অনলাইন জগতে সদ্য প্রয়াত হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে চলছে আলোচনা। ব্লগ ফেসবুকে তাঁর সৃষ্টিশীল কাজ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে; তবে সবচেয়ে বেশি হচ্ছে হুমায়ূনের ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ।
আসলে হুমায়ূন কত বড় মাপের সাহিত্যিক ছিলেন? এ নিয়ে বিতর্কের কমতি হবে বলে মনে হয় না। জনপ্রিয়তা এবং সাহিত্যের মানকে যদি আলাদাভাবে বিচার করি তবে বিতর্কে কেরোসিন ঢেলে দেওয়া হবে।
আমরা অনেকেই জানি নন্দিত নরকে প্রকাশ হওয়ার পর আহমদ ছফার পছন্দের লেখক হয়ে ওঠেন হুমায়ূন আহমেদ। কিন্তু ধীরে ধীরে ছফা তার প্রতি হতাশ হয়ে ওঠেন। সস্তা সাহিত্য দিয়ে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে উঠে যাওয়ার অভিযোগ এনে হুমায়ূন আহমেদকে তীব্র সমালোচনার শরে বিদ্ধ করেন ছফা। শুধু ছফা নন। এই তালিকায় ছিলেন ড. হুমায়ূন আজাদও। তার লেখা ‘সবকিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে’ বইটি উৎসর্গ করেছিলেন হুমায়ূন আহমেদ এবং ইমদাদুল হক মিলনকে।
তাই বলে হুমায়ূন কি দমে ছিলেন? তিনি নিজের বেশে এগিয়ে গেছেন। সৃষ্টি করে গেছেন হিমু, মিসির আলী এবং শুভ্র’র মতো ভিন্নধর্মী সব চরিত্র।
তবে একটি জায়গায় হুমায়ূন বাংলা সাহিত্যে কালজয়ী হিসেবেই থেকে যাবেন; সেটি হলো হুমায়ূন আহমেদ বাংলার মধ্যবিত্ত সমাজকে সাহিত্যের ভেতর নিয়ে এসেছেন। মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর সুখ-দুঃখ-বেদনার গল্পগুলো তিনি অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে তুলে এনেছেন বইয়ের পাতায়।
সাধারণ ঝরঝরে বাক্যে হুমায়ূনের সাহিত্যে সাধারণ পাঠকের বিনোদনের খোরাক অঢেল। সেই হুমায়ূন চলে গেলেন। মৃত্যুর কাছে শেষমেষ তিনি সমর্পিত হলেন। প্রতিটি মানুষকেই তা হতে হয় সময় ফুরিয়ে এলে। এটাই মানুষের অনিবার্য নিয়তি। এই বিষয়ে তিনি সাক্ষাৎকারে বলেছেন,
“মৃত্যু নিয়ে আমার কোনো আফসোস নেই। মরে গেলাম ফুরায়া গেল। তবে এটা আমার কাছে খুব পেইনফুল। একটা মানুষ পৃথিবীতে এতো ক্ষমতা নিয়ে আসে, ৭০ বা ৮০ বছর বাঁচে। তারপর শেষ। আর একটা কচ্ছপ সাড়ে তিনশ বছর বাঁচে। হোয়াই? কচ্ছপের মত একটা প্রাণীর এতো বছর বাঁচার প্রয়োজন কী?”
এভাবেই মৃত্যুর কথা বহুবার উল্লেখ করেছেন হুমায়ূন আহমেদ। এসব কথার অনেকগুলোই হয়তো এতোদিনে পাঠকদের মুখস্থ হয়ে গেছে। পত্রিকা কিংবা অনলাইল জগতে বারবার সবাই উল্লেখ করছে।
হুমায়ূনের নন্দিত উপন্যাসগুলোর মধ্যে একটি হলো ‘মাতাল হাওয়া’। এই উপন্যাসটি নিয়ে একটু আলোচনা করা যাক। অন্যপ্রকাশ থেকে ২০১০ সালে প্রকাশিত হয়। বইটির উৎসর্গ পত্রটিও মৃত্যু নিয়ে।
উৎসর্গ পত্রে লেখা-
কোনো মৃত মানুষ মহান আন্দোলন চালিয়ে নিতে পারেন না। একজন পেরেছিলেন। আমানুল্লাহ মোহম্মদ আসাদুজ্জামান।
তার রক্তমাখা শার্ট ছিল ঊনসত্তরের গণ আন্দোলনের চালিকাশক্তি।
একটি আন্দোলনকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য ‘মৃত্যু’ প্রয়োজন। এই ছিল ম্যাসেজ। হয়তো আমার ধারণা ভুল। মাতাল হাওয়া উপন্যাসটি ঊনসত্তরের গণ আন্দোলন নিয়ে লিখেছেন। যেখানে তারই নিজস্ব ঢঙে মধ্যবিত্ত চরিত্রগুলো নিয়ে খেলা করেছেন। দেশের রাজনীতির সঙ্গে পরিবার এবং সমাজের রাজনীতির চিত্র তুলে এনেছেন। পুরোটা সময়জুড়ে হুমায়ূন গল্প বলে গেছেন। মাঝখানে সাহিত্যের ফর্ম ভেঙে লেখক তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা সরাসরি উল্লেখ করেছেন। কেন আমি ফর্ম ভাঙার কথা বললাম সেই বিষয়ে পরে আসছি।
