস আক্রমণে ক্ষত-বিক্ষত হুমায়ুন আজাদ আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান আর মানুষের অফুরন্ত ভালোবাসার শক্তিতে বেঁচে উঠলেও ভেতর থেকে ক্ষয়ে গিয়েছিলেন পাড়ভাঙা নদীর মতন।
২০০৪ সালের ১১ আগস্ট জার্মানির মিউনিখে আকস্মিকভাবে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন হুমায়ুন আজাদ। ১২ আগস্ট তার ফ্ল্যাটের নিজ কক্ষে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। জার্মানি যাওয়ার মাত্র পাঁচ দিন পর তার এই মৃত্যু রহস্যময় প্রতীয়মান হয়েছে।
বর্ণাঢ্য জীবনে হুমায়ূন আজাদ
১৯৬২ সালে জে. সি. বোস ইন্সটিটিউশন থেকে মাধ্যমিক পাস করেন হুমায়ুন আজাদ। পূর্ব পাকিস্তানে তিনি একুশতম স্থান অধিকার করেছিলেন। অনিচ্ছাসত্ত্বেও ঢাকা কলেজে ভর্তি হন বিজ্ঞান বিভাগে। সেখান থেকে দ্বিতীয় বিভাগে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। তারপর ১৯৬৪ সালে পারিবারিক প্রতিকূলতা পেরিয়ে তিনি ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে। অনার্সে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হন। ১৯৬৯ সালে সেখান থেকেই বাংলায় আবারো প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।
একই বছর তিনি শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন চট্টগ্রাম সরকারি মহাবিদ্যালয়ে। তারপর ১৯৭০ সালে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে প্রায় এগারো মাস কাজ করেন। ১৯৭০ সালের ১২ ডিসেম্বরে চলে আসেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে সহকারী অধ্যাপক পদে।
হুমায়ুন আজাদ ১৯৭৩ সালে কমনওয়েলথ বৃত্তি পেয়ে পিএইচ.ডি. ডিগ্রি নেওয়ার জন্য চলে যান এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সে সময় প্রায় তিন বছর তিনি সৃষ্টিশীল লেখালেখি থেকে দূরে ছিলেন। তবে অন্তরঙ্গ বন্ধু রবার্টের সঙ্গে অনুবাদ করেন জীবনানন্দ দাশের কবিতা। তাদের দুজনের করা করা কয়েকটি অনুবাদ, এর অনেক পরে, নব্বই দশকের গোড়ায় ছাপা হয় স্কটল্যান্ড পোয়েট্রি রিভিয়্যু পত্রিকায়।
১৯৭৬ সালে এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভাষাবিজ্ঞনে অর্জন করেন পিএইচ.ডি. ডিগ্রি। ১৯৭৭ সাল থেকে তিনি পুরোপুরিই লেখালেখির জগতে প্রবেশ করেন। ১৯৭৮ সালের ১ নভেম্বর সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চলে আসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে।
তার কাব্যগ্রন্থগুলো হলো- অলৌকিক ইস্টিমার (১৯৭৩), জ্বলো চিতাবাঘ (১৯৮০), সবকিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে (১৯৮৫), আমি বেঁচে ছিলাম অন্যদের সময়ে (১৯৯০), হুমায়ুন আজাদের শ্রেষ্ঠ কবিতা (১৯৯৩), আধুনিক বাংলা কবিতা (১৯৯৪), কাফনে মোড়া অশ্রুবিন্দু (১৯৯৮) সহ বেশ কটি কাব্যগ্রন্থ।