উপন্যাসের শুরু হয় হাজেরা বিবি এবং হাবু চরিত্র দিয়ে। হাবু একজন আইনজীবী এবং হাজেরা বিবি তার মা। হাবুর নাম আসলে হাবীব। মায়ের আদুরে ডাক হাবু। সারাক্ষণ পাগলামি করতে থাকা এই বৃদ্ধা উপন্যাস জুড়ে ছিলেন। হাবিবের কাছে মক্কেল এসেছে। দুইজন মানুষের সঙ্গে বোরকা পরা একজন মেয়ে। কিন্তু চতুর হাবীব বুঝে ফেলেন বোরকার আড়ালে কোনো মেয়ে নয়, একজন পুরুষ। পুরুষ না বলে ছেলে বলাই ভালো। ছেলেটির নাম হাসান রাজা চৌধুরী। এই ছেলেটি তার মামাকে খুন করেছে। কেন খুন করেছে সেই বিষয়ে সে কিছুই বলে না।
উপন্যাসের ক্লাইমেক্স তখনই শুরু হয়। তবে তার আগে ফরিদ নামে একটি চরিত্রের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন লেখক। হাবীবের বাসায় আশ্রিত ফরিদ। এই বিষয়ে লেখক চমৎকার একটি ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন,
বড় বড় বাড়ির শোভা হচ্ছে কিছু উটকা মানুষ। আশ্রিত মানুষ। এরা বাড়ির সঙ্গে যুক্ত হয় না। কোনো কাজকর্ম করে না। থাকবে, খাবে এবং লজ্জিত হয়ে জীবনযাপন করবে। এদের লজ্জাটাই বাড়ির শোভা।
ফরিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সে ঘরের আরেক মেয়ে সফুরার সঙ্গে দৈহিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল। সফুরার পেটে সন্তান চলে এসেছে। ফরিদকে শাস্তি স্বরূপ সফুরাকে বিয়ে করতে হবে। ফরিদ পুরো উপন্যাসে অসহায় চরিত্র। হুমায়ূনের সব উপন্যাসে এমন একটি অসহায় চরিত্র থাকবেই।
যাই হোক। পুরো উপন্যাস জুড়ে একটি বিভ্রান্ত ছড়িয়ে বেড়ায় হাজেরা বিবি। তিনি বলতে চান সফুরাকে আসলে শারীরিকভাবে হাবীবই ব্যবহার করতো। যদিও শেষে হাবীবের মেয়ে নাদিয়াকে দিয়ে লেখক বলান, হাবীব এই কাজটি করেনি। তারপরও সফুরার গর্ভের সন্তানটি আসলে কার এই বিষয়টি উপন্যাসে অমিমাংশিতই থেকে যায়।
উপন্যাসের ফাঁকে ফাঁকে ইতিহাসের নানান বিষয় ঢুকিয়ে দেন লেখক। উপন্যাসে জটিলতা তৈরি হলেই তিনি পাঠকদের নিয়ে যান ইতিহাসের দিকে। যেখানে গভর্নর মোনায়েম খান, বঙ্গবন্ধু সহ আরো বেশকিছু চরিত্র আছে।
তবে লেখকের নিজের উপস্থিতি পাঠককে চমক দিতে পারে। তিনি নিজেই উপন্যাসের ভেতর ঢুকে পড়েন। চরিত্রগুলোর সঙ্গে এমনভাবে নিজেকে খাপ খাওয়ান যেন মনে হবে লেখকের চোখের সামনেই চরিত্রগুলোর পরিণতি ঘটছে। ফর্ম ভাঙার কথা বলছিলাম। এখানেই লেখক ফর্ম ভেঙে দিয়েছেন।
উপন্যাসের সবগুলো চরিত্রই লেখক জাসটিফাই করেছেন। একটি ছাড়া। সেটি হলো, হাবীবের স্ত্রী লাইলী। লাইলীকে অনেকটা ঘরের বউয়ের মত আড়াল করে রেখেছেন লেখক। উপন্যাসে খুব একটা ভূমিকা তার নেই।
নাদিয়ার সঙ্গে হাসান রাজা চৌধুরীর বিয়ের আলাপ চলতে থাকে। অন্যদিকে ফরিদের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে হাসান রাজাকে বাঁচানোর চেষ্টাও চলে। কিন্তু হাসান জজ সাহেবের বাড়িতে গিয়ে সব দোষ স্বীকার করে আসে। তার মামা তাকে ছোটবেলায় শারীরিকভাবে ব্যবহার করতো তাই সে খুন করেছে বলে লেখক পাঠকদের জানান।
উপন্যাসের প্রায় শেষের দিকে খুনের কারণ উন্মোচিত হয়। হাসান রাজা জেলে যায়। অন্যদিকে ভাদু নামে বোকা সেজে থাকা চরিত্রটি সুযোগ বুঝে নাদিয়াকে ধর্ষণ করে মেরে ফেলে। হাসান রাজারও ফাঁসি হয়। উপন্যাসের সমাপ্তি ঘটে।
উপন্যাসে রাজনীতি উপস্থিত। ভাদু কিংবা নাদিয়া কিংবা হাসান রাজা কিংবা ফরিদ সবাই রাজনীতির সঙ্গে এগিয়ে গিয়েছে। চরিত্রগুলোর একে অন্যের সঙ্গে দ্বন্দ্ব ছিল। নাদিয়া পছন্দ করে তার এক শিক্ষককে। কিন্তু বাবার পছন্দে বিয়েতে রাজি হয়ে যায়। সেখানে কোনো আলাপ লেখক করেন নাই।
অন্যদিকে যে মামাকে হাসান রাজা খুন করে, তার সেই মামার মেয়ের সঙ্গে হাসানের বিয়ে হয়। কিন্তু একদিনের মধ্যে সে বিয়ে ভেঙে যায়। সেখানেও হাসানের কোনো ব্যাখ্যা ছিল না। অসহায় ক্যারেক্টার। এভাবেই মানুষের মনের বিচিত্র রসায়ন প্রকাশ পায় উপন্যাসে। যে রসায়ন মানুষের অজানা। নিজের সঙ্গে নিজের দ্বন্দ্ব কিংবা মনের সঙ্গে মনের দ্বন্দ্ব পাঠকের মনেও প্রশ্ন তৈরি করবে। প্রশ্ন নিয়েই উপন্যাস শেষ করবে। আর মনের মধ্যে বিরাট প্রশ্ন তৈরি করেই ‘মাতাল হাওয়া’ সার্থক উপন্যাসের দাবি করে ফেলতে পারে।
হুমায়ূন আহমেদ এমন একজন লেখক যিনি চরিত্র নিয়ে খেলা করতে পারতেন। আমার কাছে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে এমন মনে হয়। মানিকও চরিত্র নিয়ে খেলা করতে পারতেন। মনে হতো চরিত্রগুলো সম্পূর্ণ তার নিয়ন্ত্রণে।
হুমায়ূন বাংলা সাহিত্যের রাজপূত্র হয়ে থাকবেন। তিনি ক্যান্সার আক্রান্ত হয়েছিলেন ঠিকই কিন্তু মারা গেলেন কোনো এক অজানা ইনফেকশনে। এ যেন তারই রচিত কোনো এক গল্পের মতো। যা নিয়তি হওয়ার কথা তা হলো না। জীবনের কেমিস্ট্রি সৃষ্টিকর্তার হাতে। তিনি যেভাবে নিয়ন্ত্রণ করেন সেভাবেই মানুষের ভাগ্য রচিত হয়। এটাই প্রমাণ হলো (এটা হুমায়ণ বিশ্বাস করতেন)।
হুমায়ূন মাঝখানে যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশে এসে ছুটে গিয়েছিলেন নুহাশ পল্লীতে। সেখানে সময় কাটিয়েছেন। মিডিয়ার সামনে আসা যার তেমন আগ্রহ ছিল না সেই হুমায়ূন বলতে গেলে সব মিডিয়ার সামনে তখন এসেছেন। কথা বলেছেন। আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে আড্ডায় লিপ্ত হয়েছেন। মায়ের সঙ্গে সময় কাটিয়েছেন। গাছ ও প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটিয়ে চলে গেলেন। এ যেন তার উপন্যাসে লেখা লাইনের মতই মৃত্যু। ‘আমার আপন আঁধার’ উপন্যাসের একটি জায়গায় তিনি বলেছিলেন, “অন্য ভূবনে যাত্রার আগে আগে সবাই প্রিয়জনদের দেখতে চায়।”
ঠিকই তো। সব প্রিয়জনদের সঙ্গে দেখা করে হুমায়ূন যাত্রা করলেন অজানা অচেনা জগতে। যাত্রা মঙ্গল হোক। এরচেয়ে বেশি আমরা আর কিই বা কামনা করতে পারি?
হুমায়ূন আহমেদের এপিটাফ কী হবে? এই নিয়ে তিনি বহুবার কথা বলেছেন। তার এপিটাফ লেখবে কে? কেউ কি এমন আছে? তার ‘আমি’ নামে আত্মজৈবনিক এক রচনায় William Faulkner নামে এক লেখকের উদ্ধৃতি দিয়েছেন। যেখানে William Faulkner বলছেন, he wrote books, then he died.
একজন লেখকের জন্য এরচেয়ে বড় এপিটাফ আমার দৃষ্টিতে নেই। আমরাও বলতে পারি, humayun wrote books, then he died অর্থাৎ হুমায়ূন বই লিখেছেন, তারপর মারা গেছেন। যে বইগুলোতে তিনি একের পর এক চরিত্র সৃষ্টি করে গেছেন। তিনি চরিত্র সৃষ্টি করে করেই মারা গেছেন।
বাংলাদেশ সময়: ১৪১২ ঘণ্টা, ৩১ জুলাই, ২০১২
সম্পাদনা: আহ্সান কবীর, আউটপুট এডিটর