বাংলা উপন্যাসে নতুন মাত্রা এনেছিলেন হুমায়ূন আজাদ। ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল (১৯৯৪), সব কিছু ভেঙে পড়ে (১৯৯৫), মানুষ হিসাবে আমার অপরাধসমূহ (১৯৯৬), যাদুকরের মৃত্যু (১৯৯৬), শুভব্রত, তাঁর সম্পর্কিত সুসমাচার (১৯৯৭), রাজনীতিবিগণ (১৯৯৮), কবি অথবা দন্ডিত অপুরুষ (১৯৯৯), নিজের সঙ্গে নিজের জীবনের মধু (২০০০), দশ হাজার এবং আরো একটি ধর্ষণ (২০০৩), উপন্যাস সমগ্র-২ (২০০১), পাক সার জমিন সাদ বাদ (২০০৩) উল্লখেযোগ্য।
যুক্তিবাদী সমালোচক ছিলেন হুমায়ুন আজাদ। তার সমালোচনা গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে- রবীন্দ্রপ্রবন্ধ: রাষ্ট্র ও সমাজনীতি (১৯৭৩), শামসুর রাহমান: নিসঙ্গ শেরপা (১৯৮৩), শিল্পকলার বিমানবিকীকরণ ও অন্যান্য প্রবন্ধ (১৯৮৮), নারী (১৯৯২), প্রতিক্রিয়াশীলতার দীর্ঘ ছায়ার নীচে (১৯৯২), জলপাই রঙের অন্ধকার (১৯৯২), আমার নতুন জীবন (২০০৫), অনুবাদ গ্রন্থ - দ্বিতীয় লিঙ্গ (২০০১) সহ উল্লেখযোগ্য সমালোচনার বই।
ভাষাবিজ্ঞান বিষয়ে লেখা তার বইগুলো হলো- বাংলা ভাষা- প্রথম খণ্ড (সম্পাদিত) (১৯৮৪), বাংলা ভাষা- দ্বিতীয় খণ্ড (সম্পাদিত) (১৯৮৫), প্রনোমিলাইজেশান ইন বেঙ্গলি (১৯৮৩), বাংলা ভাষার শত্রুমিত্র (১৯৮৩), বাক্যতত্ত্ব (১৯৯৪), তুলনামূলক ও ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞান (১৯৮৮), অর্থবিজ্ঞান (১৯৯৯)। এছাড়া তার অন্যান্য ভাষাবিজ্ঞানও রয়েছে।
বাংলাভাষা ও সাহিত্যের জন্য ১৯৮৬ সালে তিনি বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার, শিশু সাহিত্যের জন্য অগ্রণী ব্যাংক পুরস্কার এবং ২০০৪ সালে মার্কেন্টাইল ব্যাংক পুরস্কার লাভ করেন।
৮ বছরেও বিচার হয়নি
৮টি বছর পেরিয়ে গেছে। আজও হুমায়ূন আজাদের ওপটর বর্বরোচিত হামলার যথার্থ বিচার হয়নি। দীর্ঘদিন পর হুমায়ুন আজাদের ওপর আক্রমণকারীদের পরিচয় মেলে তাদের নিজ জবানিতেই। আটক শীর্ষ জঙ্গি, ইতিমধ্যে যাদের মৃত্যুদণ্ডও কার্যকর হয়েছে, তারা স্বীকার করেছিল এর দায়। কিন্তু এর পেছনে কারা এ ব্যাপারে কলকাঠি নেড়েছিল, তা আজও রহস্যাবৃত। হুমায়ুন আজাদ আক্রান্ত হওয়ার মামলাটি এখন চলে গেছে প্রায় হিমাগারে।
হুমায়ুন আজাদ এক চলমান সত্তার নাম। আজও তিনি বিস্মৃত নন। তিনি জানতেন কারা তাকে আক্রমণ করেছে। তার সত্তা জেগে আছে। জেগে থাকবে প্রতিক্রিয়াশীলদের রুখে দাঁড়াতে।
বাংলাদেশ সময়: ০২২৬ ঘণ্টা, এপ্রিল ২৮, ২০১২
এডিএ/
সম্পাদনা: নজরুল ইসলাম, নিউজরুম এডিটর;
জুয়েল মাজহার, কনসালট্যান্ট এডিটর